দশম শ্রেণী: আঞ্চলিক ভূগোল অধ্যায় ৫ – ভারত
বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: ভারত (প্রাকৃতিক) | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-৮ | পূর্ণমান: ৫
১. প্রস্থ বরাবর হিমালয় পর্বতের শ্রেণিবিভাগ করো এবং যেকোনো একটি ভাগের বর্ণনা দাও। (২+৩) [মাধ্যমিক ২০১৯]
শ্রেণিবিভাগ: প্রস্থ বরাবর বা দক্ষিণ থেকে উত্তরে হিমালয় পর্বতকে চারটি সমান্তরাল শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
- শিবালিক বা অব-হিমালয়।
- হিমাচল বা মধ্য হিমালয়।
- হিমাদ্রি বা উচ্চ হিমালয়।
- টেথিস বা ট্রান্স হিমালয়।
শিবালিক হিমালয়ের বর্ণনা:
- অবস্থান: এটি হিমালয়ের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত এবং সবচেয়ে নবীন অংশ।
- উচ্চতা: গড় উচ্চতা ৬০০ থেকে ১৫০০ মিটার।
- গঠন: হিমালয়ের নদীগুলি দ্বারা বাহিত পলি, বালি ও নুড়ি সঞ্চিত হয়ে এবং পরে ভাঁজ খেয়ে এটি গঠিত হয়েছে।
- বৈশিষ্ট্য: শিবালিক ও হিমাচলের মাঝখানে সমতল উপত্যকা দেখা যায়, যাকে ‘দুন’ বলে (যেমন- দেরাদুন)।
[attachment_0](attachment)
২. পশ্চিম হিমালয়ের ভূপ্রকৃতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। [মাধ্যমিক ২০১৭]
পশ্চিম হিমালয় মূলত জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত। একে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- ১. কাশ্মীর হিমালয়: এখানে পীরপঞ্জল ও জাস্কর পর্বতশ্রেণি দেখা যায়। এদের মাঝখানে বিখ্যাত ‘কাশ্মীর উপত্যকা’ অবস্থিত। এখানকার কারেওয়া মাটিতে জাফরান চাষ হয়।
- ২. হিমাচল হিমালয়: এখানে ধৌলাধর, পীরপঞ্জল ও নাগটিব্বা পর্বতশ্রেণি দেখা যায়। কুলু ও কাংড়া উপত্যকা এবং শিমলা, মানালি, ডালহৌসি শৈলশহরগুলি এখানেই অবস্থিত।
- ৩. কুমায়ুন হিমালয়: উত্তরাখণ্ডের এই অংশে নন্দাদেবী, কামেট, ত্রিশূল প্রভৃতি শৃঙ্গ রয়েছে। নৈনিতাল, ভীমতাল প্রভৃতি হ্রদ বা ‘তাল’ এখানকার বৈশিষ্ট্য। গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী হিমবাহ এখানেই অবস্থিত।
৩. উত্তর ভারতের নদনদী ও দক্ষিণ ভারতের নদনদীর মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো। (যেকোনো ৫টি) [মাধ্যমিক ২০১৮]
| বিষয় | উত্তর ভারতের নদনদী | দক্ষিণ ভারতের নদনদী |
|---|---|---|
| ১. উৎপত্তি | বরফগলা জল বা হিমালয়ের হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হয়। | বৃষ্টির জল বা মালভূমির ঝরনা থেকে সৃষ্টি হয়। |
| ২. প্রবাহ | সারা বছর জল থাকে (নিত্যবহ)। | গ্রীষ্মকালে জল শুকিয়ে যায় বা কমে যায় (অনিত্যবহ)। |
| ৩. দৈর্ঘ্য | নদীগুলির দৈর্ঘ্য অনেক বেশি (যেমন- গঙ্গা, সিন্ধু)। | নদীগুলির দৈর্ঘ্য তুলনামূলকভাবে কম (যেমন- গোদাবরী, কৃষ্ণা)। |
| ৪. নাব্যতা | সমভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এগুলি নাব্য। | বন্ধুর মালভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এগুলি নাব্য নয়। |
| ৫. বদ্বীপ | মোহনায় বিশাল বদ্বীপ দেখা যায়। | সব নদীর মোহনায় বদ্বীপ নেই (নর্মদা-তাপ্তী)। |
৪. পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি ও পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]
| বিষয় | পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি | পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি |
|---|---|---|
| ১. অবস্থান | আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতের মাঝখানে অবস্থিত। | বঙ্গোপসাগর ও পূর্বঘাট পর্বতের মাঝখানে অবস্থিত। |
| ২. প্রস্থ | এটি সংকীর্ণ (গড় প্রস্থ ৬৫ কিমি)। | এটি বেশ চওড়া বা প্রশস্ত (গড় প্রস্থ ১০০ কিমি)। |
| ৩. বদ্বীপ | নদীগুলি খরস্রোতা হওয়ায় কোনো বদ্বীপ নেই। | মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরীর মোহনায় বিশাল বদ্বীপ আছে। |
| ৪. হ্রদ | এখানে কয়াল বা লেগুন দেখা যায় (যেমন- ভেমবানাথ)। | এখানে চিল্কা, পুলিকট ও কোলেরু হ্রদ দেখা যায়। |
| ৫. বৃষ্টিপাত | এখানে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়। | এখানে তুলনামূলকভাবে কম বৃষ্টি হয় (শীতেও বৃষ্টি হয়)। |
[attachment_1](attachment)
৫. ভারতের জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি (Factors) আলোচনা করো।
ভারতের জলবায়ু বৈচিত্র্যময়। এর প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি হলো:
- ১. অক্ষাংশ: কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের মাঝখান দিয়ে গেছে। তাই দক্ষিণ ভারত ক্রান্তীয় (উষ্ণ) এবং উত্তর ভারত উপক্রান্তীয় (নাতিশীতোষ্ণ) জলবায়ুর অন্তর্গত।
- ২. হিমালয়ের অবস্থান: হিমালয় পর্বত উত্তরের সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিশীতল বাতাসকে বাধা দিয়ে ভারতকে প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে রক্ষা করে এবং মৌসুমি বায়ুকে বাধা দিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- ৩. সমুদ্র থেকে দূরত্ব: সমুদ্রের কাছের স্থানগুলি (মুম্বাই, চেন্নাই) সমভাবাপন্ন হয়, কিন্তু সমুদ্র থেকে দূরের স্থানগুলি (দিল্লি) চরমভাবাপন্ন হয়।
- ৪. মৌসুমি বায়ু: ভারতের জলবায়ু মূলত মৌসুমি বায়ুর আসা-যাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। এটিই বৃষ্টিপাত ও ঋতু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে।
৬. ভারতের পলিমৃত্তিকা ও কৃষ্ণমৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য এবং বন্টন আলোচনা করো।
ক) পলি মৃত্তিকা (Alluvial Soil):
- বৈশিষ্ট্য: এটি নদীর পলি সঞ্চয়ে গঠিত, তাই খুব উর্বর। এতে পটাশ ও চুন বেশি থাকে। এটি খাদার (নবীন) ও ভাঙর (প্রাচীন) এই দুই প্রকারের হয়।
- বন্টন: সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সমভূমি এবং উপকূলীয় সমভূমিতে দেখা যায়। (ধান, গম, পাট চাষ হয়)।
খ) কৃষ্ণ মৃত্তিকা (Black Soil):
- বৈশিষ্ট্য: লাভা গঠিত ব্যাসল্ট শিলা থেকে সৃষ্ট। এর রং কালো এবং জলধারণ ক্ষমতা খুব বেশি। একে ‘রেগুর’ বলে।
- বন্টন: মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের দাক্ষিণাত্য মালভূমি অঞ্চলে দেখা যায়। (কার্পাস বা তুলা চাষের জন্য সেরা)।
[attachment_2](attachment)
৭. ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের ওপর জলবায়ুর প্রভাব আলোচনা করো। (শ্রেণিবিভাগ সহ)
বৃষ্টিপাত ও উষ্ণতার ওপর ভিত্তি করে ভারতের উদ্ভিদকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়:
- ১. ক্রান্তীয় চিরহরিৎ: যেখানে বৃষ্টিপাত ২০০ সেমির বেশি (পশ্চিমঘাট, আন্দামান, উত্তর-পূর্ব ভারত), সেখানে মেহগনি, রবার, রোজউড জন্মায়।
- ২. ক্রান্তীয় পর্ণমোচী: যেখানে বৃষ্টিপাত ১০০-২০০ সেমি (বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ), সেখানে শাল, সেগুন, পলাশ জন্মায়। শীতে পাতা ঝরে যায়।
- ৩. মরু উদ্ভিদ: যেখানে বৃষ্টিপাত খুব কম (৫০ সেমির নিচে, রাজস্থান), সেখানে ক্যাকটাস, বাবলা, ফনিমনসা জন্মায়।
