অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 5 প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 5: প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ
(12টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)

1. ঘর্ষণের ফলে কীভাবে স্থিরতড়িৎ উৎপন্ন হয়? ইলেকট্রন তত্ত্বের (Electron theory) সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: ইলেকট্রন তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে ধনাত্মক প্রোটন এবং বাইরে ঋণাত্মক ইলেকট্রন থাকে, ফলে পরমাণু নিস্তরিৎ হয়। দুটি উপযুক্ত বস্তুকে (যেমন কাঁচ ও রেশম) পরস্পরের সাথে ঘষলে, তাপশক্তির প্রভাবে একটি বস্তু থেকে কিছু ইলেকট্রন ছিটকে অন্য বস্তুতে চলে যায়।
যে বস্তু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে যায়, সেখানে ইলেকট্রনের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সেটি ধনাত্মক (Positive) আধানে আহিত হয়। অন্যদিকে, যে বস্তুটি ওই বাড়তি ইলেকট্রন গ্রহণ করে, সেখানে ইলেকট্রনের আধিক্য ঘটায় সেটি ঋণাত্মক (Negative) আধানে আহিত হয়। এইভাবেই ঘর্ষণের ফলে বস্তুতে স্থিরতড়িৎ উৎপন্ন হয়।

2. “আকর্ষণ নয়, বিকর্ষণই তড়িৎগ্রস্ততার চূড়ান্ত প্রমাণ”—যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: একটি আহিত বস্তু (ধরা যাক পজিটিভ) একটি বিপরীত আধানে আহিত বস্তুকে (নেগেটিভ) আকর্ষণ করে। আবার, তড়িৎ আবেশের (Induction) কারণে একটি আহিত বস্তু সম্পূর্ণ নিস্তরিৎ (Uncharged) বস্তুকেও আকর্ষণ করতে পারে। তাই শুধু আকর্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অপর বস্তুটি আগে থেকেই আহিত কি না।
কিন্তু, বিকর্ষণ কেবল এবং কেবলমাত্র দুটি সমজাতীয় আধানে আহিত বস্তুর মধ্যেই ঘটে। অর্থাৎ বিকর্ষণ ঘটলে এটি নিশ্চিত যে উভয় বস্তুই আহিত এবং সমপ্রকৃতির আধানযুক্ত। তাই বিকর্ষণই হলো তড়িৎগ্রস্ততার চূড়ান্ত প্রমাণ।

[Image illustrating electrostatic induction with a positively charged glass rod bringing near a neutral metal sphere]

3. তড়িৎ আবেশ (Electrostatic induction) কাকে বলে? একটি নিস্তরিৎ বস্তুকে স্পর্শ না করে কীভাবে আহিত করা যায়?

উত্তর দেখো

উত্তর:
তড়িৎ আবেশ: একটি আহিত বস্তুকে কোনো নিস্তরিৎ পরিবাহীর কাছাকাছি আনলে (স্পর্শ না করিয়ে), নিস্তরিৎ পরিবাহীর নিকটবর্তী প্রান্তে বিপরীত প্রকৃতির আধান এবং দূরবর্তী প্রান্তে সমপ্রকৃতির আধান সাময়িকভাবে সঞ্চিত হওয়ার ঘটনাকে তড়িৎ আবেশ বলে।
স্পর্শ না করে আহিতকরণ: একটি পজিটিভ আহিত কাঁচদণ্ডকে একটি নিস্তরিৎ ধাতব গোলকের কাছে আনলে গোলকের কাছে থাকা প্রান্তে নেগেটিভ এবং দূরের প্রান্তে পজিটিভ আধান আবিষ্ট হবে। এবার গোলকটির দূরের প্রান্তটিকে পরিবাহী তার দিয়ে মাটিতে যুক্ত (Earthing) করলে পজিটিভ আধান মাটিতে চলে যাবে, কিন্তু নেগেটিভ আধান কাঁচদণ্ডের আকর্ষণে আটকে থাকবে। এবার আর্থিং এবং কাঁচদণ্ড সরিয়ে নিলে ওই নেগেটিভ আধান পুরো গোলকে ছড়িয়ে পড়বে এবং গোলকটি স্থায়ীভাবে নেগেটিভ আধানে আহিত হবে।

4. স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের (Gold-leaf electroscope) গঠন সংক্ষেপে বর্ণনা করো। এর প্রধান কাজ কী?

