অধ্যায় 1.4: আলো — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান ২)
1. আলোর প্রতিসরণ কাকে বলে?
উত্তর: আলোক রশ্মি যখন একটি স্বচ্ছ সমসত্ত্ব মাধ্যম থেকে অন্য একটি ভিন্ন ঘনত্বের স্বচ্ছ মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন দুই মাধ্যমের বিভেদতলে আলোক রশ্মির গতিপথের অভিমুখ পরিবর্তিত হয়। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ (Refraction of light) বলে।
2. প্রতিসরণের সূত্র দুটি লেখো।
উত্তর:
১. আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমের বিভেদতলের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে থাকে।
২. দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর ক্ষেত্রে আপতন কোণ ও প্রতিসরণ কোণের সাইন (sine)-এর অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক হয় (স্নেলের সূত্র)।
3. সংকট কোণ (Critical Angle) বলতে কী বোঝো?
উত্তর: আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রতিসৃত হওয়ার সময়, আপতন কোণের যে নির্দিষ্ট মানের জন্য প্রতিসরণ কোণের মান ৯০° হয় (অর্থাৎ প্রতিসৃত রশ্মিটি বিভেদতল ঘেঁষে যায়), আপতন কোণের সেই মানকে ওই মাধ্যমদ্বয়ের সংকট কোণ বলে।
4. অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন কাকে বলে?
উত্তর: আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে যাওয়ার সময় যদি আপতন কোণের মান মাধ্যম দুটির সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয়, তবে রশ্মিটি দ্বিতীয় মাধ্যমে প্রতিসৃত না হয়ে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয়ে আবার প্রথম মাধ্যমেই (ঘন মাধ্যমে) ফিরে আসে। এই ঘটনাকে অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন বলে।
5. অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের শর্ত দুটি কী কী?
উত্তর:
১. আলোক রশ্মিকে অবশ্যই ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে যেতে হবে।
২. ঘন মাধ্যমে আপতন কোণের মান মাধ্যম দুটির সংকট কোণের চেয়ে বড় হতে হবে।
6. উত্তল লেন্সকে অভিসারী লেন্স বলা হয় কেন?
উত্তর: একগুচ্ছ সমান্তরাল আলোক রশ্মি উত্তল লেন্সের মধ্য দিয়ে প্রতিসরণের পর একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে (ফোকাস) মিলিত হয়। অর্থাৎ রশ্মিগুচ্ছ অভিসারী গুচ্ছে পরিণত হয়। তাই উত্তল লেন্সকে অভিসারী লেন্স বলা হয়।
7. অবতল লেন্সকে অপসারী লেন্স বলা হয় কেন?
উত্তর: একগুচ্ছ সমান্তরাল আলোক রশ্মি অবতল লেন্সের মধ্য দিয়ে প্রতিসরণের পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অর্থাৎ অপসারী রশ্মিগুচ্ছে পরিণত হয়। দেখে মনে হয় যেন রশ্মিগুলো কোনো একটি বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে। তাই অবতল লেন্সকে অপসারী লেন্স বলা হয়।
8. সদবিম্ব ও অসদবিম্বের দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর:
১. উৎপত্তি: প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত রশ্মি প্রকৃতপক্ষে মিলিত হলে সদবিম্ব গঠিত হয়, কিন্তু মিলিত না হয়ে অন্য বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হলে অসদবিম্ব গঠিত হয়।
২. পর্দা: সদবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় (যেমন সিনেমার পর্দা), কিন্তু অসদবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় না (যেমন আয়নায় মুখ দেখা)।
9. আলোর বিচ্ছুরণ কাকে বলে? এর একটি প্রাকৃতিক উদাহরণ দাও।
উত্তর: সাদা বা যৌগিক আলোক রশ্মি কোনো স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যমের (যেমন প্রিজম) মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বিশ্লিষ্ট হয়ে বিভিন্ন মূল বর্ণে বিভক্ত হওয়ার ঘটনাকে আলোর বিচ্ছুরণ বলে।
উদাহরণ: বৃষ্টির পর আকাশে রামধনু সৃষ্টি হলো আলোর বিচ্ছুরণের একটি প্রাকৃতিক উদাহরণ।
10. লেন্সের আলোককেন্দ্র (Optical Centre) কাকে বলে?
উত্তর: লেন্সের প্রধান অক্ষের ওপর অবস্থিত এমন একটি বিন্দু, যার মধ্য দিয়ে কোনো আলোক রশ্মি পাঠালে লেন্স থেকে নির্গত হওয়ার সময় রশ্মিটির কোনো চ্যুতি বা দিক পরিবর্তন হয় না (আপতিত ও নির্গত রশ্মি সমান্তরাল থাকে), সেই বিন্দুকে লেন্সের আলোককেন্দ্র বলে।
11. একটি সোজা লাঠিকে আংশিক জলে ডোবালে বাঁকা দেখায় কেন?
উত্তর: লাঠির যে অংশটি জলের নিচে থাকে, সেখান থেকে আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম (জল) থেকে লঘু মাধ্যমে (বায়ু) আসার সময় প্রতিসরণের ফলে অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায় এবং আমাদের চোখে পৌঁছায়। আমাদের চোখ বাঁকা পথ অনুসরণ করতে পারে না, তাই আমরা লাঠির জলের নিচের অংশটিকে কিছুটা ওপরে উঠে এসেছে বলে দেখি। ফলে লাঠিটি বাঁকা মনে হয়।
12. বর্ণালী (Spectrum) কাকে বলে?
উত্তর: সাদা আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে বিচ্ছুরিত হয়ে পর্দার ওপর যে সাতটি রঙের চওড়া পটি সৃষ্টি করে, তাকে বর্ণালী বলে। এর রংগুলি হলো— বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল।
13. মরীচিকা (Mirage) কী?
উত্তর: মরুভূমিতে বা পিচঢালা রাস্তায় প্রবল গরমে আলোর অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের ফলে দূরের কোনো বস্তুর যে উল্টো ও অসদ প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হয় এবং দর্শকের মনে জলের ভ্রম তৈরি করে, তাকে মরীচিকা বলে।
14. হিরে খুব উজ্জ্বল দেখায় বা চকচক করে কেন?
উত্তর: হিরের প্রতিসরাঙ্ক খুব বেশি এবং সংকট কোণ খুব কম (প্রায় ২৪°)। হিরেকে এমনভাবে কাটা হয় যে, এর ভেতরে আলো ঢুকলে বিভিন্ন তলে বারবার আলোর অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে। ফলে সামান্য আলো ঢুকলেও তা প্রতিফলিত হয়ে উজ্জ্বলভাবে বেরিয়ে আসে, তাই হিরে চকচক করে।
15. আতশ কাঁচ (Magnifying Glass) কী? এর কাজ কী?
উত্তর: আতশ কাঁচ হলো কম ফোকাস দূরত্বের একটি উত্তল লেন্স যা হাতল যুক্ত ফ্রেমে আটকানো থাকে।
কাজ: খুব ছোট বস্তুকে বা লেখাকে বড় করে দেখার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। বস্তুটিকে লেন্সের ফোকাস দূরত্বের মধ্যে রাখলে বস্তুর সোজা ও বিবর্ধিত অসদ বিম্ব গঠিত হয়।
16. কাঁচের স্ল্যাবে (Glass Slab) আলোর বিচ্ছুরণ হয় না কেন?
উত্তর: কাঁচের স্ল্যাবের দুই বিপরীত তল সমান্তরাল হয়। আলোকরশ্মি স্ল্যাবে প্রবেশের সময় সাতটি রঙে ভেঙে গেলেও, স্ল্যাব থেকে নির্গত হওয়ার সময় তারা আবার মিশে সাদা আলো গঠন করে। স্ল্যাবে কেবল রশ্মির পার্শ্বসরণ হয়, কিন্তু কৌণিক বিচ্যুতি হয় না, তাই বর্ণালী দেখা যায় না।
17. জলের মধ্যে বায়ুর বুদবুদ চকচক করে কেন?
উত্তর: আলোকরশ্মি জল (ঘন মাধ্যম) থেকে বায়ুর বুদবুদে (লঘু মাধ্যম) প্রবেশের সময় যদি আপতন কোণের মান সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয়, তবে বুদবুদের গায়ে আলোর অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে। এই প্রতিফলিত আলো আমাদের চোখে পড়লে বুদবুদটিকে চকচকে দেখায়।
18. রামধনু কীভাবে সৃষ্টি হয়?
উত্তর: বৃষ্টির পর বাতাসে ভেসে থাকা অসংখ্য জলকণা প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্যের সাদা আলো এই জলকণাগুলোর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণের ফলে সাতটি রঙে ভেঙে যায় এবং রামধনু সৃষ্টি করে।
19. বিপদ সংকেত হিসেবে লাল আলো ব্যবহার করা হয় কেন?
উত্তর: দৃশ্যমান আলোগুলির মধ্যে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি এবং বিক্ষেপণ সবচেয়ে কম। তাই কুয়াশা বা ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে লাল আলো অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। এজন্য বিপদ সংকেত হিসেবে লাল আলো ব্যবহার করা হয়।
20. উত্তল লেন্সের দুটি ব্যবহার লেখো।
উত্তর:
১. চশমায় দীর্ঘদৃষ্টি (Hypermetropia) ত্রুটি দূর করতে উত্তল লেন্স ব্যবহার করা হয়।
২. অণুবীক্ষণ যন্ত্র, দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও ক্যামেরায় উত্তল লেন্স ব্যবহৃত হয়।
21. অবতল লেন্সের দুটি ব্যবহার লেখো।
উত্তর:
১. চশমায় হ্রস্বদৃষ্টি (Myopia) ত্রুটি দূর করতে অবতল লেন্স ব্যবহার করা হয়।
২. গ্যালিলীয় দূরবীক্ষণ যন্ত্রে চোখের লেন্স হিসেবে অবতল লেন্স ব্যবহৃত হয়।
22. চোখের রেটিনার কাজ কী?
উত্তর: রেটিনা চোখের আলোকসংবেদী পর্দার মতো কাজ করে। চোখের লেন্স দ্বারা গঠিত বস্তুর উল্টো প্রতিবিম্ব রেটিনায় পড়ে এবং সেখান থেকে অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সংকেত পৌঁছায়, ফলে আমরা দেখতে পাই।
23. স্পষ্ট দর্শনের ন্যূনতম দূরত্ব কাকে বলে?
উত্তর: চোখ থেকে যে ন্যূনতম বা সবচেয়ে কম দূরত্বে কোনো বস্তু থাকলে বিনা শ্রান্তিতে স্পষ্ট দেখা যায়, তাকে স্পষ্ট দর্শনের ন্যূনতম দূরত্ব বলে। সুস্থ চোখের ক্ষেত্রে এটি প্রায় ২৫ সেমি।
24. সিনেমার পর্দায় কী ধরনের প্রতিবিম্ব গঠিত হয় এবং কেন?
উত্তর: সিনেমার পর্দায় সদবিম্ব গঠিত হয়। কারণ প্রজেক্টরের উত্তল লেন্স ফিল্মের উল্টো ছবিকে পর্দার ওপর ফেলে বড় ও সোজা করে দেখায়। যেহেতু প্রতিবিম্বটি পর্দায় ফেলা যায়, তাই এটি সদবিম্ব।
25. শূন্যস্থান এবং কাঁচের মধ্যে কোনটিতে আলোর বেগ কম এবং কেন?
উত্তর: কাঁচের মধ্যে আলোর বেগ কম। কারণ কাঁচ শূন্যস্থানের চেয়ে আলোকতাত্ত্বিকভাবে ঘন মাধ্যম। ঘন মাধ্যমে আলোর গতিবেগ সর্বদা লঘু বা শূন্যস্থানের চেয়ে কম হয়।