দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় -৮ উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-২৪ | পূর্ণমান: ৪
১. দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির ব্যাপারে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
স্বাধীনতার পর ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ৫৬২টি ছোট-বড় দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল এই দায়িত্ব নেন।
- কূটনীতি ও চাপ: তিনি দেশীয় রাজাদের সামনে দুটি পথ খোলা রাখেন—হয় ভারতের সাথে সম্মানে যুক্ত হওয়া, অথবা কঠোর পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।
- ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন: তিনি রাজাদের ‘ভারতভুক্তি দলিল’-এ সই করিয়ে প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতের হাতে ন্যস্ত করতে রাজি করান।
- সামরিক পদক্ষেপ: যেসব রাজ্য (যেমন- হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়) সহজে রাজি হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশি বা সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেননি।
- লৌহমানব: তাঁর এই দৃঢ়তার জন্যই ভারতকে টুকরো হওয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব হয় এবং তাঁকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বলা হয়।
২. জুনাগড় রাজ্যটি কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
✅ উত্তর:
জুনাগড় ছিল গুজরাতের কাথিয়াবাড় অঞ্চলের একটি দেশীয় রাজ্য।
- সমস্যা: জুনাগড়ের শাসক বা নবাব মহবত খান ছিলেন মুসলিম, কিন্তু প্রজাদের অধিকাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৪৭ সালে নবাব পাকিস্তানের সাথে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করলে প্রজারা বিদ্রোহ করে।
- অস্থায়ী সরকার: দেওয়ান শাহনওয়াজ ভুট্টো এবং স্থানীয় নেতারা ‘আরজি হুকুমত’ বা অস্থায়ী সরকার গঠন করে নবাবের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন।
- ভারতভুক্তি: ভয়ে নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। ভারতীয় সেনা জুনাগড়ে প্রবেশ করে শান্তি স্থাপন করে। ১৯৪৮ সালে গণভোটে ৯৯% মানুষ ভারতের পক্ষে রায় দেয় এবং ১৯৪৯ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
৩. ‘অপারেশন পোলো’ বা হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তি সম্পর্কে টীকা লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর:
হায়দ্রাবাদ ছিল ভারতের বৃহত্তম দেশীয় রাজ্য। এর শাসক নিজাম ওসমান আলি খান ভারতের সাথে যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন।
- রাজাকার বাহিনী: নিজামের মদতপুষ্ট কাসেম রিজভির নেতৃত্বে ‘রাজাকার’ বাহিনী হিন্দু প্রজাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার ও লুঠতরাজ শুরু করে।
- পুলিশি অভিযান: পরিস্থিতির অবনতি হলে সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করে। এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন পোলো’।
- ফলাফল: মাত্র ৫ দিনের মধ্যে নিজাম আত্মসমর্পণ করেন এবং হায়দ্রাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
৪. কাশ্মীর সমস্যার উদ্ভব ও ভারতভুক্তি কীভাবে হয়েছিল? [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
কাশ্মীর ছিল মুসলিম প্রধান রাজ্য, কিন্তু এর রাজা ছিলেন হিন্দু ডোগরা বংশীয় হরি সিং।
- দোটানা: রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান—কারোর সাথেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন।
- পাক আক্রমণ: ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট হানাদার বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে।
- ভারতভুক্তি: বিপদ দেখে হরি সিং ভারতের সাহায্য চান। ২৬ অক্টোবর তিনি ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’ স্বাক্ষর করেন। এরপর ভারতীয় সেনা গিয়ে কাশ্মীর রক্ষা করে। কিন্তু যুদ্ধের বিরতি পর্যন্ত পাকিস্তান কাশ্মীরের কিছু অংশ (PoK) দখল করে রাখে, যা নিয়ে আজও সমস্যা চলছে।
৫. দেশভাগের ফলে সৃষ্ট উদ্বাস্তু সমস্যার প্রকৃতি আলোচনা করো। (পাঞ্জাব বনাম বাংলা)
✅ উত্তর:
দেশভাগের ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা হয়। তবে দুই সীমান্তে এর প্রকৃতি ছিল আলাদা।
- পাঞ্জাব সীমানা: এখানে লোকবিনিময় ছিল আকস্মিক এবং ভয়াবহ দাঙ্গাপূর্ণ। প্রায় এককালীনভাবে হিন্দু-শিখরা ভারতে এবং মুসলিমরা পাকিস্তানে চলে যায়। এটি ছিল ‘One-time exchange’।
- বাংলা সীমানা: এখানে দাঙ্গা কম হলেও ভয়ের কারণে হিন্দুরা ধাপে ধাপে ভারতে আসতে থাকে। এটি কোনো এককালীন ঘটনা ছিল না, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা একটি নিরবচ্ছিন্ন স্রোত ছিল। সরকার পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের যতটা গুরুত্ব দিয়েছিল, বাংলার উদ্বাস্তুরা শুরুতে ততটা গুরুত্ব পায়নি।
৬. নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি বা দিল্লি চুক্তি (১৯৫০) কেন স্বাক্ষরিত হয়? এর শর্তগুলি কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর:
১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গার কারণে প্রচুর হিন্দু ভারতে চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ও পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এই চুক্তি করেন।
শর্তাবলী:
- উভয় দেশ সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পত্তি ও সম্মানের সুরক্ষা দেবে।
- উদ্বাস্তুরা তাদের ফেলে আসা সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার বা বিক্রি করার অধিকার পাবে।
- জোর করে ধর্মান্তরিত করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
- দাঙ্গায় অপহৃত নারীদের উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৭. আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথায় দেশভাগের যন্ত্রণার চিত্র কীভাবে ফুটে উঠেছে? (ছেড়ে আসা গ্রাম/উদ্বাস্তু)
✅ উত্তর:
সরকারি দলিলের বাইরে সাধারণ মানুষের দেশভাগের যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে বিভিন্ন স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে।
- ছেড়ে আসা গ্রাম (দক্ষিণারঞ্জন বসু): এখানে বিভিন্ন বিশিষ্ট বাঙালির স্মৃতিচারণ আছে, যেখানে তাঁরা তাঁদের ফেলে আসা ভিটেমাটি, শৈশব এবং গ্রামবাংলার প্রকৃতির প্রতি হাহাকার প্রকাশ করেছেন।
- উদ্বাস্তু (হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়): এই গ্রন্থে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কমিশনার হিসেবে লেখকের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। শিয়ালদহ স্টেশনের ভিড়, কলোনি জীবনের সংগ্রাম এবং সরকারি অব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র এখানে পাওয়া যায়।
৮. ১৯৪৭-এর ভারত স্বাধীনতা আইনে দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে কী বলা হয়েছিল?
✅ উত্তর:
১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনে বলা হয় যে:
- ব্রিটিশ ভারত দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন—ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত হবে।
- দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর থেকে ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব বা ‘প্যারামাউন্টসি’ প্রত্যাহার করা হবে।
- দেশীয় রাজ্যগুলি তাদের ইচ্ছেমতো ভারত বা পাকিস্তান—যেকোনো একটিতে যোগ দিতে পারে, অথবা স্বাধীন থাকতে পারে।
- এই আইনটিই ভারতের অখণ্ডতার সামনে বড় বিপদ তৈরি করেছিল, যা পরে সর্দার প্যাটেল সমাধান করেন।
৯. ভি. পি. মেনন কে ছিলেন? দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তিতে তাঁর অবদান কী?
✅ উত্তর:
ভি. পি. মেনন ছিলেন জওহরলাল নেহেরু ও সর্দার প্যাটেলের বিশ্বস্ত আমলা এবং ‘রাষ্ট্রীয় দপ্তর’ বা States Department-এর সচিব।
- প্যাটেলের সহযোগী: তিনি সর্দার প্যাটেলের ডানহাত হিসেবে কাজ করতেন। তিনি দেশীয় রাজাদের সাথে নিরলস আলোচনা ও দরকষাকষি করতেন।
- দলিল প্রস্তুত: ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’ বা ভারতভুক্তির আইনি খসড়া তিনিই তৈরি করেন।
- কৌশল: রাজাদের প্রিভি পার্স (ভাতা) এবং সম্মান বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি তাদের ভারতের সাথে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
১০. উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে ভারত সরকারের ভূমিকা বা পদক্ষেপগুলি আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর চাপ সামলাতে ভারত সরকারকে বিশাল পদক্ষেপ নিতে হয়।
- ত্রাণ শিবির: সীমান্তে ও বিভিন্ন রাজ্যে বিশাল বিশাল ত্রাণ শিবির বা রিফিউজি ক্যাম্প খোলা হয় যেখানে খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল।
- কলোনি স্থাপন: উদ্বাস্তুদের থাকার জন্য বিভিন্ন খালি জমিতে কলোনি তৈরি করা হয় (দণ্ডকারণ্যের মতো প্রকল্প)।
- ঋণ ও কর্মসংস্থান: তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য ব্যবসা বা কৃষিকাজের জন্য ঋণ এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
- তবে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি নিয়ে অনেক সমালোচনাও আছে।
১১. জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তির মধ্যে পার্থক্য কী ছিল?
✅ উত্তর:
- জুনাগড়: এখানে নবাব পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হিন্দু প্রজারা বিদ্রোহ করে। শেষে নবাব পালিয়ে যান এবং গণভোটের (Plebiscite) মাধ্যমে জনগণ ভারতের পক্ষে রায় দেয়। এখানে রক্তপাত বিশেষ হয়নি।
- হায়দ্রাবাদ: এখানে নিজাম স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর রাজাকার বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। ফলে ভারত সরকারকে সামরিক অভিযান (অপারেশন পোলো) চালাতে হয়। এখানে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তি ঘটে।
১২. দেশভাগের ফলে বাংলা ও পাঞ্জাবের সমাজ ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়েছিল?
✅ উত্তর:
- জনসংখ্যা বিস্ফোরণ: হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসায় কলকাতা ও দিল্লির মতো শহরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ বাড়ে। বস্তি সমস্যা দেখা দেয়।
- অর্থনীতি: পূর্ববঙ্গ থেকে আসা পাটচাষিরা পশ্চিমবঙ্গে আসায় পাটের ফলন বাড়ে, কিন্তু কাঁচামালের অভাব দেখা দেয়। বেকারত্ব সমস্যা তীব্র হয়।
- সংস্কৃতি: উদ্বাস্তু কলোনিগুলোতে এক নতুন লড়াকু সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সাহিত্য, নাটক ও সিনেমায় দেশভাগের যন্ত্রণা ফুটে ওঠে।
১৩. ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি কেন উঠেছিল? এর পক্ষে যুক্তিগুলি কী ছিল?
✅ উত্তর:
স্বাধীনতার পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের দাবি ওঠে।
- প্রশাসনিক সুবিধা: একই ভাষাভাষী মানুষ এক রাজ্যে থাকলে সরকারি কাজকর্মে এবং যোগাযোগে সুবিধা হয়।
- সংস্কৃতি রক্ষা: ভাষার সাথে সংস্কৃতি জড়িত। তাই আলাদা রাজ্য হলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটবে।
- গণতান্ত্রিক অধিকার: মাতৃভাষায় শিক্ষা ও প্রশাসন চললে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রে আরও বেশি অংশগ্রহণ করতে পারবে।
১৪. ‘ভাষাভিত্তিক প্রদেশ কমিশন’ বা ধর কমিশন (১৯৪৮)-এর সুপারিশ কী ছিল? কেন এর বিরোধিতা করা হয়?
✅ উত্তর:
সুপারিশ: এস. কে. ধরের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন জানায় যে, কেবল ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন করা উচিত নয়। এর পরিবর্তে প্রশাসনিক সুবিধা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের ওপর ভিত্তি করে রাজ্য গঠন করা উচিত।
বিরোধিতা: কংগ্রেসের নেতারা এবং দক্ষিণ ভারতের মানুষ এই রিপোর্টে খুশি হননি। তাঁরা মনে করেন এটি জনগণের আবেগকে উপেক্ষা করেছে। এর ফলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়।
১৫. জে.ভি.পি (JVP) কমিটি কেন গঠিত হয়? এর সিদ্ধান্ত কী ছিল?
✅ উত্তর:
ধর কমিশনের রিপোর্টের পর অসন্তোষ দেখা দিলে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস জওহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল ও পট্টভি সীতারামাইয়াকে নিয়ে JVP কমিটি গঠন করে।
সিদ্ধান্ত: এই কমিটিও ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করে। তাঁরা বলেন, দেশের ঐক্য ও নিরাপত্তা সবার আগে। এখনই ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করলে জাতীয় সংহতি নষ্ট হতে পারে। তবে তাঁরা বলেন, জনমত প্রবল হলে ভবিষ্যতে এটি বিবেচনা করা হবে।
১৬. পট্টি শ্রীরামালু কে ছিলেন? অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠনে তাঁর আত্মত্যাগের গুরুত্ব লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
পট্টি শ্রীরামালু ছিলেন একজন গান্ধীবাদী নেতা। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকে তেলেগু ভাষাভাষীদের জন্য পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে তিনি ১৯৫২ সালে আমরণ অনশন শুরু করেন।
গুরুত্ব: ৫৮ দিন অনশনের পর তাঁর মৃত্যু হলে অন্ধ্রপ্রদেশে ব্যাপক হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয়। পরিস্থিতি সামলাতে নেহেরু সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৫৩ সালে ভারতের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য হিসেবে অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের ঘোষণা দেয়। এটিই বাকি রাজ্য পুনর্গঠনের পথ খুলে দেয়।
১৭. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) ও রাজ্য পুনর্গঠন আইন (১৯৫৬) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
✅ উত্তর:
কমিশন: অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের পর অন্যান্য অঞ্চল থেকেও দাবি ওঠায় ১৯৫৩ সালে ফজল আলির নেতৃত্বে (সঙ্গে পানিক্কর ও কুঞ্জরু) রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়। তারা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের সুপারিশ করে।
আইন (১৯৫৬): এই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে পার্লামেন্টে রাজ্য পুনর্গঠন আইন পাস হয়। এর মাধ্যমে ভারতকে ১৪টি অঙ্গরাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
১৮. সরকারি ভাষা আইন (১৯৬৩)-এর প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
সংবিধানে বলা হয়েছিল ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইংরেজি সরকারি ভাষা থাকবে এবং পরে হিন্দি হবে। কিন্তু অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলি (বিশেষত তামিলনাড়ু) এর তীব্র বিরোধিতা করে।
এই অসন্তোষ দূর করতে ১৯৬৩ সালে সরকারি ভাষা আইন পাস হয়। এতে বলা হয়:
১) ১৯৬৫-র পরেও ইংরেজির ব্যবহার চলতে থাকবে।
২) হিন্দি ভারতের সরকারি ভাষা (Official Language) হবে, কিন্তু অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলির ওপর তা চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
১৯. ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর ও পণ্ডিচেরি কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
✅ উত্তর:
স্বাধীনতার পরেও চন্দননগর, পণ্ডিচেরি, মাহে, কারাইকাল ছিল ফরাসিদের দখলে।
চন্দননগর: ১৯৪৯ সালে গণভোটে চন্দননগরের মানুষ ভারতের পক্ষে রায় দেয় এবং ১৯৫৪ সালে এটি ভারতের সাথে যুক্ত হয়।
পণ্ডিচেরি: কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ১৯৫৪ সালে ফরাসি সরকার তাদের উপনিবেশগুলি ভারতের হাতে তুলে দেয়। ১৯৬২ সালে এগুলি আইনত ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়।
২০. গোয়া কীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত হয়? (অপারেশন বিজয়)
✅ উত্তর:
পর্তুগিজরা কোনোভাবেই গোয়া, দমন ও দিউ ছাড়তে রাজি ছিল না। দীর্ঘ আলোচনার পর ব্যর্থ হয়ে ভারত সরকার সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে গোয়ায় প্রবেশ করে এবং ১৯ ডিসেম্বর পর্তুগিজ গভর্নর আত্মসমর্পণ করেন। গোয়া ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়।
২১. ভারতের ভাষা সমস্যা সমাধানে সংবিধানের ভূমিকা কী ছিল?
✅ উত্তর:
ভারত বহুভাষী দেশ। সংবিধান প্রণেতারা কোনো একটি ভাষাকে চাপিয়ে না দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখেন।
১) হিন্দিকে দেবনাগরী লিপিতে ‘সরকারি ভাষা’র মর্যাদা দেওয়া হয়।
২) ইংরেজিকে সহযোগী ভাষা হিসেবে রাখা হয়।
৩) অষ্টম তফসিলে প্রথমে ১৪টি এবং পরে আরও ভাষা যুক্ত করে মোট ২২টি ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটি জাতীয় সংহতি রক্ষায় সাহায্য করে।
২২. সিকিম কীভাবে ভারতের ২২তম রাজ্যে পরিণত হয়?
✅ উত্তর:
সিকিম ছিল একটি স্বাধীন রাজতন্ত্র (চোগিয়াল শাসিত), কিন্তু ভারতের রক্ষিত রাজ্য। ১৯৭০-এর দশকে সিকিমের জনগণ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৭৫ সালে সিকিমের বিধানসভা ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব পাস করে এবং গণভোটে মানুষ বিপুল সমর্থন দেয়। এরপর সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের ২২তম পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হয়।
২৩. ‘তমস’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে দেশভাগের প্রভাব কীভাবে ফুটে উঠেছে?
✅ উত্তর:
তমস (ভীষ্ম সাহনি): এই উপন্যাসে দেশভাগের সময়কার দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং সাধারণ মানুষের অসহায়তার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
মেঘে ঢাকা তারা (ঋত্বিক ঘটক): এই চলচ্চিত্রে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা এক উদ্বাস্তু পরিবারের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য এবং নীতা নামের মেয়েটির আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশভাগের মানবিক ট্র্যাজেডি দেখানো হয়েছে।
২৪. দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?
✅ উত্তর:
১) ভৌগোলিক অখণ্ডতা: দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতের পেটের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তারা স্বাধীন থাকলে ভারতের মানচিত্র খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত।
২) নিরাপত্তা: পাকিস্তান সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলি (কাশ্মীর, যোধপুর) ভারতের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৩) অর্থনীতি: খনিজ সম্পদ ও নদনদীর নিয়ন্ত্রণের জন্য এদের সংযুক্তি জরুরি ছিল।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত
প্রশ্ন: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা কী ছিল?
✅ উত্তর: সর্দার প্যাটেল ছিলেন স্বাধীন ভারতের ঐক্যের রূপকার। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ৫৬২টি দেশীয় রাজ্যকে (যেমন- কাশ্মীর, জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ) ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করার অসাধ্য সাধন করেন। তাঁর এই দৃঢ়তার জন্যই তাঁকে ‘লৌহমানব’ বলা হয়।
প্রশ্ন: জুনাগড় কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
✅ উত্তর: জুনাগড়ের মুসলিম নবাব পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইলে তাঁর হিন্দু প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পরিস্থিতির চাপে নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। পরে ১৯৪৮ সালের গণভোটে ৯৯% মানুষ ভারতের পক্ষে রায় দিলে জুনাগড় ভারতের অংশ হয়।
প্রশ্ন: হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি কীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত হয়?
✅ উত্তর: হায়দ্রাবাদের নিজাম ওসমান আলি খান ভারতের সাথে যোগ দিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁর রাজাকার বাহিনী প্রজাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। শেষপর্যন্ত ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সর্দার প্যাটেল সেনা পাঠিয়ে (অপারেশন পোলো) হায়দ্রাবাদ দখল করেন এবং ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রশ্ন: কাশ্মীর সমস্যা কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালে রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান—কারোর সাথেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। সেই সুযোগে পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করে। তখন হরি সিং ভারতের সাহায্য চেয়ে ভারতভুক্তি দলিলে সই করেন। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ (PoK) দখল করে রাখে, যা আজও বিবাদের কারণ।
প্রশ্ন: ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?
✅ উত্তর: ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে প্রশাসনিক কাজ সহজ করতে এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশের জন্য ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য ভাগ করা জরুরি ছিল। ১৯৫৩ সালে পোট্টি শ্রীরামালুর আত্মত্যাগের পর অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের মাধ্যমে এই নীতি স্বীকৃতি পায়।