অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 6 জলবায়ু অঞ্চল, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 6: জলবায়ু অঞ্চল
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুর প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। এই অঞ্চলে এত ঘন জনবসতি কেন? (1+2.5+1.5=5)
উত্তর দেখো
জলবায়ুর প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য:
- ঋতু পরিবর্তন: এই জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সুস্পষ্ট ঋতু পরিবর্তন (গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, শীত)। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর প্রবাহপথ সম্পূর্ণ পালটে যায়।
- আর্দ্র গ্রীষ্ম ও শুষ্ক শীত: গ্রীষ্মকাল বা বর্ষাকাল সাধারণত আর্দ্র থাকে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এই সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অন্যদিকে, শীতকাল বৃষ্টিহীন ও শুষ্ক থাকে।
- অসম বৃষ্টিপাত: এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সব জায়গায় সমান হয় না এবং এর কোনো নির্দিষ্ট সময় বা নিশ্চয়তা নেই। কোনো বছর অতিবৃষ্টিতে বন্যা হয়, আবার কোনো বছর অনাবৃষ্টিতে খরা দেখা দেয়।
ঘন জনবসতির কারণ:
- গ্রীষ্মকালে পর্যাপ্ত উত্তাপ এবং বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে এখানকার উর্বর নদী উপত্যকায় কৃষিকাজ অত্যন্ত ভালো হয়। মানুষের জীবনধারণের জন্য অনুকূল আবহাওয়া, খাদ্য এবং জীবিকার সহজলভ্যতার জন্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ এই জলবায়ু অঞ্চলে বসবাস করে।
2. নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের (সেলভা) প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। এই অরণ্যে কাষ্ঠশিল্প উন্নত হয়নি কেন? (3+2=5)
উত্তর দেখো
- চিরসবুজ বা চিরহরিৎ: সারা বছর প্রচণ্ড উত্তাপ ও প্রচুর বৃষ্টির কারণে গাছের পাতা কখনো একসঙ্গে ঝরে যায় না, তাই অরণ্য চিরসবুজ থাকে।
- দুর্ভেদ্য ও অন্ধকার: গাছগুলি খুব কাছাকাছি জন্মায় এবং লতাপাতায় এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে ওপরের দিকটা চাঁদোয়ার মতো ঢাকা পড়ে যায়। সূর্যের আলো নীচে পৌঁছাতে পারে না বলে জঙ্গল অন্ধকার ও দুর্ভেদ্য হয়।
- শক্ত কাঠ ও বৈচিত্র্য: এখানকার মেহগনি, রবার, কোকোর মতো গাছের কাঠ অত্যন্ত ভারী ও শক্ত হয় এবং একই জায়গায় নানা প্রজাতির গাছ একসঙ্গে মিশে থাকে।
কাষ্ঠশিল্প উন্নত না হওয়ার কারণ:
- অরণ্য খুব দুর্ভেদ্য হওয়ায় ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন।
- কাঠ অত্যন্ত ভারী হওয়ায় নদীপথে তা ভাসিয়ে বাইরে নিয়ে আসা যায় না।
- নানা প্রজাতির গাছ একসঙ্গে মিশে থাকায় নির্দিষ্ট কোনো প্রয়োজনীয় গাছ খুঁজে কাটা খুব অসুবিধাজনক।
- বিষাক্ত পোকামাকড় এবং স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এই অঞ্চলে কাঠ কাটা প্রায় অসম্ভব।
3. তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চলের অবস্থান লেখো। এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে এস্কিমোদের জীবনযাত্রা (বাসস্থান, পোশাক ও শিকার) বিস্তারিত বর্ণনা করো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
এস্কিমোদের জীবনযাত্রা:
- বাসস্থান: শীতে কনকনে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে তারা বরফের চাঁই দিয়ে গম্বুজাকৃতির ‘ইগলু’ তৈরি করে বসবাস করে। গ্রীষ্মকালে বরফ গললে তারা পশুর চামড়া দিয়ে ‘টিউপিক’ নামক অস্থায়ী তাঁবু তৈরি করে।
- পোশাক: শরীর গরম রাখতে তারা সিলমাছ বা বল্গা হরিণের চামড়া ও লোমের তৈরি হুডযুক্ত বিশেষ পোশাক পরে, যাকে ‘পারকা’ বলে।
- শিকার ও খাদ্য: কৃষিকাজ অসম্ভব হওয়ায় তারা পুরোপুরি শিকারের ওপর নির্ভরশীল। তারা বরফের সমুদ্রে ‘কায়াক’ নৌকায় চেপে ‘হারপুন’ নামক বর্শা দিয়ে সিল, তিমি বা সিন্ধুঘোটক শিকার করে এবং তাদের কাঁচা মাংস খায়।
- যাতায়াত: বরফের ওপর যাতায়াত এবং শিকার করা প্রাণী বহনের জন্য তারা কুকুর (হাস্কি) বা বল্গা হরিণ টানা চাকা বিহীন ‘স্লেজ’ গাড়ি ব্যবহার করে।
4. ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী? এই অঞ্চলকে ‘ফলের বাগান’ বলা হয় কেন এবং এখানে ওয়াইন শিল্প উন্নত কেন? (2+1.5+1.5=5)
উত্তর দেখো
- আর্দ্র শীতকাল: এই জলবায়ুর সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো এখানে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় না, কেবল শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়। শীতকালে সমুদ্রের দিক থেকে আসা আর্দ্র পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টি হয়।
- শুষ্ক গ্রীষ্মকাল: গ্রীষ্মকাল সম্পূর্ণ শুষ্ক এবং রৌদ্রোজ্জ্বল থাকে। এই সময়ে বাষ্পমোচন রোধ করার জন্য এখানকার জলপাই বা অন্যান্য গাছের পাতা ও ছাল খুব পুরু হয় এবং পাতায় মোমের আস্তরণ থাকে।
ফলের বাগান:
- উষ্ণ ও শুষ্ক রৌদ্রোজ্জ্বল গ্রীষ্মকাল এবং আর্দ্র শীতকাল রসালো ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই অনুকূল আবহাওয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রচুর আঙুর, কমলালেবু, আপেল, জলপাই ইত্যাদি চাষ হয় বলে একে পৃথিবীর ফলের বাগান বলা হয়।
ওয়াইন শিল্প উন্নত হওয়ার কারণ:
- এই অঞ্চলে বিশ্বমানের মিষ্টি আঙুর বিপুল পরিমাণে জন্মায়। এই আঙুরের সহজলভ্যতা এবং উন্নত প্রযুক্তির কারণে ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশে আঙুর থেকে উৎকৃষ্ট মানের মদ বা ওয়াইন তৈরি করার শিল্প ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে।
5. ছকের সাহায্যে নিরক্ষীয় জলবায়ু এবং মৌসুমী জলবায়ুর মধ্যে 5 টি প্রধান পার্থক্য আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
| তুলনার বিষয় | নিরক্ষীয় জলবায়ু | মৌসুমী জলবায়ু |
|---|---|---|
| 1. ঋতু পরিবর্তন | এখানে কোনো ঋতু পরিবর্তন হয় না, সারা বছরই গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। | এখানে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত— এই 4 টি ঋতু স্পষ্টভাবে দেখা যায়। |
| 2. বৃষ্টিপাত | সারা বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন বিকেলবেলা প্রবল পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। | বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (মূলত বর্ষাকালে) বৃষ্টিপাত হয়, শীতকাল শুষ্ক থাকে। |
| 3. স্বাভাবিক উদ্ভিদ | সারা বছর বৃষ্টির জন্য চিরহরিৎ বা চিরসবুজ গভীর অরণ্য (যেমন- রবার, মেহগনি) দেখা যায়। | শুষ্ক মরশুমের জন্য পাতা ঝরে যাওয়া পর্ণমোচী অরণ্য (যেমন- শাল, সেগুন) দেখা যায়। |
| 4. প্রধান পেশা | গভীর অরণ্যের কারণে এখানকার আদিবাসীদের প্রধান পেশা বন্যপ্রাণী শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ। | বৃষ্টিপাত ও উর্বর সমভূমির কারণে এখানকার মানুষদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। |
| 5. জনবসতি | প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পরিবেশের জন্য এখানে জনবসতি অত্যন্ত বিরল। | অনুকূল জীবনযাত্রা ও কৃষিকাজের সুবিধার জন্য এখানে জনবসতি অত্যন্ত ঘন। |
6. নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর কেন? কঙ্গো অববাহিকার আদিবাসীদের জীবনযাত্রার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। (3+2=5)
উত্তর দেখো
- চরম আবহাওয়া: সারা বছর প্রচণ্ড গরম ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে মানুষের কাজ করার ক্ষমতা খুব কমে যায় এবং শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
- দুর্ভেদ্য অরণ্য: ঘন জঙ্গলের কারণে যাতায়াতের পথ তৈরি করা বা কৃষিকাজ করার কোনো সুযোগ থাকে না।
- রোগব্যাধি: স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে মশা ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব খুব বেশি। বিষাক্ত সেটসি মাছির কামড়ে এখানকার মানুষের প্রাণঘাতী ‘ঘুমন্ত রোগ’ (স্লিপিং সিকনেস) এবং ম্যালেরিয়া লেগেই থাকে।
কঙ্গো অববাহিকার আদিবাসীদের জীবনযাত্রা:
- আফ্রিকার কঙ্গো নদীর অববাহিকায় গভীর অরণ্যে ‘পিগমি’ নামক আদিবাসীরা বসবাস করে। এদের উচ্চতা খুব কম হয়।
- এরা আধুনিক সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কৃষিকাজ জানে না বলে এরা বন্যপ্রাণী শিকার করে এবং বন থেকে ফলমূল, মধু সংগ্রহ করে যাযাবরের মতো জীবন কাটায়। গরমের জন্য এরা গাছের ছাল বা পাতা পোশাক হিসেবে ব্যবহার করে।
7. তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলতে কী বোঝো? (3+2=5)
উত্তর দেখো
- সারা বছর প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং মাটি বরফে ঢাকা থাকার কারণে এখানে কোনো বড়ো গাছ জন্মায় না।
- গ্রীষ্মকালে মাত্র 2 থেকে 3 মাসের জন্য বরফ গলে গেলে পাথরের গায়ে কিছু শ্যাওলা, মস এবং লাইকেন জন্মায়। মাঝে মাঝে কিছু ছোটো ফুলের গাছও (যেমন- উইলো, বার্চ) চোখে পড়ে, যা শীতকাল আসার আগেই মরে যায়।
তুন্দ্রা অঞ্চলের প্রাণীজগত:
- তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য এখানকার প্রাণীদের চামড়া খুব পুরু হয় এবং গায়ে বড়ো বড়ো লোম থাকে।
- প্রধান প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে মেরু ভল্লুক, বল্গা হরিণ, মেরু শিয়াল, কস্তুরী মৃগ। এছাড়া বরফ ঢাকা সমুদ্রে সিলমাছ, সিন্ধুঘোটক, তিমি এবং পেঙ্গুইন পাখি দেখা যায়।
নিশীথ সূর্যের দেশ:
- মেরু বা তুন্দ্রা অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে একটানা 6 মাস দিন থাকে। এই সময়ে সূর্য কখনোই পুরোপুরি অস্ত যায় না।
- সারাদিন পর রাতের বেলাতেও দিগন্ত রেখার কাছে সূর্যকে জ্বলজ্বল করতে দেখা যায়। গভীর রাতেও (নিশীথে) সূর্য দেখা যায় বলে ইউরোপের উত্তরে অবস্থিত নরওয়ের হ্যামারফেস্ট বন্দর এবং তুন্দ্রা অঞ্চলের অন্যান্য জায়গাকে নিশীথ সূর্যের দেশ বলা হয়।