অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 7 ‘মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন’ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 7: মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. পরিবেশের অবনমন বলতে কী বোঝো? পরিবেশ অবনমনের প্রধান প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। (1+4=5)

[Image showing contrast between natural disasters and human pollution]

উত্তর দেখো
পরিবেশের অবনমন: ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা মানুষের বিভিন্ন অবিবেচক কার্যকলাপের ফলে চারপাশের পরিবেশের গুণগত মান যখন ক্রমশ নীচের দিকে নেমে যায় বা খারাপ হতে থাকে, তখন তাকে পরিবেশের অবনমন বলে।

প্রাকৃতিক কারণ:

  • ভূমিকম্প ও সুনামি: প্রবল ভূমিকম্প বা সমুদ্রে ধ্বংসাত্মক সুনামির ফলে মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা, জীবজন্তু ও মানুষের জীবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
  • আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: আগ্নেয়গিরি থেকে প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসা ফুটন্ত লাভা, ছাই এবং বিষাক্ত গ্যাস চারপাশের বাতাস ও মাটিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে।

মনুষ্যসৃষ্ট বা মানুষের তৈরি কারণ:

  • নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন: বসতি স্থাপন ও কলকারখানার জন্য মানুষ নির্বিচারে জঙ্গল কেটে সাফ করে দিচ্ছে, যার ফলে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে এবং মৃত্তিকা ক্ষয় হচ্ছে।
  • শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ: যত্রতত্র নতুন শহর, কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া এবং বর্জ্য পদার্থ সরাসরি পরিবেশে মিশে বাতাস ও জলকে দূষিত করছে।
  • অবৈজ্ঞানিক কৃষিকাজ: বেশি ফসলের লোভে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা এবং জলের গুণমান নষ্ট হচ্ছে।

2. বিশ্ব উষ্ণায়ন বা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলি কী কী? এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলি আলোচনা করো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ:

  • গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি: কলকারখানা, যানবাহন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, খনিজ তেল) পোড়ানোর ফলে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন প্রভৃতি গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এই গ্যাসগুলি পৃথিবীর তাপমাত্রাকে আটকে রাখছে।
  • বনভূমি ধ্বংস: গাছপালা কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। কিন্তু নির্বিচারে জঙ্গল কাটার ফলে বাতাসে এই গ্যাস প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের ক্ষতিকর প্রভাব:

  • বরফ গলন ও জলস্তর বৃদ্ধি: পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে দুই মেরু অঞ্চলের (সুমেরু ও কুমেরু) বিশাল বরফের স্তূপ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পেয়ে সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলি জলের তলায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
  • জলবায়ুর পরিবর্তন: সারা পৃথিবীতে ঋতুচক্র বদলে যাচ্ছে এবং খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ আগের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে।
  • জীববৈচিত্র্য হ্রাস: আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে বহু পশুপাখি ও উদ্ভিদ পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।

3. ভারতের পরিবেশ রক্ষায় ‘চিপকো আন্দোলন’ এবং ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’-এর গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য বিস্তারিত আলোচনা করো। (2.5+2.5=5)

[Image comparing Chipko movement and Narmada Bachao protests]

উত্তর দেখো
চিপকো আন্দোলন:

  • প্রেক্ষাপট: 1973 সালে উত্তরপ্রদেশের (বর্তমানে উত্তরাখণ্ড) হিমালয়ের গাড়োয়াল অঞ্চলে কাঠ ব্যবসায়ীরা নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংস করতে শুরু করে।
  • উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব: গাছ কাটার প্রতিবাদে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুন্দরলাল বহুগুণার নেতৃত্বে স্থানীয় মহিলারা গাছগুলিকে কাটার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য গভীরভাবে জড়িয়ে ধরতেন। হিন্দি ‘চিপকো’ কথার অর্থ হলো জড়িয়ে ধরা। অরণ্য সম্পদ রক্ষা করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাই ছিল এই অহিংস আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য, যা গোটা বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন:

  • প্রেক্ষাপট: নর্মদা নদীর ওপর সর্দার সরোবর নামে একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
  • উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব: এই বাঁধ তৈরি হলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মূল্যবান অরণ্য এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি চিরতরে জলের তলায় তলিয়ে যেত। পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের এই বিপুল ক্ষতির প্রতিবাদ করতেই মেধা পাটেকর এবং বাবা আমতের নেতৃত্বে এই প্রবল গণআন্দোলন শুরু হয়। এটি পরিবেশের পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার এক অন্যতম দৃষ্টান্ত।

4. স্থিতিশীল উন্নয়ন বলতে কী বোঝো? পরিবেশ রক্ষায় এবং এই উন্নয়ন বজায় রাখতে একজন ছাত্র বা ছাত্রী হিসেবে তোমার ভূমিকা বা কর্তব্যগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
স্থিতিশীল উন্নয়ন:

  • ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতাকে কোনোভাবেই নষ্ট বা ক্ষতি না করে, বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর জন্য পরিবেশে যে বিজ্ঞানসম্মত, দীর্ঘমেয়াদী ও পরিকল্পিত উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়, তাকে স্থিতিশীল উন্নয়ন বলে। এর মূল লক্ষ্য হলো সম্পদের অপচয় বন্ধ করা।

ছাত্র বা ছাত্রী হিসেবে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা:

  • বৃক্ষরোপণ: নিজের বাড়ি, স্কুলের মাঠ এবং রাস্তার দু-পাশে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানো এবং নিয়মিত জল দিয়ে তাদের যত্ন নেওয়া।
  • প্লাস্টিক বর্জন: দৈনন্দিন জীবনে ক্ষতিকারক প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং তার বদলে পরিবেশবান্ধব কাগজের বা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা।
  • সম্পদের সংরক্ষণ: বিনা প্রয়োজনে ঘরের পাখা বা আলো জ্বালিয়ে না রাখা এবং জলের কল খুলে রেখে জলের অপচয় বন্ধ করা।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: যত্রতত্র ময়লা বা আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা এবং এই বিষয়ে নিজের পরিবার ও আশেপাশের মানুষদের সচেতন করা।

5. ভারতের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা এবং ইউক্রেনের চেরনোবিল বিপর্যয়ের কারণ ও ফলাফল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো। (2.5+2.5=5)

উত্তর দেখো
ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা (1984):

  • কারণ: 1984 সালের 3 ডিসেম্বর রাতে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে একটি কীটনাশক কারখানায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গ্যাস সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক ফেটে যায়। ফলে মারাত্মক বিষাক্ত ‘মিথাইল আইসোসায়ানেট’ (এম. আই. সি.) গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
  • ফলাফল: এই ভয়াবহ রাসায়নিক বিপর্যয়ের ফলে ঘুমের মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষ চিরতরে অন্ধ বা পঙ্গু হয়ে যান এবং বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা ও জীবজন্তুর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব বংশপরম্পরায় আজও মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয় (1986):

  • কারণ: 1986 সালে ইউক্রেনের চেরনোবিল শহরের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মারাত্মক ত্রুটির কারণে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
  • ফলাফল: বিস্ফোরণের ফলে বাতাসে প্রচুর ক্ষতিকারক তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশে যায়। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহু কর্মী এবং স্থানীয় মানুষের মৃত্যু হয়। তেজস্ক্রিয়তার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি, জল এবং বাতাস দীর্ঘকালের জন্য দূষিত হয়ে পড়ে, যা পরিবেশের এক চরম অবনমন ঘটায়।

6. অম্লবৃষ্টি বা অ্যাসিড বৃষ্টি কীভাবে সৃষ্টি হয়? পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবগুলি আলোচনা করো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
অম্লবৃষ্টি সৃষ্টির প্রক্রিয়া:

  • কলকারখানার চিমনি, ইটভাটা এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক সালফার ডাইঅক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড গ্যাস প্রতিদিন বাতাসে মেশে।
  • বৃষ্টির সময় এই ক্ষতিকারক গ্যাসগুলি বৃষ্টির জলের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে সালফিউরিক অ্যাসিড এবং নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিডযুক্ত জল বৃষ্টির আকারে পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়াকেই অম্লবৃষ্টি বা অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।

ক্ষতিকর প্রভাব:

  • স্মৃতিসৌধের ক্ষতি: অ্যাসিড বৃষ্টির ফলে তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো মার্বেল পাথরের তৈরি ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, একে ‘স্টোন ক্যানসার’ বলা হয়।
  • জলজ প্রাণীর মৃত্যু: পুকুর, নদী ও হ্রদের জল দূষিত ও অম্লযুক্ত হয়ে প্রচুর মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যায়।
  • কৃষিকাজ ও অরণ্যের ক্ষতি: মাটির অম্লত্ব বেড়ে গিয়ে স্বাভাবিক উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। গাছের পাতা শুকিয়ে যায় এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।

7. বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রধান কারণ কী? জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান তিনটি কারণ বিশ্লেষণ করো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
ওজোন স্তর ধ্বংসের কারণ:

  • মানুষের ব্যবহৃত রেফ্রিজারেটর, এসি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র), সুগন্ধি স্প্রে, ফোম শিল্প ইত্যাদি থেকে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক ক্লোরোফ্লুরো কার্বন গ্যাস মিশছে।
  • এই গ্যাস বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে অতিবেগুনি রশ্মির উপস্থিতিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে পৃথিবীর রক্ষাকবচ ওজোন স্তরকে ভেঙে পাতলা করে দিচ্ছে বা ধ্বংস করছে।

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান তিনটি কারণ:

  • বাসস্থান ধ্বংস: বিপুল জনসংখ্যার বাসস্থান এবং কৃষিজমির প্রয়োজনে মানুষ নির্বিচারে জঙ্গল কেটে সাফ করে দিচ্ছে। এর ফলে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে এবং তারা খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে।
  • পরিবেশ দূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন: জল ও বায়ু দূষণের ফলে বহু জলজ প্রাণী ও পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে। তাছাড়া, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে অনেক প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
  • চোরাশিকার: মানুষের লোভের বশবর্তী হয়ে দাঁত, চামড়া, শিং বা লোমের জন্য বেআইনিভাবে বাঘ, গন্ডার, হাতির মতো বন্যপ্রাণীদের হত্যা করা হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্য হ্রাসের একটি অন্যতম প্রধান কারণ।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার