অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3) – পর্ব 1
নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
1. 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে ‘সভাসমিতির যুগ’ (Age of Associations) বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে ‘সভাসমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ:
- রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ: পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়রা এই সময় নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ও দাবিদাওয়া সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
- সংগঠন প্রতিষ্ঠা: নিজেদের অভাব-অভিযোগ ব্রিটিশ সরকারের কাছে তুলে ধরার জন্য বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে একাধিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন বা সভাসমিতি গড়ে ওঠে। যেমন- জমিদার সভা, ভারত সভা, পুনা সার্বজনিক সভা ইত্যাদি।
2. ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’ (1836)-এর কার্যাবলি বা উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
কালীনাথ রায়চৌধুরীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’ ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন। এর কার্যাবলি ছিল:
- ধর্ম ও সমাজ সংস্কার থেকে বিরতি: এই সভা ধর্ম বা সমাজ সংস্কারের বদলে মূলত সরকারের বিভিন্ন কাজের আলোচনা ও সমালোচনা করত।
- কর ও শাসন ব্যবস্থার প্রতিবাদ: সরকারের নিষ্কর জমির ওপর কর আরোপ করার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে এই সভা একটি জনসভা আয়োজন করেছিল এবং সরকারের কাছে আবেদনপত্র পাঠিয়েছিল।
3. ‘জমিদার সভা’ (Landholders’ Society) প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
1838 খ্রিস্টাব্দে রাধাকান্ত দেব ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ‘জমিদার সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্যগুলি হলো:
- জমিদারদের স্বার্থরক্ষা: বাংলা, বিহার ও ওড়িশার জমিদারদের সংঘবদ্ধ করে তাদের নিজস্ব স্বার্থ এবং জমিদারি অধিকার রক্ষা করা।
- নিষ্কর জমির অধিকার: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রসার ঘটানো এবং ব্রিটিশ সরকার যাতে নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করতে না পারে, তার জন্য আইনি লড়াই করা।
- নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন: ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত থেকে নিয়মতান্ত্রিক বা নিয়মতান্ত্রিক পথে নিজেদের দাবিদাওয়া আদায় করা।
4. ‘হিন্দু মেলা’ বা ‘চৈত্র মেলা’ প্রতিষ্ঠার প্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
1867 খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখের উদ্যোগে ‘হিন্দু মেলা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান লক্ষ্যগুলি ছিল:
- জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা: শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে হিন্দু ধর্মের অতীত গৌরব ও ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলা।
- স্বদেশি শিল্পের প্রসার: দেশীয় শিল্প, হস্তশিল্প ও দেশীয় কুটিরশিল্পের প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশবাসীকে স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
- শরীরচর্চা: ভারতীয়দের শারীরিক দুর্বলতা দূর করতে কুস্তি, লাঠিখেলা ও জিমন্যাস্টিকসের মাধ্যমে শরীরচর্চায় যুবকদের উদ্বুদ্ধ করা।
5. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত সভা’-র (1876) প্রধান উদ্দেশ্যগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন ‘ভারত সভা’ (Indian Association)-এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:
- জনমত গঠন: দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে শক্তিশালী জনমত গঠন করা।
- রাজনৈতিক ঐক্য: সমস্ত ভারতীয়কে একই রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা এবং একটি সর্বভারতীয় গণআন্দোলন গড়ে তোলা।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপন করে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করা।
6. লর্ড লিটন কেন 1878 খ্রিস্টাব্দে ‘দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন’ (Vernacular Press Act) পাস করেন?
উত্তর দেখো
লর্ড লিটনের এই কুখ্যাত আইন পাস করার প্রধান কারণগুলি হলো:
- সংবাদপত্রের সমালোচনা: 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সোমপ্রকাশ, অমৃতবাজার পত্রিকার মতো দেশীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলি ব্রিটিশ সরকারের চরম অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করে।
- জাতীয়তাবাদের প্রসার রোধ: এই সংবাদপত্রগুলির মাধ্যমে ভারতবাসীর মনে যে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তা দমন করে দেশীয় সংবাদপত্রগুলির কণ্ঠরোধ করার জন্যই লিটন এই কালাকানুন পাস করেন (ইংরেজি সংবাদপত্রের ওপর এই আইন প্রযোজ্য ছিল না)।
7. 1878 খ্রিস্টাব্দের ‘অস্ত্র আইন’ (Arms Act) ভারতীয়দের কাছে কেন অপমানজনক ছিল?
উত্তর দেখো
লর্ড লিটন প্রবর্তিত 1878 সালের অস্ত্র আইনটি ছিল চরম বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক, কারণ:
- বৈষম্যমূলক নীতি: এই আইনে বলা হয়, কোনো ভারতীয় সরকারি লাইসেন্স ছাড়া কোনো অস্ত্র রাখতে পারবে না। অথচ ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয় বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য ছিল না।
- অবিশ্বাসের প্রমাণ: এই আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, তারা ভারতীয়দের বিশ্বাস করে না এবং ভারতীয়দের আত্মরক্ষার অধিকারকেও তারা কেড়ে নিতে চায়। ভারত সভা এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করেছিল।
8. ‘ইলবার্ট বিল’ (Ilbert Bill) বিতর্ক কী?
উত্তর দেখো
প্রেক্ষাপট: আগে মফস্বল আদালতে কোনো ভারতীয় বিচারক ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করতে পারতেন না। এটি ছিল চরম বর্ণবিদ্বেষের উদাহরণ।
বিতর্ক: উদারপন্থী ভাইসরয় লর্ড রিপন বিচারব্যবস্থার এই বৈষম্য দূর করার জন্য তাঁর আইনসচিব সি. পি. ইলবার্টকে দিয়ে 1883 সালে একটি বিল বা খসড়া আইন রচনা করেন, যেখানে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়রা এই বিলের তীব্র বিরোধিতা শুরু করলে যে প্রবল রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তাকেই ইলবার্ট বিল বিতর্ক বলা হয়।
9. ‘শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ’ (White Mutiny) বলতে কী বোঝায়? এর ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর দেখো
শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ: ইলবার্ট বিলে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার দেওয়া হলে, ইউরোপীয়রা চরম বর্ণবিদ্বেষ ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে এই বিলের বিরুদ্ধে ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি করে যে প্রবল ও সংঘবদ্ধ আন্দোলন শুরু করেছিল, তাকেই শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ বলা হয়।
ফলাফল: ইউরোপীয়দের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ব্রিটিশ সরকার ইলবার্ট বিল সংশোধন করতে বাধ্য হয়। এতে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের আসল বর্ণবিদ্বেষী রূপটি চিনতে পারে এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারত সভা এর বিরুদ্ধে পাল্টা তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলে।
10. জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর দেখো
ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম (A.O. Hume) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন:
- উদ্যোগ গ্রহণ: তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন যে ভারতীয়দের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ মেটানোর জন্য একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ প্রয়োজন। 1883 সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের একটি খোলা চিঠি লিখে সংঘবদ্ধ হতে আহ্বান জানান।
- ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন: তাঁরই প্রচেষ্টায় 1884 সালে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ গঠিত হয়, যা পরে 1885 সালে ‘জাতীয় কংগ্রেস’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
- যোগাযোগ স্থাপন: তিনি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নওরোজির মতো নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের এই সর্বভারতীয় মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
11. জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘সেফটি ভালভ’ (Safety Valve) তত্ত্বটি কী?
উত্তর দেখো
অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম কেন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একটি বিখ্যাত তত্ত্ব হলো ‘সেফটি ভালভ তত্ত্ব’:
- ক্ষোভ প্রশমন: হিউম মনে করতেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মনে যে প্রবল ক্ষোভ জমা হচ্ছে, তা 1857 সালের মতো আরও একটি ভয়ংকর বিদ্রোহের রূপ নিতে পারে।
- নিরাপত্তা কপাট: প্রেসার কুকারে বাষ্প জমে বিস্ফোরণ যাতে না হয়, তার জন্য যেমন ‘সেফটি ভালভ’ থাকে, তেমনি ভারতীয়দের সেই রাজনৈতিক ক্ষোভ যাতে শান্তিপূর্ণভাবে বেরিয়ে যেতে পারে, তার জন্যই হিউম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে এই ‘সেফটি ভালভ’ বা নিরাপত্তা কপাট হিসেবে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
12. ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন (1885) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর দেখো
1885 খ্রিস্টাব্দে ভারতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়:
- স্থান ও সময়: 1885 খ্রিস্টাব্দের 28 ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বই) গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন বসে। প্রথমে এটি পুনেতে হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে কলেরার প্রাদুর্ভাবের জন্য স্থান পরিবর্তন করা হয়।
- নেতৃত্ব: এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট বাঙালি আইনজীবী উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
- অংশগ্রহণ: সারা ভারত থেকে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মোট 72 জন প্রতিনিধি এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
13. আদি পর্বের (1885-1905) ‘নরমপন্থী’ নেতাদের প্রধান দাবিগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম কুড়ি বছরের নেতাদের নরমপন্থী বলা হতো। তাদের প্রধান দাবিগুলি ছিল:
- প্রশাসনিক সংস্কার: আইনসভাগুলিতে ভারতীয় প্রতিনিধিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষার বয়স বাড়িয়ে ভারতে ও ইংল্যান্ডে একই সাথে পরীক্ষা নেওয়া।
- অর্থনৈতিক দাবি: ভারতের ওপর থেকে অতিরিক্ত করের বোঝা কমানো, সামরিক ব্যয় হ্রাস করা এবং সেই অর্থ কৃষির উন্নতি ও শিক্ষার প্রসারে ব্যবহার করা।
- নাগরিক অধিকার: সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং অস্ত্র আইন ও দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইনের মতো দমনমূলক আইন বাতিল করা।
14. নরমপন্থী নেতাদের ‘আবেদন-নিবেদন নীতি’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
জাতীয় কংগ্রেসের আদি পর্বের নেতারা (দাদাভাই নওরোজি, ফিরোজশাহ মেহতা প্রমুখ) ব্রিটিশ শাসনের প্রতি প্রবল আস্থাশীল ছিলেন:
- নিয়মতান্ত্রিক পথ: তাঁরা সশস্ত্র বিপ্লব বা আইন অমান্যের বিরোধী ছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, আইনসম্মত ও নিয়মতান্ত্রিক পথে চললে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের দাবি মেনে নেবে।
- পদ্ধতি: তাঁরা সরকারের কাছে নিজেদের অভাব-অভিযোগ ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়াগুলি চিঠি, স্মারকলিপি (Memorandum), এবং প্রতিনিধিদল পাঠানোর মাধ্যমে অত্যন্ত বিনীতভাবে পেশ করতেন। ব্রিটিশদের কাছে তাঁদের এই শান্তিপূর্ণ আবেদন জানানোর পদ্ধতিই ‘আবেদন-নিবেদন নীতি’ (Prayer and Petition) নামে পরিচিত।
15. ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ (Economic Nationalism) কী?
উত্তর দেখো
- 19 শতকের শেষদিকে দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত এবং মহাদেব গোবিন্দ রানাডের মতো নেতারা ভারতের দারিদ্র্যের কারণ অনুসন্ধান করেন।
- তাঁরা বই ও প্রবন্ধ লিখে পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেন যে, ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক বাণিজ্য নীতি, চড়া ভূমিরাজস্ব এবং সম্পদের নির্গমনই ভারতের চরম দারিদ্র্যের মূল কারণ।
- ব্রিটিশদের এই অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মনে যে তীব্র প্রতিবাদী ও জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয়েছিল, তাকেই ঐতিহাসিকরা ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
16. ‘সম্পদের নির্গমন’ (Drain of Wealth) তত্ত্বটি কে, কীভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন?
উত্তর দেখো
‘ভারতের বৃদ্ধ মানুষ’ বা দাদাভাই নওরোজি সর্বপ্রথম তাঁর ‘Poverty and Un-British Rule in India’ গ্রন্থে এই তত্ত্বটি তুলে ধরেন:
- একতরফা পাচার: তিনি দেখান যে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সরকার ভারত থেকে আদায় করা রাজস্ব দিয়েই ভারতের কাঁচামাল কিনে অত্যন্ত সস্তায় ইংল্যান্ডে পাঠাচ্ছে।
- বিনিময়হীনতা: এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ (অর্থ, কাঁচামাল, সোনা-রুপো) পাচারের বিনিময়ে ভারত কোনো সামরিক, বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছিল না। এটি ছিল একতরফা শোষণ। এই ঘটনাকেই তিনি ‘সম্পদের নির্গমন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
17. জাতীয়তাবাদ বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
1882 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে একটি মাইলফলক:
- দেশমাতৃকার ধারণা: এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র মাতৃভূমিকে কেবল ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং এক দেবীমূর্তি (মা দুর্গা/কালী) হিসেবে কল্পনা করে ভারতবাসীকে দেশপূজার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন।
- বন্দে মাতরম: এই উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ গানটি পরবর্তীকালে সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মন্ত্র বা জাতীয় ধ্বনিতে পরিণত হয়, যা শুনে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন।
- আত্মত্যাগের শিক্ষা: সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা এই বই যুবসমাজকে দেশের স্বাধীনতার জন্য চরম আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
18. স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ কীভাবে ভারতীয়দের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল?
উত্তর দেখো
স্বামী বিবেকানন্দ রচিত ‘বর্তমান ভারত’ (1899) প্রবন্ধটি জাতীয়তাবোধ জাগরণে অপরিসীম ভূমিকা নিয়েছিল:
- আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: তিনি ভারতবাসীকে ভীরুতা, দুর্বলতা ও দাসত্ববোধ ঝেড়ে ফেলে শক্তিশালী ও সাহসী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, “হে ভারত ভুলিও না— নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।”
- জনগণের ওপর আস্থা: তিনি মুষ্টিমেয় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের বদলে দেশের কোটি কোটি সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষকে দেশের আসল শক্তি বলে মনে করতেন। তাঁর এই বাণী ভারতবাসীকে এক গভীর ঐক্যের বাঁধনে এবং জ্বলন্ত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ
(অতিরিক্ত বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
19. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় সম্মেলন’ বা ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স’ (National Conference)-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর দেখো
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার আগে ‘জাতীয় সম্মেলন’ ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সম্মেলন। এর গুরুত্ব অপরিসীম:
- সর্বভারতীয় মঞ্চ: 1883 এবং 1885 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ভারত সভার উদ্যোগে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন। এটিই জাতীয় কংগ্রেসের একটি রূপরেখা বা মডেল তৈরি করে দিয়েছিল।
- কংগ্রেসের সাথে মিলন: 1886 সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই ‘জাতীয় সম্মেলন’ বা ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স’-কে কংগ্রেসের সাথে যুক্ত করে দেন, ফলে জাতীয় কংগ্রেস একটি শক্তিশালী রূপ পায়।
20. জাতীয় কংগ্রেসের আদি পর্বের (1885-1905) ‘নরমপন্থী’ নেতাদের কাজের সীমাবদ্ধতা বা দুর্বলতাগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
নরমপন্থী নেতারা জাতীয়তাবাদের ভিত তৈরি করলেও তাঁদের কিছু দুর্বলতা ছিল:
- জনবিচ্ছিন্নতা: কংগ্রেসের এই প্রথম পর্বের নেতারা মূলত শহরের উচ্চবিত্ত ও ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ছিলেন। দেশের সাধারণ গরিব কৃষক, শ্রমিক বা সাধারণ মানুষের সাথে তাঁদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
- ব্রিটিশদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস: তাঁরা মনে করতেন ব্রিটিশ শাসন ভারতের পক্ষে একটি আশীর্বাদ এবং ব্রিটিশরা ন্যায়বিচারক। তাই তাঁরা চরমপন্থার বদলে শুধুমাত্র আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে দাবি আদায়ে বিশ্বাসী ছিলেন, যাকে পরবর্তীকালের চরমপন্থী নেতারা ‘রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি’ বলে উপহাস করেছেন।