অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 1: ইতিহাসের ধারণা, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর মান 5

অধ্যায় ১: ইতিহাসের ধারণা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. জেমস মিল কীভাবে ভারতের ইতিহাসকে যুগ বিভাজন করেছিলেন? তাঁর এই যুগ বিভাজনের প্রধান ত্রুটিগুলি কী কী ছিল এবং এর ফলে কী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল?

উত্তর দেখো
ভূমিকা: ইতিহাস অধ্যয়নের সুবিধার্থে ঐতিহাসিকরা অতীতকে বিভিন্ন যুগে ভাগ করে থাকেন। ব্রিটিশ স্কটিশ ঐতিহাসিক জেমস মিল ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘A History of British India’ গ্রন্থে ভারতের ইতিহাসের একটি যুগ বিভাজন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়।

জেমস মিলের যুগ বিভাজন: মিল ভারতের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করেছিলেন—

  • হিন্দু যুগ: প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মুসলিম আক্রমণের আগে পর্যন্ত সময়কাল।
  • মুসলিম যুগ: সুলতানি ও মুঘল শাসনকাল।
  • ব্রিটিশ যুগ: ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকাল থেকে আধুনিক পর্ব।

যুগ বিভাজনের প্রধান ত্রুটিগুলি: জেমস মিলের এই বিভাজনটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ত্রুটিপূর্ণ। এর কারণগুলি হলো:

  • শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন: মিল কেবলমাত্র শাসকদের ধর্মের (হিন্দু ও মুসলিম) ভিত্তিতে যুগ বিভাজন করেছিলেন। সমাজ, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির বিবর্তনকে তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন।
  • ঐতিহাসিক সত্যের বিকৃতি: প্রাচীন ভারতে কেবল হিন্দুরাই নয়, বরং মৌর্য সম্রাট অশোক (বৌদ্ধ) বা কুষাণদের মতো ভিনদেশি শাসকরাও রাজত্ব করেছেন। একইভাবে মধ্যযুগে মুঘলদের পাশাপাশি দাক্ষিণাত্যে বিজয়নগরের মতো শক্তিশালী হিন্দু রাজবংশের অস্তিত্ব ছিল, যা মিল অস্বীকার করেছেন।
  • ব্রিটিশ যুগকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার চেষ্টা: তিনি সচেতনভাবে হিন্দু ও মুসলিম যুগকে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ বলে দাবি করেন এবং ব্রিটিশ যুগকে আধুনিকতা ও সভ্যতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন, যা ছিল সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট।

নেতিবাচক প্রভাব: মিলের এই বিভাজন ভারতীয়দের মনে হিন্দু ও মুসলমানদের দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সম্প্রদায় হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতির সহায়ক হিসেবে এটি হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বীজ বপন করেছিল, যার চরম পরিণতি ছিল ভারতের দেশভাগ।

উপসংহার: জেমস মিলের যুগ বিভাজন ইতিহাসের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুন্ন করেছিল। তাই আধুনিক ঐতিহাসিকরা ধর্মের পরিবর্তে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে ভারতের ইতিহাসকে ‘প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক’—এই তিন যুগে ভাগ করাকেই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন।

2. আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার প্রধান উপাদানগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: প্রাচীন বা মধ্যযুগের তুলনায় আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদানের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। মূলত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া আধুনিক যুগের ইতিহাস রচনার উপাদানগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— লিখিত উপাদান এবং দৃশ্য উপাদান।

আধুনিক ইতিহাস রচনার উপাদানসমূহ:

  1. সরকারি নথিপত্র: আধুনিক ইতিহাস রচনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান হলো সরকারি নথিপত্র। ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন আইন, সরকারি নির্দেশনামা, পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট, ভাইসরয়দের প্রতিবেদন প্রভৃতি মহাফেজখানায় (National Archives) সংরক্ষিত আছে। এগুলি থেকে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নীতির প্রামাণ্য ধারণা পাওয়া যায়।
  2. আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা: সরকারি নথির বাইরে সাধারণ মানুষ ও সমকালীন সমাজের আসল রূপ জানা যায় আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’, বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’, সরলাদেবী চৌধুরানীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে স্বদেশি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের কথা জানা যায়।
  3. চিঠিপত্র ও ডায়েরি: বিভিন্ন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিগত ও সরকারি চিঠিপত্র ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। উদাহরণস্বরূপ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর কন্যা ইন্দিরাকে যে চিঠিগুলি লিখেছিলেন (‘Letters from a Father to his Daughter’), তা তৎকালীন সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের এক অনন্য ঐতিহাসিক উপাদান।
  4. সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্র: সমকালীন সংবাদপত্র (যেমন- হিন্দু প্যাট্রিয়ট, সোমপ্রকাশ, যুগান্তর) থেকে শাসকগোষ্ঠীর শোষণ এবং তার বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত সমাজের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রত্যক্ষ খবর পাওয়া যায়।
  5. দৃশ্য উপাদান (ফটোগ্রাফ বা ছবি): আধুনিক ইতিহাস রচনায় ফটোগ্রাফের গুরুত্ব অপরিসীম। ছবি থেকে সমসাময়িক কালের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব ও চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায়, যা অনেক সময় লিখিত উপাদানের সত্যতা যাচাই করতেও সাহায্য করে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক ইতিহাস রচনার জন্য কোনো একটি উপাদানের উপর অন্ধভাবে নির্ভর করা উচিত নয়। ঐতিহাসিকদের উচিত সরকারি নথিপত্রের সাথে আত্মজীবনী, চিঠিপত্র এবং অন্যান্য উপাদানগুলির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে তবেই নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা করা।

3. ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে ‘সরকারি নথিপত্র’ এবং ‘আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা’-এর মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ‘সরকারি নথিপত্র’ এবং ‘আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা’—দুটি উপাদানই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই দুই ধরনের উপাদানের দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এদের মধ্যে একটি তুলনামূলক আলোচনা নিচে করা হলো:

১. দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য (শাসক বনাম শাসিত):

  • সরকারি নথিপত্র: এটি সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি। এই নথিতে ঔপনিবেশিক সরকারের স্বার্থ, শাসনব্যবস্থার সাফল্য এবং ব্রিটিশদের চোখে ভারতীয় সমাজের চিত্রই মূলত প্রতিফলিত হয়েছে।
  • আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা: এগুলি হলো শাসিত বা পরাধীন ভারতীয়দের নিজস্ব বয়ান। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, দেশপ্রেমিক এবং বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-ভাবনা, দুঃখ-কষ্ট এবং ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতার আসল রূপটি ফুটে ওঠে।

২. তথ্যের চরিত্র (প্রশাসনিক বনাম সামাজিক):

  • সরকারি নথিপত্র: এই নথিতে মূলত আইনকানুন, রাজস্ব আদায়, পুলিশি ব্যবস্থা, সেনাদলের তৎপরতা বা প্রশাসনিক কাঠামোর মতো কাঠখোট্টা তথ্য থাকে।
  • আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা: এতে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, পরিবারের ভেতরের নিয়মকানুন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং স্বদেশি আন্দোলনের মতো আবেগপূর্ণ ঘটনাগুলির বিবরণ থাকে (যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’)।

৩. বস্তুনিষ্ঠতা বনাম আবেগ:

  • সরকারি নথিপত্র: এখানে আবেগ বা অনুভূতির কোনো স্থান নেই; এটি একপ্রকার যান্ত্রিক প্রতিবেদন। তবে, নিজেদের ভুল আড়াল করার জন্য ব্রিটিশ সরকার অনেক সময় নথিতে ঘটনাকে বিকৃত করত (যেমন- সাধারণ কৃষক বিদ্রোহকে দস্যুতা বলে চালানো)।
  • আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা: যেহেতু এগুলি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফসল, তাই এতে আবেগ, অতিরঞ্জন বা আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা বেশি থাকে।

উপসংহার: সরকারি নথিপত্র এবং আত্মজীবনী—উভয় উপাদানেরই নিজস্ব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরকারি নথিপত্রে যে ইতিহাস শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে চাপা পড়ে যায়, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। তাই সম্পূর্ণ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার জন্য ঐতিহাসিকদের এই উভয় উপাদানের তথ্যই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার