অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 2.1 পদার্থের প্রকৃতি, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 2.1: পদার্থের প্রকৃতি
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – 2 নম্বর)
1. পদার্থের ভৌত ধর্ম ও রাসায়নিক ধর্মের মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. সংজ্ঞা: যে ধর্মের সাহায্যে পদার্থের কেবল বাহ্যিক অবস্থার বা প্রকৃতির পরিচয় পাওয়া যায়, তাকে ভৌত ধর্ম বলে। অন্যদিকে, যে ধর্মের সাহায্যে পদার্থের ভেতরের অণুর গঠনের পরিবর্তন এবং অন্য পদার্থের সাথে বিক্রিয়া করার ক্ষমতা জানা যায়, তাকে রাসায়নিক ধর্ম বলে।
2. উদাহরণ: বর্ণ, গন্ধ, গলনাঙ্ক ও ভৌত অবস্থা হলো ভৌত ধর্ম। আর পদার্থের দাহ্যতা (পোড়ার ক্ষমতা) ও অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করার ক্ষমতা হলো রাসায়নিক ধর্ম।
[Image comparing physical properties of metals and non metals like malleability, ductility and conductivity]
2. ধাতু ও অধাতুর মধ্যে দুটি ভৌত ধর্মের পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. পরিবাহিতা: ধাতুগুলি সাধারণত তাপ ও তড়িতের সুপরিবাহী হয় (যেমন— তামা, লোহা)। কিন্তু অধাতুগুলি তাপ ও তড়িতের কুপরিবাহী হয় (ব্যতিক্রম: গ্রাফাইট)।
2. আকার পরিবর্তন: ধাতুগুলি নমনীয় ও প্রসারণশীল হয়, অর্থাৎ এদের পিটিয়ে চাদর বা টেনে সরু তার বানানো যায়। কিন্তু অধাতুগুলি ভঙ্গুর হয়, পিটলে গুঁড়ো হয়ে যায় (যেমন— কয়লা)।
3. নমনীয়তা (Malleability) ও প্রসারণশীলতা (Ductility) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর:
নমনীয়তা: ধাতুগুলিকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে না ভেঙে খুব সহজে পাতলা পাতে বা চাদরে পরিণত করা যায়। ধাতুর এই ধর্মকে নমনীয়তা বলে।
প্রসারণশীলতা: ধাতুগুলিকে বল প্রয়োগ করে টেনে খুব সরু তারে পরিণত করা যায়। ধাতুর এই টেনে তার বানানোর ক্ষমতাকে প্রসারণশীলতা বলে।
4. সোডিয়াম (Na) বা পটাশিয়াম (K) ধাতুকে কেরোসিনের নীচে ডুবিয়ে রাখা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: সোডিয়াম ও পটাশিয়াম অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু। এদের খোলা বাতাসে রাখলে এরা বায়ুর অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে, আবার জলের সংস্পর্শে এলে তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কেরোসিনের সাথে এরা কোনো বিক্রিয়া করে না, তাই এদের সুরক্ষিত রাখতে কেরোসিনের নীচে ডুবিয়ে রাখা হয়।
5. সাদা ফসফরাসকে (White phosphorus) জলের নীচে সংরক্ষণ করা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: সাদা ফসফরাস একটি অত্যন্ত দাহ্য অধাতু। সাধারণ উষ্ণতায় এটি খোলা বাতাসে অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে (স্বতঃস্ফূর্ত দহন)। কিন্তু জলের সাথে এটি কোনো বিক্রিয়া করে না বা জলে দ্রবীভূত হয় না। তাই এটিকে বায়ুর অক্সিজেন থেকে দূরে রাখতে জলের নীচে রাখা হয়।
6. দুটি ব্যতিক্রমী ধাতুর নাম লেখো এবং তাদের ব্যতিক্রমী ধর্ম উল্লেখ করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. পারদ (Mercury): ধাতু সাধারণত কঠিন হয়, কিন্তু পারদ একটি ধাতু হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ উষ্ণতায় তরল থাকে।
2. সোডিয়াম (Sodium): ধাতু সাধারণত শক্ত ও কঠিন হয়, কিন্তু সোডিয়াম এতটাই নরম ধাতু যে একে সাধারণ ছুরি দিয়ে অনায়াসে কাটা যায়।
7. গ্রাফাইট (Graphite) অধাতু হওয়া সত্ত্বেও বৈদ্যুতিক কাজে (যেমন— ব্যাটারির ইলেকট্রোড হিসেবে) ব্যবহৃত হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: অধাতুগুলি সাধারণত তড়িতের কুপরিবাহী হয়। কিন্তু কার্বনের একটি বিশেষ রূপভেদ ‘গ্রাফাইট’ এর ব্যতিক্রম। গ্রাফাইটের অভ্যন্তরীণ আণবিক গঠনের কারণে এর মধ্য দিয়ে খুব সহজেই ইলেকট্রন চলাচল করতে পারে। অর্থাৎ, গ্রাফাইট তড়িতের সুপরিবাহী হওয়ায় একে বৈদ্যুতিক কাজে ব্যবহার করা হয়।
8. গন্ধ ও বর্ণের সাহায্যে তুমি কীভাবে হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S) ও ক্লোরিন (Cl2) গ্যাসকে শনাক্ত করবে?
উত্তর দেখো
উত্তর:
হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S): এটি একটি বর্ণহীন গ্যাস, কিন্তু এর গন্ধ পচা ডিমের মতো অত্যন্ত তীব্র। গন্ধ শুঁকে একে সহজে চেনা যায়।
ক্লোরিন (Cl2): এর বর্ণ সবুজাভ হলুদ। তাই সবুজাভ হলুদ রঙের কোনো গ্যাসীয় পদার্থ দেখলে আমরা প্রাথমিকভাবে সেটিকে ক্লোরিন হিসেবে শনাক্ত করতে পারি (এর গন্ধও খুব ঝাঁঝালো ও শ্বাসরোধী)।
9. ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation) কাকে বলে? এর দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: ঊর্ধ্বপাতন: সাধারণ নিয়মে কঠিন পদার্থে তাপ দিলে তা প্রথমে তরলে এবং পরে গ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু কিছু কিছু কঠিন পদার্থ আছে, যাদের তাপ দিলে তারা তরলে পরিণত না হয়ে সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয়। এই ঘটনাকে ঊর্ধ্বপাতন বলে।
উদাহরণ: কর্পূর, আয়োডিন এবং ন্যাপথলিন।
10. সালফার (গন্ধক) জলের পরিবর্তে কার্বন ডাইসালফাইডে (CS2) দ্রবীভূত করা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: দ্রাব্যতার নিয়ম অনুযায়ী, অধ্রুবীয় (Non-polar) পদার্থ অধ্রুবীয় দ্রাবকেই ভালোভাবে গলে বা দ্রবীভূত হয়। সালফার একটি অধ্রুবীয় পদার্থ। জল একটি ধ্রুবীয় (Polar) দ্রাবক হওয়ায় সালফার জলে অদ্রাব্য। অন্যদিকে, কার্বন ডাইসালফাইড (CS2) একটি অধ্রুবীয় তরল দ্রাবক, তাই সালফার এতে খুব সহজেই দ্রবীভূত হয়ে যায়।
11. রান্নার বাসনপত্র সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম বা তামা দিয়ে তৈরি করা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: অ্যালুমিনিয়াম এবং তামা হলো ধাতু। ধাতু তাপের সুপরিবাহী হয়। তাই চুলার আগুন থেকে তাপ এই ধাতুগুলির মধ্য দিয়ে খুব দ্রুত রান্নার খাবারে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাবার তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়। এছাড়া এদের গলনাঙ্কও অনেক বেশি, তাই আগুনে এরা গলে যায় না। এই কারণেই রান্নার বাসন তৈরি করতে এদের ব্যবহার করা হয়।
12. বৈদ্যুতিক তারের ভেতরে তামা এবং বাইরে প্লাস্টিকের আবরণ থাকে কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: তামা হলো একটি ধাতু এবং তড়িতের অত্যন্ত সুপরিবাহী। তাই বিদ্যুৎকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভেতরে তামার তার থাকে। অন্যদিকে, প্লাস্টিক হলো তড়িতের কুপরিবাহী। তারের বাইরে প্লাস্টিকের আবরণ থাকলে বিদ্যুৎ বাইরে আসতে পারে না, ফলে আমরা তারে হাত দিলেও শক্ (Electric shock) খাই না।
13. ধাতুগুলির ‘শব্দ করার প্রবণতা’ (Sonority) বলতে কী বোঝো? এর একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: Sonority: কঠিন ধাতুগুলিকে কোনো কঠিন বস্তু দিয়ে আঘাত করলে এক ধরনের বিশেষ মিষ্টি ও অনুরণনশীল (ঢং ঢং) শব্দ তৈরি হয়। ধাতুর এই ধর্মকে শব্দ করার প্রবণতা বা Sonority বলে।
প্রয়োগ: ধাতুর এই ধর্মের জন্যই স্কুলের ঘণ্টা (Bell) বা সাইকেলের বেল ধাতু (যেমন— লোহা বা পিতল) দিয়ে তৈরি করা হয়।
14. হিরে (Diamond) একটি অধাতু হওয়া সত্ত্বেও কেন গয়না তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর দেখো
উত্তর: হিরে হলো কার্বনের একটি রূপভেদ এবং অধাতু। কিন্তু এর একটি বিশেষ ভৌত ধর্ম হলো এর অত্যন্ত উচ্চ প্রতিসরাঙ্ক, যার কারণে এর ভেতরে আলোর আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে। এই কারণে হিরে অত্যন্ত চকচকে দেখায় এবং এর ঔজ্জ্বল্য (Luster) অন্যান্য সাধারণ ধাতুর চেয়ে অনেক বেশি হয়। এই উজ্জ্বলতার কারণেই হিরেকে গয়না তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
15. চৌম্বক পদার্থ (Magnetic substance) কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: যে সমস্ত পদার্থ চুম্বক দ্বারা তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয় এবং যাদেরকে কৃত্রিমভাবে চুম্বকে পরিণত করা সম্ভব, তাদের চৌম্বক পদার্থ বলে।
উদাহরণ: লোহা (Fe), নিকেল (Ni) এবং কোবাল্ট (Co) হলো তিনটি প্রধান চৌম্বক পদার্থ।
16. ন্যাপথলিনের বল (Naphthalene balls) জামাকাপড়ের মাঝে রাখলে কিছুদিন পর ছোট হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ন্যাপথলিন হলো এমন একটি কঠিন পদার্থ, যার ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation) ধর্ম আছে। অর্থাৎ, সাধারণ উষ্ণতায় এটি ধীরে ধীরে কঠিন অবস্থা থেকে সরাসরি বাষ্প বা গ্যাসে পরিণত হয় (তরল হয় না)। এই বাষ্পীভূত হওয়ার কারণেই ন্যাপথলিনের বলগুলি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায় এবং একসময় পুরোপুরি উবে যায়।
17. লোহা, তামা ও সোনা—এই তিনটি ধাতুর মধ্যে কোনটি বাতাসে সবচেয়ে বেশি দিন চকচকে থাকে এবং কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: সোনা (Gold) সবচেয়ে বেশি দিন চকচকে থাকে।
কারণ: লোহা ও তামা বাতাসে থাকলে বায়ুর অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে (লোহায় মর্চে পড়ে এবং তামায় সবুজ ছোপ ধরে), ফলে এদের ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়। কিন্তু সোনা হলো অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় ধাতু। এটি সাধারণ অবস্থায় বাতাস বা জলের সাথে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না, তাই বছরের পর বছর চকচকে থাকে।
18. জল এবং অ্যালকোহলকে (বা স্পিরিট) না ছুঁয়ে কেবল ভৌত ধর্মের সাহায্যে কীভাবে আলাদা করে চিনবে?
উত্তর দেখো
উত্তর: দুটি ভৌত ধর্মের সাহায্যে এদের চেনা যায়:
1. গন্ধ: জলের কোনো নির্দিষ্ট গন্ধ নেই (বর্ণহীন ও গন্ধহীন), কিন্তু স্পিরিট বা অ্যালকোহলের একটি তীব্র ও সুনির্দিষ্ট গন্ধ আছে।
2. উদ্বায়িতা (Volatility): দুটি তরলকে খোলা পাত্রে রাখলে দেখা যাবে স্পিরিট খুব দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে উবে যাচ্ছে, কারণ এটি জলের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বায়ী।
19. হিরে এবং গ্রাফাইট—উভয়ই কার্বনের রূপভেদ (অধাতু) হওয়া সত্ত্বেও এদের ভৌত ধর্মের দুটি বড় পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. কঠিনতা: হিরে হলো প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন পদার্থ। অন্যদিকে, গ্রাফাইট অত্যন্ত নরম ও পিচ্ছিল প্রকৃতির (তাই পেন্সিলের শিসে ব্যবহৃত হয়)।
2. পরিবাহিতা: হিরে তাপ ও তড়িতের কুপরিবাহী। কিন্তু গ্রাফাইট অধাতু হওয়া সত্ত্বেও তাপ ও তড়িতের অত্যন্ত সুপরিবাহী।
20. ভৌত অবস্থার (Physical state) ভিত্তিতে ধাতু ও অধাতুর একটি পার্থক্য উদাহরণসহ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ভৌত অবস্থা: সাধারণ উষ্ণতায় প্রায় সমস্ত ধাতুই কঠিন অবস্থায় থাকে (যেমন— লোহা, তামা)। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো পারদ (তরল)।
অন্যদিকে, অধাতুগুলি সাধারণ উষ্ণতায় তিন রকম অবস্থাতেই থাকতে পারে— কঠিন (যেমন: কার্বন, সালফার), তরল (যেমন: ব্রোমিন) এবং গ্যাসীয় (যেমন: অক্সিজেন, নাইট্রোজেন)।