অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 2.1 পদার্থের প্রকৃতি, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২

অধ্যায় 2.1: পদার্থের প্রকৃতি
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)

1. পদার্থের ভৌত ধর্ম ও রাসায়নিক ধর্মের মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য উদাহরণসহ আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য হলো:

বিষয় ভৌত ধর্ম (Physical Property) রাসায়নিক ধর্ম (Chemical Property)
সংজ্ঞা যে ধর্মের সাহায্যে পদার্থের কেবল বাহ্যিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়, পদার্থের অভ্যন্তরীণ গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না। যে ধর্মের সাহায্যে পদার্থের অভ্যন্তরীণ গঠনের পরিবর্তন ও অন্য পদার্থের সাথে বিক্রিয়া করার ক্ষমতা জানা যায়।
নতুন পদার্থ সৃষ্টি এই ধর্ম প্রকাশের সময় কোনো নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় না। এই ধর্ম প্রকাশের সময় সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ পদার্থের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ, গলনাঙ্ক, স্ফুটনাঙ্ক, দ্রাব্যতা ইত্যাদি। (যেমন— জলের স্ফুটনাঙ্ক 100°C)। দাহ্যতা, অ্যাসিড বা ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া। (যেমন— সোডিয়াম জলের সাথে তীব্র বিক্রিয়া করে)।

[Image comparing physical properties of metals and non-metals focusing on conductivity and luster]

2. ভৌত ধর্মের ভিত্তিতে ধাতু (Metals) এবং অধাতুর (Non-metals) মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: ভৌত ধর্মের ভিত্তিতে ধাতু ও অধাতুর তিনটি মূল পার্থক্য হলো:

1. তাপ ও তড়িতের পরিবাহিতা: ধাতুগুলি সাধারণত তাপ ও তড়িতের অত্যন্ত সুপরিবাহী হয় (যেমন— তামা, অ্যালুমিনিয়াম)। অন্যদিকে, অধাতুগুলি সাধারণত তাপ ও তড়িতের কুপরিবাহী হয় (ব্যতিক্রম: গ্রাফাইট অধাতু হলেও তড়িতের সুপরিবাহী)।
2. আকার পরিবর্তন (নমনীয়তা ও প্রসারণশীলতা): ধাতুগুলিকে পিটিয়ে খুব সহজে পাতলা চাদরে বা টেনে সরু তারে পরিণত করা যায়। কিন্তু অধাতুগুলি ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়, এদের হাতুড়ি দিয়ে পিটলে গুঁড়ো হয়ে যায় (যেমন— কয়লা, সালফার)।
3. ঔজ্জ্বল্য ও শব্দ (Luster & Sonority): ধাতুর নিজস্ব ধাতব ঔজ্জ্বল্য থাকে এবং এদের আঘাত করলে ‘ঢং ঢং’ শব্দ হয়। কিন্তু অধাতুগুলি সাধারণত অনুজ্জ্বল হয় (ব্যতিক্রম: আয়োডিন, হিরে) এবং এদের আঘাত করলে কোনো বিশেষ ধাতব শব্দ তৈরি হয় না।

3. বিজ্ঞান মানেই নিয়মের পাশাপাশি ব্যতিক্রম। ভৌত অবস্থার ও পরিবাহিতার নিরিখে ধাতু ও অধাতুর তিনটি ব্যতিক্রমী ধর্মের উদাহরণ দাও।

উত্তর দেখো

উত্তর: ধাতু ও অধাতুর সাধারণ নিয়মের তিনটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো:

1. ভৌত অবস্থার ব্যতিক্রম (ধাতু): সাধারণ নিয়মে সমস্ত ধাতু কঠিন হয়। কিন্তু পারদ (Mercury) একটি ধাতু হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ উষ্ণতায় তরল অবস্থায় থাকে।
2. ভৌত অবস্থার ব্যতিক্রম (অধাতু): অধাতুগুলি সাধারণত কঠিন বা গ্যাসীয় হয়। কিন্তু ব্রোমিন (Bromine) একটি অধাতু হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ উষ্ণতায় এটি তরল অবস্থায় থাকে।
3. পরিবাহিতার ব্যতিক্রম (অধাতু): সাধারণ নিয়মে অধাতু তাপ ও তড়িতের কুপরিবাহী। কিন্তু কার্বনের একটি রূপভেদ গ্রাফাইট (Graphite) অধাতু হওয়া সত্ত্বেও এটি তাপ ও তড়িতের অত্যন্ত সুপরিবাহী।

[Image demonstrating malleability with aluminium foil and ductility with copper wire]

4. ধাতুর নমনীয়তা (Malleability) এবং প্রসারণশীলতা (Ductility) বলতে কী বোঝো? দৈনন্দিন জীবনে এই ধর্ম দুটির একটি করে ব্যবহারিক প্রয়োগ উল্লেখ করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
নমনীয়তা (Malleability): ধাতুগুলিকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে না ভেঙে খুব সহজে পাতলা পাতে বা চাদরে (Foil/Sheet) পরিণত করার ধর্মকে নমনীয়তা বলে।
ব্যবহারিক প্রয়োগ: এই ধর্মের জন্য অ্যালুমিনিয়ামকে পিটিয়ে অত্যন্ত পাতলা ফয়েল (Aluminium foil) তৈরি করা হয়, যা খাবার গরম রাখতে বা প্যাক করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রসারণশীলতা (Ductility): ধাতুগুলিকে বল প্রয়োগ করে টেনে ছিঁড়ে না ফেলে খুব সরু তারে পরিণত করার ক্ষমতাকে প্রসারণশীলতা বলে। (সোনার প্রসারণশীলতা সবচেয়ে বেশি)।
ব্যবহারিক প্রয়োগ: এই ধর্মের জন্যই তামা (Copper) বা অ্যালুমিনিয়ামকে টেনে সরু তার তৈরি করা সম্ভব হয়, যা আমাদের বাড়িতে বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজে ব্যবহৃত হয়।

5. তোমাকে তিনটি বোতলে যথাক্রমে জল, স্পিরিট এবং হাইড্রোজেন সালফাইড $(H2S)$ গ্যাস দেওয়া হলো। না ছুঁয়ে বা স্বাদ গ্রহণ না করে তুমি কীভাবে এদের শনাক্ত করবে?

উত্তর দেখো

উত্তর: পদার্থগুলির বর্ণ, গন্ধ এবং ভৌত অবস্থার (উদ্বায়িতা) মতো ভৌত ধর্মগুলি পর্যবেক্ষণ করে এদের সহজেই আলাদা করা যাবে:

1. ভৌত অবস্থা ও গন্ধ ($H2S$ শনাক্তকরণ): বোতলগুলির মধ্যে যেটি গ্যাসীয় অবস্থায় আছে এবং যে বোতলের মুখ খুললে পচা ডিমের মতো তীব্র গন্ধ বের হবে, সেটি হলো হাইড্রোজেন সালফাইড ($H2S$) গ্যাস।
2. গন্ধ ও উদ্বায়িতা (স্পিরিট শনাক্তকরণ): বাকি দুটি বোতলের তরলের মধ্যে যেটির একটি বিশেষ মিষ্টি ও তীব্র গন্ধ আছে এবং যা সাধারণ উষ্ণতায় খোলা রাখলে খুব দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে উবে যায় (অধিক উদ্বায়ী), সেটি হলো স্পিরিট (বা অ্যালকোহল)।
3. জল শনাক্তকরণ: যে বোতলের তরলটি পুরোপুরি বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং সাধারণ উষ্ণতায় খোলা রাখলে সহজে উবে যায় না (কম উদ্বায়ী), সেটি হলো বিশুদ্ধ জল।

6. গলনাঙ্ক (Melting point), ঘনত্ব (Density) এবং ভৌত অবস্থার (Physical state) ভিত্তিতে ধাতু ও অধাতুর মধ্যে পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ধাতু ও অধাতুর পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:

বিষয় ধাতু (Metals) অধাতু (Non-metals)
ভৌত অবস্থা সাধারণ উষ্ণতায় প্রায় সমস্ত ধাতুই কঠিন (ব্যতিক্রম: পারদ বা Mercury হলো তরল)। সাধারণ উষ্ণতায় কঠিন (কার্বন), তরল (ব্রোমিন) এবং গ্যাসীয় (অক্সিজেন)— এই তিন অবস্থাতেই থাকতে পারে।
গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক ধাতুগুলির গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক সাধারণত অনেক বেশি হয় (যেমন— টাংস্টেন, লোহা)। অধাতুগুলির গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক সাধারণত কম হয় (ব্যতিক্রম: হিরে বা কার্বনের গলনাঙ্ক খুব বেশি)।
ঘনত্ব ধাতুগুলির ঘনত্ব বেশি হয়, তাই এরা বেশ ভারী হয় (ব্যতিক্রম: সোডিয়াম, লিথিয়াম জলের চেয়েও হালকা)। অধাতুগুলির ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম হয়, তাই এরা হালকা প্রকৃতির।

7. বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করো: (ক) রান্নার বাসনের হাতলে কাঠ বা প্লাস্টিকের আবরণ থাকে কেন? (খ) সোনার গয়না তৈরিতে খাঁটি সোনার সাথে সামান্য তামা বা রুপো মেশানো হয় কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর:
(ক) হাতলে প্লাস্টিক/কাঠ থাকার কারণ: রান্নার বাসন সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম বা লোহা (ধাতু) দিয়ে তৈরি হয়, যা তাপের সুপরিবাহী। রান্না করার সময় বাসন প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়। কিন্তু কাঠ বা প্লাস্টিক হলো তাপের কুপরিবাহী (Bad conductor of heat)। তাই হাতলে কাঠ বা প্লাস্টিকের আবরণ থাকলে তাপ আমাদের হাতে পৌঁছাতে পারে না এবং আমরা নিরাপদে গরম বাসন ধরতে পারি।

(খ) সোনায় খাদ মেশানোর কারণ: 24 ক্যারেট (24-carat) খাঁটি সোনা অত্যন্ত নরম এবং নমনীয় একটি ধাতু। শুধুমাত্র খাঁটি সোনা দিয়ে গয়না তৈরি করলে তা সহজেই বেঁকে বা ভেঙে যেতে পারে। তাই সোনার গয়নাকে শক্ত, মজবুত এবং টেকসই করার জন্য এর সাথে সামান্য পরিমাণ তামা (Copper) বা রুপো (Silver) খাদ হিসেবে মেশানো হয়।

8. প্রয়োগমূলক প্রশ্ন: দ্রাব্যতার (Solubility) ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তুমি কীভাবে নুন (Salt), বালি (Sand) এবং সালফারের (Sulfur) একটি মিশ্রণ থেকে উপাদানগুলিকে আলাদা করবে?

উত্তর দেখো

উত্তর: দ্রাব্যতার পার্থক্যের সাহায্যে আমরা উপাদানগুলিকে ধাপে ধাপে আলাদা করতে পারি:
ধাপ 1 (নুন পৃথকীকরণ): মিশ্রণটিতে প্রথমে জল মেশাতে হবে। নুন জলে দ্রবীভূত হয়ে যাবে, কিন্তু বালি ও সালফার অদ্রাব্য থাকবে। এরপর ফিল্টার কাগজের সাহায্যে মিশ্রণটি ছেঁকে নিলে পরিশ্রুত হিসেবে নুন-জল আলাদা হয়ে যাবে। ওই নুন-জলকে ফুটিয়ে জল বাষ্পীভূত করলেই পাত্রের তলায় নুন পড়ে থাকবে।
ধাপ 2 (সালফার পৃথকীকরণ): ফিল্টার কাগজে আটকে থাকা অবশিষ্টাংশটি হলো বালি ও সালফারের মিশ্রণ। এই মিশ্রণটিকে শুকিয়ে তার মধ্যে কার্বন ডাইসালফাইড $(CS2)$ দ্রাবক মেশাতে হবে। সালফার $CS2$-তে দ্রবীভূত হয়ে যাবে, কিন্তু বালি অদ্রাব্য থাকবে।
ধাপ 3 (বালি পৃথকীকরণ): পুনরায় মিশ্রণটিকে ছেঁকে নিলে ফিল্টার কাগজে বালি পড়ে থাকবে এবং পরিশ্রুত হিসেবে সালফারের দ্রবণ পাওয়া যাবে। ওই দ্রবণকে বাতাসে কিছুক্ষণ খোলা রাখলে CS2 উদ্বায়ী হওয়ায় উবে যাবে এবং পাত্রে সালফার (গন্ধক) পড়ে থাকবে।

9. একটি অজানা পদার্থের ভৌত ধর্মগুলি হলো— এটি কঠিন, ফিকে হলুদ বর্ণের, জলে অদ্রাব্য কিন্তু কার্বন ডাইসালফাইডে $(CS2)$ দ্রাব্য এবং একে হাতুড়ি দিয়ে পিটলে গুঁড়ো হয়ে যায়। পদার্থটি কী হতে পারে? এটি ধাতু নাকি অধাতু? এর একটি রাসায়নিক ধর্ম লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
পদার্থের পরিচয়: পদার্থটির হলুদ বর্ণ, জলে অদ্রাব্যতা, CS2 তে দ্রাব্যতা এবং ভঙ্গুরতা (পিটলে গুঁড়ো হয়ে যাওয়া) প্রমাণ করে যে পদার্থটি হলো সালফার (Sulfur) বা গন্ধক
ধাতু/অধাতু: এটি একটি অধাতু (কারণ এটি ভঙ্গুর এবং এর নমনীয়তা নেই)।
রাসায়নিক ধর্ম (দাহ্যতা): সালফার একটি দাহ্য পদার্থ। এটিকে বাতাসে পোড়ালে এটি অক্সিজেনের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে নীল শিখায় জ্বলে ওঠে এবং তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড (SO2) গ্যাস উৎপন্ন করে।

10. সাধারণ উষ্ণতায় তরল ধাতু এবং তরল অধাতু হিসেবে আমরা যথাক্রমে পারদ এবং ব্রোমিনকে জানি। এই দুটি পদার্থের মধ্যে একটি ভৌত ধর্ম এবং একটি রাসায়নিক ধর্মের পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: পারদ (তরল ধাতু) এবং ব্রোমিনের (তরল অধাতু) মধ্যে পার্থক্য:

1. ভৌত ধর্মের পার্থক্য (পরিবাহিতা ও বর্ণ): পারদ একটি ধাতু হওয়ায় এটি তাপ ও তড়িতের সুপরিবাহী এবং এর রং চকচকে রুপোলি সাদা। অন্যদিকে, ব্রোমিন অধাতু হওয়ায় এটি তাপ ও তড়িতের কুপরিবাহী এবং এর বর্ণ গাঢ় লাল বা লালচে-বাদামি।
2. রাসায়নিক ধর্মের পার্থক্য: পারদ সাধারণ উষ্ণতায় বাতাসের অক্সিজেনের সাথে সহজে বিক্রিয়া করে না। কিন্তু ব্রোমিন অত্যন্ত সক্রিয় একটি তরল অধাতু, যা সহজেই বিভিন্ন ধাতু (যেমন— সোডিয়াম, পটাশিয়াম) এবং অধাতুর সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে ব্রোমাইড যৌগ গঠন করে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার