অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 3 ‘শিলা’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 3: শিলা
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3) – পর্ব 1

নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

1. শিলা এবং খনিজের মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো
শিলা ও খনিজের মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য হলো:

  • গঠন: খনিজ হলো নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠনযুক্ত একটি মৌলিক বা যৌগিক পদার্থ। অন্যদিকে, শিলা হলো একাধিক খনিজের একটি মিশ্রণ।
  • প্রকৃতি: খনিজ হলো একটি সমসত্ত্ব পদার্থ (সব জায়গায় উপাদান একই থাকে)। কিন্তু শিলা হলো একটি অসমসত্ত্ব পদার্থ।
  • রাসায়নিক সংকেত: প্রতিটি খনিজের নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংকেত থাকে (যেমন- কোয়ার্টজ)। কিন্তু শিলার নির্দিষ্ট কোনো রাসায়নিক সংকেত থাকে না (যেমন- গ্রানাইট)।

2. আগ্নেয় শিলার (Igneous Rock) তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।

উত্তর দেখো
আগ্নেয় শিলার প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো:

  • কাঠিন্য: এই শিলা অত্যন্ত কঠিন, ভারী ও মজবুত প্রকৃতির হয়। তাই এই শিলা সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।
  • স্তরায়ন ও জীবাশ্মের অভাব: উত্তপ্ত ম্যাগমা জমাট বেঁধে তৈরি হওয়ায় এই শিলায় কোনো স্তরভেদ বা স্তরায়ন থাকে না এবং কোনো জীবাশ্ম বা ফসিল দেখা যায় না।
  • কেলাসন: আগ্নেয় শিলায় খনিজ পদার্থগুলি সাধারণত স্ফটিক বা কেলাস আকারে বিন্যস্ত থাকে।

3. আগ্নেয় শিলাকে ‘প্রাথমিক শিলা’ (Primary Rock) বলা হয় কেন?

উত্তর দেখো
আগ্নেয় শিলাকে প্রাথমিক শিলা বলার প্রধান কারণগুলি হলো:

  • প্রথম সৃষ্টি: পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে এটি একটি উত্তপ্ত ও গ্যাসীয় পিণ্ড ছিল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেই উত্তপ্ত পিণ্ডটি ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা ও কঠিন হওয়ার সময় সর্বপ্রথম এই আগ্নেয় শিলারই সৃষ্টি হয়েছিল।
  • অন্যান্য শিলার উৎস: পৃথিবীর বাকি সমস্ত শিলা (পাললিক ও রূপান্তরিত শিলা) সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই আগ্নেয় শিলা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। তাই একে প্রাথমিক বা আদি শিলা বলা হয়।

4. নিঃসারী এবং উদ্ভেদী আগ্নেয় শিলার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর দেখো
  • সৃষ্টির স্থান: নিঃসারী আগ্নেয় শিলা ভূগর্ভের ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের বাইরে লাভা রূপে বেরিয়ে এসে তৈরি হয়। কিন্তু উদ্ভেদী আগ্নেয় শিলা ভূগর্ভের ভেতরেই ফাটলের মধ্যে ম্যাগমা জমাট বেঁধে তৈরি হয়।
  • শীতল হওয়ার হার ও দানা: নিঃসারী শিলা বাইরের বাতাসে খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়, তাই এর খনিজ দানাগুলি খুব সূক্ষ্ম হয় (যেমন- ব্যাসল্ট)। অন্যদিকে, উদ্ভেদী শিলা ভূগর্ভে অত্যন্ত ধীরে ঠান্ডা হয় বলে এর দানাগুলি বেশ বড়ো হয় (যেমন- গ্রানাইট)।

5. পাললিক শিলার (Sedimentary Rock) তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর দেখো
পাললিক শিলার প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো:

  • প্রকৃতি: এই শিলা আগ্নেয় শিলার মতো কঠিন হয় না, এটি অপেক্ষাকৃত নরম, হালকা এবং সচ্ছিদ্র হয়। তাই এটি খুব সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
  • স্তরায়ন ও জীবাশ্ম: পলি স্তরে স্তরে জমা হয়ে তৈরি হয় বলে এতে স্পষ্ট স্তরায়ন দেখা যায় এবং একমাত্র এই শিলাতেই জীবাশ্ম বা ফসিল (Fossils) পাওয়া যায়।
  • অর্থনৈতিক গুরুত্ব: পৃথিবীর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্বালানি কয়লা এবং খনিজ তেল (পেট্রোলিয়াম) কেবল এই পাললিক শিলার স্তর থেকেই পাওয়া যায়।

6. পাললিক শিলাকে ‘স্তরীভূত শিলা’ বলা হয় কেন?

উত্তর দেখো
  • নদী, বায়ু বা হিমবাহের দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত পাথর, বালি বা কাদা সমুদ্র, হ্রদ বা মোহনার তলদেশে একবারে জমা হয় না।
  • এগুলি বছরের পর বছর ধরে একটি স্তরের ওপর আরেকটি স্তর হিসেবে ক্রমাগত সঞ্চিত হয়ে এবং ওপরের স্তরের প্রবল চাপে জমাট বেঁধে পাললিক শিলা তৈরি করে।
  • শিলার মধ্যে এই আলাদা আলাদা স্তরগুলি বা স্তরায়ন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায় বলেই একে স্তরীভূত শিলা বলা হয়।

7. একমাত্র পাললিক শিলাতেই জীবাশ্ম (Fossils) দেখা যায় কেন?

উত্তর দেখো
  • সমুদ্র বা হ্রদের তলদেশে বছরের পর বছর ধরে পলি জমা হওয়ার সময় অনেক জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদের মৃতদেহ সেই নরম পলির স্তরের নিচে চাপা পড়ে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর পর শিলাটি কঠিন হলে সেই মৃতদেহগুলি পাথরের গায়ে জীবাশ্ম হিসেবে থেকে যায়।
  • কিন্তু আগ্নেয় শিলা তৈরি হয় জ্বলন্ত ম্যাগমা থেকে, এবং রূপান্তরিত শিলা তৈরি হয় প্রচণ্ড তাপে ও চাপে। তাই এই দুই শিলায় কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী চাপা পড়লেও অত্যধিক তাপে তা সম্পূর্ণ পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়, কোনো জীবাশ্ম অবশিষ্ট থাকে না।

8. যান্ত্রিক এবং জৈব পাললিক শিলার মধ্যে পার্থক্য কী? উদাহরণ দাও।

উত্তর দেখো
  • যান্ত্রিক পাললিক শিলা: নদী, বায়ু বা হিমবাহের মতো প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা প্রাচীন শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে টুকরো টুকরো বালি বা পলি হিসেবে জমা হয়ে যে শিলা তৈরি করে, তাকে যান্ত্রিক পাললিক শিলা বলে। উদাহরণ: বেলেপাথর, কাদা পাথর।
  • জৈব পাললিক শিলা: প্রাচীনকালের উদ্ভিদ বা প্রাণীর মৃতদেহ সমুদ্রের তলদেশে বা মাটির নীচে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চাপা পড়ে যে শিলা তৈরি করে, তাকে জৈব পাললিক শিলা বলে। উদাহরণ: কয়লা, চুনাপাথর।

9. রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rock) কীভাবে সৃষ্টি হয়? এর দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর দেখো
  • সৃষ্টি: ভূগর্ভের প্রচণ্ড তাপ, ওপরের শিলাস্তরের প্রবল চাপ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে আগ্নেয় ও পাললিক শিলার ভেতরের খনিজগুলির মূল গঠন ও রূপ সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে এই নতুন শিলা সৃষ্টি হয়।
  • বৈশিষ্ট্য 1: রূপান্তরের ফলে শিলাটি আগের মূল শিলার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন, ভারী ও মজবুত হয়ে যায় এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।
  • বৈশিষ্ট্য 2: অত্যাধিক তাপে ও চাপে তৈরি হয় বলে এই শিলায় কোনো জীবাশ্ম বা ফসিল অবশিষ্ট থাকে না।

10. আগ্নেয় শিলা ও পাললিক শিলার মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
আগ্নেয় ও পাললিক শিলার মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য হলো:

  • উৎপত্তি: আগ্নেয় শিলা ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, পাললিক শিলা পলি বা কাদা স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে সৃষ্টি হয়।
  • কাঠিন্য ও জীবাশ্ম: আগ্নেয় শিলা অত্যন্ত কঠিন হয় এবং এতে কোনো জীবাশ্ম থাকে না। কিন্তু পাললিক শিলা অপেক্ষাকৃত নরম হয় এবং একমাত্র এই শিলাতেই জীবাশ্ম দেখা যায়।
  • স্তরায়ন: আগ্নেয় শিলায় কোনো স্তরভেদ বা স্তরায়ন থাকে না, কিন্তু পাললিক শিলায় স্পষ্ট স্তরায়ন বা আলাদা আলাদা স্তর দেখা যায়।

11. গ্রানাইট এবং ব্যাসল্ট শিলার মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো
গ্রানাইট ও ব্যাসল্ট শিলার মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য হলো:

  • সৃষ্টির স্থান: গ্রানাইট হলো উদ্ভেদী আগ্নেয় শিলা, যা ভূগর্ভের গভীরে তৈরি হয়। আর ব্যাসল্ট হলো নিঃসারী আগ্নেয় শিলা, যা ভূপৃষ্ঠের বাইরে তৈরি হয়।
  • দানার আকার: ভূগর্ভে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয় বলে গ্রানাইট শিলার দানা বা স্ফটিকগুলি বেশ বড়ো ও স্পষ্ট হয়। কিন্তু দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার কারণে ব্যাসল্ট শিলার দানাগুলি অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়।
  • রং ও গঠন: গ্রানাইট সাধারণত হালকা রঙের এবং ব্যাসল্টের তুলনায় সামান্য কম ভারী হয়। অন্যদিকে, ব্যাসল্ট কালচে রঙের এবং অত্যন্ত ভারী ও কঠিন শিলা।

12. শিলাচক্র (Rock Cycle) বলতে কী বোঝো? সংক্ষেপে বর্ণনা করো।

উত্তর দেখো
  • সংজ্ঞা: প্রকৃতির বুকে নির্দিষ্ট নিয়মে আগ্নেয়, পাললিক এবং রূপান্তরিত শিলা যেভাবে চক্রাকারে ক্রমাগত এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হচ্ছে, তাকে শিলাচক্র বলে।
  • বর্ণনা: ভূগর্ভের ম্যাগমা প্রথমে ঠান্ডা হয়ে আগ্নেয় শিলা তৈরি করে। সেই শিলা প্রাকৃতিক শক্তিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সমুদ্রে জমা হয়ে পাললিক শিলায় পরিণত হয়। পরে আগ্নেয় ও পাললিক শিলা ভূগর্ভের তাপে ও চাপে রূপান্তরিত শিলা তৈরি করে। পরিশেষে, রূপান্তরিত শিলা ভূগর্ভের গভীরে অত্যধিক তাপে গলে পুনরায় ম্যাগমা হয়ে যায়। এভাবেই চক্রটি চলতে থাকে।

13. সিয়াল (SIAL) এবং সিমা (SIMA) স্তরের মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো
সিয়াল ও সিমা স্তরের মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য হলো:

  • অবস্থান: মহাদেশগুলির নীচের ভূতক সিয়াল স্তর দিয়ে গঠিত। আর মহাসাগরগুলির তলদেশের ভূতক সিমা স্তর দিয়ে গঠিত।
  • উপাদান: সিয়াল স্তর প্রধানত সিলিকা (Si) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al) দিয়ে তৈরি। অন্যদিকে, সিমা স্তর প্রধানত সিলিকা (Si) ও ম্যাগনেশিয়াম (Mg) দিয়ে তৈরি।
  • গঠনকারী শিলা: সিয়াল স্তর অপেক্ষাকৃত হালকা ‘গ্রানাইট’ জাতীয় শিলা দিয়ে গঠিত, আর সিমা স্তর অত্যন্ত ভারী ‘ব্যাসল্ট’ জাতীয় শিলা দিয়ে গঠিত।

14. মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে বা অর্থনীতিতে শিলার তিনটি প্রধান ব্যবহার বা গুরুত্ব লেখো।

উত্তর দেখো
মানবজীবনে শিলার তিনটি প্রধান ব্যবহার হলো:

  • নির্মাণকাজ: বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, রেললাইন এবং বড়ো বড়ো সেতু বা বাঁধ তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যাসল্ট, গ্রানাইট, বেলেপাথর ও চুনাপাথর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • জ্বালানির উৎস: পাললিক শিলার স্তর থেকেই আমরা কয়লা এবং খনিজ তেল (পেট্রোলিয়াম)-এর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম জ্বালানি পাই, যা আমাদের যানবাহন ও শিল্পকে সচল রাখে।
  • শিল্পের কাঁচামাল: লোহা ও ইস্পাত শিল্পে এবং সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে চুনাপাথর ও ডলোমাইট শিলা অপরিহার্য।

15. মার্বেল এবং স্লেট পাথরের একটি করে ব্যবহার বা অর্থনৈতিক গুরুত্ব লেখো।

উত্তর দেখো
  • মার্বেল (শ্বেতপাথর): এটি অত্যন্ত সুন্দর, মসৃণ এবং চকচকে রূপান্তরিত শিলা। তাই সুন্দর মূর্তি তৈরি করতে এবং দামি সৌধ (যেমন- তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল), মন্দির ও বাড়ির মেঝে (Floor) তৈরিতে মার্বেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • স্লেট পাথর: এটি সাধারণত খুব পাতলা ও মসৃণ স্তরে স্তরে ভেঙে যায়। তাই স্লেট পাথর স্কুলে লেখার ব্ল্যাকবোর্ড তৈরি করতে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বাড়িঘরের ছাদ (Roofing) তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

16. কঠিন শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে কীভাবে নরম মাটিতে (Soil) পরিণত হয় তা সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর দেখো
কঠিন শিলা থেকে মৃত্তিকা বা মাটি সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর:

  • আবহবিকার: প্রথমে সূর্যের তাপ, বৃষ্টিপাত, বাতাস এবং তুষারের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের কঠিন শিলা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছোটো ছোটো কণায় পরিণত হয় (যাকে রেগোলিথ বলে)।
  • জৈব পদার্থের মিশ্রণ: এরপর সেই শিলাচূর্ণের সাথে মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর পচা গলিত অংশ (হিউমাস), বিভিন্ন জীবাণু এবং জল মিশে যায়।
  • মৃত্তিকা গঠন: লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা এই দীর্ঘ রাসায়নিক ও জৈব প্রক্রিয়ার ফলে অবশেষে কঠিন শিলা খনিজ সমৃদ্ধ ও নরম মাটিতে পরিণত হয়, যেখানে আমরা ফসল ফলাই।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার