অষ্টম শ্রেণি: বাংলা, অধ্যায় – 5: সবুজ জামা – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, 5 নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় 5: সবুজ জামা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. ‘সবুজ জামা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল বিষয়বস্তু বা অন্তর্নিহিত ভাব পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত আলোচ্য কবিতাটির ‘সবুজ জামা’ নামকরণটি বিষয়বস্তু ও ভাবসত্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক।

কবিতাটির শুরু থেকেই একটি ছোট্ট ছেলে তোতাইয়ের প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার গভীর বাসনা প্রকাশ পেয়েছে। সে স্কুলের চার দেওয়ালের বন্দিদশা বা বইয়ের পাতার নীরস অক্ষরগুলি পছন্দ করে না। তার বদলে সে গাছের মতো শান্ত হয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। গাছের যেমন পাতায় ঘেরা সবুজ আচ্ছাদন থাকে, তোতাইয়েরও ঠিক তেমনই একটি ‘সবুজ জামা’ চাই, যাতে রঙিন প্রজাপতিরা এসে তার গায়ে বসে।

এখানে ‘সবুজ জামা’ কেবল একটি পোশাক নয়, এটি সজীবতা, প্রাণশক্তি এবং প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপক। আধুনিক কংক্রিটের যান্ত্রিক সভ্যতায় যখন মানুষের মন থেকে সজীবতা হারিয়ে যাচ্ছে, তখন তোতাইয়ের সবুজ জামা পরার আকাঙ্ক্ষা আসলে পরিবেশ বাঁচানোর এবং মনকে সবুজে ভরিয়ে তোলারই এক নীরব আবেদন। সমগ্র কবিতাটি এই সবুজ জামা পরার বা প্রকৃতির সাথে এক হয়ে যাওয়ার বাসনাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তাই ‘সবুজ জামা’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে।

2. ‘সবুজ জামা’ কবিতার অন্তর্নিহিত মূল ভাব বা বক্তব্য নিজের ভাষায় আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘সবুজ জামা’ কবিতায় একটি ছোট্ট শিশুর ভাবনার আড়ালে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধে এক জোরালো ও নিবিড় প্রকৃতির প্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতায় তোতাই নামের ছোট্ট ছেলেটি চার দেওয়ালের গণ্ডিতে আবদ্ধ স্কুলে যেতে চায় না। দাদুর মতো চশমা চোখে দিয়ে বইয়ের পাতার নীরস অক্ষর বা বর্ণমালা পড়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। কারণ এই পুঁথিগত শিক্ষা তাকে আনন্দ দেয় না। তার প্রকৃত আনন্দ লুকিয়ে আছে প্রকৃতির বিশাল পাঠশালায়। সে গাছের মতো এক পায়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে চায়। তার বিশ্বাস, সে যদি গাছের মতো সবুজ জামা পরে, তবে তার গায়ে রঙিন প্রজাপতি এসে বসবে।

কবিতার মূল বক্তব্য হলো— বর্তমান যুগের কৃত্রিম ও যান্ত্রিক জীবনব্যবস্থা মানুষের স্বাভাবিক আনন্দকে কেড়ে নিচ্ছে। তাই তোতাইয়ের মতো নিষ্পাপ শিশুদের প্রকৃতির কোলে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া উচিত। গাছপালার সাথে বন্ধুত্ব এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যই মানুষকে প্রকৃত বাঁচার আনন্দ দিতে পারে, এটাই কবিতার মূল সুর।

3. তোতাইবাবু ও তার দাদুর চিন্তা-ভাবনা এবং জীবনাচরণের যে বৈপরীত্য কবিতায় ফুটে উঠেছে, তা বিস্তারিত লেখো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

‘সবুজ জামা’ কবিতায় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে দুটি ভিন্ন প্রজন্মের দুটি বিপরীতমুখী জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন।

দাদুর জীবনাচরণ: দাদু হলেন আধুনিক যান্ত্রিকতা, কৃত্রিমতা এবং নীরস পুঁথিগত শিক্ষার প্রতীক। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি প্রকৃতির সজীবতা থেকে দূরে সরে গেছেন। তিনি চশমা ছাড়া চোখে দেখতে পান না। এই চশমা হলো এক ধরনের কৃত্রিম আবরণ। তিনি সারাদিন বইয়ের পাতার মধ্যে মুখ গুঁজে থাকেন এবং তোতাইকেও প্রকৃতির আনন্দ থেকে সরিয়ে এনে কেবল অ, আ, ক, খ পড়তে নির্দেশ দেন। দাদুর চশমায় কখনো প্রজাপতি বা প্রকৃতির সৌন্দর্য এসে ধরা দেয় না।

তোতাইয়ের জীবনাচরণ: অন্যদিকে তোতাইবাবু হলো সজীবতা, প্রাণবন্ততা এবং স্বাধীনতার প্রতীক। সে চার দেওয়ালের বন্দিশালা, বইয়ের পাতার কালো অক্ষর এবং কৃত্রিমতা একেবারেই পছন্দ করে না। তার কাছে প্রকৃত আনন্দ হলো সবুজ গাছ, খোলা হাওয়া এবং রঙিন প্রজাপতি। সে প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে একটি সহজ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চায়। এভাবেই যান্ত্রিকতার সাথে প্রকৃতির এক অপূর্ব বৈপরীত্য কবিতায় ফুটে উঠেছে।

4. ‘সবুজ জামা’ কবিতা অবলম্বনে তোতাইবাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘সবুজ জামা’ কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো ছোট্ট ছেলে তোতাইবাবু। কবিতায় তার চরিত্রের যে বিশেষ দিকগুলি ফুটে উঠেছে, তা হলো:

  • প্রকৃতিপ্রেমী: তোতাইবাবুর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার অগাধ প্রকৃতিপ্রেম। সে চার দেওয়ালের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতির খোলা পরিবেশে থাকতে ভালোবাসে। গাছের মতো এক পায়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করাটাই তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের।
  • কল্পনাপ্রবণ ও নিষ্পাপ: তোতাইবাবুর মন অত্যন্ত নিষ্পাপ ও কল্পনাপ্রবণ। তার শিশুসুলভ বিশ্বাস হলো, সে যদি গাছের পাতার মতো একটি সবুজ জামা গায়ে দেয়, তবে রঙিন প্রজাপতিরা তাকে গাছ ভেবে তার গায়ে এসে বসবে।
  • কৃত্রিমতা বিরোধী: তোতাইবাবু আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা এবং প্রথাগত পুঁথিগত শিক্ষার ঘোর বিরোধী। দাদুর মতো চোখে চশমা দিয়ে বইয়ের পাতার নীরস বর্ণমালা পড়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। সে কৃত্রিম জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে আগ্রহী।

পরিশেষে বলা যায়, তোতাইবাবু আধুনিক যুগের এক যান্ত্রিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসারই এক সার্থক প্রতিনিধি।

5. “গাছেরা কেমন সবুজ জামা পরে থাকে / আমাদের তোতাইবাবুরও একটি সবুজ জামা চাই” – গাছেরা কীভাবে সবুজ জামা পরে থাকে? তোতাইবাবুর সবুজ জামা চাওয়ার কারণ কী? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

গাছেদের সবুজ জামা: প্রকৃতিতে গাছপালা তাদের অসংখ্য সবুজ পাতা দিয়ে নিজেদের শাখা-প্রশাখা ঢেকে রাখে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাছেরা যেন সবুজ রঙের একটি সুন্দর পোশাক বা আচ্ছাদন গায়ে জড়িয়ে আছে। গাছের এই সতেজ সবুজ পাতার আবরণকেই কবি অত্যন্ত চমৎকার কল্পনায় গাছেদের ‘সবুজ জামা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তোতাইবাবুর সবুজ জামা চাওয়ার কারণ: তোতাইবাবু একজন অত্যন্ত প্রকৃতিপ্রেমী শিশু। সে লক্ষ্য করেছে যে, প্রকৃতির স্বাধীন ও রঙিন প্রজাপতিরা মানুষের কৃত্রিম জিনিসের ওপর বা চশমায় বসে না, তারা গাছেদের সবুজ পাতায় বা ফুলেই বসতে ভালোবাসে। তোতাইবাবু প্রজাপতির সঙ্গ পেতে গভীরভাবে আগ্রহী। তাই তার শিশুসুলভ ও নিষ্পাপ মনের ধারণা হলো, সে-ও যদি গাছেদের মতো একটি সুন্দর সবুজ রঙের জামা পরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে পারবে এবং প্রজাপতিরা তাকে একটি ছোট্ট গাছ ভেবে নিশ্চিন্তে তার গায়ে এসে বসবে। এই নির্মল আনন্দ পাওয়ার জন্যই তার সবুজ জামা চাই।

6. ‘সবুজ জামা’ কবিতাটি আধুনিক মানুষকে পরিবেশ সচেতনতার কী রূপ বার্তা প্রদান করে, তা বুঝিয়ে দাও। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘সবুজ জামা’ কবিতায় একটি ছোট্ট শিশুর নির্মল বাসনার মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের যান্ত্রিক মানুষের উদ্দেশ্যে পরিবেশ রক্ষার এক অত্যন্ত গভীর ও প্রচ্ছন্ন বার্তা প্রদান করেছেন।

বর্তমানের আধুনিক মানুষ ইট, কাঠ আর কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি করতে গিয়ে নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলছে। ফলে প্রকৃতি তার সতেজতা ও সজীবতা হারিয়ে ফেলছে। প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলার কারণে প্রজাপতির মতো সুন্দর পতঙ্গরা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষ দাদুর মতো চোখে চশমা এঁটে কৃত্রিম জীবন যাপন করছে এবং আগামী প্রজন্মকেও সেই নীরস পুঁথিগত শিক্ষার চার দেওয়ালে বন্দি করে রাখছে।

কিন্তু তোতাইবাবুর সবুজ জামা পরার আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এই পৃথিবীকে আবার সবুজে ভরিয়ে তুলতে হবে। শিশুদের কেবল বইয়ের পাতায় আবদ্ধ না রেখে প্রকৃতির বিশাল অঙ্গনে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ, বেশি করে গাছ লাগিয়ে পরিবেশকে ‘সবুজ জামা’ পরাতে পারলেই এই পৃথিবী আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এবং মানুষের জীবনও প্রজাপতির মতো রঙিন ও আনন্দময় হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার