অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 11, ওশিয়ানিয়া রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 11: ওশিয়ানিয়া
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. মারে-ডার্লিং অববাহিকায় কৃষিকাজ ও পশুপালনের অভাবনীয় উন্নতির প্রধান কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। (2.5+2.5=5)
উত্তর দেখো
- উর্বর মৃত্তিকা ও সমভূমি: মারে ও ডার্লিং নদীর বন্যায় সঞ্চিত পলিমাটি অত্যন্ত উর্বর। এটি একটি বিস্তীর্ণ সমতলভূমি হওয়ায় এখানে খুব সহজেই আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রচুর গম ও ফলের চাষ করা সম্ভব হয়।
- জলসেচের সুবিধা: এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত মাঝারি হলেও, সারা বছর ধরে চিরপ্রবাহী নদী থেকে এবং অসংখ্য আর্টেজীয় কূপের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে জলসেচের সুবিধা পাওয়া যায়।
- অনুকূল জলবায়ু: এখানকার নাতিশীতোষ্ণ ও সমভাবাপন্ন জলবায়ু কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত আদর্শ।
পশুপালনের উন্নতির কারণ:
- ডাউনস তৃণভূমি: এই অববাহিকায় অবস্থিত ডাউনস তৃণভূমিতে প্রচুর পরিমাণে অত্যন্ত পুষ্টিকর ঘাস জন্মায়, যা ভেড়া ও গবাদি পশুদের প্রধান খাদ্য।
- শিপ স্টেশন ও বিশ্ববাজার: এখানে হাজার হাজার একর জমি নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি বিশাল বিশাল ভেড়া পালন কেন্দ্র (শিপ স্টেশন) গড়ে উঠেছে। এখানকার উন্নত মেরিনো জাতের ভেড়ার পশম ও মাংসের বিশ্বজোড়া চাহিদা থাকায় এই শিল্প অত্যন্ত লাভজনক।
2. অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ুর বৈচিত্র্যের ওপর অক্ষাংশ, সমুদ্রস্রোত এবং ভূপ্রকৃতির প্রভাব কীভাবে পড়ে তা বিস্তারিত লেখো। (5)
উত্তর দেখো
- অক্ষাংশের প্রভাব: মহাদেশটির ঠিক মাঝখান দিয়ে মকরক্রান্তি রেখা প্রসারিত হয়েছে। এর উত্তরের অংশটি নিরক্ষরেখার কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে সারা বছর অত্যন্ত উষ্ণ জলবায়ু থাকে। কিন্তু যত দক্ষিণ দিকে যাওয়া যায়, তাপমাত্রা তত কমতে থাকে এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু দেখা যায়।
- সমুদ্রস্রোতের প্রভাব: পূর্ব উপকূল বরাবর বয়ে যাওয়া উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে পূর্ব দিকের অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অন্যদিকে পশ্চিম উপকূল দিয়ে প্রবাহিত শীতল স্রোতের প্রভাবে সেখানে বাতাস শীতল থাকে এবং বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বিস্তীর্ণ মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে।
- ভূপ্রকৃতির প্রভাব: পূর্ব উপকূল বরাবর সুউচ্চ গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ পর্বতমালা প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু এই পর্বতে বাধা পেয়ে পূর্ব ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পর্বত পার হয়ে পশ্চিম ঢালে (বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে) পৌঁছানোর সময় তাতে আর জলীয় বাষ্প না থাকায় সেখানে বৃষ্টিপাতের তীব্র অভাব দেখা যায়।
3. আর্টেজীয় কূপ কী? এটি কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং অস্ট্রেলিয়ার কৃষি ও পশুপালনে এর গুরুত্ব কী? (1+2+2=5)
উত্তর দেখো
- আর্টেজীয় কূপ: অস্ট্রেলিয়ার সমভূমি অঞ্চলে মানুষের তৈরি করা এক বিশেষ ধরনের কুয়ো, যেখান থেকে পাম্প ছাড়াই মাটির তলার জল স্বাভাবিক চাপে ফোয়ারার মতো বেরিয়ে আসে, তাকে আর্টেজীয় কূপ বলে।
- কীভাবে সৃষ্টি হয়: মাটির নিচে যদি দুটি অপ্রবেশ্য শিলাস্তরের (যাতে জল ঢোকে না) মাঝখানে একটি প্রবেশ্য শিলাস্তর (যাতে জল ঢোকে) বাটির মতো বাঁকানো অবস্থায় থাকে, তবে বৃষ্টির জল ওই প্রবেশ্য স্তরে জমে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন ওই বাঁকানো অংশে গর্ত বা কুয়ো খুঁড়লে জলের প্রবল চাপে তা আপনা থেকেই বাইরে বেরিয়ে আসে।
গুরুত্ব:
- অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ শুষ্ক সমভূমি, মালভূমি ও মরুভূমি অঞ্চলে জলের তীব্র অভাব রয়েছে। এই শুষ্ক অঞ্চলে আর্টেজীয় কূপের মাধ্যমে মাটির তলা থেকে জল তুলে কৃষিকাজে জলসেচ করা হয়।
- ডাউনস অঞ্চলের বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে ভেড়া ও গবাদি পশুদের পানীয় জলের প্রধান উৎস হলো এই আর্টেজীয় কূপ।
4. অস্ট্রেলিয়ার পূর্বভাগের উচ্চভূমি এবং পশ্চিমভাগের মালভূমি অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। (2.5+2.5=5)
উত্তর দেখো
- অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত একটি অত্যন্ত প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বতমালা হলো গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ। এই পর্বতমালা নিয়েই পূর্বভাগের উচ্চভূমি গঠিত।
- বহু প্রাচীন হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এর উচ্চতা বর্তমানে অনেকটাই কমে গিয়েছে। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো মাউন্ট কসিয়াস্কো।
পশ্চিমভাগের মালভূমি:
- অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমভাগের এই সুবিশাল মালভূমিটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং অত্যন্ত শক্ত শিলা দিয়ে গঠিত। এটি খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ (যেমন- কালগুর্লি ও কুলগার্ডি সোনার খনি)।
- দীর্ঘকাল ধরে রোদ ও বৃষ্টিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ফলে এখানকার ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত রুক্ষ এবং এবড়োখেবড়ো। বৃষ্টির চরম অভাব থাকায় এই মালভূমির এক বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে গ্রেট ভিক্টোরিয়া, গিবসনের মতো বিশাল বিশাল শুষ্ক মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
5. নিউজিল্যান্ডের ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আলোচনা করো এবং এখানকার উন্নত পশুপালন শিল্পের কারণগুলি কী কী? (3+2=5)
উত্তর দেখো
- উত্তর দ্বীপ: এই দ্বীপটি অত্যন্ত ভূমিকম্প প্রবণ। এখানে মাউন্ট রয়াপেহু-র মতো জীবন্ত আগ্নেয়গিরি এবং মাটি ফুঁড়ে ওঠা ফুটন্ত জলের অনেক উষ্ণ প্রস্রবণ দেখা যায়।
- দক্ষিণ দ্বীপ: এই দ্বীপটি অত্যন্ত পাহাড়ি ও এবড়োখেবড়ো। এর মাঝ বরাবর বরফে ঢাকা সুউচ্চ দক্ষিণ আল্পস পর্বতমালা বিস্তৃত এবং এখানে অনেক বড়ো বড়ো হিমবাহ দেখা যায়। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো মাউন্ট কুক।
পশুপালনের উন্নতির কারণ:
- অনুকূল পরিবেশ: এখানকার নাতিশীতোষ্ণ ও সমভাবাপন্ন জলবায়ু ভেড়া ও গবাদি পশু পালনের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। দক্ষিণ দ্বীপের বিস্তীর্ণ ক্যান্টারবেরি সমভূমিতে পশুদের প্রধান খাদ্য হিসেবে প্রচুর পুষ্টিকর ঘাস জন্মায়।
- উন্নত প্রযুক্তি: আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু পালন করা হয় এবং এখানকার উন্নত হিমঘর ব্যবস্থার কারণে মাংস, দুধ ও পনির সহজে নষ্ট হয় না। ফলে সারা বিশ্বে তা রপ্তানি করে প্রচুর লাভ হয়।
6. অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে লোকবসতি সবচেয়ে বেশি, কিন্তু মধ্য ও পশ্চিম ভাগ অত্যন্ত জনবিরল কেন? (2.5+2.5=5)
উত্তর দেখো
- অনুকূল জলবায়ু ও কৃষি: এই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং জলবায়ু অত্যন্ত মনোরম। উর্বর মারে-ডার্লিং অববাহিকা এই অঞ্চলেই অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রচুর পরিমাণে কৃষিকাজ হয় ও পানীয় জলের কোনো অভাব নেই।
- উন্নত অর্থনীতি: সিডনি, মেলবোর্নের মতো বড়ো বড়ো শহর, বন্দর ও উন্নত শিল্প কারখানা এই অঞ্চলেই গড়ে ওঠায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেশি।
মধ্য ও পশ্চিম ভাগ জনবিরল হওয়ার কারণ:
- প্রতিকূল জলবায়ু ও মরুভূমি: বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গ্রেট ভিক্টোরিয়া, গিবসনের মতো বিশাল বিশাল মরুভূমি থাকায় এখানকার জলবায়ু অত্যন্ত চরমভাবাপন্ন ও শুষ্ক। বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে।
- জলের অভাব ও দুর্গমতা: পানীয় জল এবং কৃষিকাজের জন্য জলের তীব্র সংকট দেখা যায়। রুক্ষ ভূপ্রকৃতির কারণে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, ফলে এই অঞ্চলে জীবনধারণ করা অত্যন্ত কষ্টকর।
7. ওশিয়ানিয়া মহাদেশের প্রাণীজগতের স্বাতন্ত্র্য বা অভিনবত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো। এই মহাদেশের প্রাণীরা অন্যান্য মহাদেশ থেকে এত আলাদা কেন? (3+2=5)
উত্তর দেখো
- পেটে থলিযুক্ত প্রাণী: এখানে ক্যাঙারু, কোয়ালার মতো এমন অদ্ভুত প্রাণী দেখা যায়, যারা অপরিণত সন্তান প্রসব করে এবং নিজেদের পেটের সামনের দিকের একটি থলিতে রেখে তাদের বড়ো করে।
- ডিম পাড়া স্তন্যপায়ী: হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস নামক এক অদ্ভুত স্তন্যপায়ী প্রাণী এখানে দেখা যায়, যাদের মুখ হাঁসের মতো এবং এরা সরাসরি বাচ্চা না দিয়ে ডিম পাড়ে।
- উড়তে অক্ষম পাখি: ডানা থাকা সত্ত্বেও উড়তে পারে না এমন অদ্ভুত পাখি, যেমন অস্ট্রেলিয়ার এমু এবং নিউজিল্যান্ডের কিউই এই মহাদেশেই দেখা যায়।
আলাদা হওয়ার কারণ:
- ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা: লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর স্থলভাগগুলি যখন ভাঙতে শুরু করে, তখন ওশিয়ানিয়া মহাদেশ অন্যান্য মহাদেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্য কোনো মহাদেশের প্রাণীদের সাথে এদের কোনো যোগাযোগ না থাকায়, এখানকার প্রাণীদের বিবর্তন বা বেড়ে ওঠা সম্পূর্ণ আলাদা এবং অদ্ভুতভাবে হয়েছে।