দশম শ্রেণী ভূগোল: অধ্যায় – 1 ‘বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ’
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বহির্জাত প্রক্রিয়া ও ভূমিরূপ | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-৩৬ | পূর্ণমান: ৩
১. নদীর ক্ষয়কার্যের প্রক্রিয়াগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
নদী প্রধানত চারটি প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কাজ করে:
- জলপ্রবাহ ক্ষয় (Hydraulic Action): নদীর প্রবল স্রোতের আঘাতে নদীখাতের মাটি বা শিলা আলগা হয়ে ভেঙে যায়।
- অবঘর্ষ ক্ষয় (Abrasion): নদীবাহিত নুড়ি, পাথর ও বালি নদীর তলদেশে ও গাত্রে আঘাত করে এবং শিরিষ কাগজের মতো ঘষে নদীখাতকে গভীর ও মসৃণ করে।
- ঘর্ষণ ক্ষয় (Attrition): নদীবাহিত শিলাখণ্ডগুলি পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি লেগে ভেঙে গিয়ে আরও ছোট ও গোলাকার হয়।
- দ্রবণ ক্ষয় (Solution): জললর সংস্পর্শে শিলাস্তরের খনিজ (যেমন- চুনাপাথর, লবণ) গলে গিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
২. গিরিখাত (Gorge) ও ক্যানিয়ন (Canyon)-এর মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
| বিষয় | গিরিখাত | ক্যানিয়ন |
|---|---|---|
| ১. জলবায়ু | আর্দ্র বা বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে গঠিত হয়। | শুষ্ক বা মরুপ্রায় অঞ্চলে গঠিত হয়। |
| ২. আকৃতি | দেখতে ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো হয়। | দেখতে ইংরেজি ‘I’ অক্ষরের মতো হয়। |
| ৩. প্রশস্ততা | নিম্নক্ষয়ের সাথে পার্শ্বক্ষয় হওয়ায় এটি কিছুটা চওড়া হয়। | কেবল নিম্নক্ষয় হওয়ায় এটি খুব সংকীর্ণ ও গভীর হয়। |
৩. বদ্বীপ গঠনের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ বা শর্তগুলি লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
নদীর মোহনায় বদ্বীপ গড়ে ওঠার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলি প্রয়োজন:
- পলিরাশি: নদীর দীর্ঘ গতিপথ এবং প্রচুর পরিমাণে পলি বহন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
- মোহনার প্রকৃতি: মোহনায় সমুদ্রের জল শান্ত হতে হবে এবং সমুদ্রস্রোত বা জোয়ার-ভাটার প্রকোপ কম হতে হবে, যাতে পলি ধুয়ে না যায়।
- সমুদ্রের গভীরতা: মোহনা অঞ্চলে সমুদ্রের গভীরতা কম হতে হবে এবং লবণাক্ততা বেশি হতে হবে (যা পলি থিতিয়ে পড়তে সাহায্য করে)।
৪. সব নদীর মোহনায় বদ্বীপ গড়ে ওঠে না কেন? (উদাহরণসহ)
✅ উত্তর:
বদ্বীপ গঠনের শর্ত পূরণ না হলে বদ্বীপ গড়ে ওঠে না।
- প্রবল স্রোত: মোহনায় জোয়ার-ভাটা বা সমুদ্রস্রোত খুব বেশি হলে পলি সঞ্চিত হতে পারে না, সমুদ্রে ভেসে যায়।
- স্বল্প পলি: নদী যদি খুব ছোট হয় বা কঠিন শিলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তবে পলির পরিমাণ কম থাকে।
- গভীর সমুদ্র: মোহনায় সমুদ্র খুব গভীর হলে পলি ভরাট হতে অনেক সময় লাগে।
উদাহরণ: ভারতের নর্মদা ও তাপ্তী নদীর মোহনায় বদ্বীপ নেই কারণ এগুলি গ্রস্ত উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এবং মোহনায় স্রোত খুব বেশি।
৫. অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake) কীভাবে সৃষ্টি হয়? চিত্রসহ লেখো।
✅ উত্তর:
নদীর মধ্য ও নিম্ন গতিতে নদী যখন খুব বেশি বাঁক নিয়ে (মিয়েন্ডার) প্রবাহিত হয়:
- ১) বাঁকের উত্তল অংশে সঞ্চয় এবং অবতল অংশে ক্ষয় হতে থাকে।
- ২) এর ফলে বাঁকের দুটি মুখ ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসে।
- ৩) নদীতে জল বাড়লে বা বন্যার সময় নদী বাঁকানো পথ ছেড়ে সোজা পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
- ৪) তখন পরিত্যক্ত বাঁকটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হ্রদের মতো অবস্থান করে। এর আকৃতি ঘোড়ার ক্ষুরের মতো বলে একে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ বলে।
[attachment_0](attachment)
৬. বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সুন্দরবন অঞ্চলের কী কী ক্ষতি হচ্ছে? (৩টি প্রভাব) [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর:
- ১. দ্বীপ নিমজ্জন: বিশ্ব উষ্ণায়নে মেরুপ্রদেশের বরফ গলে সমুদ্রের জলতল বাড়ছে। ফলে সুন্দরবনের নিচু দ্বীপগুলি (যেমন- লোহাচড়া, নিউমুর, ঘোড়ামারা) জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে।
- ২. লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্রের জল নদীতে ঢুকে পরায় মাটি ও জলের লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরী গাছ এবং কৃষিকাজের জন্য ক্ষতিকর।
- ৩. ম্যানগ্রোভ ধ্বংস: জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোনের প্রকোপ বাড়ায় ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং বাঘের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে।
৭. অবরোহণ (Degradation) ও আরোহণ (Aggradation)-এর মধ্যে পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
| বিষয় | অবরোহণ | আরোহণ |
|---|---|---|
| ১. প্রক্রিয়া | এটি একটি ক্ষয়কারী প্রক্রিয়া। | এটি একটি সঞ্চয়কারী প্রক্রিয়া। |
| ২. ফলাফল | এর ফলে ভূমির উচ্চতা হ্রাস পায়। | এর ফলে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। |
| ৩. নিয়ন্ত্রক | নদী, বায়ু, হিমবাহের ক্ষয়কার্য। | নদী, বায়ু, হিমবাহের সঞ্চয়কার্য। |
উভয়ের মিলিত ফল হলো পর্যায়ন।
৮. জলপ্রপাত সৃষ্টির তিনটি কারণ উল্লেখ করো।
✅ উত্তর:
- শিলাস্তরের বিন্যাস: নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলা আড়াআড়িভাবে থাকলে, কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং কঠিন শিলা খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, ফলে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়।
- চ্যুতি: ভূ-আন্দোলনের ফলে নদীর গতিপথে চ্যুতি বা ফাটল সৃষ্টি হলে জলপ্রপাত তৈরি হয় (যেমন- নর্মদার কপিলধারা)।
- ঝুলন্ত উপত্যকা: হিমবাহ অঞ্চলে প্রধান হিমবাহের উপত্যকায় ছোট হিমবাহগুলি এসে মিললে বরফ গলার পর সেখানে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়।
৯. পলল ব্যজনী (Alluvial Fan) কেন পর্বতের পাদদেশে গড়ে ওঠে?
✅ উত্তর:
- ঢালের পরিবর্তন: নদী যখন খাড়া পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে হঠাৎ সমভূমিতে প্রবেশ করে, তখন ভূমির ঢাল হঠাৎ কমে যায়।
- গতিবেগ হ্রাস: ঢাল কমার ফলে নদীর স্রোত এবং বহন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়।
- সঞ্চয়: তখন নদীবাহিত নুড়ি, পাথর, বালি আর বইতে না পেরে পর্বতের পাদদেশে ত্রিকোণাকার বা হাতপাখার মতো আকৃতিতে জমা হয়ে পলল ব্যজনী গঠন করে।
১০. নদী উপত্যকা ‘V’ আকৃতির হয় কেন?
✅ উত্তর:
পার্বত্য প্রবাহে বা উচ্চগতিতে নদীর স্রোত খুব প্রবল থাকে।
- এখানে নদী তার বোঝা (পাথর, নুড়ি) দিয়ে নদীখাতের তলদেশে প্রচণ্ড আঘাত করে, ফলে নিম্নক্ষয় খুব বেশি হয়।
- তুলনামূলকভাবে দুই পাশের পাড়ে বা পার্শ্বক্ষয় কম হয়।
- গভীর নিম্নক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকাটি সংকীর্ণ ও গভীর হয় এবং ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো দেখতে হয়। একে গিরিখাত বলে।
১১. পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ কীভাবে গঠিত হয়?
✅ উত্তর:
- পরিবেশ: নদীর মোহনায় সমুদ্র শান্ত থাকলে এবং নদীর স্রোত প্রবল থাকলে এই বদ্বীপ গঠিত হয়।
- প্রক্রিয়া: নদীটি সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। নদীর জলে থাকা চুন বা লবণের প্রভাবে সূক্ষ্ম পলিরাশি দলা পাকিয়ে নদীর প্রধান ধারার দুই পাশে জমা হতে থাকে।
- আকৃতি: এই সঞ্চয় মূল নদীর দুই পাশে পাখির আঙুলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তাই একে পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ (Bird’s foot delta) বলে। উদাহরণ: মিসিসিপি বদ্বীপ।
১২. মন্থকূপ (Pot Holes) কী? এটি কীভাবে গঠিত হয়?
✅ উত্তর:
সংজ্ঞা: নদীর গতিপথে অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে শিলাখণ্ডের আঘাতে নদীগর্ভে যে ছোট ছোট হাঁড়ির মতো গর্ত সৃষ্টি হয়, তাদের মন্থকূপ বলে।
গঠন: বর্ষাকালে নদীর জল পাক খেয়ে ঘুরলে জলের সঙ্গে থাকা পাথরগুলোও ঘুরতে থাকে (Eddy current)। এই ঘূর্ণায়মান পাথরের আঘাতে নদীর তলদেশে গর্ত তৈরি হয়। অনেকগুলো মন্থকূপ পাশাপাশি থাকলে নদীখাত অমসৃণ হয়।
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বহির্জাত প্রক্রিয়া ও ভূমিরূপ | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-১২ | পূর্ণমান: ৩
১. নদীর ক্ষয়কার্যের প্রক্রিয়াগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
নদী প্রধানত চারটি প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কাজ করে:
- জলপ্রবাহ ক্ষয় (Hydraulic Action): নদীর প্রবল স্রোতের আঘাতে নদীখাতের মাটি বা শিলা আলগা হয়ে ভেঙে যায়।
- অবঘর্ষ ক্ষয় (Abrasion): নদীবাহিত নুড়ি, পাথর ও বালি নদীর তলদেশে ও গাত্রে আঘাত করে এবং শিরিষ কাগজের মতো ঘষে নদীখাতকে গভীর ও মসৃণ করে।
- ঘর্ষণ ক্ষয় (Attrition): নদীবাহিত শিলাখণ্ডগুলি পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি লেগে ভেঙে গিয়ে আরও ছোট ও গোলাকার হয়।
- দ্রবণ ক্ষয় (Solution): জললর সংস্পর্শে শিলাস্তরের খনিজ (যেমন- চুনাপাথর, লবণ) গলে গিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
২. গিরিখাত (Gorge) ও ক্যানিয়ন (Canyon)-এর মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
| বিষয় | গিরিখাত | ক্যানিয়ন |
|---|---|---|
| ১. জলবায়ু | আর্দ্র বা বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে গঠিত হয়। | শুষ্ক বা মরুপ্রায় অঞ্চলে গঠিত হয়। |
| ২. আকৃতি | দেখতে ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো হয়। | দেখতে ইংরেজি ‘I’ অক্ষরের মতো হয়। |
| ৩. প্রশস্ততা | নিম্নক্ষয়ের সাথে পার্শ্বক্ষয় হওয়ায় এটি কিছুটা চওড়া হয়। | কেবল নিম্নক্ষয় হওয়ায় এটি খুব সংকীর্ণ ও গভীর হয়। |
৩. বদ্বীপ গঠনের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ বা শর্তগুলি লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
নদীর মোহনায় বদ্বীপ গড়ে ওঠার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলি প্রয়োজন:
- পলিরাশি: নদীর দীর্ঘ গতিপথ এবং প্রচুর পরিমাণে পলি বহন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
- মোহনার প্রকৃতি: মোহনায় সমুদ্রের জল শান্ত হতে হবে এবং সমুদ্রস্রোত বা জোয়ার-ভাটার প্রকোপ কম হতে হবে, যাতে পলি ধুয়ে না যায়।
- সমুদ্রের গভীরতা: মোহনা অঞ্চলে সমুদ্রের গভীরতা কম হতে হবে এবং লবণাক্ততা বেশি হতে হবে (যা পলি থিতিয়ে পড়তে সাহায্য করে)।
৪. সব নদীর মোহনায় বদ্বীপ গড়ে ওঠে না কেন? (উদাহরণসহ)
✅ উত্তর:
বদ্বীপ গঠনের শর্ত পূরণ না হলে বদ্বীপ গড়ে ওঠে না।
- প্রবল স্রোত: মোহনায় জোয়ার-ভাটা বা সমুদ্রস্রোত খুব বেশি হলে পলি সঞ্চিত হতে পারে না, সমুদ্রে ভেসে যায়।
- স্বল্প পলি: নদী যদি খুব ছোট হয় বা কঠিন শিলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তবে পলির পরিমাণ কম থাকে।
- গভীর সমুদ্র: মোহনায় সমুদ্র খুব গভীর হলে পলি ভরাট হতে অনেক সময় লাগে।
উদাহরণ: ভারতের নর্মদা ও তাপ্তী নদীর মোহনায় বদ্বীপ নেই কারণ এগুলি গ্রস্ত উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এবং মোহনায় স্রোত খুব বেশি।
৫. অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake) কীভাবে সৃষ্টি হয়? চিত্রসহ লেখো।
✅ উত্তর:
নদীর মধ্য ও নিম্ন গতিতে নদী যখন খুব বেশি বাঁক নিয়ে (মিয়েন্ডার) প্রবাহিত হয়:
- ১) বাঁকের উত্তল অংশে সঞ্চয় এবং অবতল অংশে ক্ষয় হতে থাকে।
- ২) এর ফলে বাঁকের দুটি মুখ ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসে।
- ৩) নদীতে জল বাড়লে বা বন্যার সময় নদী বাঁকানো পথ ছেড়ে সোজা পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
- ৪) তখন পরিত্যক্ত বাঁকটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হ্রদের মতো অবস্থান করে। এর আকৃতি ঘোড়ার ক্ষুরের মতো বলে একে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ বলে।
[attachment_0](attachment)
৬. বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সুন্দরবন অঞ্চলের কী কী ক্ষতি হচ্ছে? (৩টি প্রভাব) [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর:
- ১. দ্বীপ নিমজ্জন: বিশ্ব উষ্ণায়নে মেরুপ্রদেশের বরফ গলে সমুদ্রের জলতল বাড়ছে। ফলে সুন্দরবনের নিচু দ্বীপগুলি (যেমন- লোহাচড়া, নিউমুর, ঘোড়ামারা) জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে।
- ২. লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্রের জল নদীতে ঢুকে পরায় মাটি ও জলের লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরী গাছ এবং কৃষিকাজের জন্য ক্ষতিকর।
- ৩. ম্যানগ্রোভ ধ্বংস: জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোনের প্রকোপ বাড়ায় ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং বাঘের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে।
৭. অবরোহণ (Degradation) ও আরোহণ (Aggradation)-এর মধ্যে পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
| বিষয় | অবরোহণ | আরোহণ |
|---|---|---|
| ১. প্রক্রিয়া | এটি একটি ক্ষয়কারী প্রক্রিয়া। | এটি একটি সঞ্চয়কারী প্রক্রিয়া। |
| ২. ফলাফল | এর ফলে ভূমির উচ্চতা হ্রাস পায়। | এর ফলে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। |
| ৩. নিয়ন্ত্রক | নদী, বায়ু, হিমবাহের ক্ষয়কার্য। | নদী, বায়ু, হিমবাহের সঞ্চয়কার্য। |
উভয়ের মিলিত ফল হলো পর্যায়ন।
৮. জলপ্রপাত সৃষ্টির তিনটি কারণ উল্লেখ করো।
✅ উত্তর:
- শিলাস্তরের বিন্যাস: নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলা আড়াআড়িভাবে থাকলে, কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং কঠিন শিলা খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, ফলে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়।
- চ্যুতি: ভূ-আন্দোলনের ফলে নদীর গতিপথে চ্যুতি বা ফাটল সৃষ্টি হলে জলপ্রপাত তৈরি হয় (যেমন- নর্মদার কপিলধারা)।
- ঝুলন্ত উপত্যকা: হিমবাহ অঞ্চলে প্রধান হিমবাহের উপত্যকায় ছোট হিমবাহগুলি এসে মিললে বরফ গলার পর সেখানে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়।
৯. পলল ব্যজনী (Alluvial Fan) কেন পর্বতের পাদদেশে গড়ে ওঠে?
✅ উত্তর:
- ঢালের পরিবর্তন: নদী যখন খাড়া পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে হঠাৎ সমভূমিতে প্রবেশ করে, তখন ভূমির ঢাল হঠাৎ কমে যায়।
- গতিবেগ হ্রাস: ঢাল কমার ফলে নদীর স্রোত এবং বহন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়।
- সঞ্চয়: তখন নদীবাহিত নুড়ি, পাথর, বালি আর বইতে না পেরে পর্বতের পাদদেশে ত্রিকোণাকার বা হাতপাখার মতো আকৃতিতে জমা হয়ে পলল ব্যজনী গঠন করে।
১০. নদী উপত্যকা ‘V’ আকৃতির হয় কেন?
✅ উত্তর:
পার্বত্য প্রবাহে বা উচ্চগতিতে নদীর স্রোত খুব প্রবল থাকে।
- এখানে নদী তার বোঝা (পাথর, নুড়ি) দিয়ে নদীখাতের তলদেশে প্রচণ্ড আঘাত করে, ফলে নিম্নক্ষয় খুব বেশি হয়।
- তুলনামূলকভাবে দুই পাশের পাড়ে বা পার্শ্বক্ষয় কম হয়।
- গভীর নিম্নক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকাটি সংকীর্ণ ও গভীর হয় এবং ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো দেখতে হয়। একে গিরিখাত বলে।
১১. পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ কীভাবে গঠিত হয়?
✅ উত্তর:
- পরিবেশ: নদীর মোহনায় সমুদ্র শান্ত থাকলে এবং নদীর স্রোত প্রবল থাকলে এই বদ্বীপ গঠিত হয়।
- প্রক্রিয়া: নদীটি সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। নদীর জলে থাকা চুন বা লবণের প্রভাবে সূক্ষ্ম পলিরাশি দলা পাকিয়ে নদীর প্রধান ধারার দুই পাশে জমা হতে থাকে।
- আকৃতি: এই সঞ্চয় মূল নদীর দুই পাশে পাখির আঙুলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তাই একে পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ (Bird’s foot delta) বলে। উদাহরণ: মিসিসিপি বদ্বীপ।
১২. মন্থকূপ (Pot Holes) কী? এটি কীভাবে গঠিত হয়?
✅ উত্তর:
সংজ্ঞা: নদীর গতিপথে অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে শিলাখণ্ডের আঘাতে নদীগর্ভে যে ছোট ছোট হাঁড়ির মতো গর্ত সৃষ্টি হয়, তাদের মন্থকূপ বলে।
গঠন: বর্ষাকালে নদীর জল পাক খেয়ে ঘুরলে জলের সঙ্গে থাকা পাথরগুলোও ঘুরতে থাকে (Eddy current)। এই ঘূর্ণায়মান পাথরের আঘাতে নদীর তলদেশে গর্ত তৈরি হয়। অনেকগুলো মন্থকূপ পাশাপাশি থাকলে নদীখাত অমসৃণ হয়।
১৩. রসে মতানে (Roche Moutonnee) কীভাবে গঠিত হয়? চিত্রসহ লেখো।
✅ উত্তর:
হিমবাহের প্রবাহপথে কোনো কঠিন শিলাখণ্ড বা টিলা অবস্থান করলে হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে রসে মতানে গঠিত হয়।
- প্রবাহের দিক (Stoss side): যে দিক থেকে হিমবাহ আসে, সেই দিকের শিলাস্তরটি অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মসৃণ ও চকচকে হয়।
- বিপরীত দিক (Lee side): হিমবাহ চলে যাওয়ার সময় বিপরীত দিকের ঢালে উৎপাটন (Plucking) প্রক্রিয়ায় শিলাখণ্ড ভেঙে বেরিয়ে আসে, ফলে ওই দিকটি এবড়ো-খেবড়ো ও ফাটলযুক্ত হয়।
দেখতে অনেকটা ভেড়ার মাথার মতো হয় বলে একে রসে মতানে বলে।
[attachment_0](attachment)
১৪. ঝুলন্ত উপত্যকা (Hanging Valley) সৃষ্টি হয় কেন? এখানে জলপ্রপাত দেখা যায় কেন?
✅ উত্তর:
পার্বত্য অঞ্চলে প্রধান হিমবাহের আকৃতি ও ক্ষয়ক্ষমতা তার উপনদী হিমবাহগুলির চেয়ে অনেক বেশি হয়।
- সৃষ্টি: প্রধান হিমবাহ তার উপত্যকাকে অনেক বেশি গভীর করে ক্ষয় করে। কিন্তু ছোট উপনদী হিমবাহগুলি অতটা গভীর ক্ষয় করতে পারে না। ফলে বরফ গলে গেলে মনে হয় যেন ছোট উপত্যকাগুলি প্রধান উপত্যকার ওপর ঝুলে আছে। একেই ঝুলন্ত উপত্যকা বলে।
- জলপ্রপাত: নদী যখন এই ঝুলন্ত উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হঠাৎ খাড়া ঢাল বেয়ে প্রধান উপত্যকায় পড়ে, তখনই জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয় (যেমন- কুপার জলপ্রপাত)।
১৫. রসে মতানে ও ড্রামলিনের তিনটি পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
| বিষয় | রসে মতানে | ড্রামলিন |
|---|---|---|
| ১. প্রক্রিয়া | এটি হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে গঠিত হয়। | এটি হিমবাহের সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত হয়। |
| ২. উপাদান | এটি কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত। | এটি নুড়ি, বালি, কাঁকর ও কাদা দ্বারা গঠিত। |
| ৩. আকৃতি | একদিক মসৃণ ও অন্যদিক অমসৃণ। | দেখতে উল্টানো নৌকার মতো বা চামচের মতো। |
১৬. গ্রাবরেখা (Moraine) কাকে বলে? অবস্থান অনুযায়ী এর শ্রেণিবিভাগ করো।
✅ উত্তর:
সংজ্ঞা: হিমবাহ গলে যাওয়ার সময় তার সাথে বাহিত নুড়ি, পাথর, বালি ইত্যাদি উপত্যকার বিভিন্ন অংশে সঞ্চিত হয়ে যে দীর্ঘাকৃতি স্তূপ বা বাঁধের সৃষ্টি করে, তাকে গ্রাবরেখা বলে।
শ্রেণিবিভাগ:
১) পার্শ্ব গ্রাবরেখা: হিমবাহের দুই পাশে সঞ্চিত হয়।
২) মধ্য গ্রাবরেখা: দুটি হিমবাহের মিলনস্থলে মাঝখানে সঞ্চিত হয়।
৩) প্রান্ত গ্রাবরেখা: হিমবাহের শেষ প্রান্তে বা সামনে সঞ্চিত হয়।
৪) ভূমি গ্রাবরেখা: হিমবাহের নিচে বা তলদেশে সঞ্চিত হয়।
১৭. বার্গস্রুন্ড (Bergschrund) ও ক্রেভাস (Crevasse)-এর পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
| বিষয় | বার্গস্রুন্ড | ক্রেভাস |
|---|---|---|
| ১. অবস্থান | হিমবাহ ও পর্বতগাত্রের সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয়। | হিমবাহের উপরিপৃষ্ঠে সৃষ্টি হয়। |
| ২. কারণ | পর্বতগাত্র থেকে হিমবাহ সরে গেলে বা গলে গেলে তৈরি হয়। | অসমান ভূমির ওপর দিয়ে হিমবাহের গতির তারতম্যে বা মোড় ঘোরার সময় টান পড়লে তৈরি হয়। |
| ৩. গভীরতা | এগুলি অত্যন্ত গভীর ও প্রশস্ত হয়। | তুলনামূলকভাবে কম গভীর হয় (তবে বিপজ্জনক)। |
১৮. মরু অঞ্চলে বায়ুর কাজের প্রাধান্য বেশি দেখা যায় কেন? (৩টি কারণ) [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
মরুভূমিতে বায়ুর কাজ বেশি হওয়ার কারণ:
- ১. গাছপালার অভাব: উদ্ভিদ না থাকায় বায়ু বাধাহীনভাবে প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে পারে।
- ২. আলগা মাটি: দিন ও রাতের তাপমাত্রার বিশাল পার্থক্যের (যান্ত্রিক আবহবিকার) কারণে শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালি আলগা থাকে, যা সহজেই উড়ে যায়।
- ৩. বৃষ্টির অভাব: বৃষ্টি কম হওয়ায় মাটি শুষ্ক ও ধূলিকণাময় থাকে, যা বায়ুর ক্ষয় ও বহন কাজকে সহজ করে তোলে।
১৯. ইয়ার্দাঙ (Yardang) ও জিউগেন (Zeugen)-এর পার্থক্য লেখো। [খুবই গুরুত্বপূর্ণ]
✅ উত্তর:
| বিষয় | ইয়ার্দাঙ | জিউগেন |
|---|---|---|
| ১. শিলাস্তরের বিন্যাস | কঠিন ও কোমল শিলাস্তর উলম্বভাবে (পাশাপাশি) অবস্থান করে। | কঠিন ও কোমল শিলাস্তর অনুভূমিকভাবে (ওপর-নিচে) অবস্থান করে। |
| ২. আকৃতি | দেখতে মোরগের ঝুঁটির মতো হয়। | দেখতে চ্যাপ্টা মাথাযুক্ত টেবিল বা ওষুধের ক্যাপসুলের মতো হয়। |
| ৩. ক্ষয় | কোমল শিলা দুপাশ থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গর্তের সৃষ্টি করে। | নিচের কোমল শিলা বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ওপরের কঠিন শিলা কম। |
২০. গৌর (Gaur) বা মাশরুম রক কীভাবে গঠিত হয়? চিত্রসহ লেখো।
✅ উত্তর:
মরু অঞ্চলে কোনো শিলাস্তূপের ওপরের অংশ কঠিন এবং নিচের অংশ কোমল শিলা দিয়ে গঠিত হলে বায়ুর অবঘর্ষ ক্ষয় কাজ করে।
বায়ুবাহিত বালুকণা ভারী হওয়ায় তা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি (১-২ মিটার উঁচুতে) বেশি আঘাত করে। ফলে শিলাস্তূপের নিচের কোমল অংশটি ওপরের অংশের তুলনায় বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সরু হয়ে যায়। কিন্তু ওপরের কঠিন অংশটি কম ক্ষয় হয়ে চওড়া থাকে।
এর ফলে শিলাটি দেখতে ব্যাঙের ছাতার মতো হয়, একেই গৌর বলে।
[attachment_1](attachment)
২১. বার্খান (Barchan) ও সিফ (Seif) বালিয়াড়ির মধ্যে পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
| বিষয় | বার্খান | সিফ |
|---|---|---|
| ১. আকৃতি | আধখানা চাঁদের মতো দেখতে (Crescent shaped)। | দীর্ঘ, সংকীর্ণ ও তলোয়ারের মতো দেখতে (Linear)। |
| ২. বায়ুর দিক | বায়ুপ্রবাহের পথের সাথে আড়াআড়িভাবে গড়ে ওঠে। | বায়ুপ্রবাহের সমান্তরালে গড়ে ওঠে। |
| ৩. শিং | এর দুটি শিং বা প্রান্ত বায়ুর গতির দিকে থাকে। | এর কোনো শিং থাকে না, এটি লম্বালম্বি শৈলশিরার মতো হয়। |
২২. লোয়েস (Loess) সমভূমি কীভাবে গঠিত হয়? উদাহরণ দাও।
✅ উত্তর:
প্রক্রিয়া: মরুভূমি অঞ্চল থেকে প্রবল বায়প্রবাহের দ্বারা অতি সূক্ষ্ম বালি ও পলি কণা (০.০৫ মিমি-এর কম) উড়ে গিয়ে বহু দূরে কোনো আর্দ্র নিচু জমিতে বা নদী উপত্যকায় সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমি গঠন করে, তাকে লোয়েস সমভূমি বলে।
বৈশিষ্ট্য: এই মাটির রং হলদে বা ধূসর এবং এটি খুব উর্বর হয়।
উদাহরণ: গোবি মরুভূমি থেকে বালি উড়ে এসে চীনের হোয়াংহো নদী অববাহিকায় বিশাল লোয়েস সমভূমি গঠন করেছে।
২৩. মরুভূমির সম্প্রসারণ রোধের তিনটি উপায় লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর:
মরুস্থলী বা মরুভূমির প্রসার আটকানোর উপায়:
- ১. সবুজ প্রাচীর (Shelter Belt): মরুভূমির প্রান্তে সারিবদ্ধভাবে খরা-সহনশীল গাছ (যেমন- বাবলা, ক্যাকটাস) লাগিয়ে বায়ুর গতিপথ রোধ করা। (যেমন- সাহারার ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’)।
- ২. পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত পশুচারণ বা Overgrazing বন্ধ করতে হবে যাতে মাটির ওপরের ঘাসের আস্তরণ নষ্ট না হয়।
- ৩. জলসেচ ও বালি স্থিতিকরণ: কৃত্রিমভাবে জলসেচ করে বালির ওপর ঘাস বা গুল্ম লাগিয়ে বালিকে উড়ে যাওয়া থেকে আটকাতে হবে (Sand dune stabilization)।
২৪. পেডিমেন্ট (Pediment) ও বাজাদা (Bajada)-এর সম্পর্ক ও পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
মরু অঞ্চলে পর্বতের পাদদেশে ক্ষয় ও সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ।
- পেডিমেন্ট: এটি পর্বতের ঠিক নিচে অবস্থিত শিলাময়, মৃদু ঢালু ও ক্ষয়জাত সমভূমি। (মূলত ক্ষয়কার্যের ফল)।
- বাজাদা: পেডিমেন্টের নিচে বিভিন্ন নালার জলবাহিত নুড়ি, বালি ও পলি সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমি গঠিত হয়, তাকে বাজাদা বলে। (মূলত সঞ্চয়কার্যের ফল)।
- বাজাদা হলো পেডিমেন্ট ও প্লায়া হ্রদের মধ্যবর্তী অংশ।
২৫. নদীবাঁক বা মিয়েন্ডার (Meander) কেন সৃষ্টি হয়?
✅ উত্তর:
নদীর মধ্য ও নিম্ন গতিতে ভূমির ঢাল কমে যাওয়ায় নদীর গতিবেগ ও ক্ষয় ক্ষমতা কমে যায়। ফলে নদীর গতিপথে কোনো কঠিন শিলা বা সামান্য বাধা এলে নদী তা ক্ষয় করতে বা সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। তখন নদী ওই বাধা এড়িয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। তুরস্কের মিয়েন্ডারস নদীর নামানুসারে একে মিয়েন্ডার বলে।
[attachment_0](attachment)
২৬. খাড়ি (Estuary) অঞ্চলে বদ্বীপ গড়ে ওঠে না কেন?
✅ উত্তর:
খাড়ি হলো ফানেল আকৃতির প্রশস্ত নদী মোহনা।
- প্রবল স্রোত: খাড়ি অঞ্চলে জোয়ার-ভাটার প্রকোপ খুব বেশি থাকে। প্রবল জোয়ারের টানে নদীবাহিত পলিরাশি সমুদ্রের গভীর অংশে চলে যায়।
- পলির অভাব: সঞ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় ও স্থির জল না থাকায় এখানে বদ্বীপ গঠিত হতে পারে না। (উদাহরণ: নর্মদা ও তাপ্তী নদীর মোহনা)।
২৭. অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ এবং প্লাবনভূমির সম্পর্ক কী?
✅ উত্তর:
নদীর নিম্নগতিতে প্লাবনভূমি এবং অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ—উভয়ই দেখা যায়।
- অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ সৃষ্টি হওয়ার পর মূল নদীটি সোজা পথে বইতে শুরু করে।
- পরবর্তীকালে বন্যার সময় নদীর পলি সঞ্চিত হয়ে ওই বিচ্ছিন্ন হ্রদটিকে ভরাট করে ফেলে এবং কালক্রমে তা প্লাবনভূমির অংশ হয়ে যায়। অর্থাৎ, অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ প্লাবনভূমি গঠনের একটি অন্তর্বর্তী পর্যায় হতে পারে।
২৮. নদী উপত্যকা ও হিমবাহ উপত্যকার তিনটি পার্থক্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
| বিষয় | নদী উপত্যকা | হিমবাহ উপত্যকা |
|---|---|---|
| ১. আকৃতি | ইংরেজি ‘V’ বা ‘I’ আকৃতির হয়। | ইংরেজি ‘U’ আকৃতির হয়। |
| ২. ক্ষয় | নিম্নক্ষয় বেশি এবং পার্শ্বক্ষয় কম হয়। | তলদেশ ও পার্শ্বদেশ সমানভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। |
| ৩. বৈশিষ্ট্য | এতে শৃঙ্খলিত শৈলশিরা দেখা যায়। | এতে ঝুলন্ত উপত্যকা বা কর্তিত শৈলশিরা দেখা যায়। |
২৯. হিমশৈল (Iceberg) কী? এর বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব লেখো।
✅ উত্তর:
সংজ্ঞা: মহাদেশীয় হিমবাহ বা মেরু অঞ্চলের বিশাল বরফস্তূপ সমুদ্রের জলে ভেঙে পড়ে ভাসতে থাকলে তাকে হিমশৈল বলে।
- বৈশিষ্ট্য: হিমশৈল মিষ্টি জলের উৎস। এর আয়তনের মাত্র ১/৯ অংশ জলের ওপরে এবং ৮/৯ অংশ জলের নিচে থাকে।
- গুরুত্ব: এগুলি জাহাজ চলাচলে বিপদের কারণ হতে পারে (যেমন- ১৯১২ সালে টাইটানিক ডুবি)। আবার এগুলি মগ্নচড়া সৃষ্টিতে সাহায্য করে যা মাছের খাদ্যের ভাণ্ডার।
[attachment_1](attachment)
৩০. পিরামিড চূড়া (Pyramidal Peak) কীভাবে গঠিত হয়? উদাহরণ দাও।
✅ উত্তর:
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে একটি পর্বতশৃঙ্গের বিভিন্ন দিক থেকে ৩ বা তার বেশি হিমবাহ বা ‘করি’ (Corrie) ক্ষয়কার্য চালালে, শৃঙ্গটি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খাড়া ঢালযুক্ত ও তীক্ষ্ণ হয়। এর আকৃতি পিরামিডের মতো হওয়ায় একে পিরামিড চূড়া বলে।
উদাহরণ: আল্পস পর্বতের ‘ম্যাটারহর্ন’ এবং হিমালয়ের ‘নীলকণ্ঠ’।
৩১. মরু সম্প্রসারণের (Desertification) তিনটি কারণ লেখো। [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর:
মরুভূমি আয়তনে বেড়ে যাওয়ার কারণগুলি হলো:
- ১. বিশ্ব উষ্ণায়ন: পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার ফলে খরা ও অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে, যা মরুভূমি প্রসারে সাহায্য করছে।
- ২. বৃক্ষচ্ছেদন: মরুভূমির প্রান্তীয় অঞ্চলে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে মাটি আলগা হয়ে যাচ্ছে এবং বালুঝড় সহজেই অন্য এলাকায় বালি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
- ৩. অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণ: অতিরিক্ত পশুচারণের ফলে মাটির ওপরের ঘাসের আস্তরণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা মৃত্তিকা ক্ষয় ও মরুকরণ ত্বরান্বিত করছে।
৩২. ধান্দ (Dhand) কী? এটি কীভাবে সৃষ্টি হয়?
✅ উত্তর:
রাজস্থানের থর মরুভূমিতে দুটি সমান্তরাল বালিয়াড়ির মধ্যবর্তী অবনমিত অংশে বা ব্লো-আউট গর্তে বৃষ্টির জল জমে যে লবণাক্ত হ্রদ সৃষ্টি হয়, তাকে স্থানীয় ভাষায় ধান্দ বলে। গ্রীষ্মকালে জল শুকিয়ে গেলে এর নিচে লবণের স্তর পড়ে থাকে। উদাহরণ: দিদওয়ানা, সম্বর হ্রদ।
৩৩. সুন্দরবনের দ্বীপগুলি (যেমন- ঘোড়ামারা, লোহাচড়া) কেন ধ্বংস হচ্ছে? (৩টি কারণ)
✅ উত্তর:
- ১. সমুদ্র জলতল বৃদ্ধি: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মেরুপ্রদেশের বরফ গলছে এবং বঙ্গোপসাগরের জলতল বাড়ছে, যার ফলে নিচু দ্বীপগুলি তলিয়ে যাচ্ছে।
- ২. জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়: আয়লা, আমফান-এর মতো সুপার সাইক্লোনের আঘাতে উপকূলীয় বাঁধ ও মাটি ধুয়ে যাচ্ছে।
- ৩. ম্যানগ্রোভ ধ্বংস: মানুষের বসতি ও চাষাবাদের জন্য ম্যানগ্রোভ অরণ্য কেটে ফেলায় দ্বীপগুলির প্রাকৃতিক ঢাল নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে ভূমিক্ষয় বাড়ছে।
৩৪. ইনসেলবার্জ (Inselberg) ও মোনাডনক (Monadnock)-এর পার্থক্য কী?
✅ উত্তর:
| বিষয় | ইনসেলবার্জ | মোনাডনক |
|---|---|---|
| ১. অঞ্চল | এটি শুষ্ক মরু অঞ্চলে দেখা যায়। | এটি আর্দ্র নদী অববাহিকা অঞ্চলে দেখা যায়। |
| ২. কারক | এটি বায়ুর ক্ষয়কার্যের ফলে গঠিত হয়। | এটি নদীর ক্ষয়কার্যের শেষ পর্যায়ে গঠিত হয়। |
| ৩. আকৃতি | এর গা মসৃণ ও গোলাকার হয়। | এটি কম উচ্চতাযুক্ত টিলার মতো হয়। |
৩৫. নদী, বায়ু ও হিমবাহের কাজের মধ্যে একটি সাধারণ মিল ও একটি অমিল লেখো।
✅ উত্তর:
মিল: তিনটি শক্তিই বহির্জাত প্রক্রিয়া এবং এগুলি ক্ষয়, বহন ও সঞ্চয়—এই তিনটি কাজই করে ভূমিরূপ পরিবর্তন করে।
অমিল: নদীর কাজ মূলত আর্দ্র ও বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে, বায়ুর কাজ শুষ্ক মরু অঞ্চলে এবং হিমবাহের কাজ শীতল মেরু বা উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।
৩৬. নদীর পার্বত্য প্রবাহে কেন ‘ক্যানিয়ন’ গঠিত হয় না?
✅ উত্তর:
পার্বত্য অঞ্চলে বা নদীর উচ্চগতিতে সাধারণত বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টির জল নদী উপত্যকার দুই পাশের দেওয়ালে ধৌত প্রক্রিয়ায় (Wash out) ক্ষয় করে, ফলে উপত্যকাটি চওড়া হয়ে ‘V’ আকৃতি ধারণ করে। ক্যানিয়ন বা ‘I’ আকৃতির উপত্যকা তৈরির জন্য শুষ্ক বা বৃষ্টিহীন আবহাওয়া প্রয়োজন, যা সাধারণ পার্বত্য প্রবাহে থাকে না।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বহির্জাত প্রক্রিয়া ও ভূমিরূপ (বিশ্লেষণ)
প্রশ্ন: রসে মতানে ও ড্রামলিনের মূল পার্থক্য কী?
✅ উত্তর: রসে মতানে হলো হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে কঠিন শিলায় গঠিত একপ্রকার টিলা, যার একদিক মসৃণ ও অন্যদিক এবড়ো-খেবড়ো হয়। অন্যদিকে, ড্রামলিন হলো হিমবাহের সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত উল্টানো নৌকার মতো নুড়ি-বালির স্তূপ।
প্রশ্ন: মরু অঞ্চলে বায়ুর কাজ বেশি কেন?
✅ উত্তর: মরুভূমিতে গাছপালা না থাকায় বায়ু বাধাহীনভাবে প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে পারে। তাছাড়া যান্ত্রিক আবহবিকারের কারণে শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালি আলগা থাকে, যা বায়ুর পক্ষে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া বা ক্ষয় করা সহজ হয়।
প্রশ্ন: খাড়ি অঞ্চলে কেন বদ্বীপ গঠিত হয় না?
✅ উত্তর: খাড়ি অঞ্চলে (যেমন নর্মদা নদীর মোহনা) জোয়ার-ভাটার স্রোত খুব প্রবল থাকে। নদী যে পলি নিয়ে আসে, তা জোয়ারের টানে সমুদ্রের গভীর অংশে চলে যায়। পলি থিতিয়ে পড়ার মতো শান্ত পরিবেশ না থাকায় সেখানে বদ্বীপ গড়ে উঠতে পারে না।
প্রশ্ন: গৌর বা মাশরুম রক কীভাবে তৈরি হয়?
✅ উত্তর: মরু অঞ্চলে বায়ুর সাথে ওড়া বালি কণা মাটির কাছাকাছি ১-২ মিটার উচ্চতায় বেশি আঘাত করে। তাই কোনো শিলাস্তূপের নিচের অংশ ওপরের অংশের চেয়ে বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সরু হয়ে যায়। ফলে শিলাটি দেখতে ব্যাঙের ছাতার মতো হয়, একেই গৌর বলে।
প্রশ্ন: ঝুলন্ত উপত্যকায় জলপ্রপাত কেন দেখা যায়?
✅ উত্তর: প্রধান হিমবাহের উপত্যকাটি উপনদী হিমবাহের উপত্যকার চেয়ে অনেক গভীর হয়। বরফ গলে গেলে মনে হয় উপনদী উপত্যকাটি প্রধান উপত্যকার ওপর ঝুলে আছে। নদী যখন এই খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে, তখন জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়।