- ৪. পার্বত্য উদ্ভিদ: হিমালয়ের উচ্চতা অনুযায়ী ওক, পাইন, ফার, দেবদারু (সরলবর্গীয়) জন্মায়।
- ৫. ম্যানগ্রোভ: উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে (সুন্দরবন) সুন্দরী, গড়ান, গেঁওয়া জন্মায়।
৮. ভারতের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
- ১. মৌসুমি বায়ুর প্রভাব: ভারতের জলবায়ু সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি বায়ুর খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভরশীল।
- ২. ঋতু পরিবর্তন: এখানে চারটি প্রধান ঋতু (গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, শীত) চক্রাকারে আবর্তিত হয়।
- ৩. উষ্ণ আর্দ্র গ্রীষ্ম ও শুষ্ক শীত: গ্রীষ্মকালে প্রবল গরম ও আর্দ্রতা থাকে, কিন্তু শীতকাল সাধারণত শুষ্ক ও আরামদায়ক হয়।
- ৪. অসম বৃষ্টিপাত: বৃষ্টিপাত সব জায়গায় সমান হয় না। মৌসিনরামে ১২০০ সেমি বৃষ্টি হয়, আবার রাজস্থানে মাত্র ২৫ সেমি বৃষ্টি হয়।
বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-২)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: ভারত (অর্থনৈতিক) | প্রশ্ন সংখ্যা: ৯-১৬ | পূর্ণমান: ৫
৯. ধান চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ (উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত, মৃত্তিকা) বর্ণনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭, ২০১৯]
ধান ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য। এটি ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর ফসল।
- উষ্ণতা: ধান চাষের জন্য গড়ে ২০°C থেকে ৩০°C উষ্ণতা প্রয়োজন। চারা বেরোনোর সময় কম এবং পাকার সময় বেশি উষ্ণতা লাগে।
- বৃষ্টিপাত: প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। গড়ে ১০০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাত বাঞ্ছনীয়। গাছের গোড়ায় জল জমে থাকা দরকার।
- মৃত্তিকা: উর্বর পলিমাটি বা দোআঁশ মাটি এবং এঁটেল মাটি (জল ধরে রাখতে পারে) ধান চাষের জন্য আদর্শ। নদীর পলিগঠিত সমভূমি ও বদ্বীপ অঞ্চল শ্রেষ্ঠ।
- ভূপ্রকৃতি: জল ধরে রাখার জন্য সমতল জমি প্রয়োজন। পাহাড়ি এলাকায় ধাপ কেটে চাষ করা হয়।
[attachment_0](attachment)
১০. গম চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ আলোচনা করো।
গম ভারতের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। এটি নাতিশীতোষ্ণ বা উপক্রান্তীয় জলবায়ুর ফসল (রবি শস্য)।
- উষ্ণতা: গম চাষের জন্য ১৫°C থেকে ২০°C উষ্ণতা আদর্শ। বুননোর সময় শীতল এবং পাকার সময় রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া প্রয়োজন।
- বৃষ্টিপাত: ৫০-১০০ সেমি বৃষ্টিপাত যথেষ্ট। শীতকালীন পশ্চিমী ঝঞ্ঝার বৃষ্টি গম চাষে খুব উপকার করে।
- মৃত্তিকা: হালকা দোআঁশ বা পলিমাটি গম চাষের পক্ষে ভালো। কালো বা রেগুর মাটিতেও গম ভালো হয়।
- ভূপ্রকৃতি: জল নিকাশি ব্যবস্থা যুক্ত মৃদু ঢালু বা সমতল জমি প্রয়োজন, কারণ গমের গোড়ায় জল জমলে গাছ পচে যায়।
১১. চা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ বর্ণনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
চা একটি বাগিচা ফসল এবং পানীয়।
- জলবায়ু: উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু প্রয়োজন। ২০°C-৩০°C উষ্ণতা এবং ১৫০-২৫০ সেমি বৃষ্টিপাত আদর্শ। সকালে কুয়াশা এবং শিশির পাতার গন্ধ ও স্বাদ বাড়ায়।
- মৃত্তিকা: লৌহ ও জৈব পদার্থ মিশ্রিত উর্বর দোআঁশ মাটি (আম্লিক প্রকৃতির) চা চাষের জন্য সেরা।
- ভূপ্রকৃতি: পাহাড়ের ঢালু জমি প্রয়োজন যাতে গাছের গোড়ায় জল না জমে। জল জমলে চা গাছের শেকড় পচে যায়। তাই দার্জিলিং ও আসামের পাহাড়ি ঢালে চা ভালো হয়।
- ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ: প্রখর রোদ থেকে চারাগাছকে বাঁচাতে বাগানের মাঝে মাঝে বড় গাছ লাগানো হয়।
১২. কার্পাস বা তুলা চাষের অনুকূল পরিবেশ আলোচনা করো।
- উষ্ণতা: ২০°C-২৭°C উষ্ণতা প্রয়োজন। তুষারপাত কার্পাস গাছের ক্ষতি করে, তাই অন্তত ২০০টি তুষারমুক্ত দিন (Frost free days) থাকা দরকার।
- বৃষ্টিপাত: ৫০-১০০ সেমি বৃষ্টিপাত যথেষ্ট। তবে গুটি পাকার সময় রৌদ্রোজ্জ্বল শুষ্ক আবহাওয়া প্রয়োজন।
- মৃত্তিকা: চুন ও লবণ মিশ্রিত লাভা গঠিত কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা রেগুর কার্পাস চাষের জন্য আদর্শ।
- ভূপ্রকৃতি: জল নিকাশি যুক্ত সমতল বা মৃদু ঢালু জমি প্রয়োজন।
১৩. পূর্ব ও মধ্য ভারতে লৌহ-ইস্পাত শিল্পের একদেশীভবন বা কেন্দ্রীভবনের কারণগুলি লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭, ২০১৯]
দুর্গাপুর, জামশেদপুর, রৌরকেল্লা, বোকারো, ভিলাই—ভারতের প্রায় সব বড় লৌহ-ইস্পাত কেন্দ্র পূর্ব ও মধ্য ভারতে অবস্থিত। এর কারণ:
- কাঁচামালের সহজলভ্যতা: ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার খনি থেকে আকরিক লোহা (সিংভূম, ময়ূরভঞ্জ) এবং রানিগঞ্জ ও ঝরিয়া থেকে কয়লা প্রচুর পরিমাণে ও সস্তায় পাওয়া যায়।
- অন্যান্য খনিজ: চুনাপাথর, ডলোমাইট ও ম্যাঙ্গানিজ আশেপাশের এলাকা (গাংপুর, সুন্দরগড়) থেকে সহজেই মেলে।
- জলের জোগান: দামোদর, সুবর্ণরেখা, মহানদী ও ব্রাহ্মণী নদী থেকে পর্যাপ্ত জল পাওয়া যায়।
- পরিবহণ ও বন্দর: কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নৈকট্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের সুবিধা পণ্য আমদামি-রপ্তানিতে সাহায্য করে।
[attachment_1](attachment)
১৪. পশ্চিম ভারতে (মহারাষ্ট্র ও গুজরাট) কার্পাস বয়ন শিল্পের উন্নতির বা একদেশীভবনের কারণগুলি আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
মুম্বাই, আমেদাবাদ, সুরাট অঞ্চলে কার্পাস শিল্পের উন্নতির কারণ:
- কাঁচামাল: দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণ মৃত্তিকা অঞ্চলে প্রচুর কার্পাস বা তুলা উৎপাদিত হয়, তাই কাঁচামালের অভাব হয় না।
- আর্দ্র জলবায়ু: আরব সাগরের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার জলবায়ু আর্দ্র, যা সুতো ছিঁড়ে যাওয়া রোধ করে এবং বয়ন শিল্পের জন্য আদর্শ।
- শক্তি সম্পদ: পশ্চিমঘাট পর্বতের জলবিদ্যুৎ এবং স্থানীয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সুলভ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
- বন্দর ও বাজার: মুম্বাই ও কান্দালা বন্দরের সুবিধা এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সুতিবস্ত্রের বিপুল চাহিদা রয়েছে।
১৫. ভারতের জনসংখ্যার অসম বন্টনের পাঁচটি প্রধান কারণ আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]
ভারতের সব জায়গায় জনসংখ্যা সমান নয় (গাঙ্গেয় সমভূমিতে বেশি, হিমালয়ে কম)। কারণগুলি হলো:
- ১. ভূপ্রকৃতি: সমভূমি অঞ্চল কৃষি, শিল্প ও যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক হওয়ায় জনবসতি ঘন হয়। কিন্তু পাহাড়ি বা মালভূমি এলাকা বন্ধুর হওয়ায় জনবিরল।
- ২. নদনদী ও জলবায়ু: জলের সহজলভ্যতা এবং আরামদায়ক জলবায়ু (নাতিশীতোষ্ণ) জনবসতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। মরু বা অতিশীতল অঞ্চলে লোকসংখ্যা কম।
- ৩. মৃত্তিকা ও কৃষি: উর্বর পলিমাটিযুক্ত অঞ্চলে (যেমন- উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ) কৃষি কাজ ভালো হয়, তাই জনঘনত্ব বেশি।
- ৪. শিল্প ও নগরায়ণ: শিল্পোন্নত অঞ্চল এবং বড় শহরগুলিতে (মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতা) কর্মসংস্থানের টানে প্রচুর মানুষ বসবাস করে।
[attachment_2](attachment)
১৬. ভারতের অর্থনীতিতে রেলপথের গুরুত্ব আলোচনা করো।
রেলপথকে ‘ভারতের জীবনরেখা’ বলা হয়। এর গুরুত্ব অপরিসীম:
- ১. পণ্য পরিবহণ: কয়লা, লোহা, সার, খাদ্যশস্য প্রভৃতি ভারী পণ্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কম খরচে নিয়ে যেতে রেলপথের জুড়ি নেই।
- ২. যাতায়াত: ভারতের মতো বিশাল দেশে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন সস্তায় ও নিরাপদে যাতায়াতের জন্য রেলের ওপর নির্ভরশীল।
- ৩. শিল্পায়ন: কাঁচামাল কারখানায় আনা এবং উৎপাদিত দ্রব্য বাজারে পৌঁছে দিয়ে রেল শিল্পায়নে সাহায্য করে।
- ৪. জাতীয় সংহতি: বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে যুক্ত করে রেল জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (অতিরিক্ত অংশ)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: ভারত (অতিরিক্ত) | প্রশ্ন সংখ্যা: ১৭-২৪ | পূর্ণমান: ৫
১৭. ইক্ষু বা আখ চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ বর্ণনা করো।
ইক্ষু ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফসল।
- উষ্ণতা: আখ চাষের জন্য ২১°C থেকে ২৭°C উষ্ণতা আদর্শ। চারা বেরোনোর সময় আর্দ্র এবং পাকার সময় শুষ্ক, রৌদ্রোজ্জ্বল ও ঠান্ডা আবহাওয়া প্রয়োজন। তুষারপাত আখের ক্ষতি করে।
- বৃষ্টিপাত: বছরে ১০০-১৫০ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। তবে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে জলসেচের সাহায্যে চাষ করা হয়। কাটার সময় বৃষ্টি হলে আখের মিষ্টতা কমে যায়।
- মৃত্তিকা: চুন ও লবণযুক্ত পলিমাটি বা দোআঁশ মাটি আখ চাষের জন্য সেরা। দক্ষিণ ভারতের কৃষ্ণ মৃত্তিকাতেও ভালো চাষ হয়।
- ভূপ্রকৃতি: জল নিকাশি ব্যবস্থা যুক্ত সমতল জমি প্রয়োজন। কারণ গোড়ায় জল জমলে আখের ক্ষতি হয়।
- শ্রমিক: আঁখ লাগানো, পরিচর্যা ও কাটার জন্য প্রচুর সুলভ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।
১৮. কফি চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ আলোচনা করো।
কফি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানীয় ফসল, যা মূলত দক্ষিণ ভারতে (কর্ণাটক, কেরল, তামিলনাড়ু) চাষ হয়।
- উষ্ণতা: ২০°C থেকে ৩০°C উষ্ণতা কফি চাষের জন্য আদর্শ। প্রখর রোদ বা তুষারপাত কফি গাছের ক্ষতি করে। তাই ছায়াপ্রদানকারী বড় গাছ (যেমন- ওক, সিলভার ওক) লাগানো হয়।
- বৃষ্টিপাত: ১৫০-২৫০ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। তবে ফুল ফোটার সময় অল্প বৃষ্টি (ব্লসম শাওয়ার) এবং ফল পাকার সময় শুষ্ক আবহাওয়া দরকার।
- মৃত্তিকা: লৌহ, পটাশ ও নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ লাল দোআঁশ মাটি বা লাভা সৃষ্ট মাটি কফি চাষের পক্ষে ভালো।
- ভূপ্রকৃতি: পাহাড়ের ঢালু জমি (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০-১৮০০ মিটার উঁচুতে) যেখানে জল দাঁড়ায় না, তা কফি চাষের জন্য আদর্শ।
১৯. ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প (IT Industry) গড়ে ওঠার কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।
বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ, পুনে, চেন্নাই ও গুরগাঁওয়ে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের ব্যাপক উন্নতির কারণ:
- ১. মেধা সম্পদ (Skilled Manpower): ভারতে প্রচুর সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (IIT, NIT) থাকায় সুলভে দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও ইংরেজি জানা কর্মী পাওয়া যায়।
- ২. সরকারি নীতি: ভারত সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক (STP) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) তৈরি করে কর ছাড় ও জমি দিয়ে সাহায্য করেছে।
- ৩. পরিকাঠামো: উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এই শিল্পের বিকাশে সাহায্য করেছে।
- ৪. জলবায়ু: বেঙ্গালুরু বা পুনের মতো শহরগুলির মনোরম নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু দীর্ঘক্ষণ মানসিক পরিশ্রমের জন্য অনুকূল, যা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করেছে।
- ৫. আন্তর্জাতিক বাজার: আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলির তুলনায় ভারতে কম খরচে কাজ (Outsourcing) করানো যায় বলে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে।
২০. ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং বা পূর্ত শিল্পের শ্রেণিবিভাগ করো এবং এর গড়ে ওঠার কারণ সংক্ষেপে লেখো।
শ্রেণিবিভাগ:
১) ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং: রেল ইঞ্জিন (চিত্তরঞ্জন), জাহাজ (বিশাখাপত্তনম), মোটরগাড়ি (চেন্নাই, গুরগাঁও), বিমান তৈরি।
২) হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং: সেলাই মেশিন, পাখা, সাইকেল, ঘড়ি, টাইপ রাইটার, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরি।
গড়ে ওঠার কারণ:
- কাঁচামাল: ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে লৌহ-ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা শিল্পের অবস্থান ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের কাঁচামাল জোগান দেয়।
- বিদ্যুৎ: তাপবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাচুর্য।
- বাজার ও চাহিদা: ভারতের বিশাল জনসংখ্যা এবং কৃষি ও শিল্পের যান্ত্রিকীকরণের ফলে যন্ত্রপাতির চাহিদা প্রচুর।
২১. মৃত্তিকা ক্ষয়ের কারণ এবং সংরক্ষণের উপায়গুলি আলোচনা করো। [খুব গুরুত্বপূর্ণ]
মৃত্তিকা ক্ষয়ের কারণ:
- বৃক্ষচ্ছেদন: গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখে। নির্বিচারে গাছ কাটলে মাটি আলগা হয়ে ধুয়ে যায়।
- অবাৈজ্ঞানিক কৃষি: পাহাড়ি ঢালে ধাপ না কেটে চাষ (ঝুম চাষ) এবং জমি ফেলে রাখা ক্ষয়ের কারণ।
- অতিপশুচারণ: পশুর খুরে মাটি আলগা হয় এবং ঘাসের আচ্ছাদন নষ্ট হয়।
সংরক্ষণের উপায়:
- ১. বনসৃজন: ব্যাপকভাবে গাছ লাগাতে হবে এবং সামাজিক বনসৃজন বাড়াতে হবে।
- ২. ধাপ চাষ (Terrace Farming): পাহাড়ি ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপ কেটে চাষ করলে জলের গতি কমে এবং মাটি ক্ষয় রোধ হয়।
- ৩. ফালি চাষ (Strip Cropping): ঢালু জমিতে আড়াআড়িভাবে ফালি তৈরি করে শস্য রোপণ করা।
- ৪. ঝোরা বা নালি ক্ষয় রোধ: ছোট ছোট নালাগুলিতে পাথর বা বাঁধ দিয়ে জলপ্রবাহ আটকানো (Check Dam)।
[attachment_0](attachment)
২২. অরণ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব আলোচনা করো।
মানুষ ও পরিবেশের অস্তিত্ব রক্ষায় অরণ্য সংরক্ষণ অপরিহার্য:
- ১. জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: গাছ বাতাস থেকে $CO_2$ শোষণ করে এবং $O_2$ ত্যাগ করে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করে।
- ২. বৃষ্টিপাত: বনভূমি বাষ্পমোচনের মাধ্যমে বাতাসে আর্দ্রতা যোগায় এবং বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে।
- ৩. মৃত্তিকা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ: গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রেখে ভূমিক্ষয় রোধ করে এবং বৃষ্টির জল শোষণ করে বন্যার প্রকোপ কমায়।
- ৪. অর্থনৈতিক গুরুত্ব: বন থেকে কাঠ, মধু, মোম, আঠা, ভেষজ ওষুধ এবং শিল্পের কাঁচামাল (কাগজ, রবার) পাওয়া যায়।
- ৫. জীববৈচিত্র্য: অরণ্য হলো বন্যপ্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। অরণ্যরক্ষা মানেই জীববৈচিত্র্য রক্ষা।
২৩. ভারতের নগরায়ণের (Urbanization) প্রধান সমস্যাগুলি আলোচনা করো।
ভারতে অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলি হলো:
- ১. বাসস্থানের অভাব ও বস্তি: গ্রামের মানুষ কাজের খোঁজে শহরে ভিড় করায় বাসস্থানের সংকট দেখা দেয়। এর ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশযুক্ত বস্তি (Slum) গড়ে ওঠে (যেমন- ধারাভি)।
- ২. যানজট ও পরিবহণ: অপ্রশস্ত রাস্তা এবং অতিরিক্ত গাড়ির চাপে যানজট নিত্যদিনের ঘটনা, যা সময় নষ্ট করে এবং দূষণ বাড়ায়।
- ৩. নিকাশি ও জলমগ্নতা: বেশিরভাগ শহরের নিকাশি ব্যবস্থা পুরনো ও অবৈজ্ঞানিক। সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যায় (Waterlogging) এবং রোগজীবাণু ছড়ায়।
- ৪. পরিবেশ দূষণ: কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়ায় বায়ু দূষণ এবং কঠিন বর্জ্যের স্তূপে মাটি ও জল দূষণ শহরের জনজীবনকে বিষিয়ে তুলছে।
- ৫. জল সংকট: ভৌমজলস্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।
২৪. ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সড়কপথের গুরুত্ব আলোচনা করো।
ভারতে সড়কপথ হলো পরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
- ১. যোগাযোগ: সড়কপথ দেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর, বাজার এবং শিল্পকেন্দ্রকে একে অপরের সাথে যুক্ত করে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলেও সড়কপথই একমাত্র ভরসা।
- ২. নমনীয়তা (Door to Door): সড়কপথের মাধ্যমে পণ্য বা যাত্রী সরাসরি বাড়ি থেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, যা রেল বা জলপথে সম্ভব নয়।
- ৩. কৃষিপণ্যের বিপণন: গ্রামের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পচনশীল ফসল (শাকসবজি, দুধ, মাছ) দ্রুত শহরের বাজারে পৌঁছে দিতে সড়কপথ ব্যবহার করে।
- ৪. পরিপূরক ভূমিকা: রেল স্টেশন বা বন্দরে পৌঁছানোর জন্যও সড়কপথের প্রয়োজন হয়। তাই এটি অন্যান্য পরিবহণ ব্যবস্থার পরিপূরক।
- ৫. কর্মসংস্থান: সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং যানবাহন চালনায় প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – ভারত (রচনাধর্মী)
প্রশ্ন: ইক্ষু বা আখ চাষের জন্য কেমন জলবায়ু প্রয়োজন?
[attachment_0](attachment)
প্রশ্ন: ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উন্নতির প্রধান কারণ কী?
প্রশ্ন: মৃত্তিকা ক্ষয় প্রতিরোধের সেরা উপায় কী?
প্রশ্ন: অপরিকল্পিত নগরায়নের প্রধান সমস্যাগুলি কী কী?
প্রশ্ন: সড়কপথের প্রধান সুবিধা কী?