দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় – ২ সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা

বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (প্রতিটি প্রশ্নের মান – ৮)

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | মোট প্রশ্ন:

(এই বিভাগে ১৫-১৬টি বাক্যে উত্তর লিখতে হয়। উত্তরগুলি পয়েন্ট ভিত্তিক দেওয়া হলো।)


১. উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো। তিনি কতটা সফল হয়েছিলেন? (৫+৩)

উত্তর:ঊনবিংশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর অবদানগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • ১. বিধবা বিবাহ প্রবর্তন: হিন্দু সমাজে বিধবাদের অসহনীয় যন্ত্রণা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তিনি পরাশর সংহিতা থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। তাঁর প্রবল আন্দোলনের ফলেই ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসি (ক্যানিং-এর সময়) ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করেন। তিনি নিজের ছেলের সাথে বিধবার বিবাহ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
  • ২. বহুবিবাহ রোধ: তৎকালীন সমাজে কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে বহুবিবাহের প্রচলন ছিল। বিদ্যাসাগর এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন এবং সরকারি আইন প্রণয়নের জন্য আবেদন জানান।
  • ৩. বাল্যবিবাহ বিরোধিতা: তিনি বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেন এবং পরিণত বয়সে বিবাহের পক্ষে সওয়াল করেন।
  • ৪. নারী শিক্ষা: তিনি বিশ্বাস করতেন নারীমুক্তি একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি বেথুন স্কুলের সম্পাদক ছিলেন এবং নিজের উদ্যোগে দক্ষিণবঙ্গে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা: আইন পাস হলেও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ বিধবা বিবাহকে সহজে মেনে নেয়নি। তাই তাঁর জীবদ্দশায় এটি খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি। তবে তিনি যে যুক্তিবাদী ও মানবিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা আধুনিক ভারতের পথ প্রশস্ত করেছিল।

২. শিক্ষা বিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক কী? উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলোচনা করো। (৫+৩) [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্ক: ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে বা সনদ আইনে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়। কিন্তু এই টাকা প্রাচ্য শিক্ষা (সংস্কৃত, আরবি, ফারসি) না কি পাশ্চাত্য শিক্ষা (ইংরেজি, আধুনিক বিজ্ঞান) খাতে খরচ হবে—তা নিয়ে জনশিক্ষা কমিটির সদস্যদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।

  • প্রাচ্যবাদী: এইচ.টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক প্রমুখ মনে করতেন ভারতীয়দের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী প্রাচ্য শিক্ষাই দেওয়া উচিত।
  • পাশ্চাত্যবাদী: টমাস ব্যাবিংটন মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখ মনে করতেন ইংরেজি মাধ্যমের আধুনিক শিক্ষাই ভারতের উন্নতির একমাত্র পথ।
  • অবসান: ১৮৩৫ সালে মেকলে তাঁর মিনিটস বা প্রস্তাবে ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন এবং লর্ড বেন্টিঙ্ক তা গ্রহণ করলে এই বিতর্কের অবসান ঘটে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা (১৮৫৭):

  • এটি ছিল ভারতের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়।
  • প্রাথমিকভাবে এটি কেবল পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রি প্রদান করত।
  • এর অধীনে থাকা কলেজগুলির পাঠ্যক্রম নির্ধারণ ও শিক্ষার মান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
  • এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই বাংলায় এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়, যারা পরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।

৩. উনিশ শতকের বাংলায় নবজাগরণের প্রকৃতি বা চরিত্র আলোচনা করো। এই নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা কী ছিল? (৫+৩) [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর:ইতালির নবজাগরণের অনুকরণে অনেকে উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক জাগরণকে ‘নবজাগরণ’ বা রেনেসাঁস বলেন। এর প্রকৃতি নিম্নরূপ:

  • ১. পাশ্চাত্যের প্রভাব: এটি ছিল ইংরেজি শিক্ষা ও ইউরোপীয় উদারনৈতিক চিন্তাধারার ফসল।
  • ২. নগরকেন্দ্রিকতা: এই জাগরণ মূলত কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।
  • ৩. সাহিত্য ও সংস্কৃতি: সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সৃজনশীলতা দেখা যায় (রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ)।

সীমাবদ্ধতা:

  • এলিটিস্ট আন্দোলন: অনিল শীলের মতে, এটি ছিল মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির আন্দোলন।
  • গ্রাম বিমুখতা: গ্রাম বাংলার বিশাল কৃষক সমাজ বা মুসলিম সমাজের ওপর এর বিশেষ কোনো প্রভাব পড়েনি।
  • ঐতিহ্যের দ্বন্দ্ব: এটি পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেনি, বরং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক মিশ্রণ ছিল। তাই অনেকে একে ‘ঐতিহাসিক বিভ্রম’ বা অসম্পূর্ণ নবজাগরণ বলেন।

৪. সংক্ষেপে বিবর্তনের মাধ্যমে ব্রাহ্ম আন্দোলনের পরিচয় দাও। এই আন্দোলন সমাজ সংস্কারে কতটা সফল হয়েছিল? (৫+৩)

উত্তর:ব্রাহ্ম আন্দোলনের বিবর্তন:

  • সূচনা: ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ১৮৩০ সালে ‘ব্রাহ্মসমাজ’ হয়। উদ্দেশ্য ছিল নিরাকার একঈশ্বরের উপাসনা।
  • দেবেন্দ্রনাথ পর্ব: রামমোহনের মৃত্যুর পর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আন্দোলনের হাল ধরেন। তিনি তত্ত্ববোধিনী সভার মাধ্যমে একে সুসংগঠিত করেন এবং হিন্দু ধর্মের কাঠামোর মধ্যে রাখেন।
  • কেশবচন্দ্র ও বিভাজন: কেশবচন্দ্র সেনের উদার ও সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ১৮৬৬ সালে সমাজ ভেঙে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ ও ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ গঠিত হয়।
  • দ্বিতীয় বিভাজন: ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্র নিজের নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দিলে শিবনাথ শাস্ত্রী ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ গঠিত হয়।

সমাজ সংস্কারে সাফল্য:

  • সতীদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিবাহ প্রচলনে সাহায্য।
  • ১৮৭২ সালের ‘তিন আইন’ পাসের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধ ও অসবর্ণ বিবাহ প্রচলন।
  • নারীশিক্ষা বিস্তারে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা।

৫. ডিরোজিও এবং নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিবরণ দাও। এই আন্দোলন ব্যর্থ হলো কেন? (৫+৩)

উত্তর:ডিরোজিও ও নব্যবঙ্গ: হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ছিলেন যুক্তিবাদী ও সত্যের পূজারি। তিনি তাঁর ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর অনুগামী ছাত্রদল (প্যারিচাঁদ মিত্র, রামতনু লাহিড়ী, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়)-কে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা নব্যবঙ্গ দল বলা হয়।

  • কর্মকাণ্ড: তাঁরা ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিতর্ক সভা করতেন। তাঁরা ‘পার্থেনন’, ‘জ্ঞানান্বেষণ’ প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি, জাতিভেদ ও মূর্তিপূজার তীব্র সমালোচনা করতেন।

ব্যর্থতার কারণ:

  • বিচ্ছিন্নতা: এই আন্দোলন ছিল পুরোপুরি শহরকেন্দ্রিক ও পুঁথিগত। সাধারণ মানুষের সাথে এর কোনো যোগ ছিল না।
  • নেতিবাচকতা: তাঁরা কেবল ধ্বংসাত্মক সমালোচনাই করেছেন, কোনো বিকল্প বা গঠনমূলক আদর্শ তুলে ধরতে পারেননি।
  • উগ্রতা: তাঁদের উগ্র আচরণ (যেমন- উপবীত ত্যাগ, নিষিদ্ধ খাদ্য ভক্ষণ) রক্ষণশীল সমাজ মেনে নেয়নি।
  • নেতৃত্বের অভাব: ডিরোজিওর অকালমৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলনটি ঝিমিয়ে পড়ে।

বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (সেট-২)

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | মোট প্রশ্ন:

(প্রতিটি প্রশ্নের মান ৮। উত্তর ১৫-১৬টি বাক্যে লিখতে হবে।)


১. উনিশ শতকের বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো। তিনি কি কেবল সংস্কৃত শিক্ষার সমর্থক ছিলেন? (৫+৩)

উত্তর:

ভূমিকা: উনিশ শতকের বাংলার শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন পণ্ডিই ছিলেন না, ছিলেন আধুনিক শিক্ষার অন্যতম রূপকার।

শিক্ষা বিস্তারে অবদান:

  • সংস্কৃত কলেজে সংস্কার: ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে তিনি শিক্ষার আমূল পরিবর্তন করেন। তিনি সংস্কৃতের সাথে ইংরেজি ও আধুনিক গণিত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন এবং কলেজের দ্বার অব্রাহ্মণদের জন্যও উন্মুক্ত করে দেন।
  • মডেল স্কুল স্থাপন: লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর সহযোগিতায় তিনি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় (নদিয়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, হুগলি) ৩৩টি ‘মডেল স্কুল’ বা আদর্শ বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
  • নারী শিক্ষা: বেথুন সাহেবের সাথে তিনি নারীশিক্ষা বিস্তারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। তিনি নিজের উদ্যোগে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং ‘নারীশিক্ষা ভান্ডার’ গঠন করেন।
  • মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন: সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরা যাতে কম খরচে উচ্চশিক্ষা পায়, তার জন্য তিনি ১৮৭২ সালে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত প্রথম কলেজ।
  • পাঠ্যপুস্তক রচনা: বাংলা শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে তিনি ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’, ‘বোধোদয়’-এর মতো যুগান্তকারী শিশুপাঠ্য গ্রন্থ রচনা করেন।

কেবল সংস্কৃত শিক্ষার সমর্থক ছিলেন কি?

না, বিদ্যাসাগর মোটেও কেবল সংস্কৃত শিক্ষার সমর্থক ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়বাদী।

  • তিনি বুঝেছিলেন যে আধুনিক যুগে চলতে হলে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষা অপরিহার্য।
  • তাই তিনি সংস্কৃত কলেজের পাঠ্যক্রমে ইংরেজি, গণিত ও পাশ্চাত্য দর্শন অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
  • তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ওপর জোর দিতেন।

২. উনিশ শতকের বাংলায় ব্রাহ্ম আন্দোলনের বিবর্তন বা ক্রমবিকাশ আলোচনা করো। এই আন্দোলন কেন শেষপর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে? (৫+৩)

উত্তর:

ব্রাহ্ম আন্দোলনের বিবর্তন:

  • সূচনা পর্ব (রামমোহন): ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৮৩০ সালে ‘ব্রাহ্মসমাজ’-এ পরিণত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নিরাকার একেশ্বরবাদ প্রচার এবং মূর্তিপূজার বিরোধিতা।
  • দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্ব: রামমোহনের মৃত্যুর পর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আন্দোলনের হাল ধরেন। তিনি ১৮৩৯ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করে ব্রাহ্ম আন্দোলনকে সুসংগঠিত করেন। তিনি ব্রাহ্মধর্মকে হিন্দুধর্মের একটি বিশুদ্ধ রূপ হিসেবে দেখতেন।
  • কেশবচন্দ্র সেন পর্ব: কেশবচন্দ্র সেন যোগ দেওয়ার পর আন্দোলনটি গতি পায় এবং কলকাতার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ভক্তিবাদের প্রবর্তন করেন এবং সমাজ সংস্কারে (অসবর্ণ বিবাহ, নারীশিক্ষা) জোর দেন।
  • বিভাজন: আদর্শগত পার্থক্যের কারণে ১৮৬৬ সালে সমাজ ভেঙে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ (দেবেন্দ্রনাথ) ও ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ (কেশবচন্দ্র) গঠিত হয়। পরে ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্রের অনুগামীরা বেরিয়ে গিয়ে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ গঠন করেন।

আন্দোলন দুর্বল হওয়ার কারণ:

  • অভ্যন্তরীণ কোন্দল: বারবার বিভাজন ও দলাদলি আন্দোলনের শক্তি কমিয়ে দেয়।
  • জনবিচ্ছিন্নতা: এই আন্দোলন মূলত শহরের উচ্চশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ গ্রামবাসী বা কৃষকদের সাথে এর কোনো যোগ ছিল না।
  • হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ: উনিশ শতকের শেষদিকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্মের নবজাগরণ ঘটলে মানুষ ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে।

৩. উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে সাময়িকপত্র ও সাহিত্যের ভূমিকা আলোচনা করো। (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ও সমাজ সংস্কারে বিভিন্ন সাময়িকপত্র, সংবাদপত্র ও সাহিত্য দর্পণের মতো কাজ করেছিল।

সাময়িকপত্রের ভূমিকা:

  • বামাবোধিনী পত্রিকা: উমেশচন্দ্র দত্ত সম্পাদিত এই পত্রিকাটি নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তির পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। নারীদের মনের কথা তুলে ধরার এটিই ছিল প্রধান মাধ্যম।
  • হিন্দু প্যাট্রিয়ট: হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত এই পত্রিকা নীলকর সাহেবদের অত্যাচার এবং জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। এটি বিধবা বিবাহের পক্ষেও প্রচার চালায়।
  • গ্রামবার্তা প্রকাশিকা: কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত এই পত্রিকা গ্রামীণ মানুষের দুর্দশা, মহাজনদের শোষণ এবং ব্রিটিশদের অবিচারের কাহিনী নির্ভীকভাবে প্রকাশ করত।

সাহিত্যের ভূমিকা:

  • হুতোম প্যাঁচার নকশা: কালীপ্রসন্ন সিংহের এই গ্রন্থে কলকাতার বাবু সমাজের বিলাসিতা, মদ্যপান ও ভণ্ডামির তীব্র সমালোচনা করা হয়, যা সমাজের চোখ খুলে দেয়।
  • নীলদর্পণ নাটক: দীনবন্ধু মিত্রের এই নাটক নীলচাষিদের ওপর অকথ্য অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরে। এর ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ কৃষকদের সমর্থনে এগিয়ে আসে।
  • আনন্দমঠ: বঙ্কিমচন্দ্রের এই উপন্যাস এবং ‘বন্দেমাতরম’ সংগীত পরাধীন ভারতে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে।

উপসংহার: এই পত্রিকা ও সাহিত্যগুলি কেবল বিনোদন ছিল না, এগুলি ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

৪. উনিশ শতকে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ সংক্ষেপে আলোচনা করো। (৫+৩)

উত্তর:

বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ:

  • কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ (১৮৩৫): এটি ছিল চিকিৎসাবিদ্যা চর্চার প্রাণকেন্দ্র। মধুসূদন গুপ্তের শবব্যবচ্ছেদ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসার এখান থেকেই শুরু হয়।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা: ১৮৫৬ সালে রাইটার্স বিল্ডিং-এ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে ১৮৮০ সালে শিবপুরে স্থানান্তরিত হয় (বর্তমান IIEST)। এটি কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা নেয়।
  • মহেন্দ্রলাল সরকার ও IACS: ১৮৭৬ সালে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয় উদ্যোগে তৈরি প্রথম বিজ্ঞান গবেষণাগার, যেখানে সি.ভি. রমন গবেষণা করেছিলেন।
  • প্রফুল্লচন্দ্র ও জগদীশচন্দ্র: প্রেসিডেন্সি কলেজে এই দুই বিজ্ঞানীর অধ্যাপনা ও গবেষণা বাংলার বিজ্ঞান চর্চাকে বিশ্বমানের করে তোলে।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও কারিগরি শিক্ষা:

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় (১৯০৫) ব্রিটিশ শিক্ষা বর্জন করে স্বদেশী শিক্ষার প্রসারের জন্য ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ (National Council of Education) গঠিত হয়। এর অধীনেই ১৯০৬ সালে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (বর্তমান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা কারিগরি শিক্ষায় স্বনির্ভরতা আনে।

৫. স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা আলোচনা করো। তাঁকে কেন ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ বলা হয়? (৫+৩)

উত্তর:

ধর্ম সংস্কার ও নব্য বেদান্ত:

  • বিবেকানন্দ প্রাচীন বেদান্ত দর্শনের এক নতুন ও ব্যবহারিক ব্যাখ্যা দেন, যা ‘নব্য বেদান্ত’ নামে পরিচিত।
  • তিনি বলেন, ধর্ম মানে কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয়। “শিবজ্ঞানে জীবসেবা” অর্থাৎ মানুষের সেবাই হলো ধর্মের সার।
  • তিনি অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদের কঠোর বিরোধিতা করেন এবং বলেন, “মুচি, মেথর আমার ভাই”।

জাতীয়তাবাদী ভাবধারা:

  • তিনি যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বাণী—”উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধত” (জেগে ওঠো, এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না)।
  • তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভারতকে বিশ্বগুরুর আসনে বসাতে চেয়েছিলেন।

জাতীয়তাবাদের জনক বলার কারণ:

বিবেকানন্দ সরাসরি রাজনীতি না করলেও, তাঁর বাণী ও আদর্শ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের (যেমন- সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ভারতবাসীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এবং আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাই অনেকে তাঁকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আধ্যাত্মিক জনক বলেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – সংস্কার আন্দোলন (বড় প্রশ্ন)


প্রশ্ন: বিদ্যাসাগর কি কেবল বিধবা বিবাহ আন্দোলন করেছিলেন?

উত্তর: না। বিধবা বিবাহ আইন পাস (১৮৫৬) তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কীর্তি হলেও তিনি বহুবিবাহ রোধ এবং নারীশিক্ষা বিস্তারেও সমানভাবে লড়েছিলেন। তিনি নিজের উদ্যোগে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসারে সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি ও গণিত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন।

প্রশ্ন: ব্রাহ্ম আন্দোলন কেন দুর্বল হয়ে পড়েছিল?

উত্তর: ১) অভ্যন্তরীণ বিভাজন: দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্রের মতভেদ এবং পরে কেশবচন্দ্রের নিজের মেয়ের বাল্যবিবাহকে কেন্দ্র করে দলাদলি ও বিভাজন আন্দোলনের শক্তি কমিয়ে দেয়।
২) জনবিচ্ছিন্নতা: এই আন্দোলন কেবল কলকাতা কেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষিত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

প্রশ্ন: উনিশ শতকে বিজ্ঞান চর্চায় কাদের অবদান ছিল?

উত্তর: এই সময় ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার বিজ্ঞান গবেষণার জন্য ‘IACS’ প্রতিষ্ঠা করেন। মধুসূদন গুপ্ত প্রথম শবব্যবচ্ছেদ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব আনেন। এছাড়াও প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞান চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা নেন।

প্রশ্ন: স্বামী বিবেকানন্দকে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ বলা হয় কেন?

উত্তর: স্বামীজি পরাধীন ভারতবাসীকে শিখিয়েছিলেন—”দুর্বলতাই পাপ”। তাঁর তেজদীপ্ত বাণী ভারতের যুবসমাজ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের (যেমন সুভাষচন্দ্র বসু) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ধর্মকে দেশসেবার সাথে যুক্ত করেছিলেন।

প্রশ্ন: ‘নীলদর্পণ’ নাটকটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?

উত্তর: দীনবন্ধু মিত্রের এই নাটকটি ছিল নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। এই নাটক দেখেই বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগরের মতো মানুষেরা বিচলিত হন এবং নীল বিদ্রোহে জনমত গঠিত হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার