অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 5 ‘ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3) – পর্ব 1

নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

1. সতীদাহ প্রথা রদ করার ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর দেখো
সতীদাহ প্রথা রদ করতে রামমোহন রায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন:

  • শাস্ত্রীয় প্রমাণ: তিনি প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে, বিধবাদের জোর করে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হিন্দু ধর্মের কোনো অংশ নয়, এটি একটি জঘন্য প্রথা।
  • জনমত গঠন: তিনি নিজের পত্রিকা (‘সংবাদ কৌমুদী’) এবং পুস্তিকা প্রকাশ করে এই প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলেন এবং রক্ষণশীল হিন্দুদের তীব্র বিরোধিতার সাহসের সাথে মোকাবিলা করেন।
  • আইনি সাফল্য: তাঁর এই নিরলস আন্দোলনের ফলেই গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1829 খ্রিস্টাব্দে আইন করে (17 নম্বর রেগুলেশন) সতীদাহ প্রথা চিরতরে নিষিদ্ধ করেন।

2. বিধবা বিবাহ প্রচলনের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
হিন্দু বিধবা মহিলাদের দুর্দশা দূর করতে বিদ্যাসাগর এক প্রবল আন্দোলন শুরু করেন:

  • শাস্ত্রের যুক্তি: ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি প্রমাণ করেন যে, হিন্দু শাস্ত্রে বিধবা বিবাহের স্পষ্ট বিধান দেওয়া আছে। এটি কোনো অশাস্ত্রীয় কাজ নয়।
  • আইন পাস: তাঁর লেখা পুস্তিকা এবং ব্যাপক গণস্বাক্ষর সংগ্রহের চাপে ব্রিটিশ সরকার 1856 খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করতে বাধ্য হয়।
  • ব্যক্তিগত উদ্যোগ: তিনি শুধু আইন করেই থেমে থাকেননি, প্রবল সামাজিক বাধার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের ছেলের সাথে এক বিধবার বিবাহ দিয়ে সমাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

3. ‘নব্যবঙ্গ’ বা ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর সমাজ সংস্কার আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর দেখো
ডিরোজিওর অনুগামীদের আন্দোলন খুব দ্রুত জনপ্রিয় হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল:

  • জনবিচ্ছিন্নতা: নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত শহরকেন্দ্রিক ইংরেজি শিক্ষিত তরুণ ছিলেন। বাংলার বৃহত্তর গ্রামীণ সমাজ বা সাধারণ কৃষকদের সমস্যার সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
  • উগ্র বিরোধিতা: তারা হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারের বিরোধিতার নামে অনেক সময় হিন্দু দেবদেবী এবং হিন্দু সমাজের প্রতি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষ ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি।
  • সঠিক দিশার অভাব: ডিরোজিওর অকাল মৃত্যুর পর এই আন্দোলন সঠিক নেতৃত্ব হারায় এবং সদস্যদের অনেকেই পরে ব্রিটিশ সরকারের চাকরিতে যোগ দিয়ে সংস্কার আন্দোলন থেকে সরে আসেন।

4. স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্তবাদ’ (Neo-Vedanta) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
স্বামী বিবেকানন্দ প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র বা বেদান্তের এক আধুনিক ও যুগোপযোগী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যা ‘নব্য বেদান্তবাদ’ নামে পরিচিত:

  • মানব সেবাই ঈশ্বর সেবা: তিনি মনে করতেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস। তাই মঠ বা মন্দিরে বসে শুধু পুজো করার চেয়ে, দরিদ্র ও আর্ত মানুষের সেবা করাই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
  • চরিত্র গঠন: তিনি এমন এক ধর্ম চেয়েছিলেন যা মানুষকে সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং দেশপ্রেম শেখাবে। তাঁর মতে, দুর্বলতা হলো পাপ এবং সবলতাই হলো পুণ্য। তাঁর এই মতাদর্শ ভারতীয় যুবসমাজকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

5. স্যার সৈয়দ আহমেদ খান মুসলমানদের উন্নয়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন?

উত্তর দেখো
স্যার সৈয়দ আহমেদ খান অনুভব করেছিলেন, আধুনিক শিক্ষা ছাড়া মুসলিম সমাজের উন্নতি অসম্ভব:

  • ইংরেজি শিক্ষার প্রসার: মুসলিম সমাজকে গোঁড়ামি থেকে বের করে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য তিনি 1875 খ্রিস্টাব্দে ‘মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ’ (বর্তমান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা: তিনি চেয়েছিলেন ভারতীয় মুসলমানরা ব্রিটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা করে সরকারি চাকরি এবং রাজনীতিতে নিজেদের হারানো সম্মান ও অধিকার ফিরে পাক। তাঁর এই সার্বিক প্রচেষ্টাই আলিগড় আন্দোলন নামে পরিচিত।

6. তিতুমিরের নেতৃত্বে বারাসাত বিদ্রোহের প্রধান কারণ বা লক্ষ্য কী ছিল?

উত্তর দেখো
তিতুমির বাংলায় যে ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা মূলত কৃষক বিদ্রোহে রূপ নেয়:

  • জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা: স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের বেআইনি কর আদায় (যেমন- দাড়ি রাখার ওপর কর) এবং ইউরোপীয় নীলকর সাহেবদের চরম শোষণের হাত থেকে গরিব কৃষকদের রক্ষা করাই ছিল এই বিদ্রোহের প্রধান কারণ।
  • ব্রিটিশ শাসনের অবসান: তিতুমির ঘোষণা করেছিলেন, কোম্পানির শাসন শেষ হয়ে গেছে। তিনি ব্রিটিশদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে একটি স্বাধীন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছিলেন।

7. ফরাজি আন্দোলন কীভাবে একটি ধর্মীয় আন্দোলন থেকে কৃষক বিদ্রোহে পরিণত হয়?

উত্তর দেখো
ধর্মীয় আন্দোলন: প্রথমদিকে হাজি শরিয়তউল্লাহ ইসলাম ধর্মকে কুসংস্কারমুক্ত করার জন্যই এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

কৃষক বিদ্রোহে রূপান্তর: তাঁর পুত্র মহম্মদ মহসীন বা দুদু মিঞার নেতৃত্বে এটি সম্পূর্ণ কৃষক বিদ্রোহের রূপ নেয়। দুদু মিঞা ঘোষণা করেন, “জমি আল্লাহর দান, তাই জমির ওপর কর ধার্য করার অধিকার কোনো জমিদারের নেই।” তিনি কৃষকদের সংগঠিত করে নীলকর এবং অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

8. সাঁওতাল বিদ্রোহের (1855) প্রধান তিনটি কারণ উল্লেখ করো।

উত্তর দেখো
সাঁওতাল বিদ্রোহ বা ‘হুল’ মূলত তিনটি কারণে সংঘটিত হয়েছিল:

  • দিকুদের শোষণ: বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ীরা (দিকু) সাঁওতালদের চড়া সুদে ঋণ দিয়ে এবং ওজনে ঠকিয়ে তাদের সমস্ত ফসল ও জমি কেড়ে নিত।
  • ব্রিটিশ কর্মচারীদের অত্যাচার: ব্রিটিশ রেল ঠিকাদাররা সাঁওতালদের দিয়ে জোর করে এবং অত্যন্ত কম মজুরিতে রেলপথ নির্মাণের কাজ করাত এবং অবাধ্য হলে তাদের ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালাত।
  • নারীদের ওপর নির্যাতন: ব্রিটিশ কর্মচারী ও দিকুরা সাঁওতাল মহিলাদের ওপর চরম অমর্যাদাকর আচরণ ও অত্যাচার করত, যা সাঁওতালদের বিদ্রোহের আগুনে ঘি ঢেলেছিল।

9. বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা বিদ্রোহের বা ‘উলগুলান’-এর কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
1899 খ্রিস্টাব্দে রাঁচি অঞ্চলে সংঘটিত মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল:

  • যৌথ মালিকানা লোপ: মুন্ডাদের চিরাচরিত যৌথ জমির মালিকানা ব্যবস্থা বা ‘খুঁৎকাঠি’ প্রথা ভেঙে দিয়ে ব্রিটিশরা সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং চড়া কর চাপিয়েছিল।
  • জমি হারানো: দিকুরা (বহিরাগত জমিদার ও মহাজন) প্রতারণার মাধ্যমে মুন্ডাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাদের নিজেদের জমিতেই দিনমজুরে পরিণত করেছিল।
  • মিশনারিদের আচরণ: খ্রিস্টান মিশনারিরা মুন্ডাদের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করছিল এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও রীতিনীতিতে আঘাত হানছিল।

10. 1857 সালের মহাবিদ্রোহের প্রধান রাজনৈতিক কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
মহাবিদ্রোহের পেছনে বেশ কিছু গভীর রাজনৈতিক ক্ষোভ জমা হয়েছিল:

  • স্বত্ববিলোপ নীতি: লর্ড ডালহৌসি ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে দেশীয় রাজাদের দত্তক নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেন এবং ঝাঁসি, সিতারা, সম্বলপুর প্রভৃতি রাজ্য দখল করেন।
  • ভাতা ও মর্যাদা হ্রাস: ব্রিটিশরা শেষ পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তক পুত্র নানা সাহেবের ভাতা বন্ধ করে দেয় এবং মুঘল সম্রাটের রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
  • অযোধ্যা দখল: কুশাসনের অজুহাতে লর্ড ডালহৌসি অযোধ্যা রাজ্য দখল করে নিলে সেখানকার নবাব ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

11. মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো。

উত্তর দেখো
ব্রিটিশদের দীর্ঘ 100 বছরের অর্থনৈতিক শোষণ এই বিদ্রোহের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল:

  • কৃষকদের দুর্দশা: চিরস্থায়ী ও রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে চড়া রাজস্বের চাপে এবং মহাজনদের শোষণে কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল।
  • শিল্প ধ্বংস: ব্রিটিশদের অবাধ বাণিজ্য নীতির ফলে দেশীয় হস্ত ও কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়ে যায় এবং লক্ষ লক্ষ কারিগর ও তাঁতি বেকার হয়ে পড়ে।
  • ইনাম কমিশন: লর্ড ডালহৌসি ‘ইনাম কমিশন’ বসিয়ে বহু জমিদার ও লাখেরাজদারের (নিষ্কর জমির মালিক) জমি বাজেয়াপ্ত করেন, যার ফলে তারা ব্রিটিশদের ঘোর শত্রুতে পরিণত হয়।

12. মহাবিদ্রোহের সামাজিক ও ধর্মীয় কারণগুলি কী কী ছিল?

উত্তর দেখো
রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজ ব্রিটিশদের বিভিন্ন সংস্কারকে ধর্ম ও সমাজের ওপর আঘাত বলে মনে করেছিল:

  • সমাজ সংস্কার: সতীদাহ প্রথা রদ (1829), হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাস (1856) এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ ভালো চোখে দেখেনি।
  • ধর্মান্তরিত করার ভয়: খ্রিস্টান মিশনারিরা ভারতীয়দের জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করছিল। উপরন্তু, 1850 সালের আইনে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিকেও পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার দেওয়ায় ভারতীয়রা চরম ক্ষুব্ধ হয়।
  • বর্ণবিদ্বেষ: ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ‘কালা আদমি’ বলে অবজ্ঞা করত এবং ট্রেনে বা রেস্তোরাঁয় ভারতীয়দের সাথে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করত।

13. 1857 সালের বিদ্রোহে সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষের সামরিক কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
ভারতীয় সিপাহিরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করলেও তারা নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হতো:

  • বেতন ও পদোন্নতি: একই কাজ করেও ব্রিটিশ সেনাদের তুলনায় ভারতীয় সিপাহিদের বেতন অনেক কম ছিল এবং তাদের উচ্চপদে (সুবাদার পদের ওপর) ওঠার কোনো সুযোগ ছিল না।
  • ধর্মীয় আঘাত: হিন্দু সিপাহিদের কপালে তিলক কাটা বা মুসলমানদের দাড়ি রাখায় বাধা দেওয়া হতো।
  • বিদেশে যুদ্ধ: 1856 সালের ‘জেনারেল সার্ভিস এনলিস্টমেন্ট অ্যাক্ট’ অনুযায়ী হিন্দু সিপাহিদের জোর করে সমুদ্র পেরিয়ে (কালাপানি) বিদেশে যুদ্ধ করতে পাঠানো হতো, যা তাদের ধর্মে ঘোরতর পাপ বলে গণ্য হতো।

14. ‘এনফিল্ড রাইফেলের টোটা’ বিতর্ক কীভাবে মহাবিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে উঠেছিল?

উত্তর দেখো

তাৎক্ষণিক কারণ: 1857 সালের শুরুতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে একটি নতুন ‘এনফিল্ড রাইফেল’ চালু হয়। এর টোটার (cartridge) খোলসটি দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ভরতে হতো। সিপাহিদের মধ্যে হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এই টোটার খোলসে গরু এবং শূকরের চর্বি মাখানো আছে।

গরু হিন্দুদের কাছে পবিত্র এবং শূকর মুসলমানদের কাছে অপবিত্র। তাই হিন্দু ও মুসলমান উভয় সিপাহিরাই মনে করে যে, ব্রিটিশ সরকার চক্রান্ত করে তাদের ধর্মনাশ করতে চাইছে। এই ধর্মীয় আঘাতেই সিপাহিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

15. 1857 সালের মহাবিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর দেখো
বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও কয়েকটি কারণে মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়:

  • যোগ্য নেতৃত্বের অভাব: সিপাহিদের মধ্যে রানি লক্ষ্মীবাই বা নানা সাহেবের মতো নেতা থাকলেও, সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে বিদ্রোহ পরিচালনা করার মতো কোনো যোগ্য কেন্দ্রীয় নেতা ছিল না। বৃদ্ধ বাহাদুর শাহের সেই ক্ষমতা ছিল না।
  • ঐক্য ও পরিকল্পনার অভাব: বিদ্রোহীদের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা পরিকল্পনা ছিল না। সবাই নিজের নিজের স্বার্থ ও রাজ্য উদ্ধারের জন্যই লড়ছিল।
  • অসহযোগিতা: ভারতের সব অঞ্চলের মানুষ এতে যোগ দেয়নি। বিশেষ করে দেশীয় রাজারা (যেমন- সিন্ধিয়া, হোলকার) এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ব্রিটিশদেরই সাহায্য করেছিল।

16. 1857 সালের বিদ্রোহকে কি কেবলমাত্র ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলা যুক্তিসঙ্গত?

উত্তর দেখো
না, 1857 সালের বিদ্রোহকে কেবলমাত্র ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।

  • বিদ্রোহটি প্রথমে সেনাবাহিনীর সিপাহিরা শুরু করলেও খুব দ্রুত তা অযোধ্যা, বিহার, রোহিলখণ্ড প্রভৃতি অঞ্চলে সাধারণ মানুষের গণবিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল।
  • ব্রিটিশদের শোষণে সর্বস্বান্ত হওয়া কৃষক, কারিগর এবং ক্ষমতাচ্যুত দেশীয় রাজা ও জমিদাররাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন। তাই ভি. ডি. সাভারকর একে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ এবং কার্ল মার্কস একে ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

17. 1858 সালের ‘মহারানির ঘোষণাপত্র’ (Queen’s Proclamation)-এর মূল প্রতিশ্রুতিগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমিত করতে মহারানি ভিক্টোরিয়া 1858 সালের 1 নভেম্বর এই ঘোষণাপত্র জারি করেন। এর মূল প্রতিশ্রুতিগুলি ছিল:

  • সাম্রাজ্য বিস্তার বন্ধ: ব্রিটিশ সরকার ভারতে আর কোনো নতুন রাজ্য দখল করবে না এবং দেশীয় রাজাদের দত্তক নেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা: ভারতবাসীর ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি এবং প্রাচীন প্রথাগুলিতে ব্রিটিশ সরকার আর হস্তক্ষেপ করবে না।
  • সমানাধিকার: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতা অনুযায়ী সকল ভারতীয়কে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।

18. 1858 সালের ‘ভারত শাসন আইন’-এর ফলে ভারতের শাসনব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন এসেছিল?

উত্তর দেখো
মহাবিদ্রোহের পর 1858 সালের ভারত শাসন আইন (Government of India Act 1858) পাস হয়, যার ফলে প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন আসে:

  • কোম্পানির শাসনের অবসান: ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুট বা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাতে চলে যায়।
  • ভারত সচিব নিয়োগ: কোম্পানির ‘বোর্ড অব কন্ট্রোল’ বাতিল করে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে ‘ভারত সচিব’ (Secretary of State for India) হিসেবে নিয়োগ করা হয়, যিনি ভারতের সব বিষয়ের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হন।
  • ভাইসরয় পদ সৃষ্টি: ভারতের গভর্নর জেনারেলকে এখন থেকে সরাসরি মহারানির প্রতিনিধি বা ‘ভাইসরয়’ উপাধি দেওয়া হয় (লর্ড ক্যানিং প্রথম ভাইসরয় হন)।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার