দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় – ৪ সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর

বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-১০ | পূর্ণমান:


১. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র বিশ্লেষণ করো। এটি কি শুধুই সিপাহী বিদ্রোহ ছিল, নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। কেউ একে সিপাহী বিদ্রোহ, কেউ সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া, আবার কেউ প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেছেন।

বিভিন্ন মতবাদ:

  • সিপাহী বিদ্রোহ: জন লরেন্স, চার্লস রেইকস ও অনেক ভারতীয় ঐতিহাসিক (যেমন- অক্ষয়কুমার দত্ত) মনে করেন, এটি ছিল নিছকই সিপাহীদের বিশৃঙ্খলা। তাঁদের মতে, এনফিল্ড রাইফেলের টোটা বিতর্ককে কেন্দ্র করে সিপাহীরা ধর্মনাশের ভয়ে বিদ্রোহ করেছিল, এর কোনো জাতীয় রূপ ছিল না।
  • সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া: রজনীপাম দত্তের মতে, এটি ছিল ক্ষমতাচ্যুত রাজা ও জমিদারদের (যেমন- নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাই) হারানো গদি ফিরে পাওয়ার লড়াই। তাই তিনি একে ‘সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ’ বলেছেন।
  • জাতীয় বিদ্রোহ: কার্ল মার্কস ও ডিসরেলি একে ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ বলেছেন কারণ অযোধ্যা ও বিহারের সাধারণ মানুষ এতে ব্যাপকভাবে যোগ দিয়েছিল।
  • প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ: বিনায়ক দামোদর সাভারকার একে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেছেন। তাঁর মতে, এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে স্বরাজ স্থাপন করা এবং এতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য দেখা গিয়েছিল।

উপসংহার: আধুনিক বিচারে বলা যায়, এটি কেবল সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না, আবার পুরোপুরি স্বাধীনতা যুদ্ধও ছিল না। তবে এটিই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর প্রথম ব্যাপক ও সশস্ত্র গণজাগরণ।

২. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি আলোচনা করো। (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিলেও শেষপর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • ১. যোগ্য নেতৃত্বের অভাব: বিদ্রোহের কোনো সর্বভারতীয় নেতা ছিলেন না। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ছিলেন বৃদ্ধ ও দুর্বল। নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাই বা কুনওয়ার সিং নিজ নিজ অঞ্চলে লড়লেও তাঁদের মধ্যে সমন্বয় ছিল না।
  • ২. পরিকল্পনার অভাব: বিদ্রোহ ছিল অপরিকল্পিত ও স্বতঃস্ফূর্ত। বিপ্লবীদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য বা ভবিষ্যৎ ভারত গঠনের রূপরেখা ছিল না।
  • ৩. সীমিত বিস্তার: বিদ্রোহ মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলা, দক্ষিণ ভারত, পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশ প্রায় শান্ত ছিল।
  • ৪. উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের অভাব: ভারতীয়রা লড়ছিল তলোয়ার, বল্লম ও পুরনো গাদা বন্দুক নিয়ে। অন্যদিকে ব্রিটিশদের হাতে ছিল আধুনিক এনফিল্ড রাইফেল, কামান ও উন্নত রসদ।
  • ৫. জনসমর্থনের অভাব: শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, অধিকাংশ দেশীয় রাজা (যেমন- হায়দ্রাবাদের নিজাম, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া) এবং জমিদার শ্রেণি ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।

উপসংহার: এই সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ঐক্যের অভাবেই মহাবিদ্রোহ সফল হতে পারেনি।

৩. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ ও স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’-এর ভূমিকা আলোচনা করো। (৪+৪)

উত্তর:

ক) আনন্দমঠ ও জাতীয়তাবাদ:

  • দেশমাতৃকা: বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসে দেশকে ‘মা’ হিসেবে তুলে ধরেন। দেশসেবাকেই তিনি পরম ধর্ম বলে প্রচার করেন।
  • সন্তান দল: উপন্যাসের দেশপ্রেমিক সন্তান দলের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব যুবসমাজকে দেশের জন্য প্রাণ দিতে উদ্বুদ্ধ করে।
  • বন্দেমাতরম: এই উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি বিপ্লবীদের মন্ত্রে পরিণত হয়। ব্রিটিশ বিরোধী যেকোনো আন্দোলনে এটিই ছিল রণধ্বনি।

খ) বর্তমান ভারত ও জাতীয়তাবাদ:

  • আত্মবিশ্বাস জাগরণ: স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে পরাধীন ভারতবাসীকে হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে আত্মবিশ্বাসী হতে বলেন।
  • সামাজিক ঐক্য: তিনি বলেন, “হে ভারত ভুলিও না, নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।” এই বাণী জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করে।
  • স্বাধীনতার মন্ত্র: তিনি পরাধীনতাকে পাপ বলে গণ্য করতেন। তাঁর বাণী বিপ্লবীদের কাছে গীতার মতো পবিত্র ছিল।

৪. জাতীয়তাবাদের বিকাশে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের অবদান লেখো। (৪+৪)

উত্তর:

ক) অবনীন্দ্রনাথ ও ভারতমাতা:

  • প্রেক্ষাপট: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি আঁকেন।
  • চিত্রের বর্ণনা: ছবিতে ভারতমাতাকে গৈরিক বসন পরিহিতা, চার হাত বিশিষ্টা দেবী রূপে দেখানো হয়েছে। তাঁর চার হাতে রয়েছে—বেদ (শিক্ষা), ধানের শীষ (অন্ন), জপমালা (ধর্ম) এবং শ্বেতবস্ত্র (বাসস্থান)।
  • তাৎপর্য: এই ছবিটি প্রমাণ করে যে দেশমাতা তাঁর সন্তানদের অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষা দান করেন। এটি বিপ্লবীদের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

খ) গগনেন্দ্রনাথ ও ব্যঙ্গচিত্র:

  • সমালোচনা: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন এবং তৎকালীন বাবু সমাজের ভণ্ডামিকে তীব্র আক্রমণ করতেন।
  • উল্লেখযোগ্য চিত্র: তাঁর ‘যাঁতাকল’, ‘অদ্ভুত লোক’, ‘নয়া হুল্লোড়’ প্রভৃতি চিত্রে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের শোষণ করছে এবং বাবুরা কীভাবে ব্রিটিশদের তোষামোদ করছে।
  • প্রভাব: এই ছবিগুলি মানুষকে হাসানোর পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলত।

৫. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘ভারতসভা’ (Indian Association)-এর প্রতিষ্ঠা ও কার্যাবলী আলোচনা করো। (৩+৫)

উত্তর:

প্রতিষ্ঠা: ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর উদ্যোগে কলকাতায় ‘ভারতসভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার আগে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন।

কার্যাবলী ও আন্দোলন:

  • ১. সিভিল সার্ভিস আন্দোলন: লর্ড লিটন আই.সি.এস পরীক্ষার বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করলে ভারতসভা এর বিরুদ্ধে সারা ভারত জুড়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলে।
  • ২. অস্ত্র আইন ও ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট বিরোধী আন্দোলন: ১৮৭৮ সালে লর্ড লিটনের দমনমূলক আইনগুলোর বিরুদ্ধে ভারতসভা তীব্র জনমত গঠন করে।
  • ৩. ইলবার্ট বিল সমর্থন: লর্ড রিপনের সময় ইলবার্ট বিলের পক্ষে ভারতসভা প্রচার চালায়।
  • ৪. কৃষক আন্দোলন: রায়ত বা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ভারতসভা আন্দোলন করে, যার ফলে ১৮৮৫ সালে ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’ পাস হয়।
  • ৫. সর্বভারতীয় রূপ: ১৮৮৩ সালে ভারতসভা কলকাতায় ‘জাতীয় সম্মেলন’ (National Conference) আয়োজন করে, যা ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় জাতীয় সমাবেশ।

৬. ‘হিন্দুমেলা’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও জাতীয়তাবাদের বিকাশে এর ভূমিকা আলোচনা করো। (৪+৪)

উত্তর:

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় জাতীয়তাবাদের প্রসারে যে সকল সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দুমেলা’ বা ‘চৈত্রমেলা’ অন্যতম।

হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য:

  • ঐক্য স্থাপন: ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলা।
  • স্বদেশী ভাবধারা: দেশীয় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাশীল করে তোলা এবং বিদেশী পণ্য বর্জনে উৎসাহিত করা।
  • আত্মনির্ভরতা: শরীরচর্চা, লাঠিখেলা ও কুস্তির মাধ্যমে যুবসমাজকে আত্মনির্ভর ও সাহসী করে তোলা।

জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভূমিকা:

  • স্বদেশী শিল্পের প্রসার: এই মেলায় দেশীয় হস্তশিল্প, তাঁতবস্ত্র ও কৃষিপণ্যের প্রদর্শনী হতো, যা দেশীয় শিল্পোদ্যোগকে উৎসাহিত করত।
  • দেশাত্মবোধক গান: সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা “মিলে সব ভারত সন্তান” গানটি এই মেলাতেই প্রথম গাওয়া হয়, যা জাতীয়তাবাদের মন্ত্র হয়ে ওঠে।
  • শরীরচর্চা: পরাধীনতার গ্লানি মোচনের জন্য যুবকদের শারীরিক শক্তির বিকাশে এই মেলা বিশেষ জোর দিয়েছিল।

উপসংহার: যদিও এটি হিন্দু ধর্মের গণ্ডিতে কিছুটা সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও স্বদেশী আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

৭. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহিত্য ও লেখনীর ভূমিকা আলোচনা করো (বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের পরিপ্রেক্ষিতে)। (৮) [খুব গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর:

ভূমিকা: উনিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ কেবল রাজনীতির ময়দানে ঘটেনি, সাহিত্য ও দর্শনের জগতেও ঘটেছিল। এক্ষেত্রে তিন মনীষীর অবদান অনস্বীকার্য।

১. বঙ্কিমচন্দ্র ও আনন্দমঠ:

  • বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসে দেশমাতৃকাকে দেবীরূপে বন্দনা করেন।
  • উপন্যাসের দেশপ্রেমিক ‘সন্তান দল’-এর আত্মত্যাগ যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করে।
  • তাঁর রচিত ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি পরাধীন ভারতের জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়।

২. বিবেকানন্দ ও বর্তমান ভারত:

  • স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে পরাধীন ভারতবাসীকে হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে আত্মবিশ্বাসী হতে বলেন।
  • তিনি বলেন, “হে ভারত ভুলিও না… তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।”
  • তিনি ভারতের উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মানুষের মধ্যে ঐক্যের ডাক দেন, যা জাতীয়তাবাদের ভিত্তি মজবুত করে।

৩. রবীন্দ্রনাথ ও গোরা:

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘গোরা’ (১৯১০) উপন্যাসে সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন।
  • তিনি দেখান যে প্রকৃত ভারতবাসী সেই, যার কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই—যে কেবলই এই মাটির সন্তান।
  • এই উপন্যাস বিশ্বজনীন জাতীয়তাবাদের বার্তা দেয়।

৮. ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ভারতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতির (১৯ শতকের প্রথমার্ধ) পরিচয় দাও। (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার (১৮৮৫) আগে ভারতে বেশ কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। অনিল শীল তাই এই সময়কে ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলেছেন।

প্রধান সভা-সমিতিগুলি হলো:

  • বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬): এটি ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন। এরা ব্রিটিশদের নিষ্কর জমির ওপর কর বসানোর প্রতিবাদ করেছিল।
  • জমিদার সভা (১৮৩৮): দ্বারকানাথ ঠাকুর ও রাধাকান্ত দেব এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের কাছে দাবি পেশ করা।
  • ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫১): এটি জমিদার সভা ও বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি যুক্ত হয়ে গঠিত হয়। এটি নীলকর বিরোধী আন্দোলনে এবং আইন পরিষদে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্তির দাবিতে সরব ছিল।
  • ভারতসভা (১৮৭৬): সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এটিই প্রথম সর্বভারতীয় চরিত্র লাভ করে। এটি সিভিল সার্ভিস আন্দোলন, অস্ত্র আইন ও ইলবার্ট বিলের সপক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলে।

মূল্যায়ন: এই সভাগুলিই ভারতের রাজনৈতিক সচেতনতার ভিত্তি তৈরি করে, যার ফলশ্রুতিতে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়।

৯. মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য আলোচনা করো। এতে কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল? (৩+৫)

উত্তর:

প্রেক্ষাপট: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে বুঝিয়ে দেয় যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে আর ভারত শাসন করা সম্ভব নয়। তাই ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে মহারানি ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন এবং ১ নভেম্বর এলাহাবাদে একটি ঘোষণাপত্র জারি করেন।

প্রতিশ্রুতিসমূহ:

  • স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল: ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয় এবং দেশীয় রাজাদের দত্তক পুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা: ঘোষণা করা হয় যে সরকার ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতিতে আর হস্তক্ষেপ করবে না।
  • চাকরি: জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
  • সাম্রাজ্য বিস্তার রোধ: ইংরেজরা আর নতুন কোনো ভারতীয় রাজ্য দখল করবে না।

তাৎপর্য ও বাস্তবতা: এটি ছিল ভারতের ‘ম্যাগনাকার্টা’। কিন্তু বাস্তবে ব্রিটিশরা এই প্রতিশ্রুতিগুলি রাখেনি। তারা ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি প্রয়োগ করে ভারত শোষণ চালিয়ে যায়। তাই একে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অধ্যায়’ বলা হয়।

১০. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব কেমন ছিল? তারা কেন বিদ্রোহে যোগ দেয়নি? (৮) [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর:

ভূমিকা: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে যখন ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ছিল, তখন বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ বা ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি বিস্ময়করভাবে নীরব ছিল বা বিরোধিতা করেছিল।

মনোভাব ও বিরোধিতার কারণ:

  • ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আস্থা: রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর—সকলেই মনে করতেন ব্রিটিশ শাসন ভারতের মঙ্গলের জন্য প্রয়োজন। তাঁরা ব্রিটিশদের আধুনিকতা, বিজ্ঞান ও শিক্ষার বাহক হিসেবে দেখতেন।
  • সামন্ততন্ত্রের ভীতি: বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পুরনো দিনের রাজা ও জমিদাররা (যেমন- মুঘল সম্রাট, নানাসাহেব)। শিক্ষিত সমাজ ভয় পেয়েছিল যে বিদ্রোহ সফল হলে ভারতে আবার মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও অরাজকতা ফিরে আসবে।
  • বিশৃঙ্খলা: তাঁরা সিপাহীদের এই বিদ্রোহকে নিছকই বিশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা বলে মনে করতেন। হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বা কিশোরীচাঁদ মিত্রের মতো সাংবাদিকরা ব্রিটিশদের জয় কামনা করেছিলেন।
  • স্বার্থরক্ষা: এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশদের দয়ায় চাকরি ও ব্যবসার মাধ্যমে উন্নতি করেছিল, তাই তারা প্রভুদের চটাতে চায়নি।

উপসংহার: তবে বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশদের নিষ্ঠুরতা দেখে এই শ্রেণির মোহভঙ্গ হয় এবং তারা জাতীয়তাবাদের পথে পা বাড়ায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা


প্রশ্ন: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলা হয় কেন?

উত্তর: বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকার ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেছেন। কারণ, এটি কেবল সিপাহীদের অসন্তোষ ছিল না; এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে স্বদেশী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় এবং সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছিল।

প্রশ্ন: শিক্ষিত বাঙালি সমাজ কেন মহাবিদ্রোহে যোগ দেয়নি?

উত্তর: শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ মনে করত যে ব্রিটিশ শাসন ভারতের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের জন্য প্রয়োজন। তারা আশঙ্কা করেছিল যে বিদ্রোহ সফল হলে ভারতে আবার মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসন ফিরে আসবে, যা প্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই তারা বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল।

প্রশ্ন: মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) মূল গুরুত্ব কী?

উত্তর: ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদে লর্ড ক্যানিং মহারানির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এর মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের হাতে যায়। এতে ভারতীয়দের আশ্বস্ত করা হয় যে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে সরকার আর হস্তক্ষেপ করবে না।

প্রশ্ন: ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস কীভাবে জাতীয়তাবাদে সাহায্য করেছিল?

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেশমাতৃকার বন্দনা করা হয়েছে। এই উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে মন্ত্রের মতো ছিল। উপন্যাসের দেশপ্রেমিক ‘সন্তান দল’-এর আদর্শ যুবসমাজকে ত্যাগের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

প্রশ্ন: ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি আঁকেন। এই চিত্রে ভারতমাতাকে চার হাত বিশিষ্টা দেবী রূপে দেখানো হয়েছে, যাঁর হাতে রয়েছে বেদ, ধান, জপমালা ও শ্বেতবস্ত্র। এটি ভারতীয় সংস্কৃতি, স্বনির্ভরতা ও জাতীয়তাবাদের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার