দশম শ্রেণী: ভূগোল অধ্যায় -৪ ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’

বিভাগ-গ: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (পর্ব-১)

বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-১২


১. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management) বলতে কী বোঝো? [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর: পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্য বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস, বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, পুনর্নবীকরণ এবং বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিষ্কাশন করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলে।

২. বর্জ্যের পৃথকীকরণ (Segregation of Waste) কেন প্রয়োজন?

উত্তর: উৎসস্থলে বর্জ্যকে জৈব ভঙ্গুর (পচনশীল) এবং জৈব অভঙ্গুর (অপচনশীল) বা বিষাক্ত ও বিষহীন শ্রেণিতে ভাগ করলে পরবর্তী ধাপে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াকরণ এবং পুনর্ব্যবহার করা অনেক সহজ ও কম ব্যয়সাপেক্ষ হয়।

৩. জৈব ভঙ্গুর ও জৈব অভঙ্গুর বর্জ্যের দুটি পার্থক্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর: ১) বিয়োজন: জৈব ভঙ্গুর বর্জ্য (যেমন- সবজির খোসা) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা বিয়োজিত হয়, কিন্তু জৈব অভঙ্গুর বর্জ্য (যেমন- প্লাস্টিক) বিয়োজিত হয় না।
২) পরিণতি: ভঙ্গুর বর্জ্য মাটিতে মিশে সার তৈরি করে, কিন্তু অভঙ্গুর বর্জ্য পরিবেশ দূষণ ঘটায়।

৪. বিষাক্ত (Toxic) ও বিষহীন (Non-toxic) বর্জ্যের পার্থক্য কী?

উত্তর: ১) ক্ষতিকারক প্রভাব: বিষাক্ত বর্জ্য (যেমন- সীসা, পারদ) জীবজগতের প্রাণহানি বা রোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিষহীন বর্জ্য (যেমন- কাগজ, খড়) সাধারণত সরাসরি প্রাণহানি ঘটায় না।
২) উৎস: বিষাক্ত বর্জ্য মূলত শিল্প ও হাসপাতাল থেকে আসে, বিষহীন বর্জ্য গৃহস্থালি ও কৃষি থেকে আসে।

৫. ই-বর্জ্য (E-waste) বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য কী? উদাহরণ দাও। [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর: অকেজো, ভাঙা বা বাতিল হয়ে যাওয়া বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে ই-বর্জ্য বলে।
উদাহরণ: খারাপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টিভি, ব্যাটারি, চিপস ইত্যাদি। এগুলিতে সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকে।

৬. চিকিৎসা সংক্রান্ত বর্জ্য (Biomedical Waste) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: হাসপাতাল, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব বা নার্সিংহোম থেকে নির্গত রোগ সৃষ্টিকারী বা সংক্রামক বর্জ্য পদার্থগুলিকে চিকিৎসা সংক্রান্ত বর্জ্য বলে।
উদাহরণ: ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সুঁই, ব্যান্ডেজ, মানুষের দেহাংশ, রক্তের ব্যাগ ইত্যাদি।

৭. ফ্লাই অ্যাশ (Fly Ash) কী? এর ব্যবহার বা গুরুত্ব লেখো।

উত্তর: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর ফলে যে অতি সূক্ষ্ম ধূসর রঙের ছাই উৎপন্ন হয়, তাকে ফ্লাই অ্যাশ বলে।
ব্যবহার: এটি সিমেন্ট তৈরি, ইট তৈরি এবং রাস্তা ভরাট করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

৮. তেজস্ক্রিয় বর্জ্য (Radioactive Waste) কী? এর প্রভাব লেখো।

উত্তর: পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা গবেষণা কেন্দ্র থেকে নির্গত ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম বা থোরিয়াম যুক্ত বর্জ্যকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বলে।
প্রভাব: এটি জীবদেহে ক্যানসার, জিনগত বিকৃতি এবং বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মের কারণ হতে পারে।

৯. গ্যাসীয় বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের দুটি উপায় লেখো।

উত্তর: ১) কলকারখানার চিমনিতে স্ক্রাবার (Scrubber) ব্যবহার করে গ্যাসীয় দূষক ধুয়ে ফেলা।
২) চিমনিতে ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর ব্যবহার করে ধূলিকণা ও ধোঁয়া আটকানো।

১০. তরল বর্জ্য বলতে কী বোঝো? উদাহরণ দাও।

উত্তর: গৃহস্থালি, কৃষি বা শিল্পক্ষেত্র থেকে নির্গত দূষিত জল বা তরল পদার্থকে তরল বর্জ্য বলে।
উদাহরণ: নর্দমার নোংরা জল, কলকারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত জল, সাবান জল, তেলের গাদ (Sludge)।

১১. কৃষিজ বর্জ্য (Agricultural Waste) কী? এটি কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে?

উত্তর: চাষাবাদের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ যেমন- ধানের তুষ, খড়, আখের ছিবড়ে, পচা ফলমূল ইত্যাদিকে কৃষিজ বর্জ্য বলে।
ক্ষতি: এগুলি পচরে মিথেন গ্যাস সৃষ্টি করে। আবার জমিতে খড় পোড়ালে বায়ুদূষণ হয়। তবে এগুলি থেকে জৈব সারও তৈরি করা যায়।

১২. পৌরসভার বর্জ্য (Municipal Waste) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: শহর বা পৌর এলাকায় গৃহস্থালি, দোকানপাট, বাজার, অফিস ও রাস্তাঘাট থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ কঠিন ও অর্ধ-কঠিন আবর্জনা সংগৃহীত হয়, তাকে পৌরসভার বর্জ্য বা MSW (Municipal Solid Waste) বলে।

বিভাগ-গ: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (পর্ব-২)

বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১৩-২৪


১৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় 4R পদ্ধতির গুরুত্ব কী?

উত্তর: 4R (Reduce, Reuse, Recycle, Refuse) পদ্ধতি বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে।
১) Reduce: বর্জ্য উৎপাদন কমানো।
২) Reuse: একই জিনিস বারবার ব্যবহার করা।
৩) Recycle: বর্জ্য থেকে নতুন দ্রব্য তৈরি করা।
৪) Refuse: ক্ষতিকর পণ্য (যেমন প্লাস্টিক) বর্জন করা।

১৪. ভরাটকরণ বা ল্যান্ডফিল (Landfill) কাকে বলে? এর সুবিধা কী?

উত্তর: লোকালয় থেকে দূরে নিচু জমিতে বর্জ্য পদার্থ জমা করে মাটি চাপা দিয়ে ভরাট করার পদ্ধতিকে ল্যান্ডফিল বলে।
সুবিধা: এটি আবর্জনা ফেলার সবচেয়ে সহজ ও সস্তা উপায়। এখান থেকে বায়োগ্যাস (মিথেন) উৎপাদন করা সম্ভব।

১৫. লিচেট (Leachate) কী? এটি কীভাবে দূষণ ছড়ায়?

উত্তর: ল্যান্ডফিল বা ভাগাড়ে বর্জ্য পদার্থ পচে বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যে কালো রঙের বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত তরল চুঁইয়ে বের হয়, তাকে লিচেট বলে।
এটি মাটির নিচ দিয়ে গিয়ে ভৌমজলকে এবং পাশের জলাশয়কে মারাত্মকভাবে দূষিত করে।

১৬. কম্পোস্টিং (Composting) বা জৈব সার তৈরি কাকে বলে?

উত্তর: যে পদ্ধতিতে জৈব ভঙ্গুর বর্জ্য পদার্থগুলিকে (যেমন- সবজির খোসা, পাতা) ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের সাহায্যে পচিয়ে হিউমাস সমৃদ্ধ জৈব সারে পরিণত করা হয়, তাকে কম্পোস্টিং বলে। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায়।

১৭. স্ক্রাবার (Scrubber) কী? এটি কয় প্রকার ও কী কী? [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর: কলকারখানার ধোঁয়া থেকে গ্যাসীয় দূষক এবং ধূলিকণা অপসারণ করার যন্ত্রকে স্ক্রাবার বলে।
এটি দুই প্রকার: ১) আর্দ্র স্ক্রাবার (Wet Scrubber): জল বা চুনের দ্রবণ স্প্রে করে গ্যাস পরিষ্কার করা হয়। ২) শুষ্ক স্ক্রাবার (Dry Scrubber): রাসায়নিক পাউডার ব্যবহার করে অ্যাসিড গ্যাস শোষণ করা হয়।

[attachment_0](attachment)

১৮. ভার্মিকম্পোস্টিং (Vermicomposting) কী? এর সুবিধা লেখো।

উত্তর: বিশেষ প্রজাতির কেঁচোর (যেমন- লাল কেঁচো) সাহায্যে জৈব বর্জ্যকে দ্রুত পচিয়ে যে উন্নত মানের সার (ভার্মিকম্পোস্ট) তৈরি করা হয়, তাকে ভার্মিকম্পোস্টিং বলে।
সুবিধা: এটি দ্রুত তৈরি হয়, গন্ধহীন এবং মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ায়।

১৯. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের দুটি ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর: ১) সচেতনতা বৃদ্ধি: ছাত্রছাত্রীরা পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং প্লাস্টিক বর্জনের গুরুত্ব বোঝাতে পারে।
২) 4R পালন: তারা নিজেরা কাগজের অপচয় কমিয়ে, টিফিন বক্স বা জলের বোতল পুনর্ব্যবহার করে এবং স্কুল চত্বর পরিষ্কার রেখে বর্জ্য কমাতে পারে।

২০. ভাগাড় বা ডাম্পিং গ্রাউন্ডের দুটি পরিবেশগত সমস্যা লেখো।

উত্তর: ১) বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়।
২) লিচেট চুঁইয়ে ভৌমজল দূষিত করে এবং মশা-মাছির উপদ্রবে রোগ ছড়ায়।

২১. গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান (GAP)-এর উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ১৯৮৬ সালে গৃহীত এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল:
১) গঙ্গা নদীতে সরাসরি শহরের নর্দমার জল ও শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধ করা।
২) বর্জ্য শোধনাগার (Sewage Treatment Plant) তৈরি করে জল শোধন করে নদীতে ফেলা।

২২. ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) কী?

উত্তর: জলাশয়ে ফসফেট ও নাইট্রেট জাতীয় পুষ্টি উপাদান মেশার ফলে শৈবাল ও জলজ উদ্ভিদের (যেমন- কচুরিপানা) অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ইউট্রোফিকেশন বলে। এর ফলে জলের অক্সিজেন (DO) কমে যায় এবং জলজ প্রাণী মারা যায়। একে ‘শৈবাল ব্লুম’ও বলা হয়।

২৩. বর্জ্যের পুনর্নবীকরণ (Recycling) বলতে কী বোঝো? উদাহরণ দাও।

উত্তর: বাতিল বা বর্জ্য পদার্থকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য নতুন সামগ্রীতে রূপান্তর করার পদ্ধতিকে পুনর্নবীকরণ বলে।
উদাহরণ: পুরনো খবরের কাগজ থেকে নতুন কাগজ তৈরি, বা ভাঙা প্লাস্টিক গলিয়ে নতুন প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরি।

২৪. কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুটি পদ্ধতি লেখো।

উত্তর: ১) স্যানিটারি ল্যান্ডফিল: বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাটি চাপা দেওয়া।
২) ইনসিনারেশন (Incineration): উচ্চ তাপমাত্রায় বর্জ্য পুড়িয়ে ছাই করা (এটি হাসপাতালের বর্জ্যের জন্য উপযুক্ত)।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বর্জ্য ব্যবস্থাপনা


প্রশ্ন: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে কী বোঝো?

উত্তর: পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য বর্জ্য পদার্থের উৎপাদন কমানো, সংগ্রহ করা, পৃথক করা এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তার পুনর্ব্যবহার বা নিষ্কাশন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলে।

প্রশ্ন: জৈব ভঙ্গুর ও জৈব অভঙ্গুর বর্জ্যের মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: জৈব ভঙ্গুর: এগুলি প্রাকৃতিকভাবে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক দ্বারা পচে মাটিতে মিশে যায় (যেমন- ফলের খোসা, কাগজ)।
জৈব অভঙ্গুর: এগুলি সহজে পচে না এবং মাটিতে বা জলে দীর্ঘদিন অবিকৃত অবস্থায় থেকে দূষণ ঘটায় (যেমন- প্লাস্টিক, কাঁচ)।

প্রশ্ন: ভরাটকরণ বা ল্যান্ডফিল (Landfill) কী?

উত্তর: শহরের বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য লোকালয় থেকে দূরে কোনো নির্দিষ্ট নিচু জমিতে জমা করে তার ওপর মাটি চাপা দিয়ে ভরাট করা হয়। এই পদ্ধতিকে ল্যান্ডফিল বা স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বলে। এখান থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভব।

[attachment_0](attachment)

প্রশ্ন: স্ক্রাবার (Scrubber) কী কাজে লাগে?

উত্তর: কলকারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়ার মধ্যে থাকা বিষাক্ত গ্যাস (যেমন SO₂, NO₂) এবং ভাসমান ধূলিকণা বা SPM-কে বাতাস থেকে আলাদা করার জন্য স্ক্রাবার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি বায়ুদূষণ রোধে অত্যন্ত কার্যকর।

প্রশ্ন: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কী?

উত্তর: ছাত্রছাত্রীরা তাদের বাড়ি ও স্কুলে বর্জ্য কমিয়ে, প্লাস্টিক বর্জন করে এবং অন্যদের সচেতন করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করতে পারে। তারা 4R নীতি (Reduce, Reuse, Recycle, Refuse) মেনে চলে পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা নিতে পারে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার