অষ্টম শ্রেণী: বাংলা, অধ্যায় – 1 বোঝাপড়া – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 1: বোঝাপড়া
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3) – পর্ব 1
নিচের পঙ্ক্তিগুলির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো:
1. “মনেরে আজ কহ যে, / ভালো মন্দ যাহাই আসুক, / সত্যেরে লও সহজে।” – কবি কোন সত্যকে সহজে নিতে বলেছেন এবং কেন?
উত্তর দেখো
উৎস: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত হয়েছে।
তাৎপর্য: এই পৃথিবীতে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব সবসময় মেলে না। কেউ আমাদের ভালোবাসে, আবার কেউ বিনা কারণে প্রতারণা করে। জীবন কখনো মসৃণ নয়, এখানে আলো-অন্ধকার এবং লাভ-ক্ষতি পাশাপাশি চলে। অপ্রত্যাশিত দুঃখ বা বঞ্চনায় হতাশ না হয়ে, জীবনের এই রূঢ় কিন্তু চিরন্তন বাস্তব সত্যকে নির্দ্বিধায় বা হাসিমুখে মেনে নেওয়ার কথাই কবি এখানে বলেছেন। কারণ, এই কঠিন সত্যকে মেনে নিতে পারলেই জীবনে প্রকৃত শান্তি ও স্বস্তি নেমে আসে।
2. “শঙ্কা যেথায় করে না কেউ / সেইখানে হয় জাহাজ-ডুবি।” – উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গ ও অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনমুখী কবিতা ‘বোঝাপড়া’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্নিহিত অর্থ: মানুষ সাধারণত তার জানা বিপদগুলি সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড়ো আঘাত বা বিপর্যয়গুলি আসে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে। যে চরম বিশ্বাসযোগ্য মানুষ বা নিরাপদ পরিস্থিতির দিক থেকে মানুষ কোনো বিপদের আশঙ্কাই করে না, অনেক সময় সেখান থেকেই চরম বিশ্বাসঘাতকতা বা বিপর্যয় নেমে আসে। এই আকস্মিক ও অভাবনীয় বিপর্যয়কেই কবি ‘জাহাজ-ডুবি’-র সাথে তুলনা করেছেন।
3. “ডুবতে হয় তো ভাসতে পারো / সেইটে সবার চেয়ে শ্রেয়।” – কেন ভাসতে পারাকে কবি ‘শ্রেয়’ বলেছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: পঙ্ক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা: অপ্রত্যাশিত বিপদে বা প্রিয়জনের আঘাতে মানুষ অনেক সময় এতটাই ভেঙে পড়ে যে সে জীবনের হাল ছেড়ে দেয় এবং হতাশার সাগরে ডুবে যায়। কবির মতে, এইভাবে আত্মসমর্পণ করে নিজেকে শেষ করে দেওয়া কাপুরুষতা। চরম প্রতিকূলতা বা বিপর্যয়ের মাঝেও মনের জোর না হারিয়ে, বাস্তবকে মেনে নিয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই করা এবং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাকেই (ভাসতে পারাকেই) কবি এখানে ‘শ্রেয়’ বা শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছেন।
4. “দোহাই তবে এ কার্যটা / যত শীঘ্র পারো সারো।” – কোন কার্যটার কথা বলা হয়েছে? কবি কেন তা শীঘ্র সারতে বলেছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত কবিতা ‘বোঝাপড়া’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
ব্যাখ্যা: এখানে ‘কার্য’ বলতে অপ্রত্যাশিত আঘাতে বা দুঃখে বুক ভাসিয়ে কান্নাকাটি করে মনের ভার হালকা করার কথা বলা হয়েছে। মানুষ আবেগপ্রবণ, তাই চরম দুঃখে তার কান্না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কান্না বা হতাশায় দিনের পর দিন ডুবে থাকা উচিত নয়। কারণ, সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তাই দ্রুত কেঁদে মনের ভার মুক্ত করে বাস্তবকে মেনে নিয়ে নতুন করে পথ চলা শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই কারণেই কবি কার্যটি শীঘ্র সারতে বলেছেন।
5. “বিধির সাথে বিবাদ করে / নিজের পায়ে কুড়ুল মারো।” – মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বোঝাপড়া’ কবিতার অংশ বিশেষ।
তাৎপর্য: জীবনে কোনো দুঃখ বা বিপর্যয় এলে দুর্বল চিত্তের মানুষ অনেক সময় ভাগ্যের বা ঈশ্বরের (বিধির) দোহাই দিয়ে অকারণে হা-হুতাশ করে এবং জীবনযুদ্ধে হার মেনে বসে থাকে। এর ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি সামলানোর ও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হারায় এবং নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে। নিজের বোকামির জন্য নিজের এই চরম ক্ষতি করাকেই কবি ‘নিজের পায়ে কুড়ুল মারা’ প্রবাদটির মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন।
6. “তাহার পরে আঁধার ঘরে / প্রদীপখানি জ্বালিয়ে তোলো।” – ‘আঁধার ঘর’ ও ‘প্রদীপ জ্বালানো’ রূপক দুটি বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উৎস: পঙ্ক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
রূপকের ব্যাখ্যা: ‘আঁধার ঘর’ বলতে এখানে অপ্রত্যাশিত আঘাত, চরম ব্যর্থতা বা গভীর দুঃখে নিমজ্জিত মানুষের বিষণ্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মনকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘প্রদীপ জ্বালানো’ হলো সেই হতাশার অন্ধকার দূর করে মনের ভেতর নতুন করে আশা, আত্মবিশ্বাস ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করা। অর্থাৎ, দুঃখের সাময়িক কান্না শেষ করে মনের সাথে বোঝাপড়া করে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করার কথাই কবি এখানে রূপকের আড়ালে বুঝিয়েছেন।
7. “তোমার মাপে হয়নি সবাই, / তুমিও হওনি সবার মাপে” – এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত হয়েছে।
তাৎপর্য: মানুষ স্বভাবতই প্রত্যাশা করে যে অন্যেরা ঠিক তার মনের মতো আচরণ করবে এবং তা না হলেই সে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের স্বভাব, চিন্তাধারা ও চাওয়া-পাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা। পৃথিবীর কেউ অন্যের ছাঁচে গড়া নয়। তাই অন্যের ওপর নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দেওয়া বা অন্যের কাছে নিখুঁত কিছু প্রত্যাশা করা একধরনের স্বার্থপরতা। মানবচরিত্রের এই চরম বাস্তবটাকেই কবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন।
8. “বিশ্বজগত চলবে না তো / তোমার সঙ্গে আড়ি করে।” – উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গ ও অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনমুখী কবিতা ‘বোঝাপড়া’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্নিহিত অর্থ: মানুষের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব সবসময় মেলে না। অনেক সময় প্রিয়জনের সাথে বিবাদ বা অপ্রত্যাশিত বঞ্চনায় মানুষ গভীর দুঃখে নিমজ্জিত হয়। সে মনে করে তার জীবন বুঝি ওখানেই শেষ। কিন্তু এই বিশাল বিশ্বজগতের নিজস্ব এক চিরন্তন নিয়ম ও গতি রয়েছে। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখ, হতাশা, অভিমান বা আড়ির কারণে এই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম বা চলা কখনোই থেমে থাকে না, সে তার আপন ছন্দেই সামনের দিকে এগিয়ে চলে।
9. “কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা / সিকি পয়সা ধারে না যে” – উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে সমাজের কোন বৈচিত্র্যের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: পঙ্ক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে।
তাৎপর্য: মানবসমাজ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, এখানে সব মানুষ সমান নয়। সমাজের একদল মানুষ হয়তো ভালোবেসে অন্যের জন্য নিজের সর্বস্ব নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করে (বিকিয়ে আছে), আবার অন্যদল এতটাই স্বার্থপর বা হিসেবি যে তারা অন্যের সামান্যতম উপকারেও আসে না বা কাউকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না (সিকি পয়সা ধারে না)। সমাজে স্বার্থপরতা ও নিঃস্বার্থপরতার এই চরম বৈপরীত্যকেই কবি আলোচ্য অংশে তুলে ধরেছেন।
10. “কতকটা যে স্বভাব তাদের, / কতকটা বা তোমারও ভাই” – কাদের স্বভাবের কথা বলা হয়েছে? লাইনটির তাৎপর্য কী?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত কবিতা ‘বোঝাপড়া’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
তাৎপর্য: এখানে সমাজের সেইসব স্বার্থপর মানুষের স্বভাবের কথা বলা হয়েছে, যারা আমাদের ভালোবাসে না বা আমাদের সাথে ছলনা করে। এর তাৎপর্য হলো, পৃথিবীতে কেউ আমাদের ঠকায়, আবার আমরাও কখনো কখনো পরিস্থিতি অনুযায়ী বা নিজেদের অজান্তেই অন্যদের ফাঁকি দিই— এটিই মানবচরিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। তাই অন্যের কাছ থেকে আঘাত পেলে শুধু অন্যের দোষ না দেখে নিজের ভুলটাও স্বীকার করে নেওয়া উচিত।
11. “অকারণে হা হা করে / আকাশটাতে ফাটল ধরানো” – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? এমনটা করা উচিত নয় কেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বোঝাপড়া’ কবিতার অংশ বিশেষ।
ব্যাখ্যা: জীবনে অপ্রত্যাশিত বিপদে বা সামান্য ক্ষতিতে অধৈর্য হয়ে প্রবল চিৎকার বা হাহাকার করে চারপাশের পরিবেশকে অশান্ত করে তোলাকেই এখানে বোঝানো হয়েছে। কবি মনে করেন, এইভাবে বৃথা আক্ষেপ করে আকাশ-বাতাস কাঁপানো সম্পূর্ণ অর্থহীন। এতে মনের শান্তি তো আসেই না, উলটে নিজের ও চারপাশের মানুষের অকারণ কষ্ট বাড়ে। তাই শান্ত হয়ে বাস্তবকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
12. “মনের সঙ্গে একরকমে / করে নে ভাই বোঝাপড়া।” – মনের সঙ্গে কী রূপ বোঝাপড়া করার কথা বলা হয়েছে এবং কেন?
উত্তর দেখো
উৎস: পঙ্ক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
ব্যাখ্যা: জীবনে ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ বা লাভ-ক্ষতি যাই আসুক না কেন, তাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াই হলো মনের সাথে বোঝাপড়া। অকারণে হাহাকার না করে বা ভাগ্যের দোষ না দিয়ে এই রূঢ় বাস্তবকে হাসিমুখে ও দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কারণ, বাস্তবকে মেনে নিয়ে নিজের মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটাতে পারলেই মানুষ জীবনে প্রকৃত শান্তি এবং নতুন করে বাঁচার প্রেরণা খুঁজে পায়।