অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 10 ‘পরিবেশ ও তার সংরক্ষণ’ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 10: পরিবেশের সংকট ও সংরক্ষণ
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – 2 নম্বর: পর্ব 1)
1. জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) কাকে বলে? এর একটি গুরুত্ব লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: পৃথিবীতে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব এবং তাদের জিন ও বাস্তুতন্ত্রের যে বিপুল বৈচিত্র্য বা সমাহার দেখা যায়, তাকেই একত্রে জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভারসিটি বলে।
গুরুত্ব: পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মানুষের খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতে জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত অপরিহার্য।
2. বায়োডাইভারসিটি হটস্পট (Biodiversity Hotspot) বলতে কী বোঝো? ভারতের দুটি হটস্পটের নাম লেখো.
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: পৃথিবীর যে সমস্ত অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক এবং নানা প্রজাতির জীব (বিশেষ করে এন্ডেমিক প্রজাতি) বসবাস করে, কিন্তু মানুষের ক্রিয়াকলাপের ফলে তাদের অস্তিত্ব আজ চরম বিপন্ন, সেই অঞ্চলগুলোকে বায়োডাইভারসিটি হটস্পট বলা হয়।
উদাহরণ: ভারতবর্ষের দুটি হটস্পট হলো— 1. পূর্ব হিমালয় (Eastern Himalayas) এবং 2. পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও শ্রীলঙ্কা (Western Ghats and Sri Lanka)।
3. এন্ডেমিক প্রজাতি (Endemic species) কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: যে সমস্ত প্রজাতির উদ্ভিদ বা প্রাণী পৃথিবীর কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলেই কেবল প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় এবং অন্য কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে এদের দেখা মেলে না, তাদের এন্ডেমিক প্রজাতি বলা হয়।
উদাহরণ: ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতের লায়ন-টেইলড ম্যাকাক (Lion-tailed macaque) বা আসামের একশৃঙ্গ গণ্ডার।
4. গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) কী? এর প্রধান কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির প্রভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমশ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
প্রধান কারণ: মানুষের ক্রিয়াকলাপে (যেমন কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া, জঙ্গল ধ্বংস) বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2), মিথেন (CH4), CFC প্রভৃতি গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ অত্যাধিক বৃদ্ধি পাওয়াই এর প্রধান কারণ।
5. বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পরিবেশে কী কী ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে? (দুটি প্রভাব লেখো)
উত্তর দেখো
উত্তর: বিশ্ব উষ্ণায়নের দুটি প্রধান ক্ষতিকর প্রভাব হলো:
1. বরফ গলন ও জলস্তর বৃদ্ধি: পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল বরফের স্তূপ গলে যাচ্ছে, ফলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উপকূলবর্তী এলাকা তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
2. জলবায়ু পরিবর্তন: এর প্রভাবে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা বাড়ছে, যার ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি বা বন্যা, আবার কোথাও খরা দেখা দিচ্ছে।
6. অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid rain) কীভাবে সৃষ্টি হয়? এর একটি ক্ষতিকর প্রভাব লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সৃষ্টি: কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নির্গত সালফার ডাইঅক্সাইড (SO2) এবং নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO2) বৃষ্টির জলের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে যথাক্রমে সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে এবং বৃষ্টির সাথে মাটিতে ঝরে পড়ে। একেই অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
প্রভাব: এর ফলে জলাশয়ের জল আম্লিক হয়ে যায় এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যায়।
7. SPM (Suspended Particulate Matter) কী? মানবদেহে এর ক্ষতিকর প্রভাব কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: বাতাসে ভাসমান অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধূলিকণা, ধোঁয়া বা ছাইয়ের কণাকে (যাদের ব্যাস 10 মাইক্রোমিটারের কম) একত্রে SPM বলা হয়।
ক্ষতিকর প্রভাব: নিশ্বাসের সাথে এই সূক্ষ্ম কণাগুলি মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস এবং অন্যান্য মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত রোগ সৃষ্টি করে।
8. জীববৈচিত্র্য হ্রাসের বা বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান দুটি কারণ আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. বাসস্থান ধ্বংস: মানুষের ঘরবাড়ি ও কলকারখানা তৈরির জন্য নির্বিচারে জঙ্গল কেটে ফেলার ফলে বন্যপ্রাণীদের বাসস্থান ও খাদ্যের অভাব ঘটছে, যা জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণ।
2. চোরাশিকার: অর্থের লোভে চামড়া, শিং, দাঁত বা মাংসের জন্য চোরাশিকারিরা প্রতিনিয়ত বাঘ, গণ্ডার, হাতির মতো প্রাণীদের হত্যা করছে।
9. গঙ্গার শুশুক (Ganges River Dolphin) আজ বিপন্ন কেন? দুটি কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: গঙ্গার শুশুক বিপন্ন হওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো:
1. জল দূষণ: কলকারখানা ও কৃষিজমির রাসায়নিক বর্জ্য নদীর জলে মিশে গঙ্গা নদীর জলকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, যা শুশুকের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিকূল।
2. মাছ ধরার জাল: মৎস্যজীবীদের জালে প্রায়শই শুশুক আটকে যায় এবং দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। এছাড়া নদীর বুকে বাঁধ দেওয়ার ফলে এদের স্বাধীন চলাফেরা ব্যাহত হচ্ছে।
10. একশৃঙ্গ গণ্ডারের (One-horned Rhino) সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান দুটি কারণ কী কী?
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. চোরাশিকার: গণ্ডারের খড়্গ বা শিং (Horn)-এর অনেক দাম এবং তা দিয়ে ওষুধ তৈরি হয় বলে মানুষের ভুল ধারণা আছে। এই শিংয়ের লোভেই চোরাশিকারিরা এদের নির্বিচারে হত্যা করে।
2. বাসস্থান সংকোচন: বনজঙ্গল কেটে কৃষিজমি ও জনবসতি তৈরির ফলে এদের চারণভূমি ও প্রাকৃতিক বাসস্থান ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, যা এদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে।
11. ইন-সিটু (In-situ) সংরক্ষণ কাকে বলে? এর 2 টি উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: কোনো বিপন্ন জীবকে যখন তার নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে বা বাসস্থানেই আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়, তখন তাকে ইন-সিটু বা স্বস্থানিক সংরক্ষণ বলে।
উদাহরণ: ন্যাশনাল পার্ক (জাতীয় উদ্যান) এবং অভয়ারণ্য (Sanctuary)।
12. এক্স-সিটু (Ex-situ) সংরক্ষণ বলতে কী বোঝো? 2 টি উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: কোনো বিপন্ন জীবকে তার প্রাকৃতিক বাসস্থানের বাইরে অন্য কোনো কৃত্রিম ও সুরক্ষিত স্থানে নিয়ে গিয়ে বিশেষ যত্নের মাধ্যমে সংরক্ষণ করাকে এক্স-সিটু বা অস্থানিক সংরক্ষণ বলে।
উদাহরণ: চিড়িয়াখানা (Zoo) এবং বোটানিক্যাল গার্ডেন (Botanical Garden)।
13. ইন-সিটু ও এক্স-সিটু সংরক্ষণের মধ্যে প্রধান 2 টি পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. স্থান: ইন-সিটু সংরক্ষণে জীবকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশেই সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু এক্স-সিটু সংরক্ষণে জীবকে প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে কৃত্রিম জায়গায় রাখা হয়।
2. পরিসর: ইন-সিটু সংরক্ষণের এলাকা অনেক বড় ও বিস্তৃত হয় (যেমন- জঙ্গল)। অন্যদিকে, এক্স-সিটু সংরক্ষণের এলাকা তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট হয় (যেমন- চিড়িয়াখানা)।
14. সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (Royal Bengal Tiger) আজ বিপন্ন কেন? 2 টি কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: বাঘ বিপন্ন হওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো:
1. বাসস্থান ধ্বংস: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং বাঘেদের বাসস্থান জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে।
2. চোরাশিকার ও খাদ্যাভাব: চামড়া, দাঁত ও হাড়ের লোভে বাঘ শিকার করা হচ্ছে। এছাড়া জঙ্গলে হরিণ ও শূকরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাঘেদের তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে।
15. রেড পান্ডা (Red Panda) সংরক্ষণে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: এদের বাঁচানোর জন্য দার্জিলিং এবং সিকিমের পাহাড়ি জঙ্গলে এদের প্রাকৃতিক বাসস্থানেই সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে (যেমন- সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক)। এর পাশাপাশি, দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্কে কৃত্রিম প্রজননের (Captive breeding) মাধ্যমে এদের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
16. ন্যাশনাল পার্ক (National Park) এবং অভয়ারণ্যের (Sanctuary) মধ্যে একটি প্রধান পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যান সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ বা গাছ কাটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, অভয়ারণ্য রাজ্য সরকারের অধীনে থাকে এবং সেখানে অনুমতি নিয়ে সাধারণ মানুষ সামান্য কাঠ, মধু বা মোম সংগ্রহ করতে পারে।
17. JFM (Joint Forest Management) বলতে কী বোঝো? এর মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: সংজ্ঞা: ধ্বংস হয়ে যাওয়া বনজ সম্পদ পুনরুদ্ধার ও রক্ষার জন্য বনদপ্তর এবং বনের আশেপাশে থাকা স্থানীয় গ্রামবাসীদের মিলিত উদ্যোগকে JFM বা যৌথ বন ব্যবস্থাপনা বলে।
উদ্দেশ্য: জঙ্গলকে চোরাকারবারি ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং জঙ্গল থেকে পাওয়া লভ্যাংশের কিছু অংশ স্থানীয় মানুষের উপকারে ব্যবহার করা।
18. পশ্চিমবঙ্গের আড়াবাড়ি (Arabari) অরণ্যে JFM প্রকল্পের মাধ্যমে কীভাবে বনভূমি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আড়াবাড়িতে শাল জঙ্গল সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে বসেছিল। তখন বনদপ্তরের আধিকারিক এ. কে. ব্যানার্জির উদ্যোগে স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে বন সুরক্ষা কমিটি তৈরি করা হয়। গ্রামবাসীরা জঙ্গল পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নেন এবং বিনিময়ে তারা জ্বালানি কাঠ, কাজু ও শালপাতা সংগ্রহের অধিকার পান। এভাবেই শাল জঙ্গলটি রক্ষা পেয়েছিল।
19. PBR (People’s Biodiversity Register) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: PBR বা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য পঞ্জি হলো এমন একটি প্রামাণ্য সরকারি নথি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার স্থানীয় মানুষ, পঞ্চায়েত ও পুরসভার সহায়তায় সেখানকার সমস্ত উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব এবং তাদের ব্যবহার সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়।
20. PBR-এর 2 টি গুরুত্ব বা উদ্দেশ্য উল্লেখ করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
1. সম্পদ চিহ্নিতকরণ: কোনো এলাকায় কী কী দেশীয় ও ঔষধযুক্ত গাছপালা বা প্রাণী আছে, তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়।
2. ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সংরক্ষণ: স্থানীয় আদিবাসী বা সাধারণ মানুষদের জীবজন্তু ও গাছপালা সম্পর্কে যে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান রয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।