উত্তর দেখো

উত্তর:
গঠন: এই যন্ত্রে একটি পিতল বা তামার দণ্ড থাকে। দণ্ডটির ওপরের প্রান্তে একটি ধাতব চাকতি এবং নিচের প্রান্তে দুটি অত্যন্ত পাতলা সোনার পাত (Gold leaves) পাশাপাশি ঝোলানো থাকে। পাত দুটিকে বাইরের বাতাস থেকে রক্ষা করার জন্য পুরো দণ্ডটিকে একটি রবারের ছিপির সাহায্যে কাঁচের বোতলের ভেতরে রাখা হয়। কাঁচের বোতলের ভেতরের দিকের নিচের অংশে দুটি টিনের পাত লাগানো থাকে যা মাটির সাথে যুক্ত (Earthed) থাকে।
কাজ: কোনো বস্তুতে তড়িৎ আধানের উপস্থিতি এবং সেই আধানের প্রকৃতি (পজিটিভ না নেগেটিভ) নির্ণয় করতে এই যন্ত্র ব্যবহৃত হয়।

5. একটি আহিত বস্তুর সাহায্যে স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের আধানের প্রকৃতি (পজিটিভ না নেগেটিভ) কীভাবে নির্ণয় করবে?

উত্তর দেখো

উত্তর: আধানের প্রকৃতি নির্ণয় করতে হলে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রটিকে প্রথমে একটি জানা আধান (যেমন পজিটিভ) দ্বারা আহিত করে নিতে হবে। এর ফলে সোনার পাত দুটি পরস্পরকে বিকর্ষণ করে ফাঁক হয়ে থাকবে।
এরপর পরীক্ষাধীন বস্তুটিকে যন্ত্রের ধাতব চাকতির কাছে আনতে হবে।
1. যদি পাত দুটির ফাঁক আরও বেড়ে যায়, তবে বুঝতে হবে বস্তুটিতে সমজাতীয় আধান অর্থাৎ পজিটিভ আধান আছে (কারণ সমজাতীয় আধানের বিকর্ষণ বাড়ে)।
2. আর যদি পাত দুটির ফাঁক কমে যায়, তবে বুঝতে হবে বস্তুটিতে বিপরীত অর্থাৎ নেগেটিভ আধান আছে (কারণ আবেশের ফলে পাত দুটির পজিটিভ আধান কমে যায়)।

6. আকাশে বজ্রপাত (Lightning) সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক কারণটি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
1. কালবৈশাখী বা প্রবল ঝড়ের সময় বায়ুমণ্ডলে তীব্র ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ চলে। এর ফলে মেঘের জলকণা এবং বরফকণাগুলির মধ্যে প্রচণ্ড ঘর্ষণ হয়।
2. ঘর্ষণের ফলে ইলেকট্রন স্থানান্তরের কারণে মেঘের ওপরের দিক ধনাত্মক (Positive) এবং নিচের দিক ঋণাত্মক (Negative) আধানে আহিত হয়।
3. মেঘের নিচের দিকের নেগেটিভ আধানের প্রভাবে আবেশের (Induction) কারণে ভূপৃষ্ঠে প্রবল পজিটিভ আধান সৃষ্টি হয়।
4. যখন মেঘের নেগেটিভ আধান এবং ভূপৃষ্ঠের পজিটিভ আধানের মধ্যে আকর্ষণ বল অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়, তখন বাতাসের বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রন তীব্র বেগে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। এই তড়িৎমোক্ষণের ফলেই বাতাস প্রচণ্ড গরম হয়ে আলোর ঝলকানি ও তীব্র শব্দের সৃষ্টি করে, একেই বজ্রপাত বলে।

7. বজ্রবহ বা লাইটনিং কন্ডাক্টর (Lightning conductor) কী? একটি আদর্শ বজ্রবহ তৈরি করতে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরি?

