অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 7 : ‘অণুজীবের জগৎ’ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 7: অণুজীবের জগৎ
(12টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)
[Image showing the 4 main types of microorganisms: Bacteria, Fungi, Algae, and Protozoa]
1. অণুজীবদের প্রধানত কয়টি ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী? প্রত্যেক প্রকারের একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: অণুজীবদের প্রধানত 4 টি ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলি হলো:
1. ব্যাকটেরিয়া (Bacteria): এরা এককোষী এবং প্রোক্যারিওটিক (আদি কোষযুক্ত)। উদাহরণ: ল্যাকটোব্যাসিলাস (দই তৈরিতে সাহায্য করে)।
2. ছত্রাক (Fungi): এরা ক্লোরোফিলবিহীন, তাই নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে না। উদাহরণ: ইস্ট (পাউরুটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়)।
3. আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া (Protozoa): এরা এককোষী কিন্তু উন্নত কোষযুক্ত (ইউক্যারিওটিক) এবং পরভোজী। উদাহরণ: অ্যামিবা বা প্লাজমোডিয়াম।
4. শৈবাল (Algae): এরা ক্লোরোফিলযুক্ত এবং নিজেদের খাদ্য নিজেরাই তৈরি করতে পারে। উদাহরণ: ক্ল্যামাইডোমোনাস।
(বিঃদ্রঃ ভাইরাসকে এই 4 টি প্রধান ভাগের বাইরে জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের এক বিশেষ সত্তা হিসেবে ধরা হয়।)
2. ভাইরাসকে (Virus) ‘বাধ্যতামূলক পরজীবী’ (Obligate parasite) বলা হয় কেন? ভাইরাসের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
বাধ্যতামূলক পরজীবী বলার কারণ: ভাইরাসের নিজস্ব কোনো কোশীয় অঙ্গাণু বা বিপাকীয় ক্ষমতা নেই। এটি অন্য কোনো জীবিত কোশের (Host cell) বাইরে সম্পূর্ণ জড় বস্তুর মতো আচরণ করে। এটি কেবল সজীব কোশের ভেতরে প্রবেশ করলেই সেই কোশের উপাদান ব্যবহার করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং জীবের লক্ষণ প্রকাশ করে। তাই অন্য জীবের কোশ ছাড়া এরা বাঁচতে পারে না বলে এদের বাধ্যতামূলক পরজীবী বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য:
1. এরা জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু।
2. এদের দেহে কেবল প্রোটিনের আবরণ এবং ভেতরে নিউক্লিক অ্যাসিড ($DNA$ বা $RNA$) থাকে।
3. কৃষিকাজে এবং শিল্পে ব্যাকটেরিয়ার (Bacteria) উপকারী ভূমিকাগুলি আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
কৃষিকাজে ভূমিকা:
1. মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি: রাইজোবিয়াম নামক মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে বসবাস করে এবং বাতাস থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিতে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
2. বর্জ্য পচন: ব্যাকটেরিয়া মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ পচিয়ে (বিয়োজক হিসেবে) হিউমাসে পরিণত করে, যা সার হিসেবে কৃষিকাজে অত্যন্ত উপকারী।
শিল্পে ভূমিকা:
1. খাদ্য শিল্পে: ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া দুধ থেকে দই, পনির ইত্যাদি দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরিতে অপরিহার্য।
2. ওষুধ শিল্পে: স্ট্রেপটোমাইসেস নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে স্ট্রেপটোমাইসিনের মতো জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি হয়।
4. মানুষের খাদ্য এবং ওষুধ প্রস্তুতিতে ছত্রাকের (Fungi) ভূমিকা বর্ণনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
খাদ্য হিসেবে ও খাদ্য শিল্পে:
1. মাশরুম (অ্যাগারিকাস) নামক একপ্রকার ছত্রাক প্রচুর প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ হওয়ায় সরাসরি খাদ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়।
2. বেকারি শিল্পে পাউরুটি, কেক, বিস্কুট তৈরি করতে এবং অ্যালকোহল বা মদ শিল্পে সন্ধান (Fermentation) প্রক্রিয়ার জন্য ইস্ট (Yeast) নামক এককোষী ছত্রাক ব্যবহার করা হয়।
ওষুধ প্রস্তুতিতে:
রোগ নিরাময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করতে ছত্রাক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, পেনিসিলিয়াম নোটেটাম নামক ছত্রাক থেকে পৃথিবীর প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ‘পেনিসিলিন’ তৈরি হয়েছিল।
5. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিয়োজক (Decomposers) হিসেবে অণুজীবদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিয়োজক হিসেবে ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের ভূমিকা পরিবেশে অপরিসীম:
1. পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: প্রতিদিন পরিবেশে প্রচুর উদ্ভিদ ও প্রাণী মারা যায় এবং বর্জ্য পদার্থ জমা হয়। ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক এই মৃতদেহ ও বর্জ্য পদার্থগুলিকে পচিয়ে দেয়, ফলে পরিবেশ দুর্গন্ধমুক্ত ও পরিষ্কার থাকে।
2. উপাদানের চক্রাকার আবর্তন: বিয়োজকরা জটিল জৈব পদার্থকে ভেঙে সরল খনিজ উপাদানে (যেমন কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস) পরিণত করে মাটিতে ও বাতাসে ফিরিয়ে দেয়। এই উপাদানগুলো উদ্ভিদ আবার মাটি থেকে গ্রহণ করে খাদ্য তৈরি করে। অণুজীবরা না থাকলে এই প্রাকৃতিক উপাদান চক্র চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত এবং পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হতো।
6. অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) কী? এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা কী কী সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেন?
উত্তর দেখো
উত্তর:
অ্যান্টিবায়োটিক: কিছু অণুজীব (প্রধানত ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া) থেকে পাওয়া যে রাসায়নিক পদার্থ অন্যান্য রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষতিকারক জীবাণুদের বৃদ্ধি আটকে দেয় বা তাদের সম্পূর্ণ মেরে ফেলে রোগ নিরাময় করে, তাকে অ্যান্টিবায়োটিক বলে।
ব্যবহারের সতর্কতা:
1. চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া কখনোই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।
2. চিকিৎসকের বলে দেওয়া সম্পূর্ণ কোর্স (নির্দিষ্ট সময়কাল) শেষ করা বাধ্যতামূলক, একটু সুস্থ বোধ করলেই ওষুধ খাওয়া মাঝপথে বন্ধ করা উচিত নয়।
3. সাধারণ সর্দি-জ্বর বা ডেঙ্গির মতো ভাইরাসঘটিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, তাই অকারণে এর ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে।
7. খাদ্য সংরক্ষণের (Food Preservation) তিনটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি উদাহরণসহ আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: খাদ্যকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করার 3 টি প্রধান পদ্ধতি হলো:
1. নুন ও শর্করার ব্যবহার (Salting & Sugaring): খাবারে প্রচুর নুন বা চিনি মিশিয়ে দিলে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় জীবাণুর কোশ থেকে জল বেরিয়ে গিয়ে জীবাণুটি মারা যায়। যেমন— মাছে নুন মাখিয়ে শুঁটকি মাছ তৈরি করা এবং জ্যাম-জেলিতে চিনির রস ব্যবহার করা।
2. ভিনিগার বা তেলের ব্যবহার: ভিনিগার (অ্যাসিটিক অ্যাসিড) বা তেল খাবারের চারদিকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে জীবাণুরা বাঁচতে বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। যেমন— বাড়িতে আচার সংরক্ষণ।
3. পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization): এই পদ্ধতিতে তরল খাদ্যকে (প্রধানত দুধ) নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বেশ কিছুক্ষণ গরম করে হঠাত ঠান্ডা করে নেওয়া হয়, ফলে ভেতরের সমস্ত ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়।
8. ম্যালেরিয়া (Malaria) ও ডেঙ্গি (Dengue) রোগের জন্য দায়ী জীবাণু এবং তাদের বাহকের নাম উল্লেখ করে এই রোগগুলি প্রতিরোধের দুটি উপায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
ম্যালেরিয়া: দায়ী জীবাণু হলো প্লাজমোডিয়াম (প্রোটোজোয়া) এবং এর বাহক হলো স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা।
ডেঙ্গি: দায়ী জীবাণু হলো ডেঙ্গি ভাইরাস (ফ্ল্যাভি ভাইরাস) এবং এর বাহক হলো স্ত্রী এডিস মশা।
প্রতিরোধের উপায়:
1. বাড়ির আশেপাশে, টায়ারে, ডাবের খোলায় বা ফুলের টবে জল জমতে দেওয়া যাবে না, কারণ জমে থাকা পরিষ্কার জলেই এরা ডিম পাড়ে।
2. রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং মশার উপদ্রব কমাতে মশা তাড়ানোর ধূপ বা রিপেল্যান্ট ব্যবহার করতে হবে।
[Image comparing Algae with Fungi, highlighting the presence of chlorophyll in Algae]
9. শৈবাল (Algae) এবং ছত্রাকের (Fungi) মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
| বৈশিষ্ট্য | শৈবাল (Algae) | ছত্রাক (Fungi) |
|---|---|---|
| ১. ক্লোরোফিল | এদের দেহে ক্লোরোফিল থাকে, তাই এরা সাধারণত সবুজ রঙের হয়। | এদের দেহে ক্লোরোফিল থাকে না, এরা বর্ণহীন বা অন্য রঙের হয়। |
| ২. পুষ্টি | নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে (স্বভোজী)। | নিজেদের খাদ্য তৈরি করতে পারে না (পরভোজী – মৃতজীবী বা পরজীবী)। |
| ৩. বাসস্থান | এরা প্রধানত জলজ পরিবেশে বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় জন্মায়। | এরা পচা কাঠ, গোবর, বা যেকোনো জৈব পদার্থের ওপর জন্মায়। |
10. টিকা বা ভ্যাকসিন (Vaccine) কীভাবে মানুষের শরীরে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ করে?
