অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 2.3: রাসায়নিক বিক্রিয়া, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 2.3: রাসায়নিক বিক্রিয়া
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)
1. আধুনিক ইলেকট্রনীয় তত্ত্বের সাহায্যে জারণ (Oxidation) ও বিজারণ (Reduction) প্রক্রিয়া উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: আধুনিক ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব অনুযায়ী:
জারণ (Oxidation): কোনো পরমাণু, অণু বা আয়ন যখন এক বা একাধিক ইলেকট্রন বর্জন করে (ছেড়ে দেয়), তখন সেই প্রক্রিয়াকে জারণ বলে। অর্থাৎ জারণ মানে ইলেকট্রন বর্জন।
উদাহরণ: ফেরাস আয়ন ($Fe^{2+}$) একটি ইলেকট্রন বর্জন করে ফেরিক আয়নে ($Fe^{3+}$) পরিণত হয়।
সমীকরণ: $Fe^{2+} \rightarrow Fe^{3+} + e^{-}$ (জারণ)
বিজারণ (Reduction): কোনো পরমাণু, অণু বা আয়ন যখন এক বা একাধিক ইলেকট্রন গ্রহণ করে, তখন সেই প্রক্রিয়াকে বিজারণ বলে। অর্থাৎ বিজারণ মানে ইলেকট্রন গ্রহণ।
উদাহরণ: ক্লোরিন পরমাণু ($Cl$) একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে ক্লোরাইড আয়নে ($Cl^{-}$) পরিণত হয়।
সমীকরণ: $Cl + e^{-} \rightarrow Cl^{-}$ (বিজারণ)
2. অনুঘটক (Catalyst) কাকে বলে? ধনাত্মক ও ঋণাত্মক অনুঘটকের সংজ্ঞা একটি করে উদাহরণসহ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
অনুঘটক: যেসব পদার্থ সামান্য পরিমাণে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় বা কমায়, কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজেদের ভর ও রাসায়নিক ধর্মে অপরিবর্তিত থাকে, তাদের অনুঘটক বলে।
ধনাত্মক অনুঘটক (Positive Catalyst): যে অনুঘটক কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ বৃদ্ধি করে, তাকে ধনাত্মক অনুঘটক বলে।
উদাহরণ: হাইড্রোজেন পারক্সাইড ($H_2O_2$) থেকে অক্সিজেন প্রস্তুতির সময় ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($MnO_2$) ধনাত্মক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বিক্রিয়াকে দ্রুত করে।
ঋণাত্মক অনুঘটক (Negative Catalyst): যে অনুঘটক কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ কমিয়ে দেয় বা ধীর করে, তাকে ঋণাত্মক অনুঘটক বলে।
উদাহরণ: হাইড্রোজেন পারক্সাইডের ($H_2O_2$) বিয়োজনকে ধীর করার জন্য এতে সামান্য পরিমাণ ফসফরিক অ্যাসিড ($H_3PO_4$) মেশানো হয়।
3. প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement) এবং বিনিময় বিক্রিয়ার (Double Displacement) মধ্যে মূল পার্থক্য কী? রাসায়নিক সমীকরণসহ উভয় বিক্রিয়ার একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর:
মূল পার্থক্য: প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ায় একটি অধিক সক্রিয় মৌল অন্য একটি যৌগের অণু থেকে কম সক্রিয় মৌলকে সরিয়ে নিজে তার জায়গা দখল করে। অন্যদিকে, বিনিময় বিক্রিয়ায় দুটি আলাদা যৌগ নিজেদের উপাদান বা আয়নগুলিকে পরস্পর স্থান বিনিময় করে দুটি সম্পূর্ণ নতুন যৌগ তৈরি করে।
প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার উদাহরণ: কপার সালফেট দ্রবণে লোহার পেরেক ডোবালে লোহা কপারকে সরিয়ে দেয়।
সমীকরণ: $Fe + CuSO_4 \rightarrow FeSO_4 + Cu\downarrow$
বিনিময় বিক্রিয়ার উদাহরণ: সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং সিলভার নাইট্রেটের জলীয় দ্রবণ মেশালে তারা নিজেদের আয়ন বিনিময় করে।
সমীকরণ: $NaCl + AgNO_3 \rightarrow AgCl\downarrow + NaNO_3$