উত্তর দেখো

উত্তর:
বজ্রবহ: এটি একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা যা উঁচু বাড়ি বা ইমারতকে বজ্রপাতের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা করে। এটি মূলত একটি মোটা ধাতব পরিবাহী দণ্ড।
বৈশিষ্ট্য:
1. দণ্ডটিকে অবশ্যই তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো বিদ্যুতের খুব ভালো সুপরিবাহী ধাতু দিয়ে তৈরি হতে হবে।
2. দণ্ডটির ওপরের প্রান্তে একাধিক সূঁচালো বা তীক্ষ্ণ কাঁটা (Spikes) থাকতে হবে এবং এটি বাড়ির ছাদের সবচেয়ে উঁচু অংশে লাগাতে হবে।
3. দণ্ডটির নিচের অংশ একটি মোটা পরিবাহী তারের সাহায্যে মাটির বেশ গভীরে পুঁতে রাখা একটি তামার পাতের সাথে ভালোভাবে যুক্ত (Earthing) করতে হবে।

[Image illustrating how the spikes of a lightning conductor discharge a cloud and safely ground the lightning strike]

8. বজ্রবহ কীভাবে একটি উঁচু বাড়িকে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করে? এর কার্যপ্রণালী সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: বজ্রবহ প্রধানত দুটি ধাপে কাজ করে:
1. বজ্রপাত নিবারণ: মেঘের নিচের অংশে নেগেটিভ আধান থাকলে, আবেশের ফলে বজ্রবহের তীক্ষ্ণ কাঁটাগুলোতে তীব্র পজিটিভ আধান তৈরি হয়। সূঁচালো অংশের তড়িৎমোক্ষণ ক্রিয়ার (Point action) ফলে এই পজিটিভ আধানযুক্ত বাতাস ওপরের দিকে ছুটে গিয়ে মেঘের নেগেটিভ আধানকে কিছুটা প্রশমিত করে, ফলে বজ্রপাতের আশঙ্কা কমে যায়।
2. বজ্রপাত হলে সুরক্ষা: যদি আধান প্রশমিত না হয় এবং বজ্রপাত ঘটেই যায়, তবে বিদ্যুৎ সোজা বাড়ির ওপর না পড়ে বজ্রবহের তীক্ষ্ণ কাঁটার ওপর এসে পড়ে। তখন সেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বজ্রবহের মোটা তামার তার দিয়ে কোনো ক্ষতি না ঘটিয়ে সরাসরি মাটির ভেতরে (আর্থিং) চলে যায়। বাড়িটি রক্ষা পায়।

9. বজ্রপাতের সময় আত্মরক্ষার জন্য অন্তত 3টি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা বা নিয়ম লেখো যা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

উত্তর দেখো

উত্তর: বজ্রপাতের সময় বাঁচার জন্য নিম্নলিখিত নিয়মগুলো মানা উচিত:
1. নিরাপদ আশ্রয়: খোলা মাঠ বা উঁচু গাছের নিচে একদমই দাঁড়ানো উচিত নয়। দ্রুত কোনো পাকা বাড়ির ভেতরে অথবা চারদিক বন্ধ থাকা গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেওয়া উচিত।
2. ধাতব বস্তু এড়ানো: বজ্রপাতের সময় ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা বা জানালার ধাতব গ্রিল ধরে থাকা উচিত নয়, কারণ ধাতু বিদ্যুতের সুপরিবাহী।
3. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি: বাড়িতে থাকলে তারযুক্ত ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার করা, টিভির ডিশ অ্যান্টেনার তার লাগানো বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (যেমন ফ্রিজ, কম্পিউটার) প্লাগ-ইন অবস্থায় রাখা উচিত নয়, এগুলি বন্ধ করে প্লাগ খুলে রাখা উচিত।