উত্তর দেখো
উত্তর: টিকা বা ভ্যাকসিন হলো মূলত কোনো নির্দিষ্ট রোগের মৃত বা অত্যন্ত দুর্বল করে দেওয়া জীবাণু।
কার্যপ্রণালী: যখন এই দুর্বল জীবাণুকে টিকা হিসেবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (শ্বেত রক্তকণিকা) ভাবে সত্যিকারের শক্তিশালী জীবাণু আক্রমণ করেছে। ফলে শরীর সেই দুর্বল জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়তে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে এবং এই জীবাণু চিনে রাখার স্মৃতি শরীরের ইমিউন সিস্টেমে সঞ্চিত হয়ে যায়।
ভবিষ্যতে যদি সত্যি সত্যিই ওই রোগের শক্তিশালী সজীব জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে, তখন শরীরের আগে থেকে তৈরি থাকা অ্যান্টিবডিগুলি মুহূর্তের মধ্যে সেই জীবাণুকে ধ্বংস করে দেয়, ফলে ওই রোগটি আর মানুষের শরীরে হতে পারে না।
11. মিথোজীবিতা (Symbiosis) কাকে বলে? লাইকেনের (Lichen) উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: যখন দুটি ভিন্ন প্রজাতির জীব একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সহাবস্থান করে এবং একে অপরের সাহায্যে বেঁচে থাকে, তখন তাদের সেই সম্পর্ককে মিথোজীবিতা বলে।
লাইকেনের উদাহরণ: লাইকেন হলো শৈবাল ও ছত্রাকের মিথোজীবিতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে ছত্রাকের সূত্রগুলি শৈবালকে শক্তভাবে আটকে রাখে এবং মাটি থেকে জল ও খনিজ লবণ শোষণ করে শৈবালকে দেয়। বিনিময়, শৈবাল তার ক্লোরোফিলের সাহায্যে সেই জল ও খনিজ লবণ ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে এবং সেই খাদ্যের কিছু অংশ ছত্রাককে প্রদান করে। ফলে দুই জীবই একে অপরের দ্বারা উপকৃত হয়ে বেঁচে থাকে।
12. মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী 3 টি বিভিন্ন প্রকারের অণুজীবের নাম এবং তাদের দ্বারা সৃষ্ট একটি করে রোগের নাম লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী 3 প্রকার অণুজীব এবং তাদের সৃষ্ট রোগগুলি হলো:
1. ব্যাকটেরিয়া: মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামক ব্যাকটেরিয়া মানুষের ফুসফুসে যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis) রোগ সৃষ্টি করে।
2. ভাইরাস: পোলিও ভাইরাস বা ডেঙ্গি ভাইরাস মানুষের শরীরে যথাক্রমে পোলিও এবং ডেঙ্গি জ্বর সৃষ্টি করে।
3. আদ্যপ্রাণী (Protozoa): প্লাজমোডিয়াম নামক আদ্যপ্রাণী মানুষের রক্তে সংক্রমিত হয়ে ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে। (অ্যামিবা থেকে আমাশয় রোগও হয়)।