অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় 9: অন্তক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3, 5
অধ্যায় 9: অন্তক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি
(8টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)
1. মানবদেহের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তক্ষরা গ্রন্থির (পিটুইটারি, থাইরয়েড এবং অগ্ন্যাশয়) অবস্থান এবং ক্ষরিত প্রধান হরমোনের নাম একটি ছকের সাহায্যে দেখাও।
উত্তর দেখো
| অন্তক্ষরা গ্রন্থির নাম | অবস্থান | ক্ষরিত প্রধান হরমোন |
|---|---|---|
| ১. পিটুইটারি গ্রন্থি | মস্তিষ্কের মূলদেশে অবস্থিত। | সোমাটোট্রপিক হরমোন (STH) বা গ্রোথ হরমোন। |
| ২. থাইরয়েড গ্রন্থি | গলায় শ্বাসনালীর দু’পাশে অবস্থিত। | থাইরক্সিন। |
| ৩. অগ্ন্যাশয় | পাকস্থলীর ঠিক নিচে অবস্থিত। | ইনসুলিন এবং গ্লুকাগন। |
2. হরমোন (Hormone) কাকে বলে? হরমোনের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: যে রাসায়নিক বার্তাবহ পদার্থ অন্তক্ষরা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়ে রক্ত বা লসিকার মাধ্যমে দূরবর্তী কোনো অঙ্গে পরিবাহিত হয় এবং সেই অঙ্গ বা কোশের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে হরমোন বলে।
বৈশিষ্ট্য:
1. রাসায়নিক বার্তাবহ (Chemical messenger): হরমোন শরীরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কোশে কোশে রাসায়নিক বার্তা পৌঁছে দেয় এবং কাজের সমন্বয় সাধন করে।
2. কাজের ধরণ: এটি সাধারণত যে গ্রন্থি থেকে তৈরি হয়, সেখান থেকে দূরে গিয়ে কাজ করে।
3. ধ্বংসপ্রাপ্তি: হরমোন নির্দিষ্ট কাজ শেষ হওয়ার পর ওই স্থানেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, অর্থাৎ এটি শরীরে জমা থাকে না।
[Image illustrating Insulin lowering blood sugar and Glucagon raising it]
3. ইনসুলিন (Insulin) এবং গ্লুকাগন (Glucagon) হরমোন দুটি কীভাবে একে অপরের বিপরীত কাজ করে তা বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত এই হরমোন দুটি মানুষের রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা সঠিক রাখতে একে অপরের ঠিক বিপরীত কাজ করে:
1. ইনসুলিনের কাজ: যখন আমরা খাবার খাই এবং রক্তে প্রচুর শর্করা বা গ্লুকোজ চলে আসে, তখন ইনসুলিন সেই অতিরিক্ত গ্লুকোজকে কোশে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং যকৃতে গ্লাইকোজেন হিসেবে সঞ্চয় করে রাখে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে স্বাভাবিক হয়।
2. গ্লুকাগনের কাজ: যখন আমরা অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকি বা পরিশ্রম করি, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়। এই সময় গ্লুকাগন যকৃতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেনকে ভেঙে আবার গ্লুকোজে পরিণত করে রক্তে মিশিয়ে দেয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে এবং স্বাভাবিক হয়।
4. অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির (Adrenal gland) অবস্থান লেখো। ভয় বা উত্তেজনার সময় অ্যাড্রেনালিন হরমোন কীভাবে আমাদের শরীরকে রক্ষা করে?
উত্তর দেখো
উত্তর: অবস্থান: অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি দুটি মানুষের মেরুদণ্ডের দু’পাশে থাকা দুটি বৃক্ক বা কিডনির ঠিক ওপরে টুপির মতো অবস্থান করে।
অ্যাড্রেনালিন হরমোনের কাজ: ভয়, রাগ, উত্তেজনা বা হঠাৎ বিপদের মতো আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এই হরমোন প্রচুর পরিমাণে রক্তে মিশে যায়। এটি দ্রুত হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, ফলে পেশিতে বেশি করে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছায়। একই সাথে শ্বাসকার্যের হার বেড়ে যায়। এর ফলে শরীর মুহূর্তের মধ্যে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন করে এবং সেই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য (লড়াই করা বা পালিয়ে যাওয়া) তাৎক্ষণিকভাবে শরীরকে প্রস্তুত করে।
5. বয়ঃসন্ধিকালে (Adolescence) কিশোর-কিশোরীদের শরীরে প্রধান কী কী বাহ্যিক বা শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: 10 থেকে 19 বছর বয়সের মধ্যে ছেলে-মেয়েদের শরীরে যে বাহ্যিক পরিবর্তনগুলি আসে, তা হলো:
1. উচ্চতা ও ওজনের দ্রুত বৃদ্ধি: এই সময়ে হাড় ও পেশির দ্রুত বৃদ্ধির কারণে ছেলে-মেয়েদের উচ্চতা হঠাৎ করে অনেকটা বেড়ে যায় এবং ওজনও বাড়ে।
2. শারীরিক গঠনের পরিবর্তন: ছেলেদের কাঁধ চওড়া হয় এবং পেশিবহুল দেহ তৈরি হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ফ্যাট সঞ্চিত হয়ে মেয়েলিসুলভ শারীরিক গঠন তৈরি হয়।
3. গলার স্বর: ছেলেদের গলার স্বর বা ভয়েস বক্স বড় হয়ে যাওয়ায় গলার আওয়াজ মোটা বা ভারী হয়ে যায়।
4. ত্বকের পরিবর্তন: ঘর্মগ্রন্থি ও সিবেসিয়াস গ্রন্থির কাজ বেড়ে যাওয়ায় মুখে ব্রন (Acne) দেখা দেয়। ছেলেদের মুখে গোঁফ-দাড়ি গজায়।
6. বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক বা আচরণের কী কী পরিবর্তন ঘটে এবং এই সময়ে পুষ্টির (Nutrition) বিশেষ প্রয়োজন হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর:
মানসিক পরিবর্তন: এই সময়ে ছেলে-মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠে। মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন বা মুড সুইং (Mood swing) দেখা যায়। কখনো খুব আনন্দ, আবার কখনো অকারণে রাগ বা দুঃখ হয়। বন্ধুবান্ধবদের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে এবং চেহারা বা পোশাক নিয়ে সচেতনতা খুব বেড়ে যায়।
পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা: বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। হাড় লম্বা ও শক্ত হওয়ার জন্য খাদ্যে প্রচুর ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। পেশি ও কলা গঠনের জন্য প্রোটিন এবং প্রচুর রক্ত তৈরির জন্য আয়রন বা লোহা সমৃদ্ধ সুষম খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলা উচিত।
7. বয়ঃসন্ধিকালে ত্বকের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কেন অত্যন্ত জরুরি? ব্রন (Acne) সমস্যার সমাধানে কী কী করা উচিত?
উত্তর দেখো
উত্তর: পরিচ্ছন্নতার কারণ: বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের প্রভাবে শরীরের ঘর্মগ্রন্থি এবং সিবেসিয়াস (তৈল) গ্রন্থিগুলি খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে শরীরে প্রচুর ঘাম হয় এবং ত্বক তেলতেলে থাকে। এই ঘাম ও তেলের কারণে খুব সহজেই ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আক্রমণ হতে পারে এবং দুর্গন্ধ বা চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত স্নান করা ও পরিষ্কার পোশাক পরা জরুরি।
ব্রন সমস্যার সমাধান: মুখে ব্রন হলে তা নখ দিয়ে খোঁটা একদম উচিত নয়, এতে দাগ হয়ে যায়। দিনে কয়েকবার পরিষ্কার জল দিয়ে মুখ ধোয়া উচিত এবং প্রচুর পরিমাণে জল পান করা উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
[Image depicting WHO’s 10 Life Skills like Self-awareness, Empathy, and Problem Solving]
8. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নির্দেশিত ‘জীবনকুশলতা’ (Life Skills) কী? যেকোনো তিনটি জীবনকুশলতার নাম ও তাদের গুরুত্ব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা, মানসিক চাপ এবং বাধাবিপত্তিকে সফল ও ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করার জন্য মানুষের মধ্যে যে 10 টি মানসিক ও সামাজিক দক্ষতার প্রয়োজন, তাদেরই জীবনকুশলতা বা Life Skills বলা হয়।
তিনটি জীবনকুশলতা ও গুরুত্ব:
1. আত্মসচেতনতা (Self-awareness): নিজের শক্তি, দুর্বলতা, ভালোলাগা এবং খারাপলাগা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা। এটি নিজেকে বুঝতে এবং সঠিক পেশা বা লক্ষ্য বাছতে সাহায্য করে।
2. সমমর্মিতা (Empathy): নিজেকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে অন্যের কষ্ট, অনুভূতি এবং অবস্থাকে গভীরভাবে বুঝতে পারার ক্ষমতা। এর ফলে অন্যের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয় এবং সম্পর্ক মজবুত হয়।
3. সমস্যা দূরীকরণ (Problem solving): জীবনে হঠাৎ আসা কোনো বড় বাধা বা সমস্যাকে ভয় না পেয়ে, মাথা ঠান্ডা রেখে তার সঠিক সমাধান খুঁজে বের করার দক্ষতা। এটি মানুষকে জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।