অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 2.2‌ পদার্থের গঠন, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 2.2: পদার্থের গঠন
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)

1. রাদারফোর্ডের আলফা (α) কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষার প্রধান তিনটি পর্যবেক্ষণ (Observations) লেখো এবং এর থেকে তিনি কী সিদ্ধান্তে উপনীত হন?

উত্তর দেখো

উত্তর:
পর্যবেক্ষণ:
1. বেশিরভাগ আলফা (α) কণা সোনার পাত ভেদ করে কোনো বাধা না পেয়ে সোজা বেরিয়ে যায়।
2. খুব অল্প সংখ্যক আলফা কণা তাদের মূল পথ থেকে সামান্য কোণে বেঁকে যায়।
3. অতি নগণ্য সংখ্যক আলফা কণা (প্রায় 20,000 এর মধ্যে 1 টি) 180° কোণে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ফিরে আসে।

সিদ্ধান্ত: রাদারফোর্ড এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, পরমাণুর বেশিরভাগ স্থানই ফাঁকা। পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর এবং ধনাত্মক আধান এর কেন্দ্রে একটি অতি ক্ষুদ্র স্থানে কেন্দ্রীভূত থাকে, যার নাম তিনি দেন নিউক্লিয়াস (Nucleus)

[Image showing a spiral path of an electron falling into the nucleus as per classical electromagnetism]

2. রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের প্রধান দুটি ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা (Drawbacks) ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের প্রধান দুটি ত্রুটি হলো:

1. পরমাণুর স্থায়িত্বের অভাব: ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো আধানযুক্ত কণা (যেমন ইলেকট্রন) বৃত্তাকার পথে ঘুরলে তা প্রতিনিয়ত শক্তি বিকিরণ করে। এর ফলে ইলেকট্রনের শক্তি কমতে থাকবে এবং সেটি ক্রমশ ছোট বৃত্তাকার পথে ঘুরে একসময় নিউক্লিয়াসের ওপর আছড়ে পড়বে। অর্থাৎ পরমাণুর কোনো স্থায়িত্ব থাকবে না, কিন্তু বাস্তবে পরমাণু অত্যন্ত স্থায়ী।
2. বর্ণালির ত্রুটি: ইলেকট্রন যদি প্রতিনিয়ত শক্তি বিকিরণ করে, তবে পরমাণু থেকে নিরবচ্ছিন্ন বর্ণালি (Continuous spectrum) পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে পরমাণু থেকে সর্বদা রেখা বর্ণালি (Line spectrum) পাওয়া যায়। রাদারফোর্ডের মডেল এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

3. নিলস বোরের (Niels Bohr) পরমাণু মডেলের প্রধান দুটি স্বীকার্য লেখো এবং 2n² সূত্র প্রয়োগ করে প্রথম দুটি কক্ষপথের ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা নির্ণয় করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
বোরের মডেলের স্বীকার্য:
1. ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারদিকে যেকোনো বৃত্তাকার পথে ঘুরতে পারে না। তারা কেবল কতগুলি নির্দিষ্ট শক্তির বৃত্তাকার কক্ষপথে (Energy shells) ঘোরে। এই কক্ষপথে ঘোরার সময় ইলেকট্রন কোনো শক্তি বিকিরণ বা শোষণ করে না।
2. এই নির্দিষ্ট কক্ষপথগুলিকে ভেতর থেকে বাইরের দিকে যথাক্রমে K, L, M, N ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করা হয় (বা n = 1, 2, 3, 4…)।

ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা (2n² সূত্র):
প্রথম বা K কক্ষের ক্ষেত্রে (n = 1): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2 × (1)² = 2 টি
দ্বিতীয় বা L কক্ষের ক্ষেত্রে (n = 2): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2 × (2)² = 8 টি

4. আইসোটোপ (Isotopes) এবং আইসোবার (Isobars)-এর মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য উদাহরণসহ আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
উত্তর:

বিষয় আইসোটোপ (Isotopes) আইসোবার (Isobars)
১. সংজ্ঞা এদের পারমাণবিক সংখ্যা সমান কিন্তু ভরসংখ্যা আলাদা হয়। এদের ভরসংখ্যা সমান কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা আলাদা হয়।
২. মৌলের প্রকৃতি এগুলি সর্বদা একই মৌলের পরমাণু হয় (তাই রাসায়নিক ধর্ম একই থাকে)। এগুলি সর্বদা ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু হয় (তাই রাসায়নিক ধর্ম আলাদা হয়)।
৩. উদাহরণ হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ: ¹H₁, ²H₁, ³H₁ আর্গন ও ক্যালসিয়ামের আইসোবার: ⁴⁰Ar₁₈ এবং ⁴⁰Ca₂₀

[Image showing the electron transfer and formation of Sodium cation and Chloride anion]

5. ক্যাটায়ন (Cation) এবং অ্যানায়ন (Anion) কীভাবে তৈরি হয় তা যথাক্রমে সোডিয়াম (Na) এবং ক্লোরিন (Cl) পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাসের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
ক্যাটায়ন গঠন (সোডিয়ামের ক্ষেত্রে):
সোডিয়ামের (Na) পারমাণবিক সংখ্যা 11। এর ইলেকট্রন বিন্যাস হলো 2, 8, 1। এর বাইরের (M) কক্ষে 1 টি বাড়তি ইলেকট্রন আছে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য সোডিয়াম পরমাণু তার বাইরের কক্ষের এই 1 টি ইলেকট্রন বর্জন করে। ফলে এতে প্রোটন (11 টি) ইলেকট্রনের (10 টি) চেয়ে 1 টি বেশি হয় এবং এটি ধনাত্মক আধানযুক্ত ক্যাটায়নে (Na⁺) পরিণত হয়।
বিক্রিয়া: Na (2, 8, 1) → Na⁺ (2, 8) + e⁻

অ্যানায়ন গঠন (ক্লোরিনের ক্ষেত্রে):
ক্লোরিনের (Cl) পারমাণবিক সংখ্যা 17। এর ইলেকট্রন বিন্যাস হলো 2, 8, 7। এর বাইরের (M) কক্ষে 8 টি ইলেকট্রন পূর্ণ করতে মাত্র 1 টি ইলেকট্রন প্রয়োজন। তাই এটি বাইরের উৎস থেকে 1 টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে। ফলে এতে প্রোটনের (17 টি) চেয়ে ইলেকট্রন (18 টি) 1 টি বেশি হয় এবং এটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত অ্যানায়নে (Cl⁻) পরিণত হয়।
বিক্রিয়া: Cl (2, 8, 7) + e⁻ → Cl⁻ (2, 8, 8)


অধ্যায় 2.2: পদার্থের গঠন
(আরও 5টি ব্যাখ্যামূলক ও গাণিতিক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)

6. পরমাণু (Atom) এবং আয়ন (Ion)-এর মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
উত্তর: পরমাণু ও আয়নের মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য হলো:

বিষয় পরমাণু (Atom) আয়ন (Ion)
১. আধান বা চার্জ পরমাণু সর্বদা নিস্তরিৎ (Electrically neutral) হয়। এর কোনো চার্জ থাকে না। আয়ন সর্বদা তড়িৎগ্রস্ত (Charged) হয়। এটি ধনাত্মক (+) বা ঋণাত্মক (-) হতে পারে।
২. কণার সংখ্যা পরমাণুতে প্রোটন এবং ইলেকট্রনের সংখ্যা সর্বদা সমান থাকে। আয়নে প্রোটন এবং ইলেকট্রনের সংখ্যা কখনোই সমান হয় না।
৩. স্থিতিশীলতা নিষ্ক্রিয় গ্যাস ছাড়া অন্যান্য মৌলের পরমাণুর বাইরের কক্ষপথ ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকে না, তাই এরা কম স্থিতিশীল। আয়নের বাইরের কক্ষপথ সাধারণত 8 টি ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকে (অষ্টক পূর্ণ), তাই এরা পরমাণুর চেয়ে বেশি স্থিতিশীল।

7. গাণিতিক প্রশ্ন: একটি মৌলের পরমাণুর ভরসংখ্যা 27 এবং নিউট্রন সংখ্যা 14। মৌলটির পারমাণবিক সংখ্যা, প্রোটন সংখ্যা এবং ইলেকট্রন বিন্যাস (Electron configuration) নির্ণয় করো। মৌলটি ক্যাটায়ন নাকি অ্যানায়ন গঠন করবে?

উত্তর দেখো

উত্তর:
দেওয়া আছে, ভরসংখ্যা (A) = 27 এবং নিউট্রন সংখ্যা (N) = 14।
প্রোটন সংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যা: আমরা জানি, প্রোটন সংখ্যা = ভরসংখ্যা – নিউট্রন সংখ্যা = 27 – 14 = 13 টি। প্রোটন সংখ্যাই হলো পারমাণবিক সংখ্যা। সুতরাং, মৌলটির পারমাণবিক সংখ্যা হলো 13 (মৌলটি হলো অ্যালুমিনিয়াম)।
ইলেকট্রন বিন্যাস: নিস্তরিৎ পরমাণুতে 13 টি ইলেকট্রন থাকবে। বোরের সূত্র অনুযায়ী এর ইলেকট্রন বিন্যাস হবে: K কক্ষে 2 টি, L কক্ষে 8 টি এবং M কক্ষে 3 টি। অর্থাৎ, 2, 8, 3
আয়ন গঠন: এর সর্ববহিঃস্থ কক্ষে 3 টি ইলেকট্রন আছে। অষ্টক পূর্ণ করার জন্য এটি এই 3 টি ইলেকট্রন বর্জন করবে। সুতরাং, এটি ধনাত্মক আধানযুক্ত ক্যাটায়ন (Al³⁺) গঠন করবে।

[Image illustrating the strong nuclear force overcoming electrostatic repulsion between protons in an atomic nucleus]

8. নিউক্লিয় বল (Nuclear force) কাকে বলে? নিউক্লিয়াসের ভেতরে সমধর্মী প্রোটনগুলি থাকা সত্ত্বেও নিউক্লিয়াস ভেঙে যায় না কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর:
নিউক্লিয় বল: পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে নিউক্লিয়নগুলির (প্রোটন ও নিউট্রন) মধ্যে যে অত্যন্ত শক্তিশালী আকর্ষণ বল কাজ করে, তাকে নিউক্লিয় বল বলে।

নিউক্লিয়াস না ভাঙার কারণ: নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা প্রোটনগুলি ধনাত্মক আধানযুক্ত হওয়ায় এরা পরস্পরকে তীব্রভাবে বিকর্ষণ করে। এই বিকর্ষণ বলের জন্য নিউক্লিয়াস ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে যে ‘নিউক্লিয় বল’ কাজ করে, তা এই বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী। এই প্রবল আকর্ষণ বলই প্রোটনগুলিকে একত্রে বেঁধে রাখে এবং নিউক্লিয়াসকে স্থিতিশীল করে, ফলে নিউক্লিয়াস ভেঙে যায় না।

9. আইসোটোন (Isotone) কাকে বলে? উপযুক্ত উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।

উত্তর দেখো

উত্তর:
সংজ্ঞা: ভিন্ন ভিন্ন মৌলের যেসব পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নিউট্রন সংখ্যা সমান থাকে, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা এবং ভরসংখ্যা আলাদা হয়, তাদের পরস্পরের আইসোটোন বলে।

উদাহরণ: ফসফরাস-31 (³¹P₁₅) এবং সালফার-32 (³²S₁₆) হলো পরস্পরের আইসোটোন।
ব্যাখ্যা:
ফসফরাসের ক্ষেত্রে: নিউট্রন সংখ্যা = ভরসংখ্যা – প্রোটন সংখ্যা = 31 – 15 = 16 টি
সালফারের ক্ষেত্রে: নিউট্রন সংখ্যা = ভরসংখ্যা – প্রোটন সংখ্যা = 32 – 16 = 16 টি
যেহেতু উভয় পরমাণুতেই নিউট্রন সংখ্যা সমান (16), তাই এরা আইসোটোন।

10. গাণিতিক প্রশ্ন: O²⁻ (অক্সাইড আয়ন) এবং Mg²⁺ (ম্যাগনেসিয়াম আয়ন) – এদের ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন সংখ্যা নির্ণয় করো। (অক্সিজেনের Z=8, A=16 এবং ম্যাগনেসিয়ামের Z=12, A=24)। এদের মধ্যে কী মিল পাচ্ছ?

উত্তর দেখো

উত্তর:
O²⁻ (অক্সাইড আয়ন) এর ক্ষেত্রে:
প্রোটন (Z) = 8 টি।
নিউট্রন (A – Z) = 16 – 8 = 8 টি。
ইলেকট্রন = 8 টি (প্রোটনের সমান) + 2 টি (ঋণাত্মক আধানের জন্য গ্রহণ করেছে) = 10 টি

Mg²⁺ (ম্যাগনেসিয়াম আয়ন) এর ক্ষেত্রে:
প্রোটন (Z) = 12 টি।
নিউট্রন (A – Z) = 24 – 12 = 12 টি。
ইলেকট্রন = 12 টি (প্রোটনের সমান) – 2 টি (ধনাত্মক আধানের জন্য বর্জন করেছে) = 10 টি

মিল: উভয় আয়নেই মোট ইলেকট্রন সংখ্যা সমান (10 টি)। যাদের ইলেকট্রন সংখ্যা সমান হয়, তাদের সমইলেকট্রনীয় (Isoelectronic) বলা হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার