অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 5 ‘ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ’, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – মান: 2) – পর্ব 1
নিচের প্রশ্নগুলির দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও:
1. সতীদাহ প্রথা (Sati System) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: প্রাচীন হিন্দু সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর তার জ্বলন্ত চিতায় বিধবা স্ত্রীকে জোর করে পুড়িয়ে মারার যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রথা চালু ছিল, তাকেই সতীদাহ প্রথা বলা হয়। রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে 1829 খ্রিস্টাব্দে এই প্রথা নিষিদ্ধ হয়।
2. রাজা রামমোহন রায় কীভাবে সতীদাহ প্রথা রদ করেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: রাজা রামমোহন রায় প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ প্রথা ধর্মসম্মত নয়। তাঁর প্রবল জনমত গঠন এবং লাগাতার আন্দোলনের ফলেই গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1829 খ্রিস্টাব্দে আইন করে এই অমানবিক প্রথা নিষিদ্ধ করেন।
3. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের প্রধান সাফল্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিদ্যাসাগর মশাই প্রাচীন শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে বিধবা বিবাহ অশাস্ত্রীয় নয়। তাঁর নেতৃত্বে প্রবল আন্দোলনের ফলে 1856 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করে। তিনি নিজের ছেলের সাথে এক বিধবার বিবাহ দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
4. ‘নব্যবঙ্গ’ বা ‘ইয়ং বেঙ্গল’ (Young Bengal) দল কাদের বলা হতো?
উত্তর দেখো
উত্তর: হিন্দু কলেজের (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) তরুণ ও যুক্তিবাদী শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও-র আদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্রদের নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল দল বলা হতো। এরা হিন্দু সমাজের অন্ধবিশ্বাস, জাতিভেদ প্রথা এবং মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
5. স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্তবাদ’ (Neo-Vedanta) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ প্রাচীন বেদান্ত দর্শনকে আধুনিক সমাজের উপযোগী করে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি প্রচার করেন যে, মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস, তাই ‘জীবে প্রেম’ বা মানব সেবাই হলো প্রকৃত ঈশ্বর সেবা। তাঁর এই মানবতাবাদী ধর্মীয় মতাদর্শই নব্য বেদান্তবাদ নামে পরিচিত।
6. স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের ‘আলিগড় আন্দোলন’-এর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: স্যার সৈয়দ আহমেদ খান অনুভব করেছিলেন যে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ছাড়া মুসলিম সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে ভারতীয় মুসলিম সমাজের সার্বিক উন্নতির জন্যই তিনি আলিগড় আন্দোলন শুরু করেছিলেন।
7. ওয়াহাবি (Wahabi) আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ওয়াহাবি’ শব্দের অর্থ নবজাগরণ। আরবে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মকে সমস্ত কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে তার আদি ও বিশুদ্ধ রূপ ফিরিয়ে আনা। তবে ভারতে সৈয়দ আহমেদ এবং বাংলায় তিতুমিরের নেতৃত্বে এটি ব্রিটিশ ও অত্যাচারী জমিদার বিরোধী এক ব্যাপক কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়।
8. বারাসাত বিদ্রোহ (Barasat Rebellion) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1831 খ্রিস্টাব্দে বাংলার বারাসাত অঞ্চলে মীর নিসার আলি বা তিতুমিরের নেতৃত্বে স্থানীয় জমিদার, নীলকর সাহেব এবং ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কৃষকরা যে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল, তা ইতিহাসে বারাসাত বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
9. ফরাজি (Faraizi) আন্দোলন কেন শুরু হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ফরাজি’ শব্দের অর্থ ইসলাম ধর্ম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য। হাজি শরিয়তউল্লাহ পূর্ববঙ্গে ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণের উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন শুরু করেন। তবে পরে তাঁর পুত্র দুদু মিঞার নেতৃত্বে এটি স্থানীয় হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বেআইনি কর আদায়ের বিরুদ্ধে এক প্রবল কৃষক বিদ্রোহে পরিণত হয়।
10. সাঁওতাল বিদ্রোহের (1855) দুটি প্রধান কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) বহিরাগত মহাজন বা ‘দিকু’-রা সাঁওতালদের চড়া সুদে ঋণ দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের জমি, ফসল ও সর্বস্ব কেড়ে নিত। (2) ব্রিটিশ কর্মচারীরা জোর করে সাঁওতালদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে রেলপথ নির্মাণের কাজ করাত এবং তাদের ওপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালাত।
11. ‘দিকু’ (Diku) কাদের বলা হতো? তারা কীভাবে সাঁওতালদের শোষণ করত?
উত্তর দেখো
উত্তর: সাঁওতালরা দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে আসা বহিরাগত মহাজন, জমিদার ও ব্যবসায়ীদের ‘দিকু’ বলত। দিকুরা সাঁওতালদের চড়া সুদে টাকা ধার দিত এবং পরে ওজন ও হিসেবে জালিয়াতি করে তাদের সমস্ত ফসল, জমি, এমনকী গবাদি পশুও কেড়ে নিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করত।
12. মুন্ডা বিদ্রোহ বা ‘উলগুলান’-এর প্রধান লক্ষ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1899 খ্রিস্টাব্দে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে শুরু হওয়া মুন্ডা বিদ্রোহ বা উলগুলান-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল মুন্ডাদের জমি থেকে বহিরাগত দিকু (জমিদার ও মহাজন), খ্রিস্টান মিশনারি এবং ব্রিটিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করে নিজেদের স্বাধীন ‘মুন্ডা রাজ’ বা স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
13. 1857 সালের মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কারণ কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1857 সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নতুন ‘এনফিল্ড রাইফেল’ চালু হয়। সিপাহিদের মধ্যে গুজব ছড়ায় যে, এই রাইফেলের টোটার খোলসে গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো আছে, যা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো। এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সিপাহিরাই ধর্মনাশের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে।
14. মহাবিদ্রোহের (1857) দুটি রাজনৈতিক কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) লর্ড ডালহৌসির ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে ঝাঁসি, সিতারা, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য দখল করায় দেশীয় রাজারা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। (2) মুঘল সম্রাট, পেশোয়া ও কর্ণাটকের নবাবের উপাধি ও পেনশন ব্রিটিশরা কেড়ে নেওয়ায় তা চরম রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল।
15. 1857 সালের বিদ্রোহে সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষের দুটি সামরিক কারণ কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) ভারতীয় সিপাহিদের বেতন ও পদোন্নতির সুযোগ ব্রিটিশ সেনাদের তুলনায় অনেক কম ছিল। (2) হিন্দু সিপাহিদের জোর করে সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশে যুদ্ধ করতে পাঠানো হতো, যা তাদের ধর্মে নিষিদ্ধ থাকায় তাদের মধ্যে ধর্মনাশের আশঙ্কা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
16. মঙ্গল পাণ্ডে কে ছিলেন? মহাবিদ্রোহে তাঁর ভূমিকা কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: মঙ্গল পাণ্ডে ছিলেন ব্যারাকপুর সেনানিবাসের 34 নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির একজন সাহসী সিপাহি। 1857 সালের 29 মার্চ তিনি এনফিল্ড রাইফেলের বিতর্কিত টোটা ব্যবহারের প্রতিবাদে প্রথম ব্রিটিশ অফিসারের ওপর গুলি চালান এবং ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দিয়ে মহাবিদ্রোহের প্রথম শহিদ হন।
17. বিদ্রোহী সিপাহিরা কেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ‘ভারতের সম্রাট’ বলে ঘোষণা করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: সিপাহিরা বুঝতে পেরেছিল যে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় স্তরে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে হলে একজন সর্বজনমান্য নেতার প্রয়োজন। তাই তারা দিল্লির লালকেল্লা দখল করে বৃদ্ধ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বিদ্রোহের প্রতীকী নেতা হিসেবে ‘ভারতের সম্রাট’ ঘোষণা করে।
18. রানি লক্ষ্মীবাই কেন 1857 সালের মহাবিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: লর্ড ডালহৌসি ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার অস্বীকার করেন এবং ঝাঁসি রাজ্যটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। নিজের রাজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্যই রানি লক্ষ্মীবাই মহাবিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন।
19. নানা সাহেব এবং তাঁতিয়া তোপী কে ছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: নানা সাহেব ছিলেন শেষ পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তক পুত্র, যিনি ব্রিটিশদের ভাতা বন্ধের প্রতিবাদে কানপুরে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁতিয়া তোপী ছিলেন নানা সাহেবের বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ সেনাপতি, যিনি কানপুর ও গোয়ালিয়রে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
20. বেগম হজরত মহল মহাবিদ্রোহে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশরা অন্যায়ভাবে অযোধ্যা রাজ্য দখল করে নিলে, সেখানকার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের স্ত্রী বেগম হজরত মহল চরম ক্ষুব্ধ হন। তিনি 1857 সালের মহাবিদ্রোহে অযোধ্যা বা লক্ষ্ণৌতে সিপাহি ও সাধারণ কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
21. 1857 সালের মহাবিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হয়েছিল? (দুটি কারণ লেখো)
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো সর্বভারতীয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সুদক্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং উন্নত অস্ত্রের অভাব ছিল। (2) ভারতের বহু দেশীয় রাজা, জমিদার এবং শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি, বরং তারা ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।
22. 1858 সালের ভারত শাসন আইনের (Government of India Act 1858) প্রধান ফল কী হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: এই আইনের ফলে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় একশো বছরের শোষণের পাকাপাকি অবসান ঘটে। ভারতের শাসনভার কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুট বা মহারানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
23. ‘ভাইসরয়’ (Viceroy) বলতে কী বোঝায়? ভারতের প্রথম ভাইসরয় কে ছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ভাইসরয়’ কথাটির অর্থ হলো রাজপ্রতিনিধি বা মহারানির প্রতিনিধি। 1858 সালের পর থেকে ভারতের গভর্নর জেনারেলকে সরাসরি মহারানির প্রতিনিধি হিসেবে ভাইসরয় উপাধি দেওয়া হয় এবং লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন।
24. মহারানির ঘোষণাপত্রের (Queen’s Proclamation, 1858) প্রধান দুটি প্রতিশ্রুতি কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1858 সালের 1 নভেম্বর প্রকাশিত এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়: (1) ব্রিটিশ সরকার ভারতে আর সাম্রাজ্য বিস্তার করবে না এবং দেশীয় রাজাদের দত্তক নেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। (2) ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
25. 1857 সালের বিদ্রোহকে কেন কেবল ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলা হয়?
উত্তর দেখো
উত্তর: অনেক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মতো ভারতীয়দের মতে, 1857 সালের বিদ্রোহটি মূলত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কিছু অসন্তুষ্ট ভারতীয় সিপাহির দ্বারা শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে কোনো জাতীয়তাবাদী চেতনা বা সর্বভারতীয় যোগদান ছিল না, তাই তারা একে নিছক ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন।
26. ভি. ডি. সাভারকর কেন 1857 সালের বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতে, এটি কেবল সিপাহিদের বিদ্রোহ ছিল না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ (কৃষক, জমিদার, রাজা) ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদেশি ব্রিটিশ শাসনকে ভারত থেকে উৎখাত করার জন্য এই সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল। তাই এটি ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ।
14. মহাবিদ্রোহের (1857) দুটি রাজনৈতিক কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) লর্ড ডালহৌসির ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে ঝাঁসি, সিতারা, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য দখল করায় দেশীয় রাজারা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। (2) মুঘল সম্রাট, পেশোয়া ও কর্ণাটকের নবাবের উপাধি ও পেনশন ব্রিটিশরা কেড়ে নেওয়ায় তা চরম রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল।
15. 1857 সালের বিদ্রোহে সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষের দুটি সামরিক কারণ কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) ভারতীয় সিপাহিদের বেতন ও পদোন্নতির সুযোগ ব্রিটিশ সেনাদের তুলনায় অনেক কম ছিল। (2) হিন্দু সিপাহিদের জোর করে সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশে যুদ্ধ করতে পাঠানো হতো, যা তাদের ধর্মে নিষিদ্ধ থাকায় তাদের মধ্যে ধর্মনাশের আশঙ্কা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
16. মঙ্গল পাণ্ডে কে ছিলেন? মহাবিদ্রোহে তাঁর ভূমিকা কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: মঙ্গল পাণ্ডে ছিলেন ব্যারাকপুর সেনানিবাসের 34 নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির একজন সাহসী সিপাহি। 1857 সালের 29 মার্চ তিনি এনফিল্ড রাইফেলের বিতর্কিত টোটা ব্যবহারের প্রতিবাদে প্রথম ব্রিটিশ অফিসারের ওপর গুলি চালান এবং ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দিয়ে মহাবিদ্রোহের প্রথম শহিদ হন।
17. বিদ্রোহী সিপাহিরা কেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ‘ভারতের সম্রাট’ বলে ঘোষণা করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: সিপাহিরা বুঝতে পেরেছিল যে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় স্তরে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে হলে একজন সর্বজনমান্য নেতার প্রয়োজন। তাই তারা দিল্লির লালকেল্লা দখল করে বৃদ্ধ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বিদ্রোহের প্রতীকী নেতা হিসেবে ‘ভারতের সম্রাট’ ঘোষণা করে।
18. রানি লক্ষ্মীবাই কেন 1857 সালের মহাবিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: লর্ড ডালহৌসি ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার অস্বীকার করেন এবং ঝাঁসি রাজ্যটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। নিজের রাজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্যই রানি লক্ষ্মীবাই মহাবিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন।
19. নানা সাহেব এবং তাঁতিয়া তোপী কে ছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: নানা সাহেব ছিলেন শেষ পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তক পুত্র, যিনি ব্রিটিশদের ভাতা বন্ধের প্রতিবাদে কানপুরে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁতিয়া তোপী ছিলেন নানা সাহেবের বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ সেনাপতি, যিনি কানপুর ও গোয়ালিয়রে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
20. বেগম হজরত মহল মহাবিদ্রোহে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশরা অন্যায়ভাবে অযোধ্যা রাজ্য দখল করে নিলে, সেখানকার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের স্ত্রী বেগম হজরত মহল চরম ক্ষুব্ধ হন। তিনি 1857 সালের মহাবিদ্রোহে অযোধ্যা বা লক্ষ্ণৌতে সিপাহি ও সাধারণ কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
21. 1857 সালের মহাবিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হয়েছিল? (দুটি কারণ লেখো)
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো সর্বভারতীয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সুদক্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং উন্নত অস্ত্রের অভাব ছিল। (2) ভারতের বহু দেশীয় রাজা, জমিদার এবং শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি, বরং তারা ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।
22. 1858 সালের ভারত শাসন আইনের (Government of India Act 1858) প্রধান ফল কী হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: এই আইনের ফলে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় একশো বছরের শোষণের পাকাপাকি অবসান ঘটে। ভারতের শাসনভার কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুট বা মহারানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
23. ‘ভাইসরয়’ (Viceroy) বলতে কী বোঝায়? ভারতের প্রথম ভাইসরয় কে ছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ভাইসরয়’ কথাটির অর্থ হলো রাজপ্রতিনিধি বা মহারানির প্রতিনিধি। 1858 সালের পর থেকে ভারতের গভর্নর জেনারেলকে সরাসরি মহারানির প্রতিনিধি হিসেবে ভাইসরয় উপাধি দেওয়া হয় এবং লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন।
24. মহারানির ঘোষণাপত্রের (Queen’s Proclamation, 1858) প্রধান দুটি প্রতিশ্রুতি কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1858 সালের 1 নভেম্বর প্রকাশিত এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়: (1) ব্রিটিশ সরকার ভারতে আর সাম্রাজ্য বিস্তার করবে না এবং দেশীয় রাজাদের দত্তক নেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। (2) ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
25. 1857 সালের বিদ্রোহকে কেন কেবল ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলা হয়?
উত্তর দেখো
উত্তর: অনেক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মতো ভারতীয়দের মতে, 1857 সালের বিদ্রোহটি মূলত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কিছু অসন্তুষ্ট ভারতীয় সিপাহির দ্বারা শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে কোনো জাতীয়তাবাদী চেতনা বা সর্বভারতীয় যোগদান ছিল না, তাই তারা একে নিছক ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন।
26. ভি. ডি. সাভারকর কেন 1857 সালের বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতে, এটি কেবল সিপাহিদের বিদ্রোহ ছিল না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ (কৃষক, জমিদার, রাজা) ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদেশি ব্রিটিশ শাসনকে ভারত থেকে উৎখাত করার জন্য এই সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল। তাই এটি ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ।