দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় – ৩ প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ

বিভাগ-গ: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ | প্রশ্ন সংখ্যা: ৪৪


১. ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন পাস করার দুটি উদ্দেশ্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর: ১) ভারতের বিশাল বনজ সম্পদ (কাঠ, মধু, মোম) সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তা থেকে রাজস্ব আদায় করা।
২) রেললাইন পাতার জন্য স্লিপার তৈরির কাঠ সংগ্রহ করা এবং আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার খর্ব করা।

২. ১৮৭৮ সালের অরণ্য আইনে অরণ্যকে কী কী ভাগে ভাগ করা হয়?

উত্তর: ১৮৭৮ সালের দ্বিতীয় অরণ্য আইনে ভারতের বনাঞ্চলকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়: ১) সংরক্ষিত অরণ্য (Reserved Forest), ২) সুরক্ষিত অরণ্য (Protected Forest) এবং ৩) গ্রামীণ অরণ্য (Village Forest)।

৩. চুঁয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮-৯৯) দুটি কারণ লেখো।

উত্তর: ১) ইংরেজ সরকার চুঁয়াড়দের নিষ্কর জমি (পাইকান জমি) কেড়ে নিয়ে তাতে উচ্চ হারে রাজস্ব ধার্য করে।
২) স্থানীয় জমিদারদের জমিদারি নিলামে উঠলে এবং বহিরাগত ইজারাদারদের অত্যাচার বাড়লে চুঁয়াড়রা বিদ্রোহ করে।

৪. রানি শিরোমণি বিখ্যাত কেন?

উত্তর: মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি ১৭৯৮-৯৯ সালে চুঁয়াড় বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন বলে তাঁকে ‘মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ’ বলা হয়।

৫. পাইক কাদের বলা হতো? পাইকান জমি কী?

উত্তর: মধ্যযুগে ও ব্রিটিশ আমলের শুরুতে জঙ্গলমহলের জমিদারদের অধীনে যারা লাঠিয়াল বা প্রহরীর কাজ করত, তাদের পাইক বলা হতো। বেতনের পরিবর্তে তারা যে নিষ্কর জমি ভোগ করত, তাকে পাইকান জমি বলে।

৬. রংপুর বিদ্রোহের (১৭৮৩) প্রধান কারণ কী ছিল?

উত্তর: ইজারাদার দেবীসিংহের অমানবিক অত্যাচার এবং জোর করে অতিরিক্ত কর আদায় ছিল এই বিদ্রোহের মূল কারণ। তিনি কৃষকদের ওপর এতটাই শোষণ চালাতেন যে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে বিদ্রোহে নামতে বাধ্য হয়।

৭. কেনারাম ও বেচারাম বলতে কী বোঝো?

উত্তর: সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় বহিরাগত মহাজনরা সাঁওতালদের ঠকানোর জন্য দুই ধরনের বাটখারা ব্যবহার করত। ফসল কেনার সময় ভারী বাটখারা বা ‘কেনারাম’ এবং ফসল বিক্রি বা ধার দেওয়ার সময় হালকা বাটখারা বা ‘বেচারাম’ ব্যবহার করত।

৮. দিকু (Diku) কাদের বলা হতো? [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর: সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি আদিবাসী এলাকায় বাইরে থেকে আসা মহাজন, জমিদার ও ব্যবসায়ীদের আদিবাসীরা ঘৃণার সাথে ‘দিকু’ বলত। এরা আদিবাসীদের নানাভাবে শোষণ ও প্রতারণা করত।

৯. ‘দামিন-ই-কোহ’ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: ‘দামিন-ই-কোহ’ কথার অর্থ হলো পাহাড়ের প্রান্তদেশ। ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ সরকার রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশে বনভূমি পরিষ্কার করে সাঁওতালদের বসবাসের জন্য যে নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে দিয়েছিল, তাকেই দামিন-ই-কোহ বলা হয়।

১০. সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫) দুটি প্রধান কারণ লেখো।

উত্তর: ১) মহাজন ও ব্যবসায়ীদের (দিকু) দ্বারা অর্থনৈতিক শোষণ এবং ঋণের জালে আটকানো।
২) ইংরেজ ঠিকাদারদের দ্বারা সাঁওতাল নারীদের সম্মানহানি এবং রেললাইন তৈরির কাজে সাঁওতাল শ্রমিকদের পারিশ্রমিক না দেওয়া।

১১. ‘হুল’ (Hul) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: সাঁওতালি ভাষায় ‘হুল’ শব্দের অর্থ হলো বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল, তা ইতিহাসে ‘সাঁওতাল হুল’ নামে পরিচিত।

১২. কোল বিদ্রোহের (১৮৩১) গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: ১) এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে আদিবাসীরাও সংগঠিত হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে পারে।
২) এই বিদ্রোহের ফলে সরকার ১৮৩৩ সালে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি’ (South-West Frontier Agency) নামে একটি পৃথক প্রশাসনিক এলাকা গঠন করতে বাধ্য হয়।

১৩. ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? বাংলায় এই আন্দোলনের নেতৃত্ব কে দেন?

উত্তর: ওয়াহাবি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার দূর করে তাকে শুদ্ধ করা (তারিকা-ই-মোহাম্মদিয়া)। তবে ভারতে এটি ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। বাংলায় এর নেতৃত্ব দেন মীর নিসার আলি বা তিতুমির।

১৪. তিতুমির স্মরণীয় কেন? [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর: তিতুমির বারাসাত বিদ্রোহের (১৮৩১) নেতা ছিলেন। তিনি নীলকর ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেন এবং নারকেলবেড়িয়া গ্রামে একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন।

১৫. ‘দার-উল-হারব’ ও ‘দার-উল-ইসলাম’ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: ওয়াহাবিদের মতে, ব্রিটিশ শাসিত ভারত ছিল ‘দার-উল-হারব’ বা বিধর্মীদের দেশ (শত্রুর দেশ)। তারা জিহাদের মাধ্যমে ভারতকে ‘দার-উল-ইসলাম’ বা ইসলামের দেশে (শান্তির দেশ) পরিণত করতে চেয়েছিল।

১৬. ফরাজি আন্দোলন কি কেবল ধর্মীয় আন্দোলন ছিল?

উত্তর: শুরুতে হাজী শরিয়তউল্লাহ ইসলাম ধর্ম সংস্কারের উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন শুরু করলেও, তাঁর পুত্র দুদু মিঞার নেতৃত্বে এটি জমিদার ও নীলকর বিরোধী এক শক্তিশালী কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়। তিনি ঘোষণা করেন, “জমি আল্লাহর দান, তাই জমির ওপর কর ধার্য করার অধিকার কারোর নেই।”

১৭. দুদু মিঞা বিখ্যাত কেন? [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর: দুদু মিঞা (মহসিন উদ্দিন আহমেদ) ফরাজি আন্দোলনকে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামে পরিণত করেন। তিনি জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করার ডাক দেন এবং একটি সমান্তরাল প্রশাসন বা ‘খেলাফত’ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

১৮. মুন্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০) প্রধান কারণ কী ছিল?

উত্তর: ১) মুন্ডাদের চিরাচরিত জমি ব্যবস্থা বা ‘খুৎকাঠি প্রথা’ ইংরেজ ও জমিদাররা বাতিল করে ব্যক্তিগত মালিকানা চালু করে।
২) ঠিকাদার ও মহাজনদের শোষণ এবং ‘বেট-বেগার’ বা বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদানে বাধ্য করা।

১৯. ‘খুৎকাঠি’ প্রথা (Khutkatti System) কী?

উত্তর: মুন্ডা সমাজে জমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে যৌথ মালিকানা প্রচলিত ছিল। গ্রামের সবাই মিলে জঙ্গল পরিষ্কার করে যে জমি তৈরি করত, তাতে সবার সমান অধিকার থাকত। একেই খুৎকাঠি প্রথা বলে।

২০. উলগুলান (Ulghulan) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: মুন্ডা ভাষায় ‘উলগুলান’ শব্দের অর্থ হলো ‘ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলা’ বা ‘প্রবল বিক্ষোভ’। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডারা তাদের অধিকার ফিরে পেতে ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক বিদ্রোহ করেছিল, তাকেই উলগুলান বলা হয়।

২১. বিরসা মুন্ডা কেন আদিবাসীদের কাছে ভগবান বা ‘ধরতি আবা’ ছিলেন?

উত্তর: বিরসা মুন্ডা মুন্ডা সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করতে এবং মহাজনদের শোষণ থেকে বাঁচাতে নতুন ধর্মমত ‘বিরসাইত’ প্রচার করেন। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের দূত ঘোষণা করেন এবং মুন্ডাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেন। তাই তাঁকে ‘ধরতি আবা’ বা পৃথিবীর পিতা বলা হতো।

২২. মুন্ডা বিদ্রোহের দুটি ফলাফল লেখো।

উত্তর: ১) ১৯০৮ সালে ‘ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন’ (Chota Nagpur Tenancy Act) পাস হয়।
২) এই আইনের মাধ্যমে মুন্ডাদের জমি হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের খুৎকাঠি স্বত্ব (যৌথ মালিকানা) স্বীকৃতি পায়।

২৩. নীলকর সাহেবরা চাষিদের ওপর কীভাবে অত্যাচার করত? (নীল বিদ্রোহের কারণ)

উত্তর: নীলকররা চাষিদের সেরা জমিতে খাদ্যশস্যের বদলে নীল চাষ করতে বাধ্য করত। তারা চাষিদের নামমাত্র দাদন (অগ্রিম) দিয়ে আজীবনের জন্য ঋণের জালে জড়াত। চাষ করতে না চাইলে তাদের কুঠিতে ধরে এনে মারধর করা হতো এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো।

২৪. দাদন প্রথা (Dadon System) কী?

উত্তর: নীলকর সাহেবরা নীল চাষের জন্য কৃষকদের বিঘা প্রতি ২ টাকা করে যে অগ্রিম অর্থ দিত, তাকে দাদন বলা হতো। একবার দাদন নিলে কৃষক আর তা শোধ করতে পারত না এবং বংশপরম্পরায় নীল চাষ করতে বাধ্য থাকত।

২৫. নীল বিদ্রোহে (১৮৫৯) শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর: হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় (‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’), শিশিরকুমার ঘোষ, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। আইনজীবীরা কৃষকদের আইনি সহায়তা দেন। এটি ছিল প্রথম আন্দোলন যেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

২৬. ‘নীল দর্পণ’ নাটকের গুরুত্ব কী?

উত্তর: দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ নাটকে নীলকরদের পৈশাচিক অত্যাচারের চিত্র জনসমক্ষে আসে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, ফলে বিষয়টি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত পৌঁছায় এবং সরকার নীল কমিশন গঠনে বাধ্য হয়।

২৭. নীল কমিশন (Indigo Commission) কেন গঠিত হয়? এর সুপারিশ কী ছিল?

উত্তর: নীল বিদ্রোহের ব্যাপকতায় ভীত হয়ে সরকার ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠন করে। কমিশন রায় দেয় যে, নীল চাষ কৃষকদের ইচ্ছাধীন। জোর করে কাউকে নীল চাষে বাধ্য করা যাবে না এবং দাদন প্রথা অবৈধ।

২৮. দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস স্মরণীয় কেন?

উত্তর: নদিয়া জেলার চৌগাছা গ্রামের এই দুই ভাই ছিলেন নীল বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান নেতা। তাঁরা নিজেরা নীল চাষ বন্ধ করে দেন এবং স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করে নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

২৯. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের (১৭৬৩-১৮০০) দুটি কারণ লেখো।

উত্তর: ১) তীর্থকর: ব্রিটিশ সরকার সন্ন্যাসী ও ফকিরদের তীর্থযাত্রার ওপর কর আরোপ করে এবং তাদের অবাধ যাতায়াতে বাধা দেয়।
২) রাজস্ব বৃদ্ধি: ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পরেও জোর করে রাজস্ব আদায় করায় কৃষক ও সন্ন্যাসীরা ক্ষুব্ধ হয়।

৩০. সন্ন্যাসী ও ফকির কারা ছিলেন?

উত্তর: এরা মূলত গৃহত্যাগী সাধু ও ফকির হলেও অনেকেই ছিলেন কৃষিজীবী ও পেশাদার যোদ্ধা। শীতকালে এরা দলবেঁধে তীর্থভ্রমণে আসত এবং ভিক্ষাবৃত্তি বা ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। ব্রিটিশরা এদের ‘ডাকাত’ বলে অভিহিত করত।

৩১. ভিল বিদ্রোহের (১৮১৯) কারণ কী ছিল?

উত্তর: খান্দেশ অঞ্চলের আদিবাসী ভিলরা ব্রিটিশদের শোষণ ও তাদের এলাকায় অনুপ্রবেশ মেনে নিতে পারেনি। কৃষি ব্যবস্থায় উচ্চ কর এবং তাদের চিরাচরিত অধিকারে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তারা শিউরামের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে।

৩২. পাগলপন্থী বিদ্রোহ (১৮২৫) কেন হয়? এর নেতা কে ছিলেন?

উত্তর: ময়মনসিংহের শেরপুর পরগনায় জমিদারদের শোষণ ও অতিরিক্ত কর আদায়ের বিরুদ্ধে পাগলপন্থী সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিদ্রোহ করে। এর নেতা ছিলেন করিম শাহ এবং তাঁর পুত্র টিপু। টিপু নিজেকে ‘রাজা’ ঘোষণা করেছিলেন।

৩৩. ফরাজি ও ওয়াহাবি আন্দোলনের একটি মিল ও একটি অমিল লেখো।

উত্তর: মিল: উভয় আন্দোলনই ধর্মীয় সংস্কার দিয়ে শুরু হয়েছিল কিন্তু পরে ব্রিটিশ ও জমিদার বিরোধী কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়।
অমিল: ফরাজি আন্দোলন মূলত পূর্ববঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ওয়াহাবি আন্দোলন সারা ভারত জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

৩৪. নীল বিদ্রোহকে কেন ‘ধর্মীয় আন্দোলন’ বলা যায় না?

উত্তর: নীল বিদ্রোহে হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টান (মিশনারি)—সব ধর্মের মানুষ নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এখানে ধর্মের কোনো বিভেদ ছিল না, এটি ছিল নিখাদ অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগ্রাম।

৩৫. পাবনা কৃষক বিদ্রোহের (১৮৭০) মূল দাবি কী ছিল?

উত্তর: পাবনা বিদ্রোহের কৃষকরা ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেনি, তারা কেবল জমিদারদের অন্যায় খাজনা বৃদ্ধি এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। তাদের দাবি ছিল—”আমরা মহামান্য রাণীর প্রজা হতে চাই, জমিদারের নয়।”

৩৬. খাসি বিদ্রোহের নেতৃত্ব কে দেন এবং কেন?

উত্তর: ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক সিলেট থেকে আসাম পর্যন্ত রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করলে খাসি উপজাতিদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। এর প্রতিবাদে তিরৎ সিং-এর নেতৃত্বে খাসিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

৩৭. হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় নীল চাষিদের কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?

উত্তর: তিনি তাঁর ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় নিয়মিত নীলকরদের অত্যাচারের খবর ছাপাতেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজের বাড়িতে কৃষকদের আশ্রয় দিতেন এবং তাদের আইনি লড়াইয়ের জন্য অর্থ সাহায্য করতেন।

৩৮. ব্রিটিশ সরকার কেন ‘অরণ্য আইন’ পাস করেছিল?

উত্তর: ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের বনজ সম্পদ (মূলত শাল ও সেগুন কাঠ) নিজেদের কাজে লাগানো, বিশেষ করে রেললাইনের স্লিপার তৈরি ও জাহাজ তৈরির জন্য। এছাড়া বন থেকে রাজস্ব আদায় করাও ছিল তাদের লক্ষ্য।

৩৯. নীল বিদ্রোহ সফল হয়েছিল কেন?

উত্তর: ১) হিন্দু-মুসলিম কৃষকদের অভূতপূর্ব ঐক্য।
২) শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সমর্থন ও সংবাদপত্রের ভূমিকা।
৩) কৃষকদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা—”প্রাণ দেব তবু নীল বুনব না”।
৪) সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান (নীল কমিশন গঠন)।

৪০. সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো কেন?

উত্তর: ১) সাঁওতালদের তীর-ধনুক ব্রিটিশদের আধুনিক বন্দুক ও কামানের সামনে টিকতে পারেনি।
২) তাদের কোনো অভিজ্ঞ সেনাপতি বা সুসংগঠিত পরিকল্পনা ছিল না।
৩) ব্রিটিশদের নিষ্ঠুর দমননীতি বিদ্রোহকে ভেঙে দেয়।

৪১. অষ্টম আইন (১৮৬৮) কী?

উত্তর: নীল বিদ্রোহের পরবর্তীকালে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৮৬৮ সালে অষ্টম আইন পাস করা হয়। এতে বলা হয়, নীল চুক্তি কৃষকের ইচ্ছাধীন এবং নীল চাষ না করলে তাকে জমি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না।

৪২. বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হলো কেন?

উত্তর: ১৮৩১ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক তিতুমিরকে দমন করার জন্য লেঃ কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী পাঠান। তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা কামানের গোলার আঘাত সহ্য করতে পারেনি এবং ধ্বংস হয়ে যায়।

৪৩. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো কেন?

উত্তর: ১) এই বিদ্রোহের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা আদর্শ ছিল না।
২) ভবানী পাঠক ও মজনু শাহের মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়।
৩) ব্রিটিশদের আধুনিক সেনাবাহিনী ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কাছে তারা পরাজিত হয়।

৪৪. উপজাতি বিদ্রোহগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর: ১) এই বিদ্রোহগুলি ছিল স্থানীয় এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
২) এগুলি ছিল মূলত বহিরাগত মহাজন (দিকু), জমিদার এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের শোষণের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ।
৩) বিদ্রোহীরা চিরাচরিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়াই করেছিল।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ


প্রশ্ন: ব্রিটিশ অরণ্য আইন পাসের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ব্রিটিশ সরকার মূলত ভারতের বিপুল বনজ সম্পদ (বিশেষ করে রেললাইনের স্লিপার ও জাহাজ তৈরির কাঠ) নিজেদের কুক্ষিগত করতে এবং বনভূমি থেকে রাজস্ব আদায় করতে অরণ্য আইন পাস করে। এর মাধ্যমে তারা অরণ্যের ওপর আদিবাসীদের হাজার বছরের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল।

প্রশ্ন: ‘দিকু’ (Diku) কাদের বলা হতো এবং কেন?

উত্তর: আদিবাসী এলাকায় বহিরাগত মহাজন, জমিদার ও ব্যবসায়ীদের আদিবাসীরা ‘দিকু’ বলত। এরা আদিবাসীদের চড়া সুদে ঋণ দিয়ে সর্বস্বান্ত করত এবং নানাভাবে ঠকাত। তাই সাঁওতাল ও মুন্ডা বিদ্রোহে দিকুরা ছিল আদিবাসীদের অন্যতম প্রধান শত্রু।

প্রশ্ন: নীল বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: নীল বিদ্রোহ ছিল এমন এক আন্দোলন যেখানে শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ (সাংবাদিক, আইনজীবী, সাহিত্যিক) সরাসরি কৃষকদের সমর্থন করেছিল। হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় এবং দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘নীলদর্পণ’ নাটকে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরে জনমত গঠন করেছিলেন।

প্রশ্ন: তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা কেন বিখ্যাত?

উত্তর: বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা তিতুমির নারকেলবেড়িয়া গ্রামে বাঁশ ও মাটি দিয়ে একটি কেল্লা তৈরি করে নিজেকে ‘বাদশাহ’ ঘোষণা করেন এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। যদিও কামানের আঘাতে এটি ধ্বংস হয়, তবুও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বাঁশের কেল্লা প্রতিরোধের এক অমর প্রতীক।

প্রশ্ন: ফরাজি আন্দোলন কি কেবল ধর্মীয় আন্দোলন ছিল?

উত্তর: না। হাজী শরিয়তউল্লাহ ইসলাম ধর্ম সংস্কারের জন্য এটি শুরু করলেও, তাঁর পুত্র দুদু মিঞা একে একটি জমিদার ও ব্রিটিশ বিরোধী কৃষক আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে ঘোষণা করেন—”জমি আল্লাহর দান, তাই এর ওপর কর বসানোর অধিকার জমিদারদের নেই।”

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার