অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 5, ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 5: মেঘ ও বৃষ্টি
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. বৃষ্টিপাত প্রধানত কয় প্রকার ও কী কী? চিত্রসহ পরিচলন বৃষ্টিপাত সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি আলোচনা করো। (1+4=5)

উত্তর দেখো
বৃষ্টিপাতের শ্রেণিবিভাগ: সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনুযায়ী বৃষ্টিপাতকে প্রধানত 3টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা— 1) পরিচলন বৃষ্টিপাত, 2) শৈলৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত এবং 3) ঘূর্ণবৃষ্টি।

পরিচলন বৃষ্টিপাত সৃষ্টির প্রক্রিয়া:

  • প্রবল বাষ্পীভবন: দিনের বেলায় সূর্যের প্রখর তাপে নদী, সমুদ্র, হ্রদ বা ভূপৃষ্ঠের জল দ্রুত গরম হয়ে বাষ্পীভূত হয়। উষ্ণ ও হালকা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু সোজা ওপরের দিকে উঠে যায়।
  • মেঘ সৃষ্টি: বায়ু যত ওপরে ওঠে, তত প্রসারিত ও শীতল হতে থাকে। ওপরে উঠে সেই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ভাসমান ধূলিকণাকে আশ্রয় করে বিশাল আকৃতির কালো মেঘ (কিউমুলোনিম্বাস) তৈরি করে।
  • বৃষ্টিপাত: মেঘের ভেতরের জলকণাগুলি ক্রমশ বড়ো ও ভারী হয়ে গেলে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল বেগে সোজা নীচের দিকে ঝরে পড়ে। একেই পরিচলন বৃষ্টিপাত বলে।
  • সংঘটনের স্থান: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছর প্রবল উত্তাপ এবং বিশাল জলভাগ থাকায় সেখানে প্রায় প্রতিদিন বিকেলবেলা এই বৃষ্টিপাত হয়।

2. চিত্রসহ শৈলৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করো। ‘বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল’ কাকে বলে? (3+2=5)

উত্তর দেখো
শৈলৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত সৃষ্টির প্রক্রিয়া:

  • বায়ুর বাধা প্রাপ্তি: সমুদ্রের দিক থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তার প্রবাহপথে আড়াআড়িভাবে থাকা কোনো উঁচু পর্বত বা মালভূমিতে বাধা পায়।
  • বায়ুর ঊর্ধ্বগমন ও ঘনীভবন: পর্বতে বাধা পেয়ে সেই আর্দ্র বায়ু পর্বতের ঢাল (যাকে প্রতিবাদ ঢাল বলে) বেয়ে ওপরের দিকে ওঠে। ওপরে ওঠার ফলে বায়ু ক্রমশ প্রসারিত ও শীতল হতে থাকে এবং একসময় ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে।
  • বৃষ্টিপাত: এরপর সেই মেঘ থেকে পর্বতের ওই প্রতিবাদ ঢালেই প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। পর্বতে (শৈল) বাধা পেয়ে বায়ু ওপরে উঠে (উৎক্ষেপ) এই বৃষ্টিপাত ঘটায় বলে একে শৈলৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে।

বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল:

  • পর্বতের প্রতিবাদ ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটানোর পর সেই বায়ু যখন পর্বত পেরিয়ে বিপরীত দিকের ঢালে (যাকে অনুবাত ঢাল বলে) পৌঁছায়, তখন তাতে জলীয় বাষ্প প্রায় থাকে না। তাছাড়া, বায়ু নীচের দিকে নামতে থাকায় ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকে। ফলে পর্বতের এই বিপরীত ঢালে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এই বৃষ্টিহীন অঞ্চলটিকেই বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে। (যেমন- মেঘালয়ের শিলং)।

3. ঘূর্ণবৃষ্টি কীভাবে সৃষ্টি হয় তা চিত্রসহ আলোচনা করো। ঘূর্ণবৃষ্টি ও পরিচলন বৃষ্টিপাতের একটি পার্থক্য লেখো। (4+1=5)

উত্তর দেখো
ঘূর্ণবৃষ্টি সৃষ্টির প্রক্রিয়া:

  • নিম্নচাপের সৃষ্টি: ক্রান্তীয় অঞ্চলে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে হঠাৎ করে তীব্র উত্তাপের কারণে বায়ু গরম ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে গেলে সেখানে একটি গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়।
  • বায়ুর সংঘাত: সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য চারপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও ভারী বায়ু প্রবল বেগে ছুটে আসে। এর ফলে উষ্ণ ও হালকা বায়ু এবং শীতল ও ভারী বায়ু একে অপরের মুখোমুখি হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
  • বায়ুর ঊর্ধ্বগমন ও বৃষ্টিপাত: উষ্ণ বায়ু হালকা বলে তা ভারী শীতল বায়ুর ওপর দিয়ে ঘূর্ণির আকারে পাক খেতে খেতে দ্রুত ওপরে উঠে যায়। ওপরে উঠে উষ্ণ বায়ু দ্রুত শীতল ও ঘনীভূত হয়ে ঘন কালো মেঘের সৃষ্টি করে এবং প্রবল ঝড়ো হাওয়াসহ যে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়, তাকে ঘূর্ণবৃষ্টি বলে।

পার্থক্য:

  • পরিচলন বৃষ্টিপাত মূলত প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে (বিকেল বা সন্ধ্যায়) অল্প সময়ের জন্য হয়। কিন্তু ঘূর্ণবৃষ্টির কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই (মূলত শরৎকালে বা বর্ষার শেষে হয়) এবং এটি শুরু হলে একটানা কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।

4. জলচক্র কাকে বলে? প্রকৃতির বুকে জলচক্র কীভাবে সম্পন্ন হয় তা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করো। (1+4=5)

উত্তর দেখো
জলচক্র: প্রকৃতির বুকে জল কখনো বাষ্প, কখনো মেঘ, আবার কখনো বৃষ্টি বা বরফরূপে আকাশ ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে যে অবিরত চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে, তাকেই জলচক্র বলে।

জলচক্রের বিভিন্ন পর্যায়:

  • 1. বাষ্পীভবন: সূর্যের প্রখর তাপে সমুদ্র, নদী, হ্রদ এবং অন্যান্য জলাশয়ের জল প্রতিদিন গরম হয়ে জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। এছাড়া গাছপালাও তাদের অতিরিক্ত জল বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায় বাতাসে ছেড়ে দেয়। এই উষ্ণ ও হালকা বাষ্প সোজা ওপরের দিকে উঠে যায়।
  • 2. ঘনীভবন ও মেঘ সৃষ্টি: ওপরে ওঠার পর শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে এই জলীয় বাষ্প ঠান্ডা ও ঘনীভূত হয়। এরপর তা বাতাসে ভাসমান ধূলিকণাকে আশ্রয় করে ছোটো ছোটো জলকণা বা বরফকণায় পরিণত হয়ে মেঘের আকার ধারণ করে।
  • 3. অধঃক্ষেপণ: মেঘের ভেতরের জলকণাগুলি একে অপরের সাথে জুড়ে গিয়ে যখন ভারী হয়ে যায়, তখন তা বৃষ্টিপাত, তুষারপাত বা শিলাবৃষ্টিরূপে (অধঃক্ষেপণ) আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে।
  • 4. জলের ফিরে আসা: বৃষ্টির জল নদী দিয়ে গড়িয়ে আবার সমুদ্রে গিয়ে মেশে এবং কিছু জল চুঁইয়ে মাটির নীচে ভৌমজল হিসেবে সঞ্চিত হয়। এভাবেই প্রকৃতির বুকে জলের চক্রাকার আবর্তন বজায় থাকে।

5. মেঘ কীভাবে সৃষ্টি হয়? উচ্চতা অনুসারে মেঘের শ্রেণিবিভাগ করো এবং যেকোনো এক স্তরের মেঘের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। (2+1+2=5)

উত্তর দেখো
মেঘ সৃষ্টি: বাতাসে ভাসমান উষ্ণ জলীয় বাষ্প ওপরে উঠে শীতল হওয়ার পর ঘনীভূত হয়। এরপর তা বাতাসে ভেসে থাকা অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা ধোঁয়াকে আশ্রয় করে অসংখ্য ছোটো ছোটো জলকণা বা বরফকণায় পরিণত হয়। এই জলকণা বা বরফকণার সমষ্টিই হলো মেঘ।

মেঘের শ্রেণিবিভাগ: আকাশ কতটা উঁচুতে মেঘ রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে মেঘকে প্রধানত 4টি ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. অধিক বা বেশি উচ্চতার মেঘ
  2. মাঝারি উচ্চতার মেঘ
  3. নিম্ন বা কম উচ্চতার মেঘ
  4. উল্লম্ব বা বিশাল মেঘ

অধিক উচ্চতার মেঘের বিবরণ (গড় উচ্চতা 6000 মিটারের বেশি):

  • সিরাস: আকাশের সবচেয়ে উঁচুতে থাকা সাদা পালকের মতো মেঘ, যা পরিষ্কার আবহাওয়া বোঝায়।
  • সিরোস্ট্যাটাস: পাতলা সাদা চাদরের মতো মেঘ, যা চাঁদ বা সূর্যের চারপাশে আলোর বলয় তৈরি করে।
  • সিরোকিউমুলাস: পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, যা আকাশকে সামুদ্রিক ম্যাকারেল মাছের পিঠের মতো দেখতে করে তোলে।

6. ছকের সাহায্যে পরিচলন, শৈলৎক্ষেপ এবং ঘূর্ণবৃষ্টির মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
তুলনার বিষয় পরিচলন বৃষ্টিপাত শৈলৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘূর্ণবৃষ্টি
সৃষ্টির মূল কারণ প্রবল সূর্যতাপে জল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে সোজা ওপরে উঠে এই বৃষ্টিপাত ঘটায়। আর্দ্র বায়ু প্রবাহপথে কোনো উঁচু পর্বতে বাধা পেয়ে ওপরে উঠে এই বৃষ্টিপাত ঘটায়। উষ্ণ ও শীতল বায়ু মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ঘূর্ণির আকারে ওপরে উঠে এই বৃষ্টি ঘটায়।
সংঘটনের স্থান মূলত নিরক্ষীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। সমুদ্রের ধারে বা আর্দ্র বায়ুর পথে থাকা পর্বত অঞ্চলে দেখা যায়। ক্রান্তীয় অঞ্চল এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি বেশি দেখা যায়।
বৃষ্টির স্থায়িত্ব খুব অল্প সময়ের জন্য (সাধারণত বিকেলে) প্রবল বেগে হয়। মাঝারি বা ভারী বেগে বেশ কয়েক ঘণ্টা বা দিন ধরে হতে পারে। প্রবল ঝড়ো হাওয়াসহ একটানা বেশ কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মেঘ মূলত কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে হয়। মূলত নিম্বোস্ট্যাটাস বা কিউমুলাস মেঘ থেকে হয়। ঘন কালো নিম্বোস্ট্যাটাস এবং কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার