দশম শ্রেণী জীবন বিজ্ঞান: অধ্যায় ৪ অভিব্যক্তি ও অভিযোজন
বিভাগ-ঘ: দীর্ঘ উত্তরধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান
বিষয়: জীবন বিজ্ঞান | অধ্যায়: অভিব্যক্তি ও অভিযোজন | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-৩৬ | পূর্ণমান: ৫
১. ওপারিন ও হ্যালডেনের মতবাদ অনুসারে পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছিল? (রাসায়নিক বিবর্তন) [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ বিস্তারিত উত্তর:
বিজ্ঞানী ওপারিন ও হ্যালডেনের মতে, আদিম পৃথিবীতে অজৈব পদার্থ থেকে দীর্ঘ রাসায়নিক বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রধান ধাপগুলি হলো:
১) সরল জৈব যৌগের উৎপত্তি: আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেন ($O_2$) ছিল না। বাজ্জ্রপাত, অতিবেগুনি রশ্মি ও আগ্নেয়গিরির তাপশক্তির প্রভাবে মিথেন ($CH_4$), অ্যামোনিয়া ($NH_3$) ও জলীয় বাষ্প বিক্রিয়া করে শর্করা, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড ও পিউরিন-পিরিমিডিন বেস তৈরি করে।
২) জটিল জৈব যৌগের উৎপত্তি: বৃষ্টির জলের সাথে এই সরল যৌগগুলি সমুদ্রের গরম জলে মেশে। হ্যালডেন একে ‘হট ডাইলুট সুপ’ (Hot Dilute Soup) বলেন। এখানে পলিমারাইজেশনের ফলে প্রোটিন, পলিস্যাকারাইড, ফ্যাট ও নিউক্লিয়টাইড গঠিত হয়।
৩) নিউক্লিক অ্যাসিড গঠন: নিউক্লিয়টাইডগুলি যুক্ত হয়ে নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA ও পরে DNA) গঠন করে, যা প্রজননে সক্ষম ছিল।
৪) কোয়াসারভেট ও প্রোটোসেল: প্রোটিন ও অন্যান্য জৈব অণু একত্রিত হয়ে দ্বি-স্তরী আবরণযুক্ত কোলয়েড কণা বা ‘কোয়াসারভেট’ গঠন করে। এর সাথে নিউক্লিক অ্যাসিড যুক্ত হয়ে আদি কোষ বা ‘প্রোটোসেল’-এর উৎপত্তি হয়।
২. মিলার ও উরের পরীক্ষাটি চিত্রসহ সংক্ষেপে বর্ণনা করো। এই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত কী ছিল? (৩+২) [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ বিস্তারিত উত্তর:
পরীক্ষা (Experiment): ১৯৫৩ সালে বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড উরে আদিম পৃথিবীর পরিবেশ কৃত্রিমভাবে পরীক্ষাগারে সৃষ্টি করেন।
– যন্ত্রসজ্জা: তাঁরা একটি কাঁচের ফ্লাস্কে মিথেন ($CH_4$), অ্যামোনিয়া ($NH_3$) এবং হাইড্রোজেন ($H_2$) গ্যাস ২:২:১ অনুপাতে নেন।
– শক্তি প্রয়োগ: ফ্লাস্কের মধ্যে ফুটন্ত জল থেকে জলীয় বাষ্প চালনা করা হয় এবং টাংস্টেন ইলেকট্রোডের সাহায্যে ৭৫,০০০ ভোল্ট বিভবে টানা এক সপ্তাহ ধরে তড়িৎ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করা হয় (যা বাজ্জ্রপাতের অনুরূপ)।
– ঘনীভবন: উৎপন্ন গ্যাসকে কন্ডেন্সারের মাধ্যমে ঠান্ডা করে তরলে পরিণত করা হয় এবং ‘U’ আকৃতির নলে সংগ্রহ করা হয়।
[attachment_0](attachment)
পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত:
সংগৃহীত লালচে তরল বিশ্লেষণ করে গ্লাইসিন, অ্যালানিন, অ্যাসপারটিক অ্যাসিড প্রভৃতি অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং জৈব অ্যাসিড পাওয়া যায়।
সিদ্ধান্ত: এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, আদিম বিজারক পরিবেশে অজৈব পদার্থ থেকেই রাসায়নিক সংশ্লেষের মাধ্যমে প্রাণের মূল উপাদান বা জৈব অণু সৃষ্টি হওয়া সম্ভব।
৩. ল্যামার্কের অভিব্যক্তি সংক্রান্ত মতবাদের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি লেখো। (৫) [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ বিস্তারিত উত্তর:
১৮০৯ সালে জঁ ব্যাপটিস্ট ল্যামার্ক তাঁর ‘ফিলোজফিক জুওলজিক’ গ্রন্থে বিবর্তন সম্পর্কে যে মতবাদ দেন, তার চারটি মূল প্রতিপাদ্য হলো:
১) পরিবেশের প্রভাব: পরিবেশের পরিবর্তন জীবের স্বভাব ও আচরণের পরিবর্তন ঘটায়, যা জীবের দৈহিক গঠনে পরিবর্তন আনে।
২) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার ও অব্যবহার: ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে জীবের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ সুগঠিত ও শক্তিশালী হয় (যেমন- জিরাফের গলা)। অপরদিকে, অব্যবহারের ফলে অঙ্গটি দুর্বল, ক্ষুদ্র এবং কালক্রমে নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয় (যেমন- সাপের পা)।
৩) অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ: জীবদ্দশায় পরিবেশের প্রভাবে বা অঙ্গের ব্যবহার-অব্যবহারের ফলে জীব যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, তা বংশপরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
৪) নতুন প্রজাতির উৎপত্তি: প্রতিটি প্রজন্মে অর্জিত সামান্য পরিবর্তনগুলি বংশপরম্পরায় জমা হতে হতে একসময় মূল জীব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নতুন প্রজাতির সৃষ্টি করে।
৪. ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ (Natural Selection) তত্ত্বের মূল বিষয়গুলি আলোচনা করো। (৫) [মাধ্যমিক ২০১৭, ২০২০]
✅ বিস্তারিত উত্তর:
চার্লস ডারউইনের ‘অরিজিন অফ স্পিসিস’ গ্রন্থে বর্ণিত বিবর্তনবাদের মূল পাঁচটি প্রতিপাদ্য হলো:
১) অত্যধিক হারে বংশবৃদ্ধি: প্রতিটি জীব জ্যামিতিক বা গাণিতিক হারে বংশবৃদ্ধি করে। (যেমন- একটি ঝিনুক এক বছরে কোটি কোটি ডিম পাড়ে)।
২) অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম: খাদ্য ও বাসস্থান সীমিত থাকায় জীবদের বাঁচার জন্য লড়াই করতে হয়। এটি তিন প্রকার: ক) অন্তঃপ্রজাতি (নিজেদের মধ্যে), খ) আন্তঃপ্রজাতি (অন্য প্রজাতির সাথে), গ) পরিবেশগত সংগ্রাম (প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে)।
৩) প্রকরণ বা ভেদ: এই সংগ্রামের ফলে জীবের দেহে ছোট ছোট পরিবর্তন বা প্রকরণ (Variation) সৃষ্টি হয়। অনুকূল প্রকরণ বাঁচার জন্য সহায়ক।
৪) যোগ্যতমের উদ্বর্তন: ডারউইনের মতে, যাদের দেহে অনুকূল প্রকরণ থাকে, তারাই কেবল জীবন সংগ্রামে জয়ী হয় এবং বেঁচে থাকে। অন্যরা বিলুপ্ত হয়।
৫) প্রাকৃতিক নির্বাচন ও নতুন প্রজাতি: প্রকৃতি কেবল যোগ্যতম জীবকেই নির্বাচন করে। নির্বাচিত জীবেরা বংশবিস্তার করে এবং তাদের বৈশিষ্ট্যগুলি পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে কালক্রমে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটায়।
৫. জিরাফের লম্বা গলার বিবর্তন সম্পর্কে ল্যামার্ক ও ডারউইনের মতপার্থক্য লেখো। (৫)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
| বিষয় | ল্যামার্কের ব্যাখ্যা | ডারউইনের ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| ১. আদি জিরাফ | ল্যামার্কের মতে, সব আদি জিরাফের গলা ছোট ছিল। | ডারউইনের মতে, আদি জিরাফদের মধ্যে প্রকরণ ছিল—কেউ লম্বা গলার এবং কেউ ছোট গলার ছিল। |
| ২. প্রক্রিয়া | নিচু গাছের পাতা শেষ হওয়ায়, তারা উঁচু গাছের পাতা খাওয়ার জন্য গলা বাড়ানোর চেষ্টা করত (ব্যবহারের সূত্র)। | খাদ্য সংকটের সময় লম্বা গলার জিরাফরা উঁচু ডালের পাতা খেতে পেরে বেঁচে যায় (প্রাকৃতিক নির্বাচন), কিন্তু ছোট গলার জিরাফরা না খেতে পেয়ে মারা যায়। |
| ৩. ফলাফল | প্রচেষ্টার ফলে গলা লম্বা হয় এবং তা বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে আজকের জিরাফ এসেছে। | যোগ্যতম হিসেবে নির্বাচিত লম্বা গলার জিরাফরাই বংশবিস্তার করে টিকে আছে। |
৬. সমসংস্থ অঙ্গ (Homologous Organ) কাকে বলে? চিত্রসহ উদাহরণ দাও। এটি কী ধরনের বিবর্তন নির্দেশ করে? (২+২+১)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
সংজ্ঞা: বিভিন্ন জীবের যে সব অঙ্গের উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন এক, কিন্তু পরিবেশভেদে ও অভিযোজনের কারণে তাদের কাজ আলাদা, তাদের সমসংস্থ অঙ্গ বলে。
উদাহরণ ও গঠন: পাখির ডানা, ঘোড়ার অগ্রপদ, তিমির ফ্লিপার এবং মানুষের হাত।
– এদের সবারই অস্থির বিন্যাস একই: হিউমেরাস, রেডিয়াস-আলনা, কার্পাল, মেটাকার্পাল ও ফাল্যাঞ্জেস।
– কিন্তু কাজ ভিন্ন: পাখির ডানা ওড়ার জন্য, ঘোড়ার পা দৌড়ানোর জন্য, তিমির ফ্লিপার সাঁতারের জন্য এবং মানুষের হাত ধরার জন্য ব্যবহৃত হয়।
বিবর্তন: এটি **অপসারী বিবর্তন (Divergent Evolution)** নির্দেশ করে, অর্থাৎ এরা একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়ে বিভিন্ন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণে আলাদা হয়েছে।
৭. সমবৃত্তীয় অঙ্গ (Analogous Organ) কাকে বলে? উদাহরণসহ লেখো। এটি সমসংস্থ অঙ্গের চেয়ে কোথায় আলাদা? (২+২+১)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
সংজ্ঞা: বিভিন্ন জীবের যে সব অঙ্গের কাজ এক, কিন্তু উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পূর্ণ আলাদা, তাদের সমবৃত্তীয় অঙ্গ বলে।
উদাহরণ: পাখির ডানা এবং পতঙ্গের (যেমন- প্রজাপতি, আরশোলা) ডানা।
– উভয়ের কাজ: ওড়া।
– গঠন: পাখির ডানা পালক ও অস্থি দিয়ে গঠিত এবং মেরুদণ্ডী উৎসের। পতঙ্গের ডানা কাইটিন নির্মিত ঝিল্লি বিশেষ এবং অমেরুদণ্ডী উৎসের।
বিবর্তন ও পার্থক্য: এটি **অভিসারী বিবর্তন (Convergent Evolution)** নির্দেশ করে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন পূর্বপুরুষ থেকে এসেও একই পরিবেশে (আকাশে) বাঁচার জন্য তারা একই রকম অঙ্গ তৈরি করেছে।
৮. মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হৃৎপিণ্ডের গঠনগত বিবর্তন কীভাবে অভিব্যক্তির সপক্ষে প্রমাণ দেয়? (৫)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের গঠন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, জীবেরা সরল থেকে জটিলের দিকে বিবর্তিত হয়েছে:
১) মাছ: হৃৎপিণ্ড সরলতম, ২ প্রকোষ্ঠ যুক্ত (১ অলিন্দ, ১ নিলয়)। এর মধ্য দিয়ে কেবল দূষিত রক্ত প্রবাহিত হয় (একচক্রী)।
২) উভচর (ব্যাঙ): হৃৎপিণ্ড ৩ প্রকোষ্ঠ যুক্ত (২ অলিন্দ, ১ নিলয়)। বাম অলিন্দে বিশুদ্ধ ও ডান অলিন্দে দূষিত রক্ত এলেও নিলয়ে তা মিশে যায়।
৩) সরীসৃপ: হৃৎপিণ্ড অসম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠ যুক্ত (নিলয়টি অর্ধবিভক্ত)। ফলে দূষিত ও বিশুদ্ধ রক্তের মিশ্রণ কিছুটা কমেছে। (ব্যতিক্রম: কুমির – ৪ প্রকোষ্ঠ)।
৪) স্তন্যপায়ী ও পাখি: হৃৎপিণ্ড সম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠ যুক্ত (২ অলিন্দ, ২ নিলয়)। এখানে দূষিত ও বিশুদ্ধ রক্ত সম্পূর্ণ আলাদা থাকে (দ্বিচক্রী)।
সিদ্ধান্ত: এই ধারাবাহিক জটিলতা প্রমাণ করে যে, মাছ জাতীয় কোনো সরল জলজ উদ্বংশীয় জীব থেকেই কালক্রমে উভচর, সরীসৃপ এবং শেষে স্তন্যপায়ী ও পাখির উৎপত্তি হয়েছে।
[attachment_1](attachment)
৯. জীবাশ্ম (Fossil) কাকে বলে? ঘোড়ার বিবর্তনের উল্লেখযোগ্য ধাপগুলি (পর্যায়ক্রম) বৈশিষ্ট্যসহ লেখো। (২+৩) [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
জীবাশ্ম: সুদূর অতীতের কোনো জীবের সম্পূর্ণ দেহ বা দেহাংশ পাললিক শিলাস্তরে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হয়ে যে প্রস্তরীভূত ছাপ বা নমুনা তৈরি করে, তাকে জীবাশ্ম বলে।
ঘোড়ার বিবর্তন:
১) ইওহিপ্পাস (Eohippus): আদিমতম ঘোড়া (শেয়ালের মতো, উচ্চতা ৩০ সেমি)। অগ্রপদে ৪টি ও পশ্চাৎপদে ৩টি আঙুল ছিল।
২) মেসোহিপ্পাস (Mesohippus): উচ্চতা বাড়ল (৬০ সেমি)। পায়ে ৩টি করে আঙুল, মাঝেরটি বড় ও মজবুত।
৩) মেরিচিপ্পাস (Merychippus): উচ্চতা প্রায় ১০০ সেমি। এটিই প্রথম তৃণভোজী ঘোড়া। মাঝের আঙুল আরও বড় হলো।
৪) প্লিওহিপ্পাস (Pliohippus): এটি আধুনিক ঘোড়ার নিকটতম পূর্বপুরুষ। পায়ে ১টি শক্ত আঙুল ও খুর গঠিত হলো।
৫) ইকুয়াস (Equus): আধুনিক ঘোড়া (উচ্চতা ১৫০ সেমি)। পায়ে একটিমাত্র শক্ত খুর এবং দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম।
১০. নিষ্ক্রিয় অঙ্গ (Vestigial Organ) কাকে বলে? মানুষের পরিপাকতন্ত্র ও কঙ্কালতন্ত্রে অবস্থিত একটি করে নিষ্ক্রিয় অঙ্গের নাম ও তাদের পূর্বতন ভূমিকা লেখো। (২+৩)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
সংজ্ঞা: জীবদেহের যেসব অঙ্গ পূর্বপুরুষদের দেহে সুগঠিত ও কার্যক্ষম ছিল, কিন্তু খাদ্যাভ্যাস বা পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে অব্যবহারের কারণে ক্ষুদ্র ও কার্যহীন অঙ্গে পরিণত হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় অঙ্গ বলে।
মানুষের উদাহরণ:
১) পরিপাকতন্ত্র: ভার্মিফর্ম অ্যাপেন্ডিক্স।
পূর্বতন ভূমিকা: আমাদের তৃণভোজী পূর্বপুরুষদের দেহে এটি ‘সিকাম’ হিসেবে সক্রিয় ছিল এবং সেলুলোজ পরিপাকে সাহায্য করত। রান্না করা খাবার খাওয়ায় এর প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
২) কঙ্কালতন্ত্র: কক্সিস (Coccyx) বা লেজের হাড়।
পূর্বতন ভূমিকা: পূর্বপুরুষদের দেহে এটি লেজ হিসেবে ভারসাম্য রক্ষায়, গাছে চড়তে বা ভাবভঙ্গিতে সাহায্য করত।
১১. আর্কিওপটেরিক্স (Archaeopteryx)-এর জীবাশ্মকে কেন ‘মিসিং লিঙ্ক’ বলা হয়? এর সরীসৃপ ও পক্ষী বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। (২+৩)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
মিসিং লিঙ্ক (Missing Link): আর্কিওপটেরিক্সের জীবাশ্মে সরীসৃপ এবং পাখি—উভয় শ্রেণির বৈশিষ্ট্যই স্পষ্টভাবে বর্তমান। এটি প্রমাণ করে যে সরীসৃপ থেকেই পাখির উৎপত্তি হয়েছে। তাই একে এই দুই গোষ্ঠীর সংযোগরক্ষাকারী বা ‘মিসিং লিঙ্ক’ বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য:
| সরীসৃপ বৈশিষ্ট্য | পক্ষী বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| ১. চোয়ালে দাঁত বর্তমান। | ১. চোয়াল চঞ্চুতে বা ঠোঁটে পরিণত। |
| ২. দীর্ঘ লেজ ও তাতে কশেরুকা আছে। | ২. অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত। |
| ৩. আঙুলের ডগায় নখর আছে। | ৩. সারা দেহ পালক দ্বারা আবৃত। |
১২. ভ্রূণতত্ত্বঘটিত প্রমাণ (Embryological Evidence) বা হেকেলের বায়োজেনেটিক সূত্রটি ব্যাখ্যা করো। (৫)
✅ উত্তর:
জার্মান বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল বায়োজেনেটিক সূত্রে বলেন, “ব্যক্তিজনু জাতিজনুর পুনরাবৃত্তি করে” (Ontogeny recapitulates phylogeny)।
ব্যাখ্যা:
বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণী (যেমন- মাছ, স্যালামান্ডার, কচ্ছপ, মুরগি, মানুষ)-এর ভ্রূণের পরিস্ফুটনের বিভিন্ন দশা তুলনা করলে দেখা যায়:
১) প্রাথমিক দশায় সবারই ভ্রূণের গঠন প্রায় হুবহু এক।
২) সবারই বহিঃস্থ ফুলকা খাঁজ (Gill slits) এবং লেজ-সদৃশ গঠন (Tail bud) থাকে।
৩) হৃৎপিণ্ড প্রথমে সরু নলাকার (মাছের মতো), পরে দুই, তিন ও শেষে চার প্রকোষ্ঠে ভাগ হয়।
মানুষের ভ্রূণে ফুলকা ছিদ্র ও লেজ থাকার ঘটনা প্রমাণ করে যে আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষ জলজ মৎস্যসদৃশ প্রাণী ছিল।
১৩. সুন্দরী গাছের লবণ সহনশীলতার জন্য তিনটি অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্য লেখো। (৫) [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ বিস্তারিত উত্তর:
সুন্দরবনের শারীরবৃত্তীয় শুষ্ক মাটিতে (লবণাক্ত ও অক্সিজেন কম) টিকে থাকার জন্য সুন্দরী গাছের অভিযোজন:
১) শ্বাসমূল বা নিউম্যাটোফোর (Pneumatophore): মাটির নিচে বায়ু চলাচলের অভাবে, মূলের কিছু শাখা অভিকর্ষের বিপরীতে মাটির ওপরে খাড়াভাবে উঠে আসে। এদের গায়ে অসংখ্য ছিদ্র বা নিউম্যাটোথোড থাকে যা বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করে।
২) লবণ গ্রন্থি ও লবণ মোচন: সুন্দরী গাছের পাতার ত্বকে বিশেষ লবণ গ্রন্থি (Salt Gland) থাকে, যার মাধ্যমে এরা অতিরিক্ত লবণ জলসহ দেহ থেকে বের করে দেয়।
৩) পাতা ও বাকল মোচন: এরা এদের পুরনো পাতা এবং বাকলের কোষে অতিরিক্ত লবণ সঞ্চয় করে রাখে এবং সময়মতো তা ঝরিয়ে ফেলে দেহকে লবণমুক্ত করে।
১৪. ক্যাকটাস বা ফনিমনসার জাঙ্গল অভিযোজন বা জল সংরক্ষণের জন্য তিনটি অভিযোজন উল্লেখ করো। (৫)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশে জল সংরক্ষণ ও বাষ্পমোচন রোধের জন্য ক্যাকটাসের অভিযোজন:
১) পাতার রূপান্তর: বাষ্পমোচনের হার কমানোর জন্য পাতাগুলি কাঁটায় (Spines) রূপান্তরিত হয়েছে। এটি আত্মরক্ষায়ও সাহায্য করে।
২) পর্ণকাণ্ড (Phylloclade): পাতা না থাকায়, কাণ্ডটি চ্যাপ্টা, প্রসারিত, সবুজ ও রসালো হয়ে পাতার কাজ (সালোকসংশ্লেষ) করে এবং মিউসিলেজ বা আঠালো পদার্থের সাহায্যে জল সঞ্চয় করে রাখে।
৩) ত্বক ও পত্ররন্ধ্র: কাণ্ডের ত্বক পুরু কিউটিকল যুক্ত। পত্ররন্ধ্রগুলি সংখ্যায় কম এবং গর্তের গভীরে (Sunken Stomata) থাকে। এগুলি কেবল রাত্রে খোলে (স্কোটোঅ্যাকটিভ), ফলে দিনের গরমে জল বাষ্পীভূত হতে পারে না।
১৫. রুই মাছের জলজ অভিযোজনে পটকার (Swim Bladder) ভূমিকা চিত্রসহ আলোচনা করো। (৫) [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ বিস্তারিত উত্তর:
রুই মাছের মেরুদণ্ডের নিচে অবস্থিত দুই প্রকোষ্ঠ যুক্ত পটকা মাছকে জলের বিভিন্ন গভীরতায় ভাসতে ও ডুবতে সাহায্য করে (উদস্থৈতিক অঙ্গ)।
কার্যপদ্ধতি:
১) ভাসা: অগ্র প্রকোষ্ঠে অবস্থিত ‘রেড গ্রন্থি’ (Red Gland) রক্ত থেকে গ্যাস ($O_2, N_2$) শোষণ করে পটকায় মুক্ত করে। ফলে পটকা ফুলে ওঠে, মাছের আয়তন বাড়ে এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব কমে যায়। তখন মাছ জলের ওপরে ভেসে ওঠে।
২) ডোবা: পশ্চাৎ প্রকোষ্ঠে অবস্থিত ‘রেটি মিরাবিলি’ (Retia Mirabilia) নামক রক্তজালক পটকার গ্যাস শোষণ করে নেয়। ফলে পটকা চুপসে যায়, মাছের আয়তন কমে এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় মাছ জলের গভীরে ডুবে যায়।
এর ফলে মাছকে সাঁতার কাটার জন্য অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয় না।
১৬. পায়রার উড্ডয়ন অভিযোজনে বায়ুথলি (Air Sacs) এবং ডানার ভূমিকা লেখো। (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
ক) বায়ুথলির ভূমিকা:
১) দেহ হালকা করা: পায়রার ফুসফুসের সাথে ৯টি বায়ুথলি যুক্ত থাকে। এগুলি গরম বাতাস দ্বারা পূর্ণ হয়ে বেলুনের মতো কাজ করে এবং পায়রার দেহকে হালকা করে ওড়েতে সাহায্য করে।
২) দ্বি-শ্বসন (Double Respiration): ওড়ার সময় পায়রার প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। বায়ুথলিগুলি ফুসফুসে অতিরিক্ত অক্সিজেন সরবরাহ করে, যাতে শ্বাসকার্য নিরবচ্ছিন্ন থাকে এবং পায়রা ক্লান্ত হয় না।
খ) ডানার ভূমিকা:
পায়রার অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত। ডানার ওপরের তল উত্তল এবং নিচের তল অবতল, যা বায়ুর চাপ কাজে লাগিয়ে ওপরে উঠতে সাহায্য করে (Airfoil principle)। ডানার পালকগুলি (রেমিজেস) এমনভাবে সাজানো থাকে যা বাতাস কেটে এগোতে সাহায্য করে।
১৭. উটের মরু অভিযোজন বা জলক্ষয় সহনের কৌশলগুলি আলোচনা করো। (৫)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
মরুভূমির চরম উষ্ণতা ও জলের অভাব সহ্য করার জন্য উটের বিশেষ অভিযোজন:
১) বিপাকীয় জল: উটের কুঁজে সঞ্চিত চর্বি জারিত হয়ে শক্তি ও প্রচুর পরিমাণ ‘বিপাকীয় জল’ উৎপন্ন করে, যা উটের জলের চাহিদা মেটায়।
২) জল সংরক্ষণ (রেচন): উটের বৃক্কের হেনলির লুপ খুব দীর্ঘ হওয়ায় জল পুনঃশোষণ বেশি হয়। ফলে উট খুব ঘন ও অর্ধ-কঠিন মূত্র ত্যাগ করে। এদের বিষ্ঠাও খুব শুষ্ক হয়।
৩) দেহত্বক: উটের ত্বক খুব পুরু ও লোমশ। দেহের তাপমাত্রা ৪১.৭°C না হওয়া পর্যন্ত এরা ঘামে না, ফলে শরীর থেকে জল বেরোয় না।
৪) RBC-এর বৈশিষ্ট্য: উটের লোহিত রক্তকণিকা ডিম্বাকার ও নিউক্লিয়াসবিহীন। এটি ডিহাইড্রেশনের সময় সরু রক্তনালীতে আটকে যায় না এবং জল পেলে ফেটে না গিয়ে ২৪০% পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে।
১৮. শিম্পাঞ্জির সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বা আচরণগত অভিযোজন উদাহরণসহ লেখো। (৫)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
শিম্পাঞ্জিরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী এবং তারা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উন্নত আচরণ দেখায়:
১) উইপোকা শিকার (Tool Use): শিম্পাঞ্জিরা গাছের সরু ডাল ভেঙে পাতা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর সেই কাঠি উইপোকার ঢিবির গর্তে ঢুকিয়ে দেয়। উইপোকারা কাঠি বেয়ে ওপরে উঠলে তারা কাঠিটি বের করে পোকাগুলি খেয়ে ফেলে। একে ‘Fishing tool’ ব্যবহার বলা হয়।
২) বাদাম ভাঙা: শক্ত খোলাযুক্ত বাদাম ভাঙার জন্য তারা ‘হাতুড়ি ও নেহাই’ (Hammer and Anvil) পদ্ধতি ব্যবহার করে। তারা একটি শক্ত চ্যাপ্টা পাথর বা কাঠের ওপর বাদাম রেখে অন্য একটি ভারী পাথর বা কাঠ দিয়ে আঘাত করে বাদাম ভাঙে।
৩) ভেষজ ঔষধ: পরজীবী আক্রান্ত হলে তারা বিশেষ কিছু ভেষজ উদ্ভিদের (যেমন অ্যাসপিলিয়া) পাতা চিবিয়ে খায়। এটি তাদের উন্নত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
১৯. সমসংস্থ অঙ্গ (Homologous) ও সমবৃত্তীয় অঙ্গের (Analogous) মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো। উদ্ভিদ ও প্রাণীর একটি করে নিষ্ক্রিয় অঙ্গের নাম লেখো। (৩+২) [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
ক) পার্থক্য:
| বিষয় | সমসংস্থ অঙ্গ | সমবৃত্তীয় অঙ্গ |
|---|---|---|
| ১. উৎপত্তি ও গঠন | এদের উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন এক। | এদের উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। |
| ২. কাজ | এদের কাজ সাধারণত ভিন্ন হয় (যেমন- সাঁতার, ওড়া)। | এদের কাজ একই হয় (যেমন- ওড়া)। |
| ৩. বিবর্তনের দিক | এটি অপসারী বিবর্তন (Divergent) নির্দেশ করে। | এটি অভিসারী বিবর্তন (Convergent) নির্দেশ করে। |
খ) নিষ্ক্রিয় অঙ্গ:
১) উদ্ভিদ: কালকাসুন্দা ফুলের বন্ধ্যা পুংকেশর বা স্ট্যামিনোড (Staminode)।
২) প্রাণী: মানুষের সিকামের সাথে যুক্ত ভার্মিফর্ম অ্যাপেন্ডিক্স (Vermiform Appendix)।
[attachment_0](attachment)
২০. ল্যামার্কবাদ ও ডারউইনবাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি আলোচনা করো। (৫)
✅ উত্তর:
ল্যামার্ক ও ডারউইনের বিবর্তন সম্পর্কিত মতবাদের মূল পার্থক্যগুলি হলো:
| বিষয় | ল্যামার্কবাদ | ডারউইনবাদ |
|---|---|---|
| ১. ভিত্তি | ব্যবহার ও অব্যবহার এবং অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ। | প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং জীবন সংগ্রাম। |
| ২. প্রকরণ | পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রভাবে জীবের দেহে পরিবর্তন আসে বলে মনে করতেন। | জননের মাধ্যমে ছোট ছোট ধারাবাহিক প্রকরণ সৃষ্টি হয় বলে মনে করতেন। |
| ৩. জিরাফের গলা | উঁচু ডাল থেকে পাতা খাওয়ার চেষ্টায় গলা লম্বা হয়েছে। | লম্বা ও খাটো গলার জিরাফ ছিল, প্রাকৃতিক নির্বাচনে লম্বারা টিকে গেছে। |
২১. মৌমাছির বার্তা আদান-প্রদান কৌশল বা নৃত্য (Bee Dance) সংক্ষেপে বর্ণনা করো। এটি কী ধরনের অভিযোজন? (৪+১)
✅ উত্তর:
মৌমাছির নৃত্য: শ্রমিক মৌমাছিরা খাদ্যের সন্ধান পেলে মৌচাকে ফিরে বিশেষ ভঙ্গি করে নেচে অন্য মৌমাছিদের খাদ্যের অবস্থান জানায়। বিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিজ এটি আবিষ্কার করেন।
১) চক্রাকার নৃত্য (Round Dance): খাদ্যের উৎস মৌচাক থেকে ১০০ মিটারের কম দূরত্বের মধ্যে হলে মৌমাছিরা বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। এতে খাদ্যের দিক নির্দিষ্ট থাকে না, শুধু উপস্থিতি বোঝায়।
২) ওয়াগেল নৃত্য (Waggle Dance): খাদ্যের উৎস ১০০ মিটারের বেশি দূরে হলে তারা ইংরেজি ‘৪’ (৪) অক্ষরের মতো বা ‘৪’-এর মতো পেটের পিছন দিক দুলিয়ে নাচে। এই নাচের অভিমুখ সূর্যের সাপেক্ষে খাদ্যের দিক নির্দেশ করে এবং নাচের গতি খাদ্যের দূরত্ব বোঝায়।
ধরণ: এটি একটি আচরণগত অভিযোজন (Behavioral Adaptation)।
[attachment_1](attachment)
২২. রুই মাছের জলজ অভিযোজনে পাখনার ভূমিকা বিস্তারিত আলোচনা করো। মাছের দেহে আইশের কাজ কী? (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) পাখনার ভূমিকা:
রুই মাছের দেহে মোট ৭টি পাখনা থাকে যা গমনে সাহায্য করে:
১) বক্ষ পাখনা (১ জোড়া): জলের গভীরে যেতে, ভেসে উঠতে এবং গমনের সময় ব্রেক কষে থামতে সাহায্য করে।
২) শ্রোণি পাখনা (১ জোড়া): এটিও বক্ষ পাখনার মতো ওঠানামা করতে সাহায্য করে।
৩) পৃষ্ঠ পাখনা (১টি): গমনের সময় দেহের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং জল কেটে এগোতে সাহায্য করে।
৪) পায়ু পাখনা (১টি): দেহকে কাত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
৫) পুচ্ছ পাখনা (১টি): এটি হালের মতো কাজ করে এবং সাঁতারের সময় মাছের দিক পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
খ) আইশের কাজ:
মাছের দেহ সিক্ত ও পিচ্ছিল মিউকাসযুক্ত সাইক্লয়েড আঁশ দ্বারা আবৃত থাকে। এটি মাছের দেহকে জলের ঘর্ষণজনিত বাধা এবং বাইরের আঘাত বা পরজীবীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
২৩. উটের লোহিত রক্তকণিকার (RBC) বিশেষত্ব এবং অতিরিক্ত জলক্ষয় সহনের কৌশলগুলি লেখো। (২+৩) [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর:
ক) RBC-এর বিশেষত্ব:
১) আকৃতি: উটের লোহিত রক্তকণিকা ডিম্বাকার। ফলে ডিহাইড্রেশনের সময় রক্ত ঘন হয়ে গেলেও এটি সরু রক্তনালীর মধ্য দিয়ে সহজেই চলাচল করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহ সচল রাখে।
২) প্রসারণ ক্ষমতা: জল পানের সুযোগ পেলে এই কোষগুলি অভিস্রবন চাপে ফেটে না গিয়ে প্রায় ২৪০% পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে জল সঞ্চয় করতে পারে।
খ) জলক্ষয় সহন বা অভিযোজন:
১) ত্বক: উটের ত্বক খুব পুরু এবং লোমশ। দেহের তাপমাত্রা ৪১.৭°C এর বেশি হলে তবেই ঘাম হয়, ফলে জল অপচয় কমে।
২) শ্বাসক্রিয়া: নিশ্বাস বায়ুর সাথে বেরিয়ে যাওয়া জলীয় বাষ্পকে নাসাপথে ঘনীভূত করে মিউকাস ঝিল্লির মাধ্যমে দেহে ফিরিয়ে নেয়।
৩) রেচন: বৃক্কের হেনলির লুপ দীর্ঘ হওয়ায় জল পুনঃশোষণ বেশি হয়, ফলে খুব ঘন মূত্র এবং শুষ্ক বিষ্ঠা ত্যাগ করে।
২৪. ক্যাকটাসের বাষ্পমোচন রোধ করার জন্য তিনটি অঙ্গসংস্থানগত অভিযোজন উল্লেখ করো। পর্ণকাণ্ড কী? (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) অভিযোজন:
১) পাতার রূপান্তর: বাষ্পমোচন কমানোর জন্য পাতাগুলি কাঁটায় (Spines) রূপান্তরিত হয়েছে। এটি আত্মরক্ষায়ও সাহায্য করে।
২) ত্বক ও কিউটিকল: কাণ্ডের ত্বক পুরু এবং মোম জাতীয় কিউটিকলের আস্তরণ যুক্ত, যা জলরোধী।
৩) পত্ররন্ধ্র: পত্ররন্ধ্রগুলি সংখ্যায় কম এবং এগুলি ত্বকের গর্তের গভীরে লুকানো থাকে (Sunken Stomata)। এগুলি কেবল রাত্রে খোলে (স্কোটোঅ্যাকটিভ), ফলে দিনের বেলা জল বাষ্পীভূত হতে পারে না।
খ) পর্ণকাণ্ড (Phylloclade):
ক্যাকটাসের পাতা কাঁটায় রূপান্তরিত হওয়ায়, কাণ্ডটি চ্যাপ্টা, প্রসারিত, সবুজ ও রসালো হয়ে পাতার কাজ (সালোকসংশ্লেষ) করে এবং জল সঞ্চয় করে রাখে। রূপান্তরিত এই কাণ্ডকে পর্ণকাণ্ড বা ফাইলোক্ল্যাড বলে।
২৫. সুন্দরী গাছের লবণ সহনশীলতার জন্য তিনটি শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন লেখো। নিউম্যাটোফোর কী? (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) লবণ সহনশীলতা (Physiological Adaptation):
১) মূল দ্বারা লবণ বর্জন: সুন্দরী গাছের মূলের কোষে একধরণের বিশেষ ফিল্টার থাকে যা জল শোষণ করার সময় সমুদ্রের জলের অতিরিক্ত সোডিয়াম লবণকে আটকে দেয় (Ultrafiltration)।
২) লবণ গ্রন্থি: এদের পাতার ত্বকে বিশেষ লবণ গ্রন্থি (Salt gland) থাকে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ জলসহ বের করে দেয়। পাতায় লবণের কেলাস দেখা যায়।
৩) বাকল মোচন ও পত্রমোচন: এরা বাকল বা পুরনো পাতা ঝরিয়েও দেহের কোষে সঞ্চিত অতিরিক্ত লবণ ত্যাগ করে।
খ) নিউম্যাটোফোর (Pneumatophore):
লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত মাটিতে অক্সিজেনের অভাব থাকায় সুন্দরী গাছের কিছু মূল মাটির নিচ থেকে অভিকর্ষের বিপরীতে খাড়াভাবে মাটির ওপরে উঠে আসে। এদের গায়ে শ্বাসছিদ্র থাকে যা বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয়। এদের নিউম্যাটোফোর বা শ্বাসমূল বলে।
২৬. ডারউইনবাদের ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাগুলি কী কী? ‘নয়া-ডারউইনবাদ’ বলতে কী বোঝো? (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) ডারউইনবাদের ত্রুটি:
১) প্রকরণের কারণ: ডারউইন প্রকরণের (Variation) ওপর জোর দিলেও প্রকরণ কেন সৃষ্টি হয় বা এর উৎস কী, তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি (তখন জিন আবিষ্কৃত হয়নি)।
২) দেহকোষীয় ও জননকোষীয় প্রকরণ: তিনি দেহকোষীয় (অস্থায়ী) এবং জননকোষীয় (বংশগত) প্রকরণের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেননি।
৩) মিউটেশন: তিনি ‘মিউটেশন’ বা হঠাৎ পরিবর্তনের গুরুত্ব উপেক্ষা করেছিলেন এবং কেবল ছোট ছোট পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন।
খ) নয়া-ডারউইনবাদ (Neo-Darwinism):
ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদের সাথে মেন্ডেলের বংশগতি সূত্র এবং ভাইসম্যান ও হুগো দ্য ভ্রিসের মিউটেশন তত্ত্বের সমন্বয়ে বিবর্তনের যে আধুনিক, জিনগত ও সংশোধিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাকে নয়া-ডারউইনবাদ বলে।
২৭. ভেনাস হৃৎপিণ্ড (Venous Heart) কী? মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হৃৎপিণ্ডের গঠনগত জটিলতা কীভাবে বিবর্তনকে সমর্থন করে? (২+৩)
✅ উত্তর:
ভেনাস হৃৎপিণ্ড: মাছের হৃৎপিণ্ডকে ভেনাস হৃৎপিণ্ড বলে। কারণ এর মধ্য দিয়ে সর্বদা কম অক্সিজেনযুক্ত বা $CO_2$ যুক্ত (দূষিত) রক্ত প্রবাহিত হয় এবং এতে মাত্র দুটি প্রকোষ্ঠ (১টি অলিন্দ ও ১টি নিলয়) থাকে।
বিবর্তনের প্রমাণ:
মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হৃৎপিণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়:
১) মাছ (২ প্রকোষ্ঠ) $\rightarrow$ সরলতম।
২) উভচর (৩ প্রকোষ্ঠ) $\rightarrow$ অলিন্দ বিভক্ত, নিলয় অবিভক্ত।
৩) সরীসৃপ (অসম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠ) $\rightarrow$ নিলয় আংশিক বিভক্ত।
৪) পক্ষী ও স্তন্যপায়ী (সম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠ) $\rightarrow$ জটিলতম, বিশুদ্ধ ও দূষিত রক্ত পৃথক।
হৃৎপিণ্ডের এই সরল থেকে ক্রমশ জটিল গঠন প্রমাণ করে যে, সরল জলজ উদ্বংশীয় জীব থেকেই কালক্রমে জটিল ডাঙ্গার জীবের উৎপত্তি হয়েছে।
[attachment_2](attachment)
২৮. আর্কিওপটেরিক্সের জীবাশ্মে সরীসৃপ ও পক্ষীর কী কী বৈশিষ্ট্য দেখা যায়? একে ‘মিসিং লিঙ্ক’ বলা হয় কেন? (২+২+১)
✅ উত্তর:
ক) বৈশিষ্ট্য:
১) সরীসৃপ বৈশিষ্ট্য: মুখে দাঁতযুক্ত চোয়াল, দীর্ঘ লেজ, নখরযুক্ত আঙুল এবং দেহ আঁশযুক্ত।
২) পক্ষী বৈশিষ্ট্য: অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত, সারা দেহ পালক দ্বারা আবৃত এবং চোয়াল চঞ্চুতে পরিণত, ডানা ওড়ার উপযোগী।
খ) মিসিং লিঙ্ক (Missing Link):
এই প্রাণীটি সরীসৃপ ও পক্ষী—উভয় শ্রেণির বৈশিষ্ট্য বহন করায় একে দুই গোষ্ঠীর সংযোগরক্ষাকারী বা ‘মিসিং লিঙ্ক’ বলা হয়। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী থেকেই বিবর্তনের মাধ্যমে পাখিদের উৎপত্তি হয়েছে।
২৯. মানুষের দেহে অবস্থিত তিনটি নিষ্ক্রিয় অঙ্গের নাম ও তাদের অবস্থান লেখো। বিবর্তনে এদের গুরুত্ব কী? (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) নিষ্ক্রিয় অঙ্গ:
১) ভার্মিফর্ম অ্যাপেন্ডিক্স: বৃহদন্ত্র ও ক্ষুদ্রান্তের সংযোগস্থলে (সিকাম) থাকে।
২) কক্সিস (Coccyx): মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে (লেজের হাড়)।
৩) নিকটিটেটিং পর্দা (Plica semilunaris): চোখের ভিতরের কোণায় অবস্থিত লালচে মাংসপিণ্ড।
খ) গুরুত্ব:
এই অঙ্গগুলি প্রমাণ করে যে আমাদের পূর্বপুরুষদের দেহে এগুলি সক্রিয় ও কার্যক্ষম ছিল (যেমন- অ্যাপেন্ডিক্স তৃণভোজীদের সেলুলোজ হজমে লাগত)। খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশ পরিবর্তনের ফলে অব্যবহারের কারণে এগুলি মানুষের দেহে নিষ্ক্রিয় হয়েছে (ল্যামার্কের সূত্রানুযায়ী), যা বিবর্তনকে সমর্থন করে।
৩০. আচরণ (Behaviour) কাকে বলে? শিম্পাঞ্জির উইপোকা শিকার এবং বাদাম ভাঙার কৌশল বর্ণনা করো। (১+৪)
✅ উত্তর:
আচরণ: পরিবেশের উদ্দীপনার প্রভাবে বা জীবনধারণের প্রয়োজনে প্রাণী যে সুনির্দিষ্ট, জটিল ও সমন্বিত সাড়া প্রদান করে বা কার্যকলাপ দেখায়, তাকে আচরণ বলে।
শিম্পাঞ্জির কৌশল (Tool use):
১) উইপোকা শিকার: শিম্পাঞ্জি গাছের সরু ডাল ভেঙে পাতা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর সেই কাঠি উইপোকার ঢিবির গর্তে ঢুকিয়ে দেয়। উইপোকারা কাঠি বেয়ে ওপরে উঠলে তারা কাঠিটি সাবধানে বের করে পোকাগুলি খেয়ে ফেলে। একে ‘Fishing tool’ ব্যবহার বলা হয়।
২) বাদাম ভাঙা: তারা একটি শক্ত চ্যাপ্টা পাথর বা কাঠের ওপর (অ্যানভিল) শক্ত খোলাযুক্ত বাদাম রেখে অন্য একটি ভারী পাথর বা শক্ত কাঠ হাতুড়ির মতো ব্যবহার করে আঘাত করে বাদাম ভাঙে। এটি তাদের উন্নত বুদ্ধিমত্তা ও অভিযোজনের পরিচয়।
[attachment_3](attachment)
৩১. ভ্রূণতত্ত্ব কীভাবে বিবর্তনের সপক্ষে প্রমাণ দেয়? হেকেলের বায়োজেনেটিক সূত্রটি লেখো। (৩+২)
✅ উত্তর:
ভ্রূণতত্ত্বের প্রমাণ:
বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর (যেমন- মাছ, স্যালামান্ডার, কচ্ছপ, মুরগি, মানুষ) ভ্রূণের ক্রমবিকাশ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রাথমিক দশায় তাদের গঠন প্রায় হুবহু এক।
– সবারই লেজ-সদৃশ গঠন এবং গলবিলীয় ফুলকা ছিদ্র (Pharyngeal gill slits) থাকে।
– হৃৎপিণ্ডের গঠনও সরল নলাকার হয়।
ভ্রূণের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। এই সাদৃশ্য প্রমাণ করে যে তারা সকলেই একই জলজ পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
বায়োজেনেটিক সূত্র: আর্নস্ট হেকেলের মতে, “ব্যক্তিজনু জাতিজনুর পুনরাবৃত্তি করে” (Ontogeny recapitulates Phylogeny)। অর্থাৎ, কোনো জীবের ভ্রূণের বিকাশ তার পূর্বপুরুষদের বিবর্তনের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরে।
৩২. ঘোড়ার বিবর্তনের চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বা পরিবর্তনের ধারা উল্লেখ করো। ইওহিপ্পাস ও ইকুয়াসের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো। (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) বিবর্তনের ধারা:
১) আকার বৃদ্ধি: দেহের উচ্চতা ও আকার শেয়ালের মতো ছোট থেকে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান ঘোড়ার মতো হয়েছে।
২) আঙুলের হ্রাস: পায়ের আঙুলের সংখ্যা ৪টি বা ৩টি থেকে কমে ১টিতে (মধ্যমা) পরিণত হয়েছে।
৩) খুর সৃষ্টি: আঙুলের ডগায় শক্ত খুর সৃষ্টি হয়েছে, যা শক্ত মাটিতে দৌড়ানোর উপযোগী।
৪) দাঁতের গঠন: ঘাস চিবানোর জন্য পেষক ও পুরঃপেষক দাঁতের আকার ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্রাউন লম্বা হয়েছে।
খ) পার্থক্য:
১) আকার: ইওহিপ্পাস ছিল ছোট আকারের (৪০ সেমি), ইকুয়াস বড় আকারের (১৫০ সেমি)।
২) আঙুল: ইওহিপ্পাসের অগ্রপদে ৪টি ও পশ্চাৎপদে ৩টি আঙুল ছিল। ইকুয়াসের পায়ে ১টি মাত্র আঙুল ও খুর আছে।
৩৩. জীবনের উৎপত্তিতে কোয়াসারভেট (Coacervate) ও মাইক্রোস্ফিয়ার (Microsphere)-এর গুরুত্ব লেখো। প্রোটোসেল কী? (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) গুরুত্ব:
১) কোয়াসারভেট: বিজ্ঞানী ওপারিনের মতে, আদিম সমুদ্রে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও লিপিড অণুগুলি একত্রিত হয়ে যে দ্বি-স্তরী পর্দাযুক্ত কোলয়েড কণা গঠন করে, তা হলো কোয়াসারভেট। এটি পরিবেশ থেকে রসদ গ্রহণ করতে পারত এবং বিভাজিত হতে পারত।
২) মাইক্রোস্ফিয়ার: বিজ্ঞানী সিডনি ফক্সের মতে, অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলি যুক্ত হয়ে প্রোটিনয়েড এবং তা থেকে মাইক্রোস্ফিয়ার গঠন করে। এটি অর্ধভেদ্য পর্দাযুক্ত এবং এটিও কোষের পূর্বসূরি।
খ) প্রোটোসেল (Protocell):
কোয়াসারভেট বা মাইক্রোস্ফিয়ারের সাথে নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA বা DNA) যুক্ত হয়ে যে আদিমতম, স্ব-প্রতিলিপি গঠনে সক্ষম কোষীয় গঠন তৈরি হয়েছিল, তাকে প্রোটোসেল বা প্রোটোপ্লাজম বলে। এটিই প্রথম জীবকোষ।
৩৪. অভিযোজন ও অভিব্যক্তির সম্পর্ক আলোচনা করো। (৫)
✅ উত্তর:
অভিযোজন ও অভিব্যক্তি বা বিবর্তন একে অপরের সাথে কার্য-কারণ সম্পর্কে সম্পর্কিত।
১) অভিযোজন: পরিবর্তনশীল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য জীব তার গঠন ও আচরণের যে পরিবর্তন ঘটায়, তাকে অভিযোজন বলে। এটি একটি স্বল্পমেয়াদী বা তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া হতে পারে।
২) প্রকরণ ও নির্বাচন: অভিযোজনের ফলে সৃষ্ট অনুকূল পরিবর্তন বা প্রকরণগুলি ডারউইনের মতবাদ অনুযায়ী প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়।
৩) অভিব্যক্তি: লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ছোট ছোট অভিযোজিত বৈশিষ্ট্যগুলি পুঞ্জীভূত হয়ে একসময় মূল জীব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও নতুন বৈশিষ্ট্যের প্রজাতির সৃষ্টি করে। এই ধীর ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়াটিই হলো অভিব্যক্তি।
সুতরাং বলা যায়, অভিযোজন হলো অভিব্যক্তির কারণ বা ধাপ এবং অভিব্যক্তি হলো অভিযোজনের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল।
৩৫. সুন্দরী গাছের মূলের গঠনগত অভিযোজন সংক্ষেপে লেখো। লবণাক্ত মাটিতে বাঁচার জন্য এটি কীভাবে সাহায্য করে? (৫)
✅ উত্তর:
সুন্দরবনের লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত মাটিতে অক্সিজেনের অভাব থাকে এবং মাটি খুব নরম হয়। তাই সুন্দরী গাছের মূলে বিশেষ অভিযোজন দেখা যায়:
১) শ্বাসমূল (Pneumatophore): মাটির নিচে বায়ু চলাচলের অভাবে মূলের কিছু শাখা অভিকর্ষের বিপরীতে মাটির ওপরে খাড়াভাবে উঠে আসে। এদের গায়ে লেন্টিসেল বা শ্বাসছিদ্র থাকে, যা বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করে মূলে সরবরাহ করে এবং গাছকে বাঁচিয়ে রাখে।
২) বিস্তৃত মূলতন্ত্র: নরম কাদা মাটিতে গাছকে সোজা রাখতে এবং জোয়ার-ভাটার স্রোত সহ্য করতে এদের মূলগুলি মাটির নিচে বহু দূর পর্যন্ত জালের মতো বিস্তৃত হয়। কিছু ক্ষেত্রে অধিমূল বা ঠেসমূলও দেখা যায় যা যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে।
৩৬. চিত্রাঙ্কন: রুই মাছের পটকার অবস্থান ও গঠন চিত্রসহ বর্ণনা করো। (৫)
✅ উত্তর:
(ছাত্রছাত্রীরা রুই মাছের ব্যবচ্ছেদিত চিত্র এঁকে পটকার অবস্থান ও অংশগুলি দেখাবে।)
[attachment_4](attachment)
বর্ণনা:
রুই মাছের দেহগহ্বরে মেরুদণ্ডের নিচে এবং পৌষ্টিক নালীর ওপরে একটি চকচকে সাদা থলির মতো পটকা থাকে। এটি যোজক কলার পর্দা দ্বারা দুটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত:
১) অগ্র প্রকোষ্ঠ: এতে ‘রেড গ্রন্থি’ (Red Gland) থাকে। এটি রক্তজালক পূর্ণ এবং গ্যাস ($O_2, N_2, CO_2$) উৎপন্ন করে পটকাকে ফোলাতে সাহায্য করে।
২) পশ্চাৎ প্রকোষ্ঠ: এতে ‘রেটি মিরাবিলি’ (Retia Mirabilia) নামক অসংখ্য রক্তজালক থাকে। এটি গ্যাস শোষণ করে পটকাকে চুপসে দিতে সাহায্য করে।
দুই প্রকোষ্ঠের মাঝখানে একটি ভালভ বা কপাটিকা থাকে যা গ্যাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মাছের প্লবতা রক্ষায় সাহায্য করে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – অভিব্যক্তি ও অভিযোজন
প্রশ্ন: ল্যামার্কবাদ ও ডারউইনবাদের মূল পার্থক্য কী?
✅ উত্তর: ল্যামার্ক বিশ্বাস করতেন জীবের নিজস্ব প্রচেষ্টা এবং অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণের ওপর। অন্যদিকে, ডারউইন গুরুত্ব দিয়েছিলেন প্রকরণ (Variation) এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের (Natural Selection) ওপর। ডারউইনের মতে প্রকৃতিই যোগ্যতম জীবকে নির্বাচন করে।
প্রশ্ন: আর্কিওপটেরিক্সকে মিসিং লিঙ্ক বলা হয় কেন?
✅ উত্তর: আর্কিওপটেরিক্স হলো এমন একটি জীবাশ্ম প্রাণী যার মধ্যে সরীসৃপ (লম্বা লেজ, নখরযুক্ত আঙুল, দাঁত) এবং পাখি (ডানা, পালক)—উভয় শ্রেণির বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে যে পাখিরা সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী থেকেই বিবর্তিত হয়েছে।
[attachment_0](attachment)
প্রশ্ন: বায়োজেনেটিক সূত্র বা পুনরাবৃত্তি মতবাদ কী?
✅ উত্তর: আর্নস্ট হেকেলের এই সূত্রটি হলো: “Ontogeny recapitulates Phylogeny”। এর অর্থ হলো, একটি জীবের ভ্রূণ থেকে পূর্ণাঙ্গ দশায় পৌঁছানোর সময় সে তার পূর্বপুরুষদের বিবর্তনের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্তভাবে পুনরাবৃত্তি করে। যেমন, মানুষের ভ্রূণে একসময় ফুলকা ছিদ্র ও লেজ থাকে।
প্রশ্ন: উটের কুঁজে কি জল থাকে?
✅ উত্তর: না, এটি একটি ভুল ধারণা। উটের কুঁজে প্রচুর পরিমাণে চর্বি বা ফ্যাট সঞ্চিত থাকে। খাদ্যাভাবের সময় এই চর্বি জারিত হয়ে শক্তি এবং উপজাত হিসেবে জল (বিপাকীয় জল) তৈরি করে, যা উটকে দীর্ঘ দিন জল না খেয়ে বাঁচতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন: কোয়াসারভেট (Coacervate) কী?
✅ উত্তর: বিজ্ঞানী ওপারিনের মতে, আদিম পৃথিবীর গরম সমুদ্রে প্রোটিন ও অন্যান্য জৈব অণুগুলি একত্রিত হয়ে যে কোলয়েড জাতীয় কণা তৈরি করেছিল, তাকে কোয়াসারভেট বলে। এটি বিভাজনে সক্ষম ছিল এবং একেই প্রথম কোষ বা প্রোটোসেলের পূর্বরূপ বলে মনে করা হয়।