অষ্টম শ্রেণি: বাংলা, দ্বিতীয় পাঠ: চিঠি – মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 6: চিঠি
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘চিঠি’ গদ্যাংশের প্রথম চিঠিতে মধুসূদন দত্তের বিলেত যাত্রার যে বিবরণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানা যায়, তা নিজের ভাষায় লেখো। (5)
উত্তর দেখো
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর প্রিয় বন্ধু গৌরদাস বসাককে লেখা প্রথম চিঠিতে তাঁর রোমাঞ্চকর বিলেত যাত্রা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণনা করেছেন।
বিলেত যাত্রার বিবরণ: চিঠিটি লেখার সময় কবি ‘সীলোন’ নামক একটি চমৎকার জাহাজে করে ভূমধ্যসাগর পার হচ্ছিলেন। জাহাজটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের গন্তব্য ইংল্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সমুদ্রযাত্রার এই আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা কবির মনকে প্রবল উৎসাহে ভরিয়ে তুলেছিল।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: বাংলা সাহিত্যে কবি হিসেবে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মনে ছিল সমাজে আরও প্রতিষ্ঠা এবং প্রচুর অর্থ উপার্জনের অদম্য জেদ। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই তিনি আইন বা ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যাচ্ছিলেন। তাঁর আশা ছিল, এই পড়াশোনা শেষ করে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরলে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ একটি জীবন যাপন করতে পারবেন।
2. ফ্রান্সে থাকাকালীন মাইকেল মধুসূদন দত্ত কী রূপ ভয়ংকর বিপদে পড়েছিলেন এবং তার কারণ কী ছিল? (5)
উত্তর দেখো
বিপদের কারণ: বিলেতে যাওয়ার আগে মধুসূদন দত্ত দেশে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির বা বিষয়-আশয়ের দেখভালের দায়িত্ব কিছু পরিচিত মানুষের হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে সেই অসাধু লোকগুলি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা কবির সম্পত্তির সমস্ত টাকা আত্মসাৎ করে এবং ফ্রান্সে টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
ভয়ংকর বিপদ: দেশ থেকে টাকা আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফ্রান্সে অবস্থানকালে কবি সপরিবারে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েন। অচেনা ভিনদেশে তাঁর কাছে বাড়িভাড়া দেওয়া বা খাবার কেনার মতো একটি পয়সাও ছিল না। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি প্রায় অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হন। সবচেয়ে বড়ো ভয়ের বিষয় ছিল, পাওনাদারদের টাকা মেটাতে না পারলে আইন অনুযায়ী ফরাসি সরকারের পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে বন্দি করত। একদিকে অনাহারে মৃত্যু, অন্যদিকে কারাবাস— এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি চরম অসহায় ও ভয়ংকর বিপদে পড়েছিলেন।
3. চরম বিপদের দিনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কীভাবে মধুসূদনের ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন, তা দ্বিতীয় চিঠি অবলম্বনে আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে চরম অর্থকষ্টে পড়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ফরাসি সরকারের কারাগারে যাওয়ার উপক্রম এবং স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনাহারে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, তখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর জীবনে সাক্ষাৎ ত্রাতা বা দেবদূতের মতো আবির্ভূত হন।
বিদেশে প্রতারিত হয়ে মধুসূদন যখন বুঝতে পারেন যে বিদ্যাসাগর ছাড়া তাঁকে এই চরম ধ্বংসের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, তখন তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে চিঠি লিখে তাঁর দুর্দশার কথা জানান। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিজের আর্থিক অবস্থাও তখন খুব একটা ভালো ছিল না। কিন্তু আর্তের ডাকে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। তিনি নিজের উদ্যোগে অন্যদের কাছ থেকে ধার করে প্রচুর টাকা জোগাড় করেন এবং কালবিলম্ব না করে সেই টাকা মধুসূদনকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেন।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পাঠানো এই টাকার সাহায্যেই মধুসূদন ফরাসি পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পান এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানরা অনাহারের হাত থেকে বেঁচে যায়। বিপদের দিনে নিঃস্বার্থভাবে এই প্রাণ বাঁচানোর জন্যই মধুসূদন তাঁকে ‘করুণাসাগর’ বলে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
4. পাঠ্য চিঠি দুটির অবলম্বনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
অষ্টম শ্রেণির পাঠ্য ‘চিঠি’ গদ্যাংশে সংকলিত চিঠি দুটির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের চরিত্রের কয়েকটি অত্যন্ত মানবিক দিক ফুটে উঠেছে:
- উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও দৃঢ়চেতা: প্রথম চিঠিতে দেখা যায়, সাহিত্যিক খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তিনি আরও অর্থ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য বিলেতে গিয়ে আইন পড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জেদের প্রমাণ দেয়।
- স্নেহময় পিতা ও স্বামী: দ্বিতীয় চিঠিতে তাঁর অত্যন্ত সংবেদনশীল রূপটি ধরা পড়েছে। ফ্রান্সে অনাহারে থাকা স্ত্রী ও সন্তানদের কষ্ট দেখে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, পৃথিবীতে তিনি তাঁর পরিবারকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।
- কৃতজ্ঞতাবোধ ও বিনয়: চরম বিপদে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সাহায্য পাওয়ার পর তাঁর অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তিনি চোখের জলে বিদ্যাসাগরকে ‘করুণাসাগর’ আখ্যা দিয়ে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা তাঁর চরিত্রের বিশালতাকে প্রমাণ করে।
5. “আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল এই যে…” – বক্তা কে? তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুলটি কী ছিল? এই ভুলের ফলে তাঁকে কী চরম পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল? (1+1+3=5)
উত্তর দেখো
বক্তা: আলোচ্য উক্তিটির বক্তা হলেন প্রখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
সবচেয়ে বড়ো ভুল: বক্তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুলটি ছিল, ব্যারিস্টারি পড়তে বিদেশে যাওয়ার সময় দেশে নিজের সম্পত্তির বা বিষয়-আশয়ের ভার অযোগ্য, লোভী এবং বিশ্বাসঘাতক লোকদের হাতে দিয়ে যাওয়া।
চরম পরিণতি: এই মারাত্মক ভুলের মাসুল কবিকে অত্যন্ত করুণভাবে চোকাতে হয়েছিল। সম্পত্তির তদারকিকারীরা তাঁর সাথে চরম বেইমানি করে। তারা সম্পত্তির টাকা আত্মসাৎ করে ফ্রান্সে কবির কাছে টাকা পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি বিদেশে চরম অর্থকষ্টে পড়েন। টাকা না থাকায় পাওনাদারদের কাছে অপমানিত হতে হয় এবং ফরাসি সরকারের কারাগারে বন্দি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ভুলের কারণেই তাঁকে প্রায় অনাহারে মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়াতে হয়েছিল।
6. মধুসূদন দত্তের লেখা প্রথম ও দ্বিতীয় চিঠির মধ্যে মানসিকতার বা সুরের যে চরম পার্থক্য দেখা যায়, তা বুঝিয়ে দাও। (5)
উত্তর দেখো
মধুসূদন দত্তের লেখা পাঠ্য চিঠি দুটির মধ্যে দিয়ে কবির মানসিক অবস্থার এক বিরাট উত্থান-পতনের চিত্র স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
প্রথম চিঠির সুর: বন্ধু গৌরদাস বসাককে লেখা প্রথম চিঠিতে কবির মন প্রবল আশা, উত্তেজনা এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এখানে তিনি একজন স্বপ্নাতুর মানুষ। বিলেতে গিয়ে আইন পড়া এবং দেশে ফিরে সম্মানজনক জীবন কাটানোর যে বর্ণময় স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তাতে কোনো গ্লানি বা ভয় নেই। সমুদ্রযাত্রার মতো তাঁর মনও তখন দ্রুতগতিতে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় চিঠির সুর: অন্যদিকে, বিদ্যাসাগরকে লেখা দ্বিতীয় চিঠিতে সেই স্বপ্ন এবং আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ। এখানে তিনি একজন প্রতারিত, ব্যর্থ এবং চরম অসহায় মানুষ। অর্থের অভাবে স্ত্রী-পুত্রের অনাহার এবং কারাবাসের ভয়ে তাঁর মন থেকে অহংকার বিলুপ্ত। এই চিঠিতে ফুটে উঠেছে নিদারুণ হতাশা, আপনজনদের প্রতি ক্ষোভ এবং ত্রাতা বিদ্যাসাগরের প্রতি চোখের জলে লেখা চরম বিনয় ও কৃতজ্ঞতা। অর্থাৎ, প্রথম চিঠির সোনালি স্বপ্নের সাথে দ্বিতীয় চিঠির রূঢ় বাস্তবের এক মর্মান্তিক পার্থক্য এখানে পরিলক্ষিত হয়।