অষ্টম শ্ৰেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 3 ঔপনিবেশিক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় ৩: ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৩)
নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
1. লর্ড কর্নওয়ালিস কেন ভারতে সিভিল সার্ভিস বা অসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করেন?
উত্তর দেখো
- দুর্নীতি দমন: কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্য ও উপঢৌকন নেওয়ার ফলে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কর্নওয়ালিস এই দুর্নীতি বন্ধ করে একটি সৎ প্রশাসন গড়তে চেয়েছিলেন।
- দক্ষ আমলাতন্ত্র গঠন: বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজস্ব আদায় এবং শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একদল দক্ষ, শিক্ষিত ও পেশাদার প্রশাসনিক আধিকারিকের প্রয়োজন ছিল।
- শাসন ও বাণিজ্যের পৃথকীকরণ: কোম্পানির বাণিজ্যিক কাজ এবং প্রশাসনিক কাজকে সম্পূর্ণ আলাদা করার জন্যই লর্ড কর্নওয়ালিস এই অসামরিক প্রশাসনের সূত্রপাত করেন।
2. সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থায় ভারতীয়দের কেন উচ্চপদে নিয়োগ করা হতো না?
উত্তর দেখো
- ব্রিটিশদের বর্ণবিদ্বেষ: কর্নওয়ালিস ভারতীয়দের প্রতি চরম অবজ্ঞাপূর্ণ ও বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করতেন। তাঁর ধারণা ছিল ভারতীয়রা স্বভাবগতভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত, অসৎ এবং দায়িত্ব পালনে অযোগ্য।
- সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ: ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করার জন্য তিনি প্রশাসনের সমস্ত উচ্চপদে এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়দেরই বিশ্বাস করতেন।
- বেতন বৈষম্য: ভারতীয়দের শুধুমাত্র নিম্নপদে (যেমন- মুনসেফ বা সদর আমিন) অতি সামান্য বেতনে কাজ দেওয়া হতো, যাতে প্রশাসনে ব্রিটিশ আধিপত্য অটুট থাকে।
3. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এটি কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়?
উত্তর দেখো
উদ্দেশ্য: ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আগত তরুণ সিভিল সার্ভেন্টদের (ব্রিটিশ আমলাদের) ভারতের দেশীয় ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, আইনকানুন এবং রীতিনীতি সম্পর্কে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়াই ছিল এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য।
বন্ধের কারণ: ব্রিটিশ কোম্পানির ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরস’ ভারতে এই ধরনের কলেজ পরিচালনার বিপুল খরচ এবং কলেজটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্বাধীন চিন্তাধারাকে ভালোভাবে নেয়নি। তাই তাদের নির্দেশে কলেজটির প্রশিক্ষণ বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং 1806 সালে ইংল্যান্ডে হেইলিবারি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
4. লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘দারোগা ব্যবস্থা’ কী? এর প্রধান ত্রুটি কী ছিল?
উত্তর দেখো
ত্রুটি: এই ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি ছিল দারোগাদের অসীম ক্ষমতা এবং সীমাহীন দুর্নীতি। দারোগাদের কাজের ওপর নজরদারির জন্য ম্যাজিস্ট্রেট থাকলেও, বাস্তবে দারোগারা সাধারণ মানুষের ওপর চরম অত্যাচার, জোরজুলুম ও চাঁদাবাজি করত। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে দারোগারা এক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
5. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে ‘সিপাহি’ কারা ছিল? তাদের সামাজিক অবস্থান কেমন ছিল?
উত্তর দেখো
সামাজিক অবস্থান: সিপাহিদের বেশিরভাগই ছিল উত্তর ভারতের অযোধ্যা এবং বিহার অঞ্চলের সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। এরা মূলত উচ্চবর্ণের (ব্রাহ্মণ বা রাজপুত) হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায় থেকে আসত। নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতি, জাতপাত ও সামাজিক সম্মান সম্পর্কে তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের সংঘাতের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
6. ‘কর্নওয়ালিস কোড’ (1793) কী? এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
বৈশিষ্ট্য: এই কোডের মাধ্যমে জেলা কালেক্টরদের হাত থেকে বিচারের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এতে স্পষ্ট করে বলা হয় যে, প্রশাসন সবার ঊর্ধ্বে নয় এবং সাধারণ মানুষ চাইলে সরকারি আধিকারিকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও নিম্ন বা উচ্চ আদালতে বিচার চাইতে পারবে।
7. ব্রিটিশ প্রবর্তিত ‘আইনের শাসন’ (Rule of Law) এবং ‘আইনের চোখে সমতা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
আইনের চোখে সমতা: এর অর্থ হলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ একই আইনের অধীনে সমান বিচার পাবে।
বাস্তব প্রয়োগ: যদিও ব্রিটিশরা কাগজে-কলমে এই নীতিগুলি প্রচার করেছিল, বাস্তবে এর প্রয়োগ ছিল অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট। ইউরোপীয়দের বিচারের জন্য আলাদা আদালত ও ব্রিটিশ বিচারক ছিল এবং তারা দেশীয়দের তুলনায় সর্বদাই বিশেষ ছাড় পেত।
8. ব্রিটিশ কোম্পানি কেন প্রথম দিকে ভারতে শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগী হয়নি?
উত্তর দেখো
- বাণিজ্যিক স্বার্থ: কোম্পানির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত থেকে সর্বাধিক মুনাফা অর্জন করা। জনশিক্ষার মতো অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থ ব্যয় করলে তাদের মুনাফা কমে যাবে বলে তারা মনে করত।
- রাজনৈতিক শঙ্কা: ব্রিটিশদের ভয় ছিল যে, ভারতীয়রা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হলে তাদের মধ্যে আধুনিক রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটবে, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
- নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা: ভারতীয়দের কোন ভাষায় (দেশীয় না ইংরেজি) শিক্ষা দেওয়া হবে, তা নিয়েও ব্রিটিশ প্রশাসকদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে দ্বন্দ্ব ও ধোঁয়াশা ছিল।
9. 1813 খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের (Charter Act) শিক্ষাগত গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
- প্রথম সরকারি অনুদান: এই আইনে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের প্রসারের জন্য প্রতি বছর অন্তত 1 লক্ষ টাকা ব্যয় করতে হবে।
- দায়িত্ব স্বীকার: এর ফলে প্রথমবার ব্রিটিশ সরকার ভারতে জনশিক্ষার প্রসারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি দায়িত্ব গ্রহণ করে।
- মিশনারিদের ছাড়পত্র: এই আইনের মাধ্যমেই খ্রিস্টান মিশনারিদের ভারতে এসে ধর্মপ্রচার এবং অবাধে স্কুল-কলেজ স্থাপনের আইনি অনুমতি দেওয়া হয়।
10. প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব (Orientalist-Anglicist controversy) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
- প্রাচ্যবাদী (Orientalists): এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক প্রমুখ মনে করতেন যে, এই টাকা সংস্কৃত, আরবি ও ফারসির মতো দেশীয় প্রাচীন শিক্ষার প্রসারেই ব্যয় করা উচিত।
- পাশ্চাত্যবাদী (Anglicists): অন্যদিকে লর্ড মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখ জোরালো দাবি করেন যে, এই অর্থ কেবল ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করতে হবে। এই মতানৈক্যই ইতিহাসে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্বন্দ্ব নামে পরিচিত।
11. ‘মেকলে মিনিট’ (Macaulay Minute)-এর মূল বক্তব্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
- প্রাচ্য শিক্ষার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন যে, ইউরোপের একটি ভালো গ্রন্থাগারের একটি মাত্র তাকের বই সমগ্র ভারত ও আরবের সাহিত্যের সমান।
- তিনি প্রস্তাব দেন যে, ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা তহবিলের সমস্ত অর্থ কেবল ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারেই ব্যয় করতে হবে।
- তাঁর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল অনুগত ভারতীয় তৈরি করা যারা “রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতবাদ, নৈতিকতা ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ”।
12. চার্লস উডের ডেসপ্যাচ (1854)-এর প্রধান সুপারিশগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
- প্রশাসনিক কাঠামো: শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রদেশে একটি করে শিক্ষা দপ্তর (Department of Education) গঠন করতে হবে।
- বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন: উচ্চশিক্ষার প্রসারে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে 1857 সালে কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- বিদ্যালয় ও অনুদান: গ্রাম স্তরে দেশীয় ভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং জেলা স্তরে ইংরেজি-বাংলা মিশ্র (অ্যাংলো-ভার্নাকুলার) স্কুল স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি স্কুলগুলিকে সরকারি অনুদান (Grant-in-aid) দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
13. ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর দেখো
- স্কুল ও কলেজ স্থাপন: মিশনারিরা বাংলার বিভিন্ন স্থানে প্রচুর স্কুল স্থাপন করেন। স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ কলকাতায় ‘জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন’ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন।
- শ্রীরামপুর ত্রয়ী: উইলিয়াম কেরি, জশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড 1800 সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করে দেশীয় ভাষায় ছাপাখানা তৈরি, পাঠ্যবই রচনা এবং শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী কাজ করেন।
- স্ত্রী শিক্ষা: সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ এবং নারী শিক্ষার প্রসারেও মিশনারিরাই প্রথম দিকে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
14. ভারতে আধুনিক শিক্ষা প্রসারে ডেভিড হেয়ারের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো。
উত্তর দেখো
- হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা: 1817 খ্রিস্টাব্দে রাধাকান্ত দেব ও স্যার হাইড ইস্টের সঙ্গে মিলে তিনি হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
- ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি: 1817 সালেই তিনি এই সোসাইটি গঠন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সস্তায় এবং বিনামূল্যে ছাত্রছাত্রীদের হাতে উন্নত মানের ছাপানো পাঠ্যবই তুলে দেওয়া।
- স্ত্রী শিক্ষা: তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি’ স্থাপন করে বহু অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুল এবং নারী শিক্ষার প্রসারে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে সাহায্য করেছিলেন।
15. ‘উপযোগিতাবাদ’ (Utilitarianism) তত্ত্বটি কীভাবে ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনকে প্রভাবিত করেছিল?
উত্তর দেখো
- প্রশাসনিক সংস্কার: এই তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ব্রিটিশ প্রশাসকরা মনে করতেন যে, আইনকানুন, বিচার ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমেই পশ্চাৎপদ ভারতীয় সমাজকে ‘সভ্য’ ও ‘সুখী’ করা সম্ভব।
- আইন প্রণয়ন: এর ফলেই ভারতে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন (যেমন কর্নওয়ালিস কোড), সতীদাহ প্রথা রদ, ঠগি দমন এবং অন্যান্য সামাজিক সংস্কারের কাজগুলি ব্রিটিশ সরকার দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করে, যাতে প্রশাসনের ‘উপযোগিতা’ বা কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।