4. তাপদায়ী (Exothermic) ও তাপগ্রাহী (Endothermic) বিক্রিয়া বলতে কী বোঝো? দৈনন্দিন জীবনের একটি করে উদাহরণ সমীকরণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
তাপদায়ী বিক্রিয়া: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয় এবং চারপাশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, তাকে তাপদায়ী বিক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: বাড়িতে চুনকাম করার সময় পোড়াচুনে ($CaO$) জল মেশালে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এবং জল ফুটতে শুরু করে।
সমীকরণ: $CaO + H_2O \rightarrow Ca(OH)_2 + তাপ$
তাপগ্রাহী বিক্রিয়া: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবেশ থেকে তাপ শোষিত হয় এবং চারপাশের তাপমাত্রা কমে গিয়ে শীতল হয়ে যায়, তাকে তাপগ্রাহী বিক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: একটি টেস্টটিউবে জলে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ($NH_4NO_3$) মেশালে তাপ শোষিত হওয়ায় টেস্টটিউবের বাইরের গা বেশ ঠান্ডা হয়ে যায়।
5. উৎসেচক বা এনজাইম (Enzyme) কী? জীবদেহে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উদাহরণের সাহায্যে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর:
উৎসেচক বা এনজাইম: জীবদেহের সজীব কোশে উৎপন্ন যেসব প্রোটিনজাতীয় জটিল জৈব পদার্থ জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটকের মতো কাজ করে বিক্রিয়ার বেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের উৎসেচক বা এনজাইম বলে। (এদের জৈব অনুঘটকও বলা হয়)।
জীবদেহে ভূমিকা ও উদাহরণ: আমাদের শরীরের কোষে নানা বিপাকীয় কাজের ফলে ক্ষতিকর হাইড্রোজেন পারক্সাইড ($H_2O_2$) তৈরি হয়। এটি শরীরে জমলে কোশের মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু আমাদের কোশে বা যকৃতে (Liver) ‘ক্যাটালেজ’ (Catalase) নামক একটি উৎসেচক থাকে। এই উৎসেচকটি অবিলম্বে ওই ক্ষতিকর $H_2O_2$ কে দ্রুত ভেঙে নিরাপদ জল ও অক্সিজেন গ্যাসে পরিণত করে শরীরকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
সমীকরণ: $2H_2O_2 \xrightarrow{Catalase} 2H_2O + O_2\uparrow$
6. নিচের রাসায়নিক সমীকরণগুলি দেখে বিক্রিয়ার ধরন (Type of reaction) শনাক্ত করো এবং উত্তরের সাপেক্ষে যুক্তি দাও:
(ক) $2\mathrm{Mg} + \mathrm{O_2} \rightarrow 2\mathrm{MgO}$
(খ) $\mathrm{Zn} + \mathrm{H_2SO_4} \rightarrow \mathrm{ZnSO_4} + \mathrm{H_2}\uparrow$
উত্তর দেখো
উত্তর:
(ক) প্রত্যক্ষ সংযোগ বিক্রিয়া (Combination Reaction): এখানে দুটি মৌল—ম্যাগনেসিয়াম ($\mathrm{Mg}$) এবং অক্সিজেন ($\mathrm{O_2}$) সরাসরি যুক্ত হয়ে একটিমাত্র নতুন যৌগ ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড ($\mathrm{MgO}$) তৈরি করেছে। তাই এটি প্রত্যক্ষ সংযোগ বিক্রিয়া।
(খ) প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction): এখানে জিংক ($\mathrm{Zn}$) সালফিউরিক অ্যাসিডের ($\mathrm{H_2SO_4}$) অণু থেকে হাইড্রোজেনকে ($\mathrm{H_2}$) সরিয়ে নিজে তার জায়গা দখল করে জিংক সালফেট ($\mathrm{ZnSO_4}$) তৈরি করেছে। তাই এটি একটি প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া।
[Image illustrating the lock and key model of enzyme catalysis]
7. “সব উৎসেচকই (Enzyme) অনুঘটক (Catalyst), কিন্তু সব অনুঘটক উৎসেচক নয়”— কথাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: উৎসেচক বা এনজাইম হলো জীবদেহের সজীব কোশে উৎপন্ন বিশেষ ধরনের প্রোটিন, যা জীবদেহের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় বা কমায় (যেমন: ক্যাটালেজ, অ্যামাইলেজ)। যেহেতু এরা রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই এরা এক প্রকার জৈব অনুঘটক। অর্থাৎ, সব উৎসেচকই নিশ্চিতভাবে অনুঘটক।
কিন্তু লোহা ($\mathrm{Fe}$), ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($\mathrm{MnO_2}$)-এর মতো অজৈব রাসায়নিক পদার্থগুলি অনুঘটক হিসেবে কাজ করলেও এরা জীবদেহে উৎপন্ন হয় না এবং প্রোটিনজাতীয় নয়। তাই এরা অনুঘটক হলেও উৎসেচক নয়। সুতরাং বলা যায়, সব অনুঘটক উৎসেচক নয়।
[Image showing oxidation and reduction process with electron transfer from Iron to Copper ion]
8. ইলেকট্রনীয় তত্ত্বের সাহায্যে নিচের বিক্রিয়াটিতে কোনটি জারক দ্রব্য (Oxidizing agent) এবং কোনটি বিজারক দ্রব্য (Reducing agent) তা যুক্তিসহ নির্ণয় করো: $\mathrm{Cu^{2+}} + \mathrm{Fe} \rightarrow \mathrm{Cu} + \mathrm{Fe^{2+}}$
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. বিজারক দ্রব্য (Reducing Agent): বিক্রিয়াটিতে আয়রন ($\mathrm{Fe}$) 2 টি ইলেকট্রন বর্জন করে $\mathrm{Fe^{2+}}$ আয়নে পরিণত হয়েছে (জারণ ঘটেছে)। যে পদার্থ ইলেকট্রন বর্জন করে অন্যকে বিজারিত করে, তাকে বিজারক দ্রব্য বলে। তাই এখানে $\mathrm{Fe}$ হলো বিজারক দ্রব্য।
2. জারক দ্রব্য (Oxidizing Agent): কিউপ্রিক আয়ন ($\mathrm{Cu^{2+}}$) ওই 2 টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে নিস্তরিৎ কপার ($\mathrm{Cu}$) পরমাণুতে পরিণত হয়েছে (বিজারণ ঘটেছে)। যে পদার্থ ইলেকট্রন গ্রহণ করে অন্যকে জারিত করে, তাকে জারক দ্রব্য বলে। তাই এখানে $\mathrm{Cu^{2+}}$ হলো জারক দ্রব্য।
9. রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার শর্ত হিসেবে ‘আলো’ (Light) এবং ‘তড়িৎ’ (Electricity)-এর ভূমিকা একটি করে সমীকরণসহ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর:
(ক) আলোর ভূমিকা: কিছু বিক্রিয়া কেবল আলোর উপস্থিতিতেই ঘটে। যেমন, সিলভার নাইট্রেটের ($\mathrm{AgNO_3}$) বিয়োজন। আলোর উপস্থিতিতে সিলভার নাইট্রেট ভেঙে রূপো তৈরি করে।
সমীকরণ: $2\mathrm{AgNO_3} \xrightarrow{Light} 2\mathrm{Ag} + 2\mathrm{NO_2} + \mathrm{O_2}$
(খ) তড়িতের ভূমিকা: কিছু বিক্রিয়া ঘটাতে তড়িৎ বা বিদ্যুৎশক্তির প্রয়োজন হয়। যেমন, সামান্য অ্যাসিড মেশানো জলের মধ্য দিয়ে তড়িৎ চালনা করলে জল বিশ্লিষ্ট হয়ে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস উৎপন্ন করে (জলের তড়িৎবিশ্লেষণ)।
সমীকরণ: $2\mathrm{H_2O} \xrightarrow{Electricity} 2\mathrm{H_2}\uparrow + \mathrm{O_2}\uparrow$
[Image showing iron rusting with oxidation equation]
10. লোহার পেরেকে মর্চে ধরা (Rusting of iron) কী ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া? মর্চে নিবারণের (বা প্রতিরোধ করার) দুটি উপায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
বিক্রিয়ার ধরন: লোহার মর্চে ধরা হলো একটি ধীরগতির জারণ (Oxidation) বিক্রিয়া। খোলা বাতাসে রাখলে লোহা বাতাসের অক্সিজেন এবং জলীয় বাষ্পের সাথে যুক্ত হয়ে শোদক ফেরিক অক্সাইড বা মর্চে তৈরি করে।
মর্চে নিবারণের দুটি উপায়:
1. লোহার তৈরি জিনিসের ওপর রং, আলকাতরা বা তেলের প্রলেপ দিলে লোহার সাথে বাতাস ও জলীয় বাষ্পের সরাসরি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফলে মর্চে ধরে না।
2. লোহার ওপর অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় ধাতু যেমন— জিংক ($\mathrm{Zn}$) বা টিন ($\mathrm{Sn}$)-এর প্রলেপ দেওয়া হয় (লোহার ওপর জিংকের প্রলেপ দেওয়াকে গ্যালভানাইজেশন বলে)।