অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 2 অস্তিত পৃথিবী, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 2: অস্থিত পৃথিবী
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. চিত্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন পাত সীমানার (Plate Boundaries) বর্ণনা দাও এবং এদের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি আলোচনা করো।

[Image showing Convergent, Divergent, and Transform plate boundaries]

উত্তর দেখো
ভূমিকা: পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর কঠিন শিলামণ্ডল 6টি প্রধান এবং কয়েকটি ছোটো পাতে বিভক্ত। ভূগর্ভের পরিচলন স্রোতের কারণে এই পাতগুলি সর্বদা গতিশীল। পাতগুলির এই চলনের ওপর ভিত্তি করে পাত সীমানাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

1. অভিসারী বা বিনাশী পাত সীমানা:

  • বর্ণনা: যখন দুটি পাত একে অপরের দিকে অগ্রসর হয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে। এই সংঘর্ষের ফলে ভারী পাতটি হালকা পাতের নীচে ঢুকে গিয়ে পৃথিবীর অভ্যন্তরের প্রচণ্ড তাপে গলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই একে ‘বিনাশী’ পাত সীমানাও বলে।
  • সৃষ্ট ভূমিরূপ: দুটি পাতের প্রবল চাপে মাঝখানের পলিস্তর ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বত (যেমন- এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের আল্পস) সৃষ্টি করে। এছাড়া এই সীমানায় সমুদ্রখাত এবং আগ্নেয়গিরিও সৃষ্টি হয়।

2. প্রতিসারী বা গঠনকারী পাত সীমানা:

  • বর্ণনা: যখন দুটি পাত একে অপরের থেকে বিপরীত দিকে বা দূরে সরে যায়, তখন তাকে প্রতিসারী পাত সীমানা বলে। পাত দুটি দূরে সরে যাওয়ার ফলে মাঝখানের ফাটল দিয়ে ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে আসে এবং ঠান্ডা হয়ে নতুন ভূতক তৈরি করে। তাই একে ‘গঠনকারী’ পাত সীমানাও বলে।
  • সৃষ্ট ভূমিরূপ: এই সীমানায় মহাসাগরের তলদেশে সামুদ্রিক শৈলশিরা (যেমন- মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা) এবং গ্রস্ত উপত্যকা সৃষ্টি হয়।

3. নিরপেক্ষ পাত সীমানা:

  • বর্ণনা: যখন দুটি পাত একে অপরের সমান্তরালে বা পাশাপাশি ঘষে অগ্রসর হয়, তখন তাকে নিরপেক্ষ পাত সীমানা বলে। এখানে ভূতক ধ্বংস বা সৃষ্টি কোনোটিই হয় না।
  • সৃষ্ট ভূমিরূপ: পাতের প্রবল ঘর্ষণের ফলে এই সীমানায় চ্যুতি বা ফাটল সৃষ্টি হয় এবং ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটে (যেমন- উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ‘সান আন্দ্রিয়াজ চ্যুতি’)।

2. ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রধান প্রাকৃতিক কারণগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত বিপুল শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠের কোনো অংশকে ক্ষণিকের জন্য প্রবলভাবে কাঁপিয়ে তুললে তাকে ভূমিকম্প বলে। ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রধান প্রাকৃতিক কারণগুলি হলো:

1. পাত সঞ্চালন (প্রধান কারণ):
ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো পৃথিবীর পাতগুলির চলন। পৃথিবীর শিলামণ্ডল কতগুলি ভাসমান ও গতিশীল পাতে বিভক্ত।

  • দুটি পাত যখন প্রবল বেগে একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় (অভিসারী সীমানা) বা পাশাপাশি ঘষে যায় (নিরপেক্ষ সীমানা), তখন প্রবল ঘর্ষণের ফলে ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তি তরঙ্গ আকারে বাইরে বেরিয়ে এসে ভয়াবহ ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে। যেমন- 2015 সালের নেপালের ভূমিকম্প ভারতীয় ও ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফল।

2. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত:
আগ্নেয়গিরি থেকে যখন প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা, গ্যাস ও বাষ্প প্রচণ্ড বেগে বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন সেই প্রচণ্ড ধাক্কায় জ্বালামুখের পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যেমন- 1883 সালে ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে প্রবল ভূমিকম্প ও সুনামি হয়েছিল।

3. চ্যুতি বা ফাটল গঠন:
ভূ-আলোড়নের ফলে পৃথিবীর কঠিন শিলাস্তরে যখন বড়ো ধরনের ফাটল বা চ্যুতির সৃষ্টি হয়, তখন শিলাস্তরের স্থানচ্যুতির কারণে ভূগর্ভে প্রবল কম্পন তৈরি হয়, যা ভূমিকম্পরূপে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে।

4. ধস ও হিমানী সম্প্রপাত:
অনেক সময় উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বিশাল পাথরের স্তূপ বা ধস নীচে নেমে আসে। আবার শীতপ্রধান দেশে পাহাড়ের চূড়া থেকে বরফের বিশাল চাঁই বা হিমানী সম্প্রপাত প্রচণ্ড বেগে নীচে আছড়ে পড়ে। এর ফলেও স্থানীয়ভাবে মৃদু ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

3. অগ্ন্যুৎপাতের সক্রিয়তা বা স্থায়িত্ব অনুসারে আগ্নেয়গিরির শ্রেণিবিভাগ করো এবং প্রতিটি ভাগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

[Image showing Active, Dormant, and Extinct volcanoes]

উত্তর দেখো
ভূমিকা: ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসাকে অগ্ন্যুৎপাত বলে। এই অগ্ন্যুৎপাতের সক্রিয়তা, স্থায়িত্ব বা প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর আগ্নেয়গিরিগুলিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

1. জীবন্ত বা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি:

  • বিবরণ: যেসব আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এখনো পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বা প্রায়শই অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়ে চলেছে, তাদের জীবন্ত আগ্নেয়গিরি বলে। এই ধরনের আগ্নেয়গিরিগুলি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এদের জ্বালামুখ দিয়ে প্রতিনিয়ত ধোঁয়া, ছাই ও লাভা নির্গত হয়।
  • উদাহরণ: ভারতের আন্দামান সাগরে অবস্থিত ব্যারেন দ্বীপ, ইতালির মাউন্ট এটনা এবং স্ট্রম্বলি।

2. সুপ্ত আগ্নেয়গিরি:

  • বিবরণ: যেসব আগ্নেয়গিরিতে অতীতে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে দীর্ঘকাল ধরে শান্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় আছে, তাদের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বলে। তবে এগুলি ভবিষ্যতেও যেকোনো সময় পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ভয়ঙ্করভাবে জেগে উঠতে পারে, তাই এগুলি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির চেয়েও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়।
  • উদাহরণ: জাপানের ফুজিয়ামা এবং ইতালির ভিসুভিয়াস।

3. মৃত আগ্নেয়গিরি:

  • বিবরণ: যেসব আগ্নেয়গিরিতে সুদীর্ঘকাল ধরে (কয়েক হাজার বা লক্ষ বছর) কোনো অগ্ন্যুৎপাত হয়নি এবং জ্বালামুখগুলি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বা হ্রদে পরিণত হয়েছে, তাদের মৃত আগ্নেয়গিরি বলে। ভবিষ্যতে এদের অগ্ন্যুৎপাত হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
  • উদাহরণ: মায়ানমারের পোপো এবং মেক্সিকোর পারিকুটিন।

4. ভূমিকম্পের প্রধান তিনটি ফলাফল বা প্রভাব আলোচনা করো। সুনামি কী? (3+2=5)

উত্তর দেখো
ভূমিকম্পের ফলাফল বা প্রভাব:

  • জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি: প্রবল ভূমিকম্পের ফলে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, রেললাইন নিমেষের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রচুর মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
  • ফাটল ও চ্যুতি সৃষ্টি: ভূমিকম্পের তীব্রতায় অনেক সময় ভূপৃষ্ঠে বিশাল ফাটল বা চ্যুতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
  • ধস নামা: পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্পের ফলে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায় এবং জনবসতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সুনামি (Tsunami):

  • সমুদ্রের তলদেশে রিখটার স্কেলে 7 বা তার বেশি মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হলে, সমুদ্রের জল ফুলে ওঠে। এরপর সেই জলরাশি বিশাল ও ধ্বংসাত্মক ঢেউয়ের আকার ধারণ করে যখন প্রবল বেগে উপকূলে আছড়ে পড়ে, তখন তাকে সুনামি বলে। 2004 সালে ভারত মহাসাগরে এই সুনামির ফলেই দক্ষিণ ভারতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

5. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পরিবেশ ও মানুষের কী কী সুফল এবং কুফল দেখা যায়? ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা’ বলতে কী বোঝো? (3+2=5)

উত্তর দেখো
অগ্ন্যুৎপাতের সুফল (উপকারিতা):

  • আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত লাভা জমে যে কালো মাটির সৃষ্টি হয়, তা কার্পাস বা তুলা চাষের জন্য অত্যন্ত উর্বর (যেমন- ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চল)।
  • অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভের গভীরের অনেক মূল্যবান খনিজ পদার্থ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছাকাছি চলে আসে, যা পরে মানুষ খনি থেকে উত্তোলন করতে পারে।

অগ্ন্যুৎপাতের কুফল (অপকারিতা):

  • প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ফলে নির্গত উত্তপ্ত লাভা, ছাই ও বিষাক্ত গ্যাসে সংলগ্ন এলাকার জীবজন্তু ও জনবসতি সম্পূর্ণ ছাই চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা (Pacific Ring of Fire):

  • প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল বরাবর পৃথিবীর প্রায় 70 শতাংশ জীবন্ত আগ্নেয়গিরি একটি আংটি বা বলয়ের মতো অবস্থান করছে। আগ্নেয়গিরিগুলির এই ভয়াবহ ও বলয়াকার শৃঙ্খলটিকেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা বলা হয়। জাপানের মতো দেশগুলি এই বলয়ের ওপর অবস্থিত হওয়ায় সেখানে এত বেশি ভূমিকম্প হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার