অষ্টম শ্রেণী: বাংলা, অধ্যায় – 3: চন্দ্রগুপ্ত (নাটক) – দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 3: চন্দ্রগুপ্ত
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের উক্তিগুলির উৎস, প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো:
1. “সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!” – বক্তা কে? তাঁর কেন দেশটিকে বিচিত্র মনে হয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ঐতিহাসিক নাট্যাংশ ‘চন্দ্রগুপ্ত’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার (আলেকজান্ডার) তাঁর সেনাপতি সেলুকাসের সাথে ভারতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করার সময় এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার বিশ্বজয়ে বেরিয়ে ভারতে এসে এখানকার অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। দিনে প্রচণ্ড রোদে পুড়ে যাওয়া আকাশ রাতে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় ভিজে যায়। শুধু প্রকৃতি নয়, এখানকার রাজাদের শৌর্যবীর্য এবং আত্মমর্যাদাবোধও তাঁকে চমকে দিয়েছিল। তাই মুগ্ধতা ও বিস্ময় থেকেই তিনি ভারতবর্ষকে ‘বিচিত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন।
2. “পুরুরাজ বন্দি হয়েও আমার কাছে রাজার প্রতি রাজার আচরণ দাবি করেছিল।” – উক্তিটির মধ্য দিয়ে বক্তার চরিত্রের কোন্ দিকটি প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে সংকলিত।
প্রসঙ্গ: ভারতীয় রাজাদের বীরত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের কথা সেনাপতি সেলুকাসকে বলার সময় সম্রাট সেকেন্দার এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: ভারতীয় বীর পুরুরাজ যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দি হয়েও গ্রিক সম্রাটের কাছে মাথা নত করেননি, বরং এক রাজার মতো সম্মান দাবি করেছিলেন। এই উক্তির মধ্য দিয়ে সেকেন্দারের চরিত্রের ঔদার্য, মহানুভবতা এবং বীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি শুধু নিজের জয় নিয়ে অহংকার করেননি, বরং এক পরাজিত শত্রুর বীরত্বকেও প্রাণখুলে সম্মান জানিয়েছেন।
3. “সম্রাট! ইনি এক ভারতীয় যুবক।” – বক্তা কে? যুবকটিকে কেন সম্রাটের সামনে আনা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: উক্তিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: গ্রিক সেনাপতি আন্তিগোনস মগধের রাজপুত্র তরুণ চন্দ্রগুপ্তকে বন্দি করে সম্রাট সেকেন্দারের সামনে হাজির করার সময় এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: তরুণ চন্দ্রগুপ্ত বিনা অনুমতিতে গ্রিক শিবিরে প্রবেশ করে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে গ্রিকদের সামরিক কৌশল ও যুদ্ধবিদ্যা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এই অবস্থা দেখে গ্রিক সেনাপতি আন্তিগোনসের সন্দেহ হয় যে যুবকটি বিপক্ষ দলের কোনো গুপ্তচর। তাই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিচার করার জন্যই তিনি যুবকটিকে বন্দি করে সম্রাটের সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
4. “আমি গুপ্তচর নই।” – বক্তা কে? তিনি গুপ্তচর না হলে কী উদ্দেশ্যে গ্রিক শিবিরে প্রবেশ করেছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: আন্তিগোনসের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগের উত্তরে তরুণ চন্দ্রগুপ্ত নির্ভীকভাবে এ কথা বলেছিলেন।
তাৎপর্য: চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র। তাঁর সৎভাই নন্দরাজ অন্যায়ভাবে সিংহাসন দখল করে তাঁকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে নয়, বরং গ্রিকদের উন্নত সামরিক কৌশল ও যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করার উদ্দেশ্যেই গ্রিক শিবিরে প্রবেশ করেছিলেন, যাতে সেই কৌশল প্রয়োগ করে তিনি নিজের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারেন।
5. “আমি গ্রিকদের রণকৌশল শিক্ষা করছিলাম।” – কে, কার কাছ থেকে এই রণকৌশল শিখছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: সম্রাট সেকেন্দারের জেরার মুখে নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার সময় চন্দ্রগুপ্ত এ কথা বলেছিলেন।
তাৎপর্য: মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক সম্রাটের প্রধান সেনাপতি সেলুকাসের কাছ থেকে গ্রিকদের রণকৌশল শিখছিলেন। সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তের সামরিক প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের শিষ্যের মতো গ্রহণ করেছিলেন এবং অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে অস্ত্রপরীক্ষা ও যুদ্ধবিদ্যা শেখাতেন।
6. “আমার সৎভাই নন্দ সিংহাসন অধিকার করে আমায় নির্বাসিত করেছে।” – এই ঘটনা বক্তার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ঐতিহাসিক নাট্যাংশ ‘চন্দ্রগুপ্ত’ থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ: নিজের পরিচয় এবং গ্রিক রণকৌশল শেখার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চন্দ্রগুপ্ত সম্রাট সেকেন্দারকে এ কথা বলেছিলেন।
তাৎপর্য: সৎভাই নন্দরাজ কর্তৃক অন্যায়ভাবে রাজ্য থেকে নির্বাসিত হওয়ার ঘটনাটি চন্দ্রগুপ্তের মনে তীব্র ক্ষোভ ও জেদের সৃষ্টি করেছিল। এই অপমানজনক ঘটনা তাঁকে হতাশ না করে বরং নিজের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছিল। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই তিনি বিপদের ঝুঁকি নিয়ে গ্রিক শিবিরে সামরিক কৌশল শিখতে এসেছিলেন।
7. “কিন্তু এই যুবক বিনা অনুমতিতে আমার শিবিরে প্রবেশ করেছে।” – এর উত্তরে যুবক কী যুক্তি দিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে সংগৃহীত।
প্রসঙ্গ: সম্রাট সেকেন্দারের এই অভিযোগের উত্তরে বন্দি চন্দ্রগুপ্ত অসীম নির্ভীকতার সাথে এই যুক্তিটি দিয়েছিলেন।
তাৎপর্য: সেকেন্দারের অভিযোগের উত্তরে চন্দ্রগুপ্ত অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্ভীক ভাষায় বলেছিলেন যে, সম্রাট সেকেন্দার যেমন বিনানুমতিতে শুধুমাত্র তরোয়ালের জোরে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে অধিকার ফলিয়েছেন, ঠিক তেমনি চন্দ্রগুপ্তও সেকেন্দারের শিবিরে প্রবেশ করেছেন। অর্থাৎ, এই ভারতবর্ষে সম্রাটের যা অধিকার, তাঁর শিবিরে চন্দ্রগুপ্তেরও ঠিক একই অধিকার রয়েছে।
8. “একি সেলুকাস, তোমার তরবারি কোষমুক্ত কেন?” – সেলুকাস কেন তরবারি কোষমুক্ত করেছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: সেলুকাসকে খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত সম্রাট সেকেন্দার তাঁকে এই প্রশ্ন করেছিলেন।
তাৎপর্য: চন্দ্রগুপ্তের স্পষ্ট ও নির্ভীক উত্তরে গ্রিক সেনাপতি আন্তিগোনস অপমানিত বোধ করেন এবং পেছন থেকে চন্দ্রগুপ্তকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। নিরস্ত্র ও বন্দি যুবককে কাপুরুষের মতো পেছন থেকে আক্রমণ হতে দেখে সেলুকাস স্থির থাকতে পারেননি। তিনি নিজের শিষ্য চন্দ্রগুপ্তকে রক্ষা করার জন্যই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তরবারি কোষমুক্ত করেছিলেন।
9. “সম্রাট, এই যুবক আমার শিষ্য।” – বক্তা কে? তাঁর এমন বলার কারণ কী?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: সেলুকাস সম্রাট সেকেন্দারের কাছে চন্দ্রগুপ্তের পরিচয় দিতে গিয়ে এ কথা বলেছিলেন।
তাৎপর্য: সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তের সামরিক প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে যুদ্ধবিদ্যা শেখাতেন। যখন আন্তিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তচর হিসেবে প্রমাণ করতে চাইলেন এবং তাঁকে আক্রমণ করতে গেলেন, তখন সেলুকাস নিজের শিষ্যের পক্ষ নেন। চন্দ্রগুপ্ত যে কোনো সাধারণ গুপ্তচর নন, বরং তাঁর কাছে সামরিক কৌশল শিখতে আসা একজন যোগ্য শিষ্য— এই সত্যটি সম্রাটের কাছে পরিষ্কার করার জন্যই তিনি এমন কথা বলেছিলেন।
10. “যাও বীর, মুক্ত তুমি।” – সেকেন্দার কেন চন্দ্রগুপ্তকে মুক্তি দিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে সংগৃহীত।
প্রসঙ্গ: সমস্ত বিচার পর্ব শেষে সম্রাট সেকেন্দার তরুণ চন্দ্রগুপ্তকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়ার সময় এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও চন্দ্রগুপ্ত একটুও ভয় পাননি। তিনি অত্যন্ত নির্ভীকভাবে সত্য কথা বলেছিলেন এবং নিজের রাজ্য উদ্ধারের অদম্য জেদ প্রকাশ করেছিলেন। সেকেন্দার একজন সত্যিকারের বীর ছিলেন, তাই তিনি চন্দ্রগুপ্তের এই অসীম সাহসিকতা, স্পষ্টবাদিতা এবং মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসায় গভীরভাবে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কোনো শাস্তি না দিয়েই মুক্তি দিয়েছিলেন।
11. “পিছন থেকে আক্রমণ করা কি গ্রিক বীরের ধর্ম?” – বক্তা কে? কোন্ পরিস্থিতিতে তিনি এমন কথা বলেছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: গ্রিক সেনাপতি আন্তিগোনসের কাপুরুষোচিত আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চন্দ্রগুপ্ত (বক্তা) এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: চন্দ্রগুপ্ত যখন নির্ভীকভাবে নিজের অধিকারের কথা বলছিলেন, তখন আন্তিগোনস তা সহ্য করতে না পেরে নিরস্ত্র চন্দ্রগুপ্তকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। একজন বীর হয়েও আন্তিগোনসের এই কাপুরুষের মতো আচরণ চন্দ্রগুপ্তের কাছে অত্যন্ত লজ্জাজনক মনে হয়েছিল। তাই তিনি তীব্র ব্যঙ্গের সাথে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, এমন কাজ কোনো প্রকৃত বীরের ধর্ম হতে পারে না।
12. নাট্যাংশের শেষে চন্দ্রগুপ্তের সেকেন্দারকে ‘সম্রাট’ সম্বোধন করার তাৎপর্য কী?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য ঘটনাটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশের একেবারে শেষ অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: সেকেন্দারের কাছ থেকে বিনা শাস্তিতে মুক্তি পাওয়ার পর চন্দ্রগুপ্ত এই সম্মানসূচক সম্বোধনটি করেছিলেন।
তাৎপর্য: সেকেন্দার একজন দিগ্বিজয়ী বিদেশি শাসক হলেও, তিনি চন্দ্রগুপ্তের বীরত্ব ও সাহসিকতার মর্যাদা দিয়েছিলেন। একজন বন্দিকে শাস্তি না দিয়ে তাঁর নির্ভীকতাকে সম্মান জানানো সেকেন্দারের চরিত্রের বিশাল মহানুভবতারই পরিচয়। সেকেন্দারের এই ঔদার্য এবং ন্যায়বিচারে মুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ হয়েই চন্দ্রগুপ্ত তাঁকে ‘সম্রাট’ বলে সম্বোধন করে তাঁর প্রতি নিজের আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।