অষ্টম শ্রেণী: অধ্যায় ১.২ স্পর্শ ছাড়া ক্রিয়াশীল বল ব্যাখ্যামূলক মান ৩
অধ্যায় 1.2: স্পর্শ ছাড়া ক্রিয়াশীল বল — ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান ৩)
1. নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রটি লেখো এবং এর গাণিতিক রূপটি ব্যাখ্যা করো। (১+২)
সূত্র: মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুকণা পরস্পরকে নিজেদের কেন্দ্রের সংযোজক সরলরেখা বরাবর আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তুকণা দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
গাণিতিক রূপ:
ধরি, দুটি বস্তুর ভর যথাক্রমে $m_1$ ও $m_2$ এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব $d$। তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বল $F$ হলে,
1. $F \propto m_1 m_2$ (যখন $d$ স্থির)
2. $F \propto \frac{1}{d^2}$ (যখন ভরদ্বয় স্থির)
যৌগিক ভেদের উপপাদ্য অনুযায়ী, $F \propto \frac{m_1 m_2}{d^2}$
বা, $F = G \frac{m_1 m_2}{d^2}$
(এখানে $G$ হলো সর্বজনীন মহাকর্ষ ধ্রুবক)।
2. অবাধে পতনশীল বস্তু সংক্রান্ত গ্যালিলিও-র সূত্র তিনটি লেখো।
একই উচ্চতা থেকে স্থির অবস্থায় এবং বায়ুশূন্য স্থানে অবাধে পতনশীল বস্তুর ক্ষেত্রে:
প্রথম সূত্র: সব বস্তু সমান দ্রুততায় নিচে নামে (ভর বা আকার কোনো প্রভাব ফেলে না)।
দ্বিতীয় সূত্র: নির্দিষ্ট সময়ে পতনশীল বস্তুর বেগ ওই সময়ের সমানুপাতিক হয় ($v \propto t$)।
তৃতীয় সূত্র: নির্দিষ্ট সময়ে পতনশীল বস্তু যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তা ওই সময়ের বর্গের সমানুপাতিক হয় ($h \propto t^2$)।
3. গাণিতিক সমস্যা: একটি বস্তুর ভর 60 kg। পৃথিবীতে এবং চাঁদে বস্তুটির ওজন কত হবে? (ধরে নাও, পৃথিবীতে g = 9.8 m/s² এবং চাঁদে অভিকর্ষ পৃথিবীর 1/6 ভাগ)। (১.৫+১.৫)
বস্তুর ভর ($m$) = 60 kg
পৃথিবীতে ওজন:
আমরা জানি, ওজন ($W$) = $m \times g$
$W = 60 \times 9.8 = 588$ নিউটন (N)।
চাঁদে ওজন:
চাঁদে বস্তুর ওজন = পৃথিবীতে ওজন × $1/6$
$= 588 \times 1/6$
$= 98$ নিউটন (N)।
4. পরমাণুর গঠন চিত্রসহ সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
পরমাণু প্রধানত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত:
1. নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক: পরমাণুর কেন্দ্রে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ভারী অংশকে নিউক্লিয়াস বলে। এতে ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন (p) এবং নিস্তড়িৎ নিউট্রন (n) থাকে।
2. ইলেকট্রন মহল: নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন বৃত্তাকার কক্ষপথে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন (e) ঘোরে।
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা সমান থাকে বলে পরমাণু নিস্তড়িৎ হয়।
[Image of atom structure diagram with nucleus and electron shells]
5. প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে শুকনো চুল আঁচড়ালে তা কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে, কিন্তু ভেজা চুলে আঁচড়ালে করে না কেন? (৩)
শুকনো চুল: শুকনো চুলে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ালে ঘর্ষণের ফলে চিরুনিতে স্থির তড়িৎ বা আধান জমা হয়। এই আহিত চিরুনি কাগজের টুকরোকে আবেশ প্রক্রিয়ায় আকর্ষণ করে।
ভেজা চুল: জল তড়িৎ পরিবাহী। তাই ভেজা চুলে ঘর্ষণের ফলে যে আধান উৎপন্ন হয়, তা চিরুনিতে জমা থাকতে পারে না; জলের মাধ্যমে আমাদের শরীর হয়ে মাটিতে চলে যায় (আর্দিং)। ফলে চিরুনি নিস্তড়িৎ থেকে যায় এবং কাগজকে আকর্ষণ করতে পারে না।
6. ভর ও ওজনের মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো।
| বিষয় | ভর (Mass) | ওজন (Weight) |
| ১. সংজ্ঞা | বস্তুর মধ্যে মোট জড় পদার্থের পরিমাণ। | পৃথিবী যে বল দ্বারা বস্তুকে টানে। |
| ২. পরিবর্তনশীলতা | স্থানভেদে পরিবর্তিত হয় না (ধ্রুবক)। | স্থানভেদে পরিবর্তিত হয় (যেমন মেরুতে বেশি)। |
| ৩. শূন্য হওয়া | কখনো শূন্য হতে পারে না। | পৃথিবীর কেন্দ্রে বা মহাকাশে শূন্য হতে পারে। |
7. গাণিতিক সমস্যা: দুটি বস্তুর মধ্যবর্তী দূরত্ব দ্বিগুণ করা হলে, তাদের মহাকর্ষ বলের কী রূপ পরিবর্তন হবে? (৩)
নিউটনের সূত্র অনুযায়ী, মহাকর্ষ বল ($F$) দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক।
অর্থাৎ, $F \propto \frac{1}{d^2}$
যদি দূরত্ব ($d$) দ্বিগুণ বা 2 গুণ করা হয়, তবে নতুন বল হবে:
$F_{\text{new}} \propto \frac{1}{(2d)^2}$
বা, $F_{\text{new}} \propto \frac{1}{4d^2}$
অর্থাৎ, নতুন বল আগের বলের $\frac{1}{4}$ গুণ বা চার ভাগের এক ভাগ হবে। বলের মান কমে যাবে।
8. “সব অভিকর্ষই মহাকর্ষ, কিন্তু সব মহাকর্ষ অভিকর্ষ নয়”— উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর (যেমন সূর্য ও মঙ্গল) পারস্পরিক আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বলে।
আর অভিকর্ষ হলো পৃথিবী এবং তার ওপর বা কাছে থাকা অন্য কোনো বস্তুর (যেমন পৃথিবী ও আপেল) আকর্ষণ বল।
যেহেতু পৃথিবী মহাবিশ্বেরই একটি বস্তু, তাই পৃথিবীর আকর্ষণ (অভিকর্ষ) আসলে মহাকর্ষেরই একটি বিশেষ রূপ। তাই সব অভিকর্ষই মহাকর্ষ। কিন্তু দুটি গ্রহের আকর্ষণ মহাকর্ষ হলেও তা অভিকর্ষ নয়, কারণ সেখানে পৃথিবী নেই।
9. বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছের নিচে বা টিনের চালের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক কেন?
বজ্রপাত বা মেঘ থেকে আসা বিদ্যুৎ সবসময় মাটিতে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে ছোট ও সুপরিবাহী পথ খোঁজে। উঁচু গাছ বা টিনের চাল বিদ্যুৎ পরিবাহী এবং মাটির খুব কাছে থাকে। তাই খোলা জায়গার চেয়ে উঁচু গাছে বা ধাতব টিনের চালে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। সেখানে আশ্রয় নিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।
10. কুলম্বের সূত্র থেকে আধানের এককের (1 কুলম্ব) সংজ্ঞা দাও।
কুলম্বের সূত্রানুযায়ী, সমপরিমাণ দুটি বিন্দু আধানকে বায়ুশূন্য স্থানে পরস্পর থেকে 1 মিটার দূরে রাখলে যদি তাদের মধ্যে $9 \times 10^9$ নিউটন বিকর্ষণ বল ক্রিয়া করে, তবে প্রতিটি আধানের পরিমাণকে 1 কুলম্ব বলা হয়।
11. “আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়”— পরীক্ষার সাহায্যে বা যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো। (৩)
একটি শক্তিশালী চুম্বকের উত্তর মেরুকে একটি লোহার টুকরোর কাছে আনলে লোহাটি চুম্বকের দিকে আকৃষ্ট হয়।
কারণ: চুম্বকটি কাছে আনার ফলে প্রথমে লোহার টুকরোটিতে ‘চৌম্বক আবেশ’ ঘটে। অর্থাৎ, লোহার যে প্রান্তটি চুম্বকের উত্তর মেরুর দিকে থাকে, সেখানে দক্ষিণ মেরু এবং দূরের প্রান্তে উত্তর মেরু সৃষ্টি হয়। এরপর চুম্বকের উত্তর মেরু এবং লোহার সৃষ্ট দক্ষিণ মেরুর মধ্যে আকর্ষণ ঘটে।
যেহেতু আবেশের ফলেই বিপরীত মেরু তৈরি হয় এবং তারপরেই আকর্ষণ ঘটে, তাই বলা হয়— “আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়”।
12. কী কী উপায়ে একটি চুম্বকের চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যেতে পারে? (৩)
নিম্নলিখিত কারণে চুম্বকের চুম্বকত্ব নষ্ট হতে পারে:
1. উত্তপ্ত করলে: চুম্বককে খুব বেশি গরম করলে তার চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়।
2. আঘাত করলে: হাতুড়ি দিয়ে পিটলে বা ওপর থেকে বারবার শক্ত মেঝের ওপর ফেলে দিলে চুম্বকত্ব কমে যায়।
3. তড়িৎ প্রবাহ: চুম্বকের চারপাশে বিপরীত দিকে তড়িৎ প্রবাহ চালনা করলে চুম্বকত্ব নষ্ট হতে পারে।
13. স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের (Gold Leaf Electroscope) গঠন ও কাজ সংক্ষেপে লেখো। (৩)
গঠন: একটি কাচের বোতলের মধ্যে একটি ধাতব দণ্ড উলম্বভাবে রাখা থাকে। দণ্ডের ওপরের প্রান্তে একটি ধাতব চাকতি এবং নিচের প্রান্তে দুটি খুব পাতলা সোনার পাতা লাগানো থাকে।
কাজ:
1. কোনো বস্তুতে আধান বা চার্জ আছে কি না তা শনাক্ত করা।
2. বস্তুটি ধনাত্মক নাকি ঋণাত্মক আধানে আহিত, তা নির্ণয় করা।
[Image of gold leaf electroscope diagram]
14. পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চল অপেক্ষা মেরু অঞ্চলে কোনো বস্তুর ওজন বেশি হয় কেন? (৩)
আমরা জানি, ওজন $W = m \times g$। অর্থাৎ ওজন অভিকর্ষজ ত্বরণ ‘g’-এর ওপর নির্ভরশীল। আবার, ‘g’-এর মান পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্বের ওপর নির্ভর করে ($g \propto 1/R^2$)।
পৃথিবী সম্পূর্ণ গোল নয়, কমলালেবুর মতো চ্যাপ্টা। তাই নিরক্ষীয় অঞ্চলের চেয়ে মেরু অঞ্চল পৃথিবীর কেন্দ্রের বেশি কাছে অবস্থিত। মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ কম হওয়ায় সেখানে ‘g’-এর মান বেশি হয়। তাই মেরু অঞ্চলে বস্তুর ওজনও বেশি হয়।
15. গাণিতিক সমস্যা: দুটি বস্তুর ভর যথাক্রমে দ্বিগুণ ও তিনগুণ করা হলো এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব স্থির রাখা হলো। মহাকর্ষ বলের কী পরিবর্তন হবে? (৩)
আমরা জানি, মহাকর্ষ বল ($F$) বস্তু দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক ($F \propto m_1 m_2$)।
ধরি, প্রাথমিক ভর ছিল $m_1$ ও $m_2$।
নতুন ভর হলো $2m_1$ (দ্বিগুণ) এবং $3m_2$ (তিনগুণ)।
নতুন বল $F_{\text{new}} \propto (2m_1) \times (3m_2)$
বা, $F_{\text{new}} \propto 6 (m_1 m_2)$
অর্থাৎ, মহাকর্ষ বল আগের চেয়ে 6 গুণ বৃদ্ধি পাবে।