10. আর্থিং (Earthing) কাকে বলে? আমাদের বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক লাইনে বা যন্ত্রপাতিতে আর্থিং করা অত্যন্ত জরুরি কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর:
সংজ্ঞা: কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বা আহিত বস্তুকে একটি পরিবাহী তারের (আর্থিং ওয়্যার) মাধ্যমে মাটির গভীরে রাখা পরিবাহী পাতের সাথে যুক্ত করার ব্যবস্থাকে আর্থিং বলে।
জরুরি কারণ: বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, ফ্রিজ, বা মাইক্রোওয়েভের মতো যন্ত্রপাতির বাইরের আবরণ ধাতব হয়। কোনো কারণে ভেতরের লাইভ তার ছিঁড়ে ধাতব আবরণের সংস্পর্শে এলে পুরো যন্ত্রটি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় আর্থিং করা থাকলে বিদ্যুৎ মানুষের শরীরে প্রবেশ না করে সরাসরি আর্থিং তারের মাধ্যমে মাটিতে চলে যায়, ফলে মানুষ মারাত্মক বৈদ্যুতিক শকের হাত থেকে রক্ষা পায়।

[Image depicting Faraday’s cage effect where lightning strikes a metal car but the person inside is completely safe]

11. বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠের চেয়ে চারদিক বন্ধ থাকা গাড়ির ভেতরে থাকা বেশি নিরাপদ কেন? ফ্যারাডের খাঁচা (Faraday cage) কী?

উত্তর দেখো

উত্তর:
ফ্যারাডের খাঁচা: বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে প্রমাণ করেন যে, কোনো ফাঁপা ধাতব পরিবাহীর বাইরের পৃষ্ঠে আধান দিলে তা কেবল বাইরের পৃষ্ঠেই অবস্থান করে, ভেতরের ফাঁপা অংশে কোনো আধান বা বিদ্যুৎ প্রবেশ করতে পারে না। একেই ফ্যারাডের খাঁচা প্রভাব বলে।
নিরাপত্তার কারণ: একটি চারদিক বন্ধ গাড়ি ফ্যারাডের খাঁচার মতো আচরণ করে। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ গাড়ির ওপর পড়লেও তা গাড়ির ধাতব বডি বা বাইরের আবরণ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে চাকার মাধ্যমে মাটিতে চলে যায়। ভেতরের ফাঁপা অংশে কোনো বিদ্যুৎ প্রবেশ করে না, তাই যাত্রীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন।

12. শীতকালে অন্ধকারে উলের বা সিন্থেটিক সোয়েটার খোলার সময় চড়চড় শব্দ হয় এবং হালকা স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় কেন? এই ঘটনাটি কোন বৈজ্ঞানিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত?

উত্তর দেখো

উত্তর:
কারণ: শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় বায়ু শুষ্ক হয়। সোয়েটার খোলার সময় আমাদের শরীরের বা ভেতরের জামার সাথে উলের বা সিন্থেটিক কাপড়ের প্রচুর ঘর্ষণ হয়। এই ঘর্ষণের ফলে ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে স্থিরতড়িৎ উৎপন্ন হয় এবং পোশাকটি আহিত হয়ে পড়ে। উৎপন্ন এই বিপরীত আধানগুলির মধ্যে আকর্ষণের ফলে যখন আধানের দ্রুত আদান-প্রদান (তড়িৎমোক্ষণ বা Discharge) ঘটে, তখন তীব্র বৈদ্যুতিক চাপের কারণে বাতাসের অণুগুলি উদ্দীপিত হয়ে এই চড়চড় শব্দ তৈরি করে এবং অন্ধকারে হালকা আলোর স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়।
বৈজ্ঞানিক নীতি: এই ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে ঘর্ষণজাত স্থিরতড়িৎ (Frictional static electricity) এবং তড়িৎমোক্ষণ (Electrical discharge) নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার