অষ্টম শ্রেণি – বাংলা, তৃতীয় পাঠ, অধ্যায় -7, পরবাসী – বিষ্ণু দে, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 7: পরবাসী
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)

নিচের উক্তিগুলির উৎস, প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো:

1. “বনের পথটি ঝিকিমিকি…” – বনের পথটিকে ‘ঝিকিমিকি’ বলা হয়েছে কেন?

উত্তর দেখো

উৎস: আলোচ্য উক্তিটি কবি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে গৃহীত হয়েছে।

প্রসঙ্গ: বনের আদিম ও রহস্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি এ কথা বলেছেন।

তাৎপর্য: বনের মাঝখানের আঁকাবাঁকা পথটি গভীর অরণ্যের ভেতর দিয়ে প্রসারিত। সেই ঘন জঙ্গলের বড়ো বড়ো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে যখন সূর্যের আলো বা চাঁদের আলো পথের ওপর এসে পড়ে, তখন এক অপূর্ব আলো-আঁধারির মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আলো আর অন্ধকারের এই লুকোচুরি খেলাকেই বোঝাতে কবি বনের পথটিকে ‘ঝিকিমিকি’ বলেছেন।

2. “থেকে থেকে জ্বলে ওঠে চোখ…” – কাদের চোখ জ্বলে ওঠে? এর মাধ্যমে বনের কোন্ রূপটি ধরা পড়েছে?

উত্তর দেখো

উৎস: উদ্ধৃতিটি কবি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে সংকলিত।

প্রসঙ্গ: রাতের অন্ধকারে বনের রহস্যময় রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি এই পঙ্‌ক্তিটির অবতারণা করেছেন।

তাৎপর্য: এখানে বন্যপ্রাণী বা বন্য জন্তুদের চোখ জ্বলে ওঠার কথা বলা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে যখন পুরো বন শান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন গাছের আড়ালে বা ঝোপের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা বন্যপ্রাণীদের চোখগুলো হঠাৎ আলোর ছটায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে গভীর অরণ্যের রহস্যময়তা এবং বন্যপ্রাণের আদিম ও স্বাধীন বিচরণের রূপটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।

3. “হঠাৎ পুলকে নেচে ওঠে…” – কে, কোথায় নেচে ওঠে? তার নাচকে কার সাথে তুলনা করা হয়েছে?

উত্তর দেখো

উৎস: উক্তিটি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে গৃহীত।

প্রসঙ্গ: প্রকৃতির কোলে বন্যপ্রাণীদের বাঁধনহারা আনন্দের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে কবি এ কথা বলেছেন।

তাৎপর্য: নিটোল টিলার ওপরে ফুটে থাকা পলাশ ফুলের ঝোপের আড়ালে একটি সুন্দর বনময়ূর হঠাৎ মনের আনন্দে বা পুলকে নেচে ওঠে। বনের স্বাধীন পরিবেশে ময়ূরের এই অপূর্ব সুন্দর ও ছন্দময় নাচ দেখে কবির মনে হয়েছে যেন কোনো সুদক্ষ শিল্পী ‘কথক’ নামক শাস্ত্রীয় নৃত্য পরিবেশন করছে।

4. “নদীর জলতরঙ্গ…” – নদীর জলতরঙ্গকে কবি কীসের সাথে তুলনা করেছেন এবং কেন?

উত্তর দেখো

উৎস: আলোচ্য উক্তিটি কবি বিষ্ণু দে-র ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ: নদীর বয়ে চলার সুমধুর প্রাকৃতিক শব্দের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি এই তুলনা টেনেছেন।

তাৎপর্য: নদীর জলতরঙ্গ বা অবিরাম বয়ে চলা স্রোতের শব্দকে কবি ‘সোনালি সেতার’-এর সাথে তুলনা করেছেন। সেতারের তারে আঙুলের আঘাত পড়লে যেমন এক মোহনীয় ও মিষ্টি সুরের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি বয়ে চলা নদীর স্রোতের শব্দও কবির কানে সেতারের সুরের মতোই সুমধুর ও মোহময় বলে মনে হয়েছে।

5. “চুপি চুপি জল খায়…” – কারা জল খায়? তাদের এই জল খাওয়ার মধ্যে কীসের ইঙ্গিত রয়েছে?

উত্তর দেখো

উৎস: উদ্ধৃতিটি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে।

প্রসঙ্গ: বন্যপ্রাণীদের অসহায়তা এবং মানুষের আগ্রাসনের ভয় বোঝাতে কবি এই মন্তব্য করেছেন।

তাৎপর্য: বনের হরিণেরা গভীর রাতে চুপি চুপি নদীর কিনারে জল খেতে আসে। এই ‘চুপি চুপি’ জল খাওয়ার মধ্যে বন্যপ্রাণীদের চরম বিপন্নতার ও ভয়ের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। আধুনিক সভ্যতার বিস্তার এবং শিকারি মানুষের লোভের কারণে তারা আজ নিজেদের জঙ্গলেই নিরাপদ নয়। মানুষের চোখে পড়ার ভয়েই তারা অত্যন্ত সন্তর্পণে এবং নিঃশব্দে জল পান করতে বাধ্য হয়।

6. “লুব্ধ হিংস্র ছন্দে…” – কার কথা বলা হয়েছে? তার ছন্দের তাৎপর্য কী?

উত্তর দেখো

উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি কবি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ: গভীর অরণ্যে বন্যপ্রাণের আদিম ও ভয়ংকর রূপ ফুটিয়ে তুলতে কবি এই কথা বলেছেন।

তাৎপর্য: এখানে শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়া চিতা বাঘের কথা বলা হয়েছে। চিতা বাঘ অত্যন্ত হিংস্র এবং শিকারের প্রতি প্রবল লুব্ধ। তার নিঃশব্দ অথচ ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে চলার যে ছন্দ, তার মধ্যে বন্যপ্রাণের এক ভয়ংকর এবং উদ্দাম রূপ লুকিয়ে আছে, যাকে কবি ‘কথাকলি’ নৃত্যের বেগের সাথে তুলনা করেছেন।

7. “জঙ্গল সাফ, গ্রাম মরে গেছে…” – এই পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?

উত্তর দেখো

উৎস: উদ্ধৃতিটি কবি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে সংগৃহীত।

প্রসঙ্গ: আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনে প্রকৃতি ও গ্রামবাংলার করুণ পরিণতি বোঝাতে কবি এই আক্ষেপ করেছেন।

তাৎপর্য: আধুনিক মানুষ নিজের স্বার্থে, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের লোভে নির্বিচারে বনের পর বন কেটে সাফ করে দিচ্ছে। এই ধ্বংসলীলার কারণে গ্রামগুলো তার স্বাভাবিক রূপ, সহজ-সরল জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ হারিয়ে ফেলছে। অথচ এত জঙ্গল ধ্বংস করেও সেখানে কোনো নতুন বা পরিকল্পিত শহর গড়ে ওঠেনি, কেবল এক বিস্তীর্ণ রুক্ষ প্রান্তর খাঁ খাঁ করছে।

8. “ময়ূর মরেছে পণ্যে…” – উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর দেখো

উৎস: আলোচ্য উক্তিটি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ: মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে স্বাধীন বন্যপ্রাণের করুণ পরিণতির কথা এখানে বলা হয়েছে।

তাৎপর্য: যে ময়ূর একদিন বনের স্বাধীন পরিবেশে পলাশ ঝোপের আড়ালে আনন্দে নেচে উঠত, মানুষের লোভের শিকার হয়ে আজ তার সেই স্বাধীনতা বিলুপ্ত। মানুষ অর্থের লোভে বনময়ূর শিকার করে তার পালক বা মাংস বাজারে বিক্রি করছে। অর্থাৎ, জীবন্ত ও সুন্দর ময়ূর আজ কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য বাজারে কেনাবেচার একটি জড় সামগ্রী বা ‘পণ্য’-এ পরিণত হয়েছে।

9. “কেন এই দেশে মানুষ মৌন অসহায়?” – মানুষের মৌন ও অসহায় হওয়ার কারণ কী?

উত্তর দেখো

উৎস: উদ্ধৃতিটি কবি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে গৃহীত।

প্রসঙ্গ: প্রকৃতির এই ব্যাপক ধ্বংসলীলার সামনে মানুষের নিষ্ক্রিয়তা দেখে কবি এই আক্ষেপ করেছেন।

তাৎপর্য: আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের চোখের সামনেই গাছপালা কাটা হচ্ছে, বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু লোভী মানুষের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে না। তারা যন্ত্রের দাপটের কাছে এতটাই আত্মসমর্পণ করেছে যে, এই ধ্বংসের সামনে তারা আজ নীরব বা মৌন এবং চরম অসহায়।

10. “নদী গাছ পাহাড় গৌণ…” – নদী, গাছ, পাহাড় কেন মানুষের কাছে গৌণ হয়ে গেছে?

উত্তর দেখো

উৎস: আলোচ্য উক্তিটি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে সংকলিত।

প্রসঙ্গ: আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের মন থেকে প্রকৃতিপ্রেম হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কবি এখানে তুলে ধরেছেন.

তাৎপর্য: আধুনিক মানুষ ইট-কাঠ-কংক্রিট এবং প্রযুক্তির কৃত্রিম জীবনে এতটাই অভ্যস্ত যে, প্রকৃতির প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র আকর্ষণ অবশিষ্ট নেই। অর্থের লোভ এবং বস্তুতান্ত্রিক জীবনের মোহে তারা ভুলে গেছে যে প্রকৃতিই হলো জীবনের মূল আধার। এই কৃত্রিম চিন্তাধারার কারণেই নদী, গাছ ও পাহাড়ের মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদগুলি আজ মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় বা গৌণ হয়ে পড়েছে।

11. “সারাদেশময় তাঁবু ব’য়ে কত ঘুরব?” – তাঁবু বয়ে ঘোরার কথা বলা হয়েছে কেন?

উত্তর দেখো

উৎস: উদ্ধৃতিটি কবি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ: প্রকৃতির বিনাশের কারণে মানুষের আশ্রয়হীনতা এবং শেকড়বিচ্ছিন্ন অবস্থা বোঝাতে কবি এই প্রশ্ন তুলেছেন।

তাৎপর্য: তাঁবু হলো যাযাবর বা ঠিকানাহীন মানুষদের অস্থায়ী বাসস্থান। প্রকৃতির বুক চিরে মানুষ শহর গড়ে তুলছে, কিন্তু সেই কংক্রিটের শহর মানুষকে আত্মার শান্তি বা প্রকৃত আশ্রয় দিতে পারে না। প্রকৃতি ধ্বংস হওয়ায় মানুষ আজ নিজ বাসভূমিতেই শেকড়হীন। তাই স্থায়ী ও সজীব আশ্রয়ের সন্ধানে যাযাবরের মতো তাঁবু বয়ে ঘুরে বেড়ানোর এই করুণ আক্ষেপ কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।

12. “পরবাসী কবে নিজ বাসভূমে গড়বে?” – ‘পরবাসী’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? তাদের এই বাসভূমি গড়ার আকাঙ্ক্ষার কারণ কী?

উত্তর দেখো

উৎস: আলোচ্য উক্তিটি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘পরবাসী’ কবিতার সর্বশেষ পঙ্‌ক্তি।

প্রসঙ্গ: কৃত্রিম ও যান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় প্রকৃতির কোলে একটি শান্ত বাসভূমি গড়ার স্বপ্ন এখানে প্রকাশ পেয়েছে।

তাৎপর্য: ‘পরবাসী’ বলতে নিজের দেশে বাস করেও যারা প্রকৃতির ধ্বংসের কারণে আজ আশ্রয়হীন এবং শেকড়বিচ্ছিন্ন, সেই আধুনিক মানুষদের বোঝানো হয়েছে। কংক্রিটের রুক্ষ শহরে মানুষের আত্মা শান্তি পায় না, তাই তারা এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি চায়। পুনরায় গাছপালা, নদী এবং বন্যপ্রাণীতে ঘেরা একটি সজীব ও অকৃত্রিম বাসভূমি গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাতেই কবি এই জিজ্ঞাসা ব্যক্ত করেছেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার