অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 1.3 : তাপ, ব্যাখ্যামূলক ও গানিতিক প্রশ্নত্তোর মান 3

অধ্যায় 1.3: তাপ (Heat)
(ব্যাখ্যামূলক ও গাণিতিক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)

1. গাণিতিক প্রশ্ন: 50 g ভরের একটি তামার টুকরোর উষ্ণতা 20°C থেকে বৃদ্ধি করে 70°C করতে কত তাপের প্রয়োজন হবে? (দেওয়া আছে, তামার আপেক্ষিক তাপ = 0.09 cal/g.°C)

উত্তর দেখো

উত্তর:
এখানে দেওয়া আছে,
তামার টুকরোর ভর (m) = 50 g
তামার আপেক্ষিক তাপ (s) = 0.09 cal/g.°C
উষ্ণতার বৃদ্ধি (t) = (70 – 20)°C = 50°C

আমরা জানি, প্রয়োজনীয় গৃহিত তাপ (H) = m × s × t
বা, H = 50 × 0.09 × 50
বা, H = 2500 × 0.09
বা, H = 225

অতএব, তামার টুকরোটির উষ্ণতা বৃদ্ধি করতে 225 ক্যালোরি তাপের প্রয়োজন হবে।

2. গাণিতিক প্রশ্ন: 0°C উষ্ণতার 10 g বরফকে গলিয়ে 0°C উষ্ণতার জলে পরিণত করতে কত তাপ লাগবে? এই প্রয়োজনীয় তাপকে কী বলা হয় এবং কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর:
আমরা জানি, বরফ গলনের লীন তাপ = 80 cal/g।
অর্থাৎ, 1 g বরফ গলাতে 80 ক্যালোরি তাপ লাগে।
তাহলে, 10 g বরফ গলাতে তাপ লাগবে = 10 × 80 = 800 ক্যালোরি

এই তাপকে লীন তাপ (Latent Heat) বলা হয়। কারণ, এই তাপ বরফের উষ্ণতার কোনো বৃদ্ধি ঘটায় না (উষ্ণতা 0°C ই থাকে), এটি বরফের ভেতরে লুকিয়ে থেকে কেবলমাত্র এর অবস্থার পরিবর্তন (কঠিন থেকে তরল) ঘটায়।

3. বাষ্পায়ন (Evaporation) ও স্ফুটনের (Boiling) মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: বাষ্পায়ন ও স্ফুটনের মধ্যে তিনটি পার্থক্য হলো:
1. উষ্ণতা: বাষ্পায়ন যেকোনো উষ্ণতাতেই ঘটে। কিন্তু স্ফুটন কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট উষ্ণতায় (তরলের স্ফুটনাঙ্কে) ঘটে।
2. স্থান: বাষ্পায়ন কেবলমাত্র তরলের মুক্ত উপরিতল থেকে ঘটে। অন্যদিকে, স্ফুটন তরলের সমগ্র অংশ থেকে ঘটে।
3. প্রকৃতি ও শব্দ: বাষ্পায়ন একটি অত্যন্ত ধীর ও নিঃশব্দ প্রক্রিয়া। কিন্তু স্ফুটন একটি দ্রুত প্রক্রিয়া এবং স্ফুটনের সময় তরল থেকে বুদবুদ ওঠার কারণে শব্দ হয়।

4. চাপ বাড়ালে বা কমালে পদার্থের গলনাঙ্কের কীরূপ পরিবর্তন হয় তা বরফ গলনের উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।

[Image showing the regelation process where pressure melts ice and releasing pressure refreezes it]

উত্তর দেখো

উত্তর: যে সমস্ত পদার্থ গলে গেলে আয়তনে কমে যায় (যেমন—বরফ, ঢালাই লোহা, বিসমাথ), তাদের ওপর চাপ বাড়ালে গলনাঙ্ক কমে যায় এবং চাপ কমালে গলনাঙ্ক বেড়ে যায়।

উদাহরণ: 0°C উষ্ণতায় থাকা একটি বরফের ব্লকের ওপর দিয়ে একটি সরু ধাতব তার ঝুলিয়ে তারের দুই প্রান্তে ভারী ওজন বেঁধে দিলে, তারের নিচের অংশের বরফের ওপর প্রচুর চাপ পড়ে। এর ফলে ওই অংশের বরফের গলনাঙ্ক 0°C এর নিচে নেমে যায় এবং বরফ গলে জল হয়ে যায়। তারটি ওই জলের মধ্য দিয়ে নিচে নেমে আসে। তার নিচে নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ওপরের অংশের চাপ কমে যায় এবং গলনাঙ্ক আবার 0°C এ ফিরে আসে। ফলে ওই জল আবার জমে বরফ হয়ে যায়। একেই পুনর্শিলীভবন (Regelation) বলে।

5. ক্যালোরিমিতির মূলনীতিটি বিবৃত করো। এই নীতিটি কোন কোন শর্তে প্রযোজ্য তা উল্লেখ করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
ক্যালোরিমিতির মূলনীতি: দুটি ভিন্ন উষ্ণতার বস্তুকে পরস্পরের তাপীয় সংস্পর্শে রাখলে উষ্ণ বস্তুটি তাপ বর্জন করবে এবং শীতল বস্তুটি তাপ গ্রহণ করবে। এই তাপের আদান-প্রদান ততক্ষণ চলবে যতক্ষণ না বস্তু দুটির উষ্ণতা সমান হয়। যদি বাইরের কোনো মাধ্যমে তাপের অপচয় না হয়, তবে উষ্ণ বস্তু কর্তৃক বর্জিত তাপ = শীতল বস্তু কর্তৃক গৃহিত তাপ

শর্তসমূহ: এই নীতিটি প্রযোজ্য হওয়ার জন্য মূলত দুটি শর্ত প্রয়োজন:
1. বস্তু দুটির মধ্যে তাপের আদান-প্রদান চলার সময় বাইরের পরিবেশে কোনো তাপ বেরিয়ে যাবে না বা বাইরে থেকে কোনো তাপ ভেতরে প্রবেশ করবে না।
2. বস্তু দুটি মেশানোর ফলে তাদের মধ্যে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটবে না এবং কোনো বস্তুর অবস্থার পরিবর্তন (যেমন কঠিন থেকে তরল) হবে না।

6. গাণিতিক প্রশ্ন: 0°C উষ্ণতার 20 g বরফকে সম্পূর্ণ গলিয়ে 10°C উষ্ণতার জলে পরিণত করতে মোট কত তাপের প্রয়োজন হবে? (দেওয়া আছে, বরফ গলনের লীন তাপ 80 cal/g এবং জলের আপেক্ষিক তাপ 1 cal/g.°C)

উত্তর দেখো

উত্তর:
এই গাণিতিক সমস্যাটি দুটি ধাপে সমাধান করতে হবে:

প্রথম ধাপ (বরফ গলানো): 0°C উষ্ণতার 20 g বরফকে 0°C উষ্ণতার জলে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় তাপ (লীন তাপ),
H1 = ভর × লীন তাপ = 20 × 80 = 1600 ক্যালোরি

দ্বিতীয় ধাপ (জলের উষ্ণতা বৃদ্ধি): 0°C উষ্ণতার 20 g জলের উষ্ণতা 10°C এ নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় তাপ,
H2 = m × s × t = 20 × 1 × (10 – 0) = 20 × 10 = 200 ক্যালোরি

মোট প্রয়োজনীয় তাপ = H1 + H2 = 1600 + 200 = 1800 ক্যালোরি

7. গাণিতিক প্রশ্ন (ক্যালোরিমিতির প্রয়োগ): 80°C উষ্ণতার 50 g গরম জলের সাথে 20°C উষ্ণতার 50 g ঠান্ডা জল মেশালে, মিশ্রণের চূড়ান্ত উষ্ণতা কত হবে? (ধরে নাও পরিবেশে কোনো তাপ নষ্ট হয়নি)

উত্তর দেখো

উত্তর:
ধরি, মিশ্রণের চূড়ান্ত উষ্ণতা = T °C। জলের আপেক্ষিক তাপ (s) = 1 cal/g.°C।

উষ্ণ জলের বর্জিত তাপ (H1) = m × s × (উষ্ণতার হ্রাস)
= 50 × 1 × (80 – T)

শীতল জলের গৃহিত তাপ (H2) = m × s × (উষ্ণতার বৃদ্ধি)
= 50 × 1 × (T – 20)

ক্যালোরিমিতির মূলনীতি অনুযায়ী, বর্জিত তাপ = গৃহিত তাপ
50 × 1 × (80 – T) = 50 × 1 × (T – 20)
বা, 80 – T = T – 20
বা, 2T = 100
বা, T = 50

অতএব, মিশ্রণের চূড়ান্ত উষ্ণতা হবে 50°C।

8. তরলের স্ফুটনাঙ্কের ওপর চাপের প্রভাব কী? প্রেশার কুকার কীভাবে এই নীতির ওপর ভিত্তি করে দ্রুত রান্না করতে সাহায্য করে?

উত্তর দেখো

উত্তর:
চাপের প্রভাব: তরলের ওপর চাপ বাড়ালে তরলের স্ফুটনাঙ্ক (Boiling Point) বৃদ্ধি পায় এবং চাপ কমালে তরলের স্ফুটনাঙ্ক কমে যায়।

প্রেশার কুকারের নীতি: প্রেশার কুকারের মুখটি এমনভাবে শক্ত করে আটকানো থাকে যে ভেতরের বাষ্প সহজে বাইরে বের হতে পারে না। ফলে রান্নার সময় ভেতরে প্রচুর বাষ্প জমে যায় এবং জলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এই অতিরিক্ত চাপের ফলে জল 100°C এ না ফুটে প্রায় 120°C উষ্ণতায় ফুটতে শুরু করে। জলের উষ্ণতা অনেক বেশি হওয়ায় সেই গরম জলে চাল, ডাল বা মাংস খুব দ্রুত সুসিদ্ধ হয়ে যায়, যার ফলে রান্নার সময় ও জ্বালানি উভয়ই সাশ্রয় হয়।

9. বাষ্পায়নের ফলে শীতলতার সৃষ্টি হয় কেন? গ্রীষ্মকালে মাটির কলসির জল ঠান্ডা থাকে, কিন্তু প্লাস্টিকের বোতলে রাখা জল ঠান্ডা হয় না কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর:
শীতলতার কারণ: বাষ্পায়ন হওয়ার জন্য তরলকে লীন তাপ (Latent Heat) গ্রহণ করতে হয়। তরল তার নিজের শরীর থেকে বা সংলগ্ন পারিপার্শ্বিক মাধ্যম থেকে এই তাপ গ্রহণ করে। ফলে সংলগ্ন পরিবেশ তাপ হারিয়ে শীতল হয়ে যায়।

মাটির কলসি বনাম প্লাস্টিক বোতল: মাটির কলসির গায়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে, যার মাধ্যমে জল চুঁইয়ে বাইরে আসে এবং বাষ্পীভূত হয়। এই বাষ্পীভবনের লীন তাপ ভেতরের জল থেকে সংগৃহীত হওয়ায় কলসির জল ঠান্ডা হয়। কিন্তু প্লাস্টিকের বোতলে কোনো ছিদ্র থাকে না, তাই বাইরের পৃষ্ঠে কোনো বাষ্পায়ন ঘটে না। ফলে লীন তাপ বর্জনের কোনো প্রশ্ন ওঠে না এবং জল ঠান্ডা হয় না।

10. জলের আপেক্ষিক তাপ অন্যান্য তরলের তুলনায় অনেক বেশি—এই ধর্মের দুটি বাস্তব প্রয়োগ বা সুবিধা আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: জলের আপেক্ষিক তাপ (1 cal/g.°C) খুব বেশি হওয়ার অর্থ হলো, জল গরম হতে যেমন অনেক বেশি তাপ গ্রহণ করে, তেমনি ঠান্ডা হওয়ার সময়ও অনেক বেশি তাপ বর্জন করে এবং খুব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। এই ধর্মের দুটি বাস্তব প্রয়োগ হলো:

1. গরম জল সেঁক দেওয়ার কাজে (Hot water bag): আপেক্ষিক তাপ বেশি হওয়ায় ফুটন্ত জল রাবারের ব্যাগে ভরে সেঁক দিলে তা অনেকক্ষণ গরম থাকে এবং ধীরে ধীরে শরীরে তাপ প্রদান করতে পারে।
2. গাড়ির ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখতে: গাড়ির ইঞ্জিন চলার সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। জলের আপেক্ষিক তাপ বেশি হওয়ায় রেডিয়েটরের ভেতরে থাকা জল খুব বেশি উষ্ণ না হয়েই ইঞ্জিনের প্রচুর পরিমাণ তাপ শোষণ করে নিতে পারে এবং ইঞ্জিনকে ঠান্ডা রাখে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার