অষ্টম শ্রেণী: বাংলা, অধ্যায় – 1 বোঝাপড়া – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 1: বোঝাপড়া
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতার মূল বিষয়বস্তু বা মর্মার্থ নিজের ভাষায় লেখো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বোঝাপড়া’ কবিতায় মানবজীবনের এক রূঢ় অথচ চিরন্তন সত্যকে অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। এই বিশাল পৃথিবীতে সব মানুষ সমান নয়। কেউ আমাদের ভালোবাসে, কেউ বা অকারণে আমাদের সাথে স্বার্থপরের মতো আচরণ করে। মানুষের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব কখনোই পুরোপুরি মেলে না।

কবির মতে, মানবজীবন কখনোই মসৃণ নয়, এখানে সুখের পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত আঘাত, দুঃখ এবং বঞ্চনা আসতেই পারে। জীবনে এমন কিছু অপ্রত্যাশিত বিপদ আসে যা মানুষের পাঁজর ভেঙে দেওয়ার মতো যন্ত্রণা দেয়। কিন্তু সেইসব বিপদে বা প্রিয়জনের প্রতারণায় হতাশ হয়ে ভেঙে পড়া, ভাগ্যের দোষ দেওয়া বা হাহাকার করা সম্পূর্ণ অর্থহীন। কারণ, এই বিশ্বজগত কারও ব্যক্তিগত দুঃখে থেমে থাকে না, সে তার নিজের ছন্দেই চলে।

তাই কবির পরম উপদেশ হলো— অন্যের সাথে দ্বন্দ্ব ও অহংকার ভুলে নিজের মনের সাথে সঠিক বোঝাপড়া করতে হবে। জীবনের এই কঠিন বাস্তবকে (সত্যকে) হাসিমুখে মেনে নিতে হবে। কান্নাকাটি করে মনের ভার হালকা করার পর, দুঃখের অন্ধকার ঘরে নতুন আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাঝেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা ও শান্তি লুকিয়ে আছে।

2. ‘বোঝাপড়া’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ একটি সার্থক নামকরণ রচনার মূল ভাব বা বিষয়বস্তুর দিকে ইঙ্গিত দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত আলোচ্য কবিতাটির ‘বোঝাপড়া’ নামকরণটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ যথাযথ ও সার্থক হয়েছে।

‘বোঝাপড়া’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো আপস করা, মেনে নেওয়া বা মীমাংসা করা। আলোচ্য কবিতায় কবি মানুষের অন্তরের সাথে বাইরের রূঢ় বাস্তবের আপস বা বোঝাপড়ার কথাই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। মানুষের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব সবসময় মেলে না। অপ্রত্যাশিত দুঃখ, প্রিয়জনের প্রতারণা বা চরম বিপদে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন হতাশায় ডুবে না গিয়ে নিজের মনের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়।

কবি স্পষ্ট করেছেন যে, এই পৃথিবীতে কেউ নিখুঁত নয়, তাই অন্যের কাছে নিখুঁত কিছু প্রত্যাশা করা বোকামি। ভাগ্যের দোহাই না দিয়ে বা অকারণে আকাশ-বাতাস না কাঁপিয়ে, নিজের মনের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই রূঢ় বাস্তবকে মেনে নেওয়াই হলো জীবনের আসল ধর্ম। যেহেতু সমগ্র কবিতাটির মূল সুর এবং কবির জীবনদর্শন এই ‘মনের সাথে আপস’ বা ‘বোঝাপড়া’-কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই কবিতাটির নামকরণ সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে।

3. “মনের সঙ্গে একরকমে / করে নে ভাই বোঝাপড়া।” – মনের সঙ্গে বোঝাপড়া বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কবি কেন এই বোঝাপড়ার ওপর এত জোর দিয়েছেন? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

বোঝাপড়ার অর্থ: ‘মনের সঙ্গে বোঝাপড়া’ বলতে জীবনের ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং লাভ-ক্ষতিকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নির্দ্বিধায় ও হাসিমুখে মেনে নেওয়াকে বোঝানো হয়েছে। অন্যের কাছে প্রত্যাশা না রেখে এবং নিজের অহংকার ত্যাগ করে, পৃথিবীর কঠিন বাস্তব পরিস্থিতিকে সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতিকেই কবি মনের সাথে বোঝাপড়া বলেছেন।

বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তা: কবি এই বোঝাপড়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তার প্রধান কারণ হলো— মানবজীবন কখনোই বাধাহীন নয়। এখানে যেমন সুখ আছে, তেমনি আছে অপ্রত্যাশিত দুঃখ ও প্রতারণা। বিপদে পড়ে শুধু শুধু ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কাঁদলে বা হতাশার সাগরে ডুবে গেলে কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না, উলটে নিজেরই ক্ষতি হয়।

তাছাড়া, মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখে এই বিশ্বজগত কখনোই থেমে থাকে না। তাই মনের ভেতরকার মিথ্যা অহংকার, ক্ষোভ ও অভিমান দূর করে, বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে যদি মনের সাথে আপস করা যায়, তবেই মানুষ হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারে। মনের সাথে এই সঠিক বোঝাপড়াই পারে অন্ধকার ঘরে নতুন করে আশার প্রদীপ জ্বালাতে এবং মানুষকে নতুন উদ্যমে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগাতে।

4. “সেইটে সবার চেয়ে শ্রেয়।” – কোন্টিকে সবার চেয়ে শ্রেয় বলা হয়েছে? জীবনে চলার পথে এই ‘শ্রেয়’ পথটি কবি কেন বেছে নিতে বলেছেন তা ‘বোঝাপড়া’ কবিতা অবলম্বনে লেখো। (1+4=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

শ্রেয় পথ: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতায় অপ্রত্যাশিত চরম বিপদে বা দুঃখের সাগরে ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতি এলেও, হাল না ছেড়ে দিয়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে ভেসে থাকাকেই ‘সবার চেয়ে শ্রেয়’ বা শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।

শ্রেয় পথ বেছে নেওয়ার কারণ: মানুষের জীবনে সুখের পাশাপাশি আচমকা অনেক বড়ো বিপর্যয় বা চরম বিশ্বাসঘাতকতা নেমে আসতে পারে। তখন মনে হয় জীবনের বুঝি আর কোনো অর্থ নেই। কিন্তু কবির মতে, সেই বিপদের সামনে আত্মসমর্পণ করে আলগোছে বুক ভাসিয়ে কাঁদা অত্যন্ত কাপুরুষতার পরিচয়। ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হা-হুতাশ করলে বা বিপদের কাছে হার মেনে নিলে মানুষের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

তার বদলে, মানুষ যদি নিজের মনের জোর এবং আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে সেই বিপদের মোকাবিলা করে, তবে সে ধ্বংসের হাত থেকে নিজেকে অনেকটাই রক্ষা করতে পারে। জীবনে বেঁচে থাকার এই অদম্য লড়াই এবং সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। এই কারণেই কবি হাল ছেড়ে দিয়ে ডুবে যাওয়ার পরিবর্তে, লড়াই করে ভেসে থাকার পথটিকেই বেছে নিতে বলেছেন।

5. “অনেক ঝঞ্ঝা কাটিয়ে বুঝি / এলে সুখের বন্দরেতে / জলের তলে পাহাড় ছিল, / লাগল বুকের অন্দরেতে।” – উদ্ধৃতাংশটির অন্তর্নিহিত অর্থ ও কবির জীবনদর্শন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

অন্তর্নিহিত অর্থ: আলোচ্য অংশে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবজীবনের এক অত্যন্ত নির্মম অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেছেন। মানুষ তার জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি, প্রতিকূলতা এবং সংগ্রাম (ঝঞ্ঝা) পার করে যখন একটি শান্তিময়, স্থিতিশীল ও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় (সুখের বন্দরে) এসে পৌঁছায়, তখন সে ভাবে তার জীবনের সব দুঃখের বুঝি অবসান ঘটল। কিন্তু ঠিক সেই পরম নিশ্চিন্তের মুহূর্তেই অনেক সময় এমন কিছু অপ্রত্যাশিত বিপদ (জলের তলার পাহাড়) এসে হাজির হয়, যা তার সাজানো জীবনকে তছনছ করে দেয় এবং বুকের গভীরে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করে।

জীবনদর্শন: কবির এই মন্তব্যের আড়ালে যে গভীর জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে, তা হলো— মানবজীবন কখনোই সম্পূর্ণ নিরাপদ বা নিষ্কণ্টক নয়। আমরা যখন সবচেয়ে বেশি নিশ্চিন্ত থাকি বা যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করি, চরম আঘাত অনেক সময় সেখান থেকেই আসে। সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা পাহাড় যেমন বাইরে থেকে দেখা যায় না, তেমনি জীবনের ভবিষ্যৎ বিপদগুলোও আমাদের অজানা থাকে। তাই ক্ষণিকের সুখে আত্মহারা না হয়ে বা হঠাৎ আসা বিপদে দিশেহারা না হয়ে, জীবনের এই চরম অনিশ্চয়তাকে (সত্যকে) অত্যন্ত সহজভাবে ও ধীর স্থির মস্তিষ্কে মেনে নেওয়াই হলো আসল জীবনদর্শন।

6. ‘বোঝাপড়া’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনদর্শনের যে বাস্তব দিকটি তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক বলে তুমি মনে করো? যুক্তিসহ আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

‘বোঝাপড়া’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবমনের যে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে উত্তরণের যে পথ দেখিয়েছেন, তা আজকের এই চূড়ান্ত প্রতিযোগিতামূলক ও জটিল সমাজের প্রেক্ষাপটে আক্ষরিক অর্থেই একশো শতাংশ প্রাসঙ্গিক।

বর্তমান সমাজে মানুষের চাওয়া-পাওয়া এবং প্রত্যাশা অনেক বেশি। সবাই নিজের লাভ ও স্বার্থ নিয়ে মগ্ন, তাই এখানে প্রতিনিয়ত ঠকে যাওয়ার বা প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একটু ব্যর্থতা এলেই বা প্রিয়জনের কাছ থেকে আঘাত পেলে আধুনিক মানুষ খুব সহজেই হতাশায় ভুগে আত্মহত্যার মতো চরম পথ পর্যন্ত বেছে নেয়। কবি বহু আগেই বলে গেছেন, “তোমার মাপে হয়নি সবাই”— অর্থাৎ এই স্বার্থান্ধ পৃথিবীতে কেউ নিখুঁত নয়, তাই অন্যের কাছে নিখুঁত কিছু আশা করা বোকামি।

আজকের দিনের এই হতাশা ও অবসাদ (Depression) থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো কবির সেই অমূল্য উপদেশ— “সত্যেরে লও সহজে”। চারপাশের মানুষের সাথে মিথ্যে অহংকার বা প্রতিযোগিতায় না মেতে, ভাগ্যের দোষ না দিয়ে, নিজের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবের রূঢ়তাকে মেনে নিতে হবে। নিজের মনের সাথে এই শান্ত ও সুস্থ বোঝাপড়াই পারে বর্তমান সমাজের প্রতিটি মানুষকে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখাতে। তাই এই কবিতার জীবনদর্শন যুগে যুগে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার