দশম শ্রেণী ইতিহাস: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা বড় প্রশ্ন

বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-২৮ | পূর্ণমান:


১. উনিশ শতকের নারী সমাজের জাগরণে ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকার গুরুত্ব আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭, ২০১৯]

উত্তর:
উমেশচন্দ্র দত্ত সম্পাদিত ‘বামাবোধিনী’ (১৮৬৩) পত্রিকা নারীমুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

  • নারী শিক্ষার প্রসার: এই পত্রিকা নারীদের শিক্ষিত করার জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ করত। এর মূল মন্ত্র ছিল—’কন্যাকেও পালন করিবে ও যত্নের সহিত শিক্ষা দিবে’।
  • কুসংস্কার বিরোধিতা: তৎকালীন সমাজের বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা এবং নারীদের অন্দরমহলে আটকে রাখার বিরুদ্ধে পত্রিকাটি সোচ্চার ছিল।
  • নারীদের আত্মপ্রকাশ: এটি ছিল নারীদের মুখপত্র। মহিলারা নিজেরা এই পত্রিকায় লিখতেন, যার ফলে তাঁদের মনের কথা, বঞ্চনা ও অধিকারের দাবি জনসমক্ষে আসত।
  • মূল্যায়ন: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

২. ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কীভাবে জনমত গঠন করেছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর:
হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ ছিল নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) প্রধান মুখপত্র।

  • অত্যাচারের বিবরণ: এই পত্রিকা নিয়মিত নীলকর সাহেবদের অমানবিক অত্যাচার, জোর করে নীল চাষ করানো এবং কৃষকদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশ করত।
  • আইনি লড়াই: সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় কেবল খবর ছাপিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি দরিদ্র চাষিদের আইনি লড়াইয়ের জন্য অর্থ সাহায্যও করতেন।
  • সরকারি নীতি সমালোচনা: ব্রিটিশ সরকারের পক্ষপাতমূলক বিচার ব্যবস্থা এবং পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার কঠোর সমালোচনা করত এই পত্রিকা।
  • প্রভাব: এর ফলেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় এবং সরকার ‘নীল কমিশন’ গঠন করতে বাধ্য হয়।

৩. ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’ গ্রন্থে উনিশ শতকের বাংলার কীরূপ সমাজচিত্র পাওয়া যায়? [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:
কালীপ্রসন্ন সিংহ রচিত ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬১) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক সামাজিক নকশা।

  • বাবু কালচার: হঠাৎ ধনী হওয়া কলকাতার ‘বাবু’ সম্প্রদায়ের উশৃঙ্খল জীবন, মদ্যপান, বাইজি নাচ এবং ভণ্ডামির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
  • ধর্মীয় ভণ্ডামি: বারোয়ারি পূজা, চড়ক পূজা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের নামে যে আড়ম্বর ও লাম্পট্য চলত, তা লেখক ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন।
  • ইংরেজি শিক্ষার কুফল: ইংরেজি শিখে একদল যুবক কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে সাহেবি কায়দা নকল করত, তার সমালোচনাও এতে আছে।
  • ঐতিহাসিক মূল্য: এটি কলকাতার চলিত ভাষায় লেখা, যা তৎকালীন সমাজের জীবন্ত দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

৪. গ্রামবাংলায় নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র ‘নীলদর্পণ’ নাটকে কীভাবে ফুটে উঠেছে? এর গুরুত্ব কী?

উত্তর:
দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটকটি ছিল নীল বিদ্রোহের দর্পণ।

  • অত্যাচারের চিত্র: নাটকে তোরাপ, আদুরী, ক্ষেত্রমণি চরিত্রগুলির মাধ্যমে নীলকর সাহেবদের (যেমন উড ও রোগ) পৈশাচিক অত্যাচার, শ্লীলতাহানি এবং গরিব চাষিদের হাহাকার মূর্ত হয়েছে।
  • মধ্যবিত্তের যোগসূত্র: এই নাটকটি কলকাতার মঞ্চে অভিনীত হলে বিদ্যাসাগরসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এটি শিক্ষিত সমাজকে কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত করে।
  • রাজনৈতিক গুরুত্ব: রেভারেন্ড জেমস লং এটি প্রকাশ করায় তাঁর জেল ও জরিমানা হয়, যা ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দেয়। বঙ্কিমচন্দ্র একে আঙ্কল টমস কেবিনের সাথে তুলনা করেছেন।

৫. ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকাটির স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

উত্তর:
হরিনাথ মজুমদার বা কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ (১৮৬৩) ছিল একটি ব্যতিক্রমী পত্রিকা।

  • গ্রামীণ সাংবাদিকতা: সমসাময়িক অধিকাংশ পত্রিকা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো, কিন্তু এটি প্রকাশিত হতো মফস্বল (কুষ্টিয়া) থেকে। তাই এতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত ছবি পাওয়া যেত।
  • শোষণের বিরোধিতা: নীলকর, জমিদার এবং মহাজনরা কীভাবে প্রজাদের ওপর শোষণ চালাত, তার নির্ভীক বিবরণ এতে ছাপা হতো।
  • জনহিতকর কাজ: কেবল খবর নয়, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি কৃষকদের অধিকার আদায়ে এই পত্রিকা জনমত গঠন করত।

৬. এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর:
রাজা রামমোহন রায় ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার একনিষ্ঠ সমর্থক।

  • আমহার্স্টকে চিঠি: ১৮২৩ সালে তিনি লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখে সংস্কৃত শিক্ষার বদলে ইংরেজি তথা আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনুরোধ জানান।
  • অ্যাংলো হিন্দু স্কুল: ১৮১৫ সালে তিনি নিজের খরচে ‘অ্যাংলো হিন্দু স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে ইংরেজি, বিজ্ঞান ও দর্শন পড়ানো হতো।
  • হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা: ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি ডেভিড হেয়ারকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেন।
  • বেদান্ত কলেজ: তিনি ১৮২৫ সালে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান পড়ানোর ব্যবস্থা ছিল।

৭. উনিশ শতকে নারীশিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:
নারীমুক্তি ও নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান অবিস্মরণীয়।

  • বেথুন স্কুল: ১৮৪৯ সালে জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন যখন ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন, বিদ্যাসাগর তার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্রীদের স্কুলে আনতেন।
  • বিদ্যালয় স্থাপন: স্কুল ইনস্পেক্টর থাকাকালীন তিনি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় এবং নিজের খরচে মায়ের নামে ‘বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন।
  • সামাজিক সচেতনতা: তিনি লেখনি ও বক্তৃতার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে হিন্দু শাস্ত্রে নারীশিক্ষার বিরোধী কোনো কথা নেই, যা রক্ষণশীল সমাজের মুখ বন্ধ করে।

৮. উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪)-এর প্রধান সুপারিশগুলি কী ছিল? একে ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয় কেন?

উত্তর:
বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যে সুপারিশ পেশ করেন, তা হলো:

  • শিক্ষা কাঠামো: প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সুসংহত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা।
  • বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিটি প্রদেশে শিক্ষা বিভাগ (Education Department) খোলা এবং কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা।
  • নারী শিক্ষা ও শিক্ষক শিক্ষণ: নারী শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

ম্যাগনাকার্টা: এই দলিলের ভিত্তিতেই ভারতের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, তাই একে ভারতীয় শিক্ষার মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা বলা হয়।

৯. আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার চর্চায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর:
১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ছিল এশিয়ার প্রথম আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা কেন্দ্র।

  • সবাক ব্যবচ্ছেদ: ১৮৩৬ সালে মধুসূদন গুপ্ত ও তাঁর সঙ্গীরা এখানে প্রথম মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করেন। এর ফলে চিকিৎসাবিদ্যায় হিন্দু সমাজের কুসংস্কার দূর হয়।
  • আধুনিক চিকিৎসা: কবিরাজি ও হাকিমি চিকিৎসার বদলে এখানে আধুনিক অ্যালোপ্যাথি, সার্জারি ও অ্যানাটমি শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়।
  • চিকিৎসক তৈরি: এই কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকরা সারা দেশে আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হন।
  • এটি ভারতের চিকিৎসা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

১০. বাংলার নবজাগরণে ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’-র ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর:
উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড—এই তিন মিশনারিকে ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ বলা হয়।

  • ছাপাখানা ও মুদ্রণ: তাঁরা শ্রীরামপুরে উন্নত মানের ছাপাখানা স্থাপন করেন, যার ফলে সুলভে পাঠ্যপুস্তক ও সাহিত্য সাধারণের কাছে পৌঁছে যায়।
  • শিক্ষা বিস্তার: ১৮১৮ সালে তাঁরা ‘শ্রীরামপুর কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
  • বাংলা গদ্য: বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ এবং পাঠ্যপুস্তক রচনার মাধ্যমে তাঁরা বাংলা গদ্যের বিকাশে সাহায্য করেন।
  • সমাজ সংস্কার: তাঁরা সতীদাহ প্রথা ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গঠনেও সক্রিয় ছিলেন।

১১. উচ্চশিক্ষার বিস্তারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৮৫৭) ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর:
লর্ড ক্যানিং-এর আমলে ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

  • নিয়ন্ত্রক সংস্থা: প্রথমদিকে এটি কেবল পরীক্ষা গ্রহণকারী ও উপাধি প্রদানকারী সংস্থা ছিল। এটি অধীনস্থ কলেজগুলির পাঠ্যক্রম ঠিক করত।
  • শিক্ষার মানোন্নয়ন: এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও চিকিৎসার উচ্চশিক্ষা প্রসারের ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে।
  • জাতীয়তাবাদ: এখান থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটরাই (যেমন- বঙ্কিমচন্দ্র, সুরেন্দ্রনাথ) পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

১২. টীকা লেখো: ডিরোজিও এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা নব্যবঙ্গ আন্দোলন।

উত্তর:
ডিরোজিও: হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ছিলেন যুক্তিবাদ ও সত্যের উপাসক। তিনি ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা করতে শিখিয়েছিলেন।
ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন:

  • তাঁর অনুগামী ছাত্রদের (প্যারিচাঁদ মিত্র, রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ) ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বলা হতো।
  • তাঁরা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি, জাতিভেদ ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।
  • তাঁরা ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে সংস্কারের কথা প্রচার করেন।
  • সীমাবদ্ধতা: তাঁদের আন্দোলন ছিল উগ্র এবং শহরকেন্দ্রিক, তাই তা সাধারণ মানুষের সমর্থন পায়নি।

১৩. শিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ারের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:
স্কটল্যান্ড থেকে ঘড়ি সারাইয়ের ব্যবসা করতে এসে ডেভিড হেয়ার নিজেকে ভারতের শিক্ষা বিস্তারে উৎসর্গ করেন।

  • হিন্দু কলেজ: ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম প্রধান উদ্যোগী ছিলেন।
  • স্কুল বুক সোসাইটি: দরিদ্র ছাত্রদের হাতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার জন্য ১৮১৭ সালে ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • স্কুল সোসাইটি: ১৮১৮ সালে তিনি স্কুল সোসাইটি গঠন করে বহু ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যম স্কুল স্থাপন করেন।
  • তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছিলেন।

১৪. ‘মেকলে মিনিটস’ (১৮৩৫) কী? এর মাধ্যমে কীভাবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে?

উত্তর:
মেকলে মিনিটস: ১৮৩৫ সালে লর্ড বেন্টিঙ্কের আইন সচিব টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ভারতের শিক্ষানীতি সম্পর্কে যে প্রস্তাব পেশ করেন, তাকে মেকলে মিনিটস বলে।
দ্বন্দ্বের অবসান:

  • ১৮১৩ সালের সনদের পর ভারতে শিক্ষার মাধ্যম প্রাচ্য (সংস্কৃত/ফারসি) হবে না কি পাশ্চাত্য (ইংরেজি) হবে—তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
  • মেকলে তাঁর প্রস্তাবে প্রাচ্য শিক্ষাকে ‘হেয়’ এবং পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ‘বিজ্ঞানসম্মত ও উন্নত’ বলে দাবি করেন।
  • তিনি বলেন, সরকারি অর্থ কেবল ইংরেজি শিক্ষার জন্যই ব্যয় করা উচিত। লর্ড বেন্টিঙ্ক এই প্রস্তাব মেনে নিলে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রসার শুরু হয়।

বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-২)

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১৫-২৮


১৫. ব্রাহ্ম আন্দোলনের বিবর্তনে কেশবচন্দ্র সেনের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর:
কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম আন্দোলন এক গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়।

  • প্রচার ও প্রসার: তাঁর বাগ্মীতা এবং উৎসাহে ব্রাহ্মধর্ম কলকাতা ছাড়িয়ে সারা ভারত তথা মহারাষ্ট্র, মাদ্রাজ ও পাঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়ে।
  • সমাজ সংস্কার: তিনি ধর্ম প্রচারের সাথে সমাজ সংস্কারকে যুক্ত করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৭২ সালে ‘তিন আইন’ (বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ) পাস হয়।
  • নববিধান: পরবর্তীকালে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের সারবস্তু নিয়ে উদার ধর্মমত ‘নববিধান’ (১৮৮০) প্রবর্তন করেন, যা সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা বলে।

১৬. উনিশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজের অবদান লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:
ব্রাহ্মসমাজ কেবল ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার।

  • নারীমুক্তি: সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং নারীশিক্ষা বিস্তারে ব্রাহ্ম নেতারা অগ্রণী ভূমিকা নেন।
  • জাতিভেদ প্রথা: তাঁরা জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং অসবর্ণ বিবাহ প্রচলন করেন।
  • কুসংস্কার দূরীকরণ: মূর্তিপূজা, বলিদান এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁরা জনমত গঠন করেন।
  • শিক্ষা: তাঁরা বহু স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটান।

১৭. বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ব্রাহ্মসমাজের সাথে যুক্ত থেকেও কেন আলাদা পথে চলে যান?

উত্তর:
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের একজন জনপ্রিয় আচার্য।

  • ভক্তিবাদের প্রভাব: তিনি ব্রাহ্মসমাজের কঠোর নিরাকার উপাসনার বদলে বৈষ্ণব ভক্তিবাদের দ্বারা প্রভাবিত হন। তিনি কীর্তন ও নামগানে বিশ্বাসী ছিলেন।
  • গুরুবাদ ও মূর্তিপূজা: তিনি গুরুবাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং চৈতন্যদেবের ভাবাদর্শ গ্রহণ করেন, যা ব্রাহ্মসমাজের মূল নীতির বিরোধী ছিল।
  • সমন্বয়: শেষপর্যন্ত তিনি ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে নব্যবৈষ্ণব আন্দোলন গড়ে তোলেন, যেখানে ব্রাহ্ম নৈতিকতার সাথে ভক্তিবাদের সমন্বয় ঘটেছিল।

১৮. শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর আদর্শটি ব্যাখ্যা করো। [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর:
উনিশ শতকে যখন বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ভেদাভেদ প্রবল ছিল, তখন শ্রীরামকৃষ্ণ এক উদার ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করেন।

  • যত মত তত পথ: তিনি কালী সাধনা, ইসলাম, খ্রিস্টান—সব পথেই সাধনা করে উপলব্ধি করেন যে সব ধর্মের গন্তব্য এক, কেবল পথ আলাদা।
  • ধর্মের ঐক্য: তিনি বলেন, জলকে কেউ বলে ‘ওয়াটার’, কেউ ‘পানি’, কেউ ‘জল’—কিন্তু বস্তু একই। তেমনই ঈশ্বর এক, কিন্তু তাঁকে ডাকার নাম ভিন্ন।
  • মানবতা: তাঁর ধর্মে কোনো জাতিভেদ বা গোঁড়ামি ছিল না। তিনি সকল ধর্মকে শ্রদ্ধা করার শিক্ষা দেন।

১৯. স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত’ (Neo-Vedanta) সম্পর্কে যা জানো লেখো।

উত্তর:
প্রাচীন বেদান্ত দর্শনের সাথে আধুনিক মানবতাবাদের সমন্বয়ে বিবেকানন্দ যে নতুন ব্যাখ্যা দেন, তাকে নব্য বেদান্ত বলে।

  • শিবজ্ঞানে জীবসেবা: তিনি বলেন, বনে জঙ্গলে গিয়ে ঈশ্বর খোঁজার দরকার নেই। দরিদ্র ও আর্ত মানুষের সেবাই হলো ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ পূজা।
  • সামাজিক মুক্তি: তাঁর বেদান্তে কেবল মোক্ষলাভ নয়, সমাজের নিচুতলার মানুষের উন্নয়ন ও জাতিভেদ প্রথা দূরীকরণের কথা বলা হয়েছে।
  • কর্মযোগ: তিনি নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে দেশ ও দশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে বলেন।

২০. উনিশ শতকের বাংলায় নবজাগরণের প্রকৃতি বা চরিত্র আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর:
বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে:

  • শহুরে সীমাবদ্ধতা: এই নবজাগরণ মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক ছিল এবং এর সুফল গ্রাম বাংলায় পৌঁছায়নি।
  • এলিটিস্ট আন্দোলন: এটি কেবল ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ কৃষক বা মুসলমান সমাজের এতে যোগ ছিল না।
  • ঐতিহ্য ও আধুনিকতা: এটি ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে ভারতীয় ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ।
  • তাই অনেকে একে তথাকথিত নবজাগরণ বা ‘ঐতিহাসিক বিভ্রম’ বলেছেন।

২১. হাজী মহহসীনের জনহিতকর কার্যাবলী আলোচনা করো।

উত্তর:
হাজী মহহসীন ছিলেন এক মহান দানবীর।

  • দানশীলতা: তিনি তাঁর বিপুল সম্পত্তি জনকল্যাণে দান করেন এবং ‘মহহসীন ফান্ড’ তৈরি করেন।
  • শিক্ষা বিস্তার: তাঁর অর্থে হুগলি মহহসীন কলেজ, ঢাকা মাদ্রাসা এবং বহু স্কুল পরিচালিত হতো। তিনি দরিদ্র ছাত্রদের বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।
  • সম্প্রীতি: তিনি ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে আর্ত মানুষের সেবা করতেন। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অকাতরে দান করেছিলেন।

২২. লালন ফকিরের চিন্তাধারায় মানবতাবাদের কী পরিচয় পাওয়া যায়?

উত্তর:
বাউল সম্রাট লালন ফকির ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।

  • জাতিভেদ বিরোধিতা: তিনি তাঁর গানে বারবার জাতিভেদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির অসারতা প্রমাণ করেছেন (“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”)।
  • সহজিয়া সাধনা: তিনি কোনো মন্দির-মসজিদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলতেন মানুষের হৃদয়েই ঈশ্বরের বাস (“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”)।
  • সমন্বয়: হিন্দু ও সুফি দর্শনের মিলনে তিনি এক উদার মানবধর্ম প্রচার করেন, যেখানে মানুষই সবার উপরে।

২৩. ব্রাহ্ম সমাজ কেন বিভাজিত হয়েছিল? (১৮৬৬ ও ১৮৭৮)

উত্তর:

  • প্রথম বিভাজন (১৮৬৬): দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর চাইতেন ব্রাহ্মধর্ম হিন্দুধর্মের মধ্যেই থাকুক, কিন্তু কেশবচন্দ্র সেন চাইতেন একে সর্বজনীন ও প্রগতিশীল করতে (উপবীত ত্যাগ, অসবর্ণ বিবাহ)। এই মতভেদে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ ও ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ তৈরি হয়।
  • দ্বিতীয় বিভাজন (১৮৭৮): কেশবচন্দ্র সেন নিজের নাবালিকা মেয়েকে কোচবিহারের রাজার সাথে হিন্দু মতে বিয়ে দিলে তাঁর অনুগামীরা (শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ) ক্ষুব্ধ হন এবং ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ গঠন করেন।

২৪. সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:

  • শাস্ত্রীয় প্রমাণ: রামমোহন রায় প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ প্রথা হিন্দু ধর্মের বাধ্যতামূলক কোনো অঙ্গ নয়, বরং এটি একপ্রকার আত্মহত্যা বা হত্যা।
  • জনমত গঠন: তিনি ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকার মাধ্যমে এবং বিভিন্ন পুস্তিকা লিখে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। তিনি শ্মশানে গিয়েও এই প্রথা আটকাতেন।
  • আইন পাস: তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে ১৭ নং রেগুলেশন জারি করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

২৫. বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ও তার ফলাফল লেখো।

উত্তর:

  • ভূমিকা: বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতা থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন—”বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত”। তিনি সরকারের কাছে প্রায় ১০০০ লোকের সই সম্বলিত আবেদনপত্র জমা দেন।
  • আইন পাস: তাঁর আন্দোলনের ফলে ১৮৫৬ সালে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয়।
  • বাস্তবায়ন: তিনি কেবল আইন পাস করেই ক্ষান্ত হননি, নিজের খরচে বহু বিধবা বিবাহ দেন এবং নিজের ছেলের সাথেও বিধবার বিয়ে দেন।

২৬. স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

উত্তর:
বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার ছিল মানবমুখী।

  • জীবে প্রেম: তিনি বলতেন, “বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?” অর্থাৎ মানুষ ও জীবের সেবাই হলো ধর্মের সার।
  • কুসংস্কার বিরোধিতা: তিনি ধর্মের নামে অস্পৃশ্যতা ও ছুঁৎমার্গ-এর তীব্র বিরোধী ছিলেন (“Don’t touchism”)।
  • শক্তি চর্চা: তিনি বলতেন, “গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালো”। সবল শরীর ও মন ছাড়া ধর্মচর্চা হয় না।

২৭. উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ‘ইয়ং বেঙ্গল’-এর ভূমিকা মূল্যায়ন করো।

উত্তর:
ভূমিকা:

  • ডিরোজিওর ছাত্ররা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি, জাতিভেদ ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তীব্র জেহাদ ঘোষণা করেন।
  • তাঁরা নারীশিক্ষা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেন।

মূল্যায়ন: তাঁদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও পদ্ধতি ছিল উগ্র (যেমন- উপবীত ছিঁড়ে ফেলা, মন্দিরে গিয়ে গোমাংস খাওয়া)। তাঁরা দেশের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে অন্ধভাবে পাশ্চাত্য অনুকরণ করেছিলেন, তাই তাঁদের আন্দোলন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং ব্যর্থ হয়।

২৮. উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে চিকিৎসকদের ভূমিকা কী ছিল? (মধুসূদন গুপ্ত ও অন্যান্য)

উত্তর:
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর চিকিৎসকরা সমাজ সংস্কারে বড় ভূমিকা নেন।

  • কুসংস্কার দূরীকরণ: ১৮৩৬ সালে মধুসূদন গুপ্ত প্রথম শবব্যবচ্ছেদ করে হিন্দু সমাজের হাজার বছরের কুসংস্কার (মড়া ছুঁলে পাপ হয়) ভেঙে দেন।
  • আধুনিকমনস্কতা: এই চিকিৎসকরা ছিলেন যুক্তিবাদী। তাঁরা নব্যবঙ্গ ও ব্রাহ্ম আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে বাল্যবিবাহ রোধ ও নারীশিক্ষা বিস্তারে সাহায্য করেন।
  • স্বাস্থ্য সচেতনতা: তাঁরা মহামারী রোধে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – সংস্কার আন্দোলন


প্রশ্ন: শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ইসলাম, খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন পথ সাধনা করে উপলব্ধি করেন যে, সব ধর্মের গন্তব্য এক। তিনি বলেন, “যত মত তত পথ”। অর্থাৎ ঈশ্বর এক, কেবল তাঁকে ডাকার পথগুলো আলাদা। এই উদার ধর্মমতই সর্বধর্ম সমন্বয়।

প্রশ্ন: স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত’ কী?

উত্তর: স্বামীজি প্রাচীন বেদান্তের ব্যাখ্যার সাথে আধুনিক মানবসেবার আদর্শ যুক্ত করেন। তিনি বলেন, মোক্ষলাভের জন্য সংসার ত্যাগের প্রয়োজন নেই; বরং দরিদ্র ও আর্ত মানুষের সেবার মাধ্যমেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। তাঁর মূল মন্ত্র ছিল—“শিবজ্ঞানে জীবসেবা”

প্রশ্ন: বাংলার নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

উত্তর: উনিশ শতকের নবজাগরণ ইতালির রেনেসাঁসের মতো ব্যাপক ছিল না। এটি মূলত কলকাতা শহর কেন্দ্রিক এবং ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষ বা মুসলিম সমাজের ওপর এর প্রভাব ছিল নগণ্য।

প্রশ্ন: ব্রাহ্মসমাজ কেন বিভাজিত হয়েছিল?

উত্তর: মূলত মতাদর্শগত কারণে ব্রাহ্মসমাজ ভাঙে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন রক্ষণশীল, আর কেশবচন্দ্র সেন ছিলেন প্রগতিশীল ও সমাজ সংস্কারক। পরে কেশবচন্দ্র সেন নিজের নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দিলে তাঁর অনুগামীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭৮ সালে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ গঠন করেন।

প্রশ্ন: লালন ফকির কেন বিখ্যাত?

উত্তর: লালন ফকির ছিলেন বাউল সম্রাট। তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে এক অসাম্প্রদায়িক মানব ধর্মের কথা প্রচার করেন। তাঁর কাছে জাতপাত বা ধর্মীয় আচারের চেয়ে মানুষই ছিল বড় (“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”)।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার