অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 2: ‘আঞ্চলিক শক্তির উত্থান’ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর মান 5
অধ্যায় ২: আঞ্চলিক শক্তির উত্থান
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণসমূহ:
- ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি: সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর রাজত্বকালের শেষ 25 বছর দাক্ষিণাত্যে মারাঠা ও অন্যান্য শক্তিকে দমনের জন্য ব্যয় করেন। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের ফলে মুঘল রাজকোষ শূন্য হয়ে যায় এবং উত্তর ভারতে প্রশাসনের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে।
- ধর্মীয় গোঁড়ামি: ঔরঙ্গজেবের চরম ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং হিন্দুদের ওপর পুনরায় ‘জিজিয়া’ কর চাপানোর ফলে রাজপুত, মারাঠা, শিখ এবং জাঠদের মতো শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলি মুঘলদের প্রবল শত্রুতে পরিণত হয়।
- দুর্বল উত্তরাধিকারী: ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল সম্রাটরা (যেমন- প্রথম বাহাদুর শাহ, ফারুকশিয়ার) ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল, অযোগ্য এবং বিলাসপ্রিয়। বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার মতো দক্ষতা তাঁদের ছিল না।
- অভিজাতদের অন্তর্দ্বন্দ্ব: সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগে মুঘল দরবারের অভিজাতরা (ইরানি, তুরানি এবং হিন্দুস্তানি গোষ্ঠী) নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তীব্র ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মেতে ওঠে, যা প্রশাসনকে পঙ্গু করে দেয়।
- আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে মুর্শিদকুলি খান (বাংলা), সাদাত খান (অযোধ্যা) এবং নিজাম-উল-মুলক (হায়দরাবাদ)-এর মতো সুবাহদাররা নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন।
- বিদেশি আক্রমণ: নাদির শাহ (1739) এবং আহমদ শাহ আবদালির ভারত আক্রমণ মুঘল সাম্রাজ্যের কঙ্কালসার রূপটি প্রকাশ্যে এনে দেয় এবং সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ডেকে আনে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ঔরঙ্গজেবের ভুল নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের বীজ বপন করেছিল এবং তাঁর পরবর্তী অযোগ্য উত্তরাধিকারীদের আমলে সেই পতন ত্বরান্বিত হয়ে সম্পূর্ণতা লাভ করে।
2. বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধের কারণ:
- দস্তকের অপব্যবহার: 1717 সালের ফারুকশিয়ারের ফরমান অনুযায়ী ইংরেজ কোম্পানি কেবল নিজস্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিনা শুল্কের অধিকার বা ‘দস্তক’ পেয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও এই দস্তকের অপব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে নবাবের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছিল। সিরাজউদ্দৌলা এর প্রতিবাদ করলে সংঘাতের সৃষ্টি হয়।
- নবাবের প্রতি অবজ্ঞা: সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসার পর প্রথা মেনে ইংরেজরা তাঁকে কোনো উপঢৌকন পাঠায়নি বা সম্মান প্রদর্শন করেনি, যা নবাবকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছিল।
- দুর্গ নির্মাণ: দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের অজুহাতে ইংরেজরা নবাবের অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার এবং সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে শুরু করে। নবাব দুর্গ নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দিলেও ইংরেজরা তা অমান্য করে।
- কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: ঢাকার শাসক রাজবল্লভ নবাবের প্রচুর অর্থ তছরুপ করেছিলেন। নবাব তাঁর কাছে হিসাব চাইলে রাজবল্লভ তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাসকে প্রচুর ধনসম্পদসহ কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেন। নবাব কৃষ্ণদাসকে ফেরত চেয়ে দূত পাঠালে ইংরেজ গভর্নর ড্রেক নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন।
- ষড়যন্ত্রে উস্কানি: সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসন লাভের বিরোধী ছিলেন তাঁর মাসি ঘসেটি বেগম এবং সেনাপতি মীরজাফর। ইংরেজরা গোপনে এই বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
উপসংহার: ইংরেজদের ঔদ্ধত্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং বাংলার রাজনীতিতে তাদের অবৈধ হস্তক্ষেপ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কোম্পানির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত পলাশীর যুদ্ধে রূপ নেয়।
3. বক্সারের যুদ্ধের (1764) কারণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
বক্সারের যুদ্ধের কারণ:
- মীরকাশিমের স্বাধীনচেতা মনোভাব: মীরকাশিম ইংরেজদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে চাননি। তিনি ইংরেজ প্রভাব মুক্ত হতে রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে সরিয়ে নিয়ে যান এবং ইউরোপীয় কায়দায় সেনাবাহিনী পুনর্গঠন শুরু করেন, যা ইংরেজদের সন্দিগ্ধ করে তোলে।
- দস্তকের অপব্যবহার ও শুল্ক বৈষম্য: কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে দস্তকের অপব্যবহার দেশীয় বণিকদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। এর প্রতিকার হিসেবে মীরকাশিম ভারতীয় বণিকদের ওপর থেকেও সমস্ত বাণিজ্যিক শুল্ক তুলে নেন। ফলে ইংরেজদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা নষ্ট হয় এবং তারা নবাবের ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
- অযোধ্যায় জোট গঠন: ইংরেজদের সঙ্গে পাটনা, কাটোয়া ও গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মীরকাশিম অযোধ্যায় পালিয়ে যান। সেখানে তিনি অযোধ্যার নবাব এবং মুঘল সম্রাটের সঙ্গে ইংরেজ বিরোধী এক শক্তিশালী সামরিক জোট গঠন করেন, যার ফলে বক্সারের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
- বক্সারের যুদ্ধ পলাশীর মতো কোনো চক্রান্তের ফল ছিল না, এটি ছিল ইংরেজদের প্রকৃত সামরিক শক্তির জয়।
- এই যুদ্ধে মুঘল সম্রাট এবং দুই প্রধান নবাবের পরাজয়ের ফলে সমগ্র উত্তর ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়।
- এই যুদ্ধের ফলেই 1765 খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ‘দেওয়ানি’ লাভ করে এবং বাংলার প্রকৃত শাসকে পরিণত হয়।
উপসংহার: বক্সারের যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে, সামরিক কৌশল ও শৃঙ্খলার দিক থেকে ভারতীয় শক্তিগুলি ইংরেজদের তুলনায় কতটা পিছিয়ে ছিল।
4. দেওয়ানি লাভ বলতে কী বোঝো? রবার্ট ক্লাইভ প্রবর্তিত ‘দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা’-র ফল বাংলার বুকে কতটা ভয়াবহ হয়েছিল তা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Dual Government):
দেওয়ানি লাভের পর রবার্ট ক্লাইভ বাংলায় এক অভিনব শাসন কাঠামোর প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় কোম্পানির হাতে আসে লাভজনক দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা। অন্যদিকে নবাব নজমুদ্দৌলার হাতে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিচারের মতো ক্ষমতাহীন ও ব্যয়বহুল দায়িত্ব। এভাবেই একই প্রদেশে কোম্পানি এবং নবাবের এই যুগ্ম শাসনকে ‘দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা’ বলা হয়।
বাংলার বুকে দ্বৈত শাসনের ভয়াবহ প্রভাব:
- দায়িত্বহীন ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীন দায়িত্ব: এই ব্যবস্থায় কোম্পানির হাতে বিপুল ক্ষমতা থাকলেও সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না। অন্যদিকে, নবাবের দায়িত্ব থাকলেও কাজ করার মতো কোনো অর্থ বা ক্ষমতা তাঁর ছিল না। প্রশাসন পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়।
- কৃষকদের ওপর নির্মম অত্যাচার: কোম্পানি নিজে রাজস্ব আদায় না করে রেজা খান ও সিতাব রায়ের মতো নায়েব-দেওয়ানদের ওপর এই দায়িত্ব চাপায়। এরা কোম্পানির কোষাগার ভরতে বাংলার কৃষকদের ওপর নির্মমভাবে জোরজুলুম করে মাত্রাতিরিক্ত কর আদায় করতে শুরু করে।
- ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: কোম্পানির সীমাহীন লুণ্ঠন, কৃষকদের সর্বস্বান্ত দশা এবং পর পর কয়েক বছরের অনাবৃষ্টির কারণে 1770 খ্রিস্টাব্দে (বাংলা 1176 বঙ্গাব্দ) বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এটিই ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’।
- জনসংখ্যার বিনাশ: এই মন্বন্তরে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ (প্রায় এক কোটি) না খেতে পেয়ে মারা যায়। বাংলার অর্থনীতি ও কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।
উপসংহার: দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ছিল বাংলার বুকে ইংরেজদের চরম লুণ্ঠন ও শোষণের এক আইনি হাতিয়ার। এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে শেষ পর্যন্ত 1772 খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস এই ব্যবস্থার অবসান ঘটান।
5. ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে লর্ড ওয়েলেসলির ‘অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি’ এবং লর্ড ডালহৌসির ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’-র তুলনামূলক আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
১. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance):
- উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি: দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে আনাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এই নীতি গ্রহণ করলে দেশীয় রাজাকে নিজ ব্যয়ে রাজ্যে একদল ব্রিটিশ সৈন্য রাখতে হতো এবং একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট তাঁর দরবারে মোতায়েন থাকতেন।
- সার্বভৌমত্ব হারানো: এর বিনিময়ে ব্রিটিশরা রাজ্যটিকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু সেই রাজাকে অন্য কোনো রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ বা সন্ধি করার অধিকার ছাড়তে হতো, অর্থাৎ তিনি কার্যত স্বাধীন বৈদেশিক নীতি ও সার্বভৌমত্ব হারাতেন।
- প্রয়োগ: হায়দরাবাদের নিজাম সর্বপ্রথম এই নীতি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে মহীশূর, মারাঠা, অযোধ্যা প্রভৃতি রাজ্য এই চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়।
২. স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse):
- উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি: এর উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ আশ্রিত দেশীয় রাজ্যগুলিকে আইনি অজুহাতে সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করা। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো আশ্রিত দেশীয় রাজা নিঃসন্তান মারা গেলে তিনি কোনো দত্তক পুত্র গ্রহণ করতে পারতেন না।
- রাজ্য গ্রাস: রাজার মৃত্যুর পর ওই দেশীয় রাজ্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। হিন্দু শাস্ত্রের দত্তক নেওয়ার প্রাচীন অধিকারকে ডালহৌসি সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করেন।
- প্রয়োগ: এই নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে ডালহৌসি খুব দ্রুত সাতারা, সম্বলপুর, ঝাঁসি, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য গ্রাস করেন।
তুলনামূলক মূল্যায়ন: ওয়েলেসলির নীতি দেশীয় রাজাদের সিংহাসনে বসিয়ে রেখে তাদের সামরিক ও বৈদেশিক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, যা ছিল একপ্রকার ‘পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ’। অন্যদিকে, ডালহৌসির নীতি ছিল অনেক বেশি আগ্রাসী, যা রাজাদের সিংহাসন থেকে পুরোপুরি উৎখাত করে রাজ্যগুলিকে সরাসরি ব্রিটিশ মানচিত্রে যুক্ত করেছিল। এই দুই নীতির ফলেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক বিশাল আকার ধারণ করে।