অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 6: ‘জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ’ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে জাতীয়তাবোধ জাগরণের বা বিকাশের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
জাতীয়তাবাদ বিকাশের কারণসমূহ:
- পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব: ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়রা রুশো, ভলতেয়ার, ম্যাৎসিনি প্রমুখ পাশ্চাত্য দার্শনিকদের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় এবং নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
- ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণ: ব্রিটিশদের চরম শোষণে ভারতের কৃষিব্যবস্থা ও কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। দাদাভাই নওরোজি তাঁর ‘সম্পদের নির্গমন’ তত্ত্বের মাধ্যমে এই শোষণের কথা তুলে ধরলে ভারতীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভ ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়।
- সংবাদপত্র ও সাহিত্যের প্রভাব: হিন্দু প্যাট্রিয়ট, সোমপ্রকাশ, অমৃতবাজার প্রভৃতি পত্রিকা এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’, স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশাত্মবোধক গান ভারতবাসীকে প্রবল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
- যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি: লর্ড ডালহৌসির আমলে রেলপথ এবং টেলিগ্রাফের প্রসারের ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমে যায় এবং তারা সহজেই নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার আদানপ্রদান করতে সক্ষম হয়।
- ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক নীতি: লর্ড লিটনের অস্ত্র আইন (1878), দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন এবং ইলবার্ট বিল বিতর্কে ব্রিটিশদের চরম বর্ণবিদ্বেষী রূপটি প্রকট হলে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে।
উপসংহার: উপরিউক্ত কারণগুলির সম্মিলিত ফলেই ভারতীয়রা বিচ্ছিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের একটি অখণ্ড ‘জাতি’ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম।
2. ‘ভারত সভা’ (Indian Association) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: 1876 খ্রিস্টাব্দের 26 জুলাই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু এবং শিবনাথ শাস্ত্রীর উদ্যোগে কলকাতায় ‘ভারত সভা’ বা ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার আগে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন।
প্রধান উদ্দেশ্য:
- দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক জনমত গঠন করা।
- হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপন করা।
- সমগ্র ভারতের মানুষকে একই রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি সর্বভারতীয় গণআন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ করা।
ভারত সভার কার্যাবলি ও আন্দোলন:
- সিভিল সার্ভিস আন্দোলন: ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় বসার সর্বোচ্চ বয়স 21 থেকে কমিয়ে 19 বছর করলে ভারত সভা এর বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলে।
- কালাকানুনের প্রতিবাদ: লর্ড লিটনের প্রবর্তিত বৈষম্যমূলক ‘অস্ত্র আইন’ (Arms Act) এবং সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধকারী ‘দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন’ (Vernacular Press Act)-এর বিরুদ্ধে ভারত সভা প্রবল গণআন্দোলন শুরু করে, যার ফলে পরে মুদ্রাযন্ত্র আইনটি বাতিল হয়।
- ইলবার্ট বিল আন্দোলন: ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার রক্ষার্থে ইউরোপীয়দের ‘শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ’-এর বিরুদ্ধে ভারত সভা পাল্টা শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
উপসংহার: ভারত সভা কেবল বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র ভারতে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার একটি সুদৃঢ় পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল।
3. ‘ইলবার্ট বিল’ (Ilbert Bill) বিতর্ক কী? ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এর গুরুত্ব বা ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর দেখো
ইলবার্ট বিল বিতর্ক: 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধেও মফস্বল আদালতে কোনো ভারতীয় বিচারক ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করতে পারতেন না। উদারপন্থী ভাইসরয় লর্ড রিপন বিচারব্যবস্থার এই বৈষম্য দূর করার জন্য তাঁর আইনসচিব সি. পি. ইলবার্টকে দিয়ে 1883 সালে একটি বিল বা খসড়া আইন রচনা করেন, যেখানে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়রা চরম বর্ণবিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে এই বিলের তীব্র বিরোধিতায় ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি করে যে প্রবল ও সংঘবদ্ধ আন্দোলন (‘শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ’) শুরু করেছিল, তাকেই ইলবার্ট বিল বিতর্ক বলা হয়।
গুরুত্ব বা ফলাফল:
- বর্ণবিদ্বেষের নগ্ন রূপ: ইউরোপীয়দের প্রবল আন্দোলনের চাপে সরকার ইলবার্ট বিল সংশোধন করতে বাধ্য হয়। এর ফলে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের আসল বর্ণবিদ্বেষী রূপটি স্পষ্টভাবে চিনতে পারে।
- সংগঠিত হওয়ার শিক্ষা: ইউরোপীয়দের ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর আন্দোলন দেখে ভারতীয়রা বুঝতে পারে যে, ব্রিটিশদের কাছ থেকে কোনো দাবি আদায় করতে হলে ভারতীয়দেরও একটি শক্তিশালী সর্বভারতীয় সংগঠন তৈরি করতে হবে।
- ভারত সভার পাল্টা আন্দোলন: শ্বেতাঙ্গদের এই অন্যায়ের প্রতিবাদে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারত সভা দেশজুড়ে এক বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তোলে, যা ভারতবাসীকে প্রবলভাবে ঐক্যবদ্ধ করে।
উপসংহার: ইলবার্ট বিল বিতর্ক ভারতীয়দের আত্মসম্মানে গভীরভাবে আঘাত করেছিল এবং এই অপমানের আগুন থেকেই 1885 সালে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ ‘জাতীয় কংগ্রেস’-এর জন্ম হয়েছিল।
4. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার (1885) পটভূমি বা কারণগুলি আলোচনা করো। এক্ষেত্রে হিউমের ‘সেফটি ভালভ’ (Safety Valve) তত্ত্বটি কতটা যুক্তিযুক্ত?
উত্তর দেখো
পটভূমি বা কারণ: 1885 খ্রিস্টাব্দের 28 ডিসেম্বর বোম্বাইয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি একদিনে গড়ে ওঠেনি:
- পুঞ্জীভূত ক্ষোভ: ব্রিটিশদের দীর্ঘ অর্থনৈতিক শোষণ, লর্ড লিটনের প্রবর্তিত বৈষম্যমূলক অস্ত্র আইন ও মুদ্রাযন্ত্র আইন ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ বিরোধী তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল।
- ইলবার্ট বিলের শিক্ষা: ইলবার্ট বিল বিতর্কে শ্বেতাঙ্গদের জয়লাভ ভারতীয়দের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে আঞ্চলিক সভার বদলে একটি শক্তিশালী সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চের প্রয়োজন।
- অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগ: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান এ. ও. হিউম ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য একটি সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা ভাবেন। তাঁরই ডাকে সাড়া দিয়ে উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নওরোজি প্রমুখ নেতারা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন।
হিউমের ‘সেফটি ভালভ’ তত্ত্ব:
অনেক ঐতিহাসিকের মতে, হিউম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার জন্যই কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, ভারতীয়দের মনে যে বিপুল ক্ষোভ জমা হচ্ছে তা 1857 সালের মতো আরেকটি ভয়ংকর বিদ্রোহের জন্ম দিতে পারে। তাই প্রেসার কুকারে বাষ্প জমে বিস্ফোরণ যাতে না হয়, তার জন্য যেমন ‘সেফটি ভালভ’ বা নিরাপত্তা কপাট থাকে, তেমনি ভারতীয়দের সেই রাজনৈতিক ক্ষোভ যাতে বিদ্রোহের আকার না নিয়ে এই মঞ্চের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিয়মতান্ত্রিক পথে বেরিয়ে যেতে পারে, তার জন্যই হিউম এই প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেন।
মূল্যায়ন: ‘সেফটি ভালভ’ তত্ত্বটি পুরোপুরি সত্য নয়। ভারতীয় নেতারা বোকা ছিলেন না; তাঁরাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি সর্বভারতীয় মঞ্চ তৈরি করতে গেলে ব্রিটিশদের সাহায্য ছাড়া তা ব্রিটিশ সরকার সহজে মেনে নেবে না। তাই তাঁরাও হিউমকে একপ্রকার ‘লাইটেনিং কন্ডাক্টর’ বা বিদ্যুৎ পরিবাহী হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
5. জাতীয় কংগ্রেসের আদি পর্বের (1885-1905) ‘নরমপন্থী’ (Moderates) নেতাদের কার্যাবলি ও মূল দাবিগুলি মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রথম কুড়ি বছর (1885-1905) দাদাভাই নওরোজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপালকৃষ্ণ গোখলে প্রমুখ নেতারা কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন এবং আইনসম্মত পথে বিশ্বাসী ছিলেন বলে তাঁদের ‘নরমপন্থী’ বলা হয়।
নরমপন্থীদের মূল দাবিগুলি:
- প্রশাসনিক সংস্কার: কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে নির্বাচিত ভারতীয় সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষার বয়স বাড়ানো এবং পরীক্ষাটি ভারতে ও ইংল্যান্ডে একই সাথে গ্রহণ করা।
- অর্থনৈতিক দাবি: ব্রিটিশদের মাত্রাতিরিক্ত সামরিক ব্যয় কমানো, ভারতীয় শিল্পের সংরক্ষণ করা এবং কৃষকদের ওপর থেকে করের বোঝা হ্রাস করা।
- নাগরিক অধিকার: সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান করা এবং অস্ত্র আইন ও দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইনের মতো দমনমূলক আইন বাতিল করা।
কার্যাবলি ও পদ্ধতি (আবেদন-নিবেদন নীতি):
নরমপন্থী নেতারা সশস্ত্র বিপ্লব বা ধর্মঘটে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁরা নিজেদের দাবিদাওয়াগুলি চিঠি, স্মারকলিপি (Memorandum) এবং প্রতিনিধিদল পাঠানোর মাধ্যমে অত্যন্ত বিনীতভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করতেন। এই নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিই ‘আবেদন-নিবেদন নীতি’ (Prayer and Petition) নামে পরিচিত।
মূল্যায়ন (সাফল্য ও ব্যর্থতা):
নরমপন্থীদের এই শান্তিপূর্ন পদ্ধতি খুব একটা সফল হয়নি। ব্রিটিশ সরকার তাঁদের বেশিরভাগ দাবিই মেনে নেয়নি। পরবর্তী চরমপন্থী নেতারা তাঁদের এই নীতিকে ‘রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি’ বলে তীব্র উপহাস করেছেন। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই নরমপন্থী নেতারাই ভারতে ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ (যেমন- সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব) প্রচার করেছিলেন এবং সমগ্র ভারতবাসীকে একই রাজনৈতিক ছাতার তলায় এনে ভারতের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সুদৃঢ় ও গণতান্ত্রিক ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন।
অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ
(অতিরিক্ত বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
6. 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতীয়দের মনে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের অবদান ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে তিনটি গ্রন্থ সমগ্র ভারতবাসীকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল।
1. বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’:
- 1882 খ্রিস্টাব্দে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র মাতৃভূমিকে দেবীমূর্তি (মা দুর্গা বা কালী) হিসেবে কল্পনা করে ভারতবাসীকে দেশপূজার মন্ত্রে দীক্ষিত করেন।
- এই উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ গানটি পরবর্তীকালে সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মন্ত্র বা জাতীয় ধ্বনিতে পরিণত হয়, যা যুবসমাজকে দেশের জন্য চরম আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
2. স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’:
- 1899 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবাসীকে ভীরুতা ও দাসত্ববোধ ঝেড়ে ফেলে সাহসী হওয়ার আহ্বান জানান।
- তিনি মুষ্টিমেয় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের বদলে দেশের কোটি কোটি সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষকে দেশের আসল শক্তি বলে মনে করতেন। তাঁর এই বাণী ভারতবাসীকে এক গভীর ঐক্যের বাঁধনে বেঁধেছিল।
3. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’:
- ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ এক উদার, ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন।
- তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রকৃত ভারতবাসী হতে গেলে হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম বা খ্রিস্টান—সমস্ত সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এবং অন্ধ কুসংস্কার ত্যাগ করে সমস্ত মানুষকে আপন করে নিতে হয়।
উপসংহার: এই তিন মহামানবের সাহিত্যকর্ম কেবল বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে জাতীয় আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
7. ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ বলতে কী বোঝায়? ভারতের দারিদ্র্য ও ‘সম্পদের নির্গমন’ (Drain of Wealth) বিষয়ে নরমপন্থী নেতাদের বক্তব্য আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ: 19 শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত এবং মহাদেব গোবিন্দ রানাডের মতো নেতারা তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেন যে, ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক নীতিই ভারতের চরম দারিদ্র্যের মূল কারণ। ব্রিটিশদের এই অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মনে যে তীব্র প্রতিবাদী চেতনার জন্ম হয়েছিল, তাকেই ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ (Economic Nationalism) বলা হয়।
নরমপন্থী নেতাদের বক্তব্য ও সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব:
- সম্পদের নির্গমন: ‘ভারতের বৃদ্ধ মানুষ’ দাদাভাই নওরোজি তাঁর ‘Poverty and Un-British Rule in India’ গ্রন্থে ‘সম্পদের নির্গমন’ তত্ত্বটি প্রচার করেন। তিনি দেখান যে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিপুল পরিমাণ অর্থ, কাঁচামাল এবং সোনা-রুপো জোর করে ইংল্যান্ডে পাচার করছে।
- বিনিময়হীন শোষণ: এই বিপুল সম্পদ পাচারের বিনিময়ে ভারত কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছিল না। এই একতরফা পাচারই ভারতকে চরম দরিদ্র করে তুলেছিল।
- শিল্প ধ্বংস ও কৃষির বেহাল দশা: রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর ‘Economic History of India’ গ্রন্থে দেখান যে, ব্রিটিশদের অবাধ বাণিজ্য নীতির ফলে ভারতের প্রাচীন হস্ত ও কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। চড়া ভূমিরাজস্বের চাপে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়েছে এবং দেশে বারবার ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে।
- সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি: নরমপন্থী নেতারা তীব্র প্রতিবাদ করে জানান যে, ব্রিটিশরা নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যে যুদ্ধ করছে, তার বিপুল সামরিক ব্যয় অন্যায়ভাবে ভারতীয়দের ঘাড়ে চাপাচ্ছে।
উপসংহার: নরমপন্থী নেতারা হয়তো রাজনৈতিকভাবে খুব একটা সফল হননি, কিন্তু এই অর্থনৈতিক শোষণের স্বরূপ উন্মোচন করে তাঁরা ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ বিরোধী যে শক্তিশালী বীজ বপন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে চরমপন্থী আন্দোলন ও স্বদেশি আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল।