নবম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – 2 বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়বাদ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় ২: নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
1. নেপোলিয়ন নিজেকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলতেন কেন?
উত্তর দেখো
ফরাসি বিপ্লব না হলে নেপোলিয়নের মতো সাধারণ পরিবারের সন্তানের পক্ষে ফ্রান্সের শাসক হওয়া সম্ভব ছিল না। বিপ্লব যে মেধার স্বীকৃতি ও সাম্যের সুযোগ তৈরি করেছিল, তার ফলেই তাঁর উত্থান ঘটেছিল। এছাড়া তিনি বিপ্লবের সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শকে (আংশিকভাবে হলেও) রক্ষা ও প্রচার করেছিলেন বলে নিজেকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলতেন।
2. কোড নেপোলিয়ন (Code Napoleon) কী?
উত্তর দেখো
১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফ্রান্সের বিচিত্র ও জটিল আইনগুলিকে বাতিল করে যে সুসংবদ্ধ আইনবিধি প্রবর্তন করেন, তাকে ‘কোড নেপোলিয়ন’ বা সিভিল কোড বলা হয়। এতে মোট ২২৮৭টি ধারা ছিল এবং এর মাধ্যমে আইনের চোখে সাম্য ও সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
3. ১৮ ব্রুমেয়ারের ঘটনা (Coup of 18 Brumaire) কী?
উত্তর দেখো
১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর (বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ব্রুমেয়ার) নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্রান্সের দুর্নীতিগ্রস্ত ডাইরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটান এবং ক্ষমতা দখল করেন। এই ঘটনা ইতিহাসে ‘১৮ ব্রুমেয়ারের ক্যু’ বা ঘটনা নামে পরিচিত।
4. কনসুলেটের শাসন কী?
উত্তর দেখো
১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতা দখলের পর নেপোলিয়ন ফ্রান্সে যে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাকে কনসুলেট শাসন বলা হয়। এতে তিনজন কনসাল বা শাসকের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। নেপোলিয়ন ছিলেন ‘ফার্স্ট কনসাল’ বা প্রধান কনসাল এবং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী।
5. কনকর্ড্যাট (Concordat) কী?
উত্তর দেখো
১৮০১ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট পোপ সপ্তম পায়াসের সঙ্গে যে ধর্মীয় মীমাংসা চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তাকে কনকর্ড্যাট বলা হয়। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে ক্যাথলিক ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং পোপ ফরাসি গির্জার ওপর নেপোলিয়নের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেন।
6. লিজিয়ন অফ অনার (Legion of Honour) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য যে রাষ্ট্রীয় সম্মান বা খেতাব প্রদানের ব্যবস্থা চালু করেন, তাকে ‘লিজিয়ন অফ অনার’ বলা হয়। এটি ছিল মেধার স্বীকৃতি এবং বংশকৌলীন্যের বিরোধী।
7. মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা (Continental System) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
ইংল্যান্ডকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করতে না পেরে নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য ১৮০৬ সালে যে অর্থনৈতিক অবরোধ নীতি ঘোষণা করেন, তাকে মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা বলা হয়। এর মাধ্যমে ইউরোপের বন্দরগুলোতে ব্রিটিশ পণ্য প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
8. বার্লিন ডিক্রি বা ঘোষণা কী?
উত্তর দেখো
১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ নভেম্বর বার্লিন থেকে নেপোলিয়ন এক ঘোষণায় বলেন যে, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ অবরুদ্ধ এবং কোনো জাহাজ ইংল্যান্ড থেকে ইউরোপের কোনো বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না। এটিই বার্লিন ডিক্রি নামে পরিচিত, যার দ্বারা মহাদেশীয় অবরোধ শুরু হয়।
9. অর্ডারস ইন কাউন্সিল (Orders in Council) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়নের বার্লিন ডিক্রির জবাবে ইংল্যান্ড ১৮০৭ সালে যে পাল্টা ঘোষণা জারি করে, তাকে অর্ডারস ইন কাউন্সিল বলে। এতে বলা হয়, কোনো নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ ফ্রান্স বা তার মিত্র দেশে যেতে চাইলে তাকে আগে ইংল্যান্ডের বন্দরে এসে শুল্ক দিতে হবে, নতুবা জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করা হবে।
10. ওয়ারশ ডিক্রি কী?
উত্তর দেখো
১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি নেপোলিয়ন পোল্যান্ডের ওয়ারশ থেকে এক ঘোষণায় বলেন যে, ইংল্যান্ডের ‘অর্ডারস ইন কাউন্সিল’ মেনে চলা কোনো নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ যদি ফরাসি বন্দরে আসে, তবে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। একেই ওয়ারশ ডিক্রি বলা হয়।
11. মিলন ডিক্রি কী?
উত্তর দেখো
১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর ইতালির মিলান শহর থেকে নেপোলিয়ন ঘোষণা করেন যে, অর্ডারস ইন কাউন্সিল মেনে চলা যেকোনো জাহাজকে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই ঘোষণাকে মিলান ডিক্রি বলা হয়।
12. ফনটেনব্লু সন্ধি (Treaty of Fontainebleau) কী?
উত্তর দেখো
১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডের যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে নেপোলিয়ন যে চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সের সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তাকে ফনটেনব্লু সন্ধি বলে। এর শর্তানুযায়ী তাঁকে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
13. শতদিবসের রাজত্ব (Hundred Days Rule) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে এলবা দ্বীপ থেকে পালিয়ে এসে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন এবং ২০ মার্চ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত প্রায় ১০০ দিন রাজত্ব করেন। ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত শাসনকালকে ‘শতদিবসের রাজত্ব’ বলা হয়।
14. ‘রাইন রাষ্ট্রসংঘ’ বা ‘কনফেডারেশন অফ দ্য রাইন’ কী?
উত্তর দেখো
১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ ও পশ্চিম জার্মানির ১৬টি ছোট রাজ্য নিয়ে যে রাষ্ট্রজোট গঠন করেন, তাকে ‘রাইন রাষ্ট্রসংঘ’ বা ‘কনফেডারেশন অফ দ্য রাইন’ বলা হয়। নেপোলিয়ন নিজে এর প্রটেক্টর বা রক্ষাকর্তা ছিলেন।
15. টিলসিটের সন্ধি (১৮০৭) কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?
উত্তর দেখো
১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে টিলসিটের সন্ধি মূলত ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন এবং রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় (প্রুশিয়াও এতে অংশ নিয়েছিল)। এর ফলে রাশিয়া মহাদেশীয় অবরোধ প্রথায় যোগ দিতে রাজি হয়।
16. ট্রাফালগারের যুদ্ধের গুরুত্ব কী?
উত্তর দেখো
১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে ট্রাফালগারের নৌযুদ্ধে ইংল্যান্ডের কাছে ফ্রান্স ও স্পেনের যৌথ বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এর ফলে সমুদ্রের ওপর ইংল্যান্ডের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নেপোলিয়ন ইংল্যান্ড জয়ের আশা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
17. অস্টারলিৎজের যুদ্ধ বা ‘তিন সম্রাটের যুদ্ধ’ কী?
উত্তর দেখো
১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন (ফ্রান্সের সম্রাট) অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিস এবং রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডারের যৌথ বাহিনীকে অস্টারলিৎজের যুদ্ধে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে তিনজন সম্রাট জড়িত ছিলেন বলে একে ‘তিন সম্রাটের যুদ্ধ’ বলা হয়।
18. ‘স্পেনীয় ক্ষত’ (Spanish Ulcer) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন পর্তুগাল ও স্পেন দখল করতে গিয়ে ১৮০৮ থেকে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে (উপদ্বীপের যুদ্ধ) জড়িয়ে পড়েন। এই যুদ্ধে স্পেনের গেরিলা বাহিনী ও ইংরেজদের কাছে ফরাসিদের বিপুল অর্থ ও সৈন্যক্ষয় হয়, যা নেপোলিয়নের পতনকে ত্বরান্বিত করে। নেপোলিয়ন নিজেই একে ‘স্পেনীয় ক্ষত’ বা আলসার বলেছিলেন।
19. ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’ (Battle of Nations) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে লিপজিগের যুদ্ধে ইউরোপের ১৩টি জাতি বা রাষ্ট্র (রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেন ইত্যাদি) জোটবদ্ধ হয়ে নেপোলিয়নকে পরাজিত করে। বহু জাতি এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল বলে একে ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’ বলা হয়।
20. কোড নেপোলিয়নের গুরুত্ব কী?
উত্তর দেখো
কোড নেপোলিয়ন ফ্রান্সে আইনের শাসন ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। এটি ফরাসি বিপ্লবের আদর্শগুলিকে (যেমন—সামন্ততন্ত্রের বিলোপ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সম্পত্তির অধিকার) আইনি স্বীকৃতি দেয় এবং আধুনিক ফ্রান্সের ভিত্তি স্থাপন করে।
21. নেপোলিয়ন কেন রাশিয়া আক্রমণ করেন?
উত্তর দেখো
রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার নেপোলিয়নের মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা মানতে অস্বীকার করেন এবং ইংল্যান্ডের সাথে বাণিজ্য শুরু করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নেপোলিয়ন রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ১৮১২ সালে রাশিয়া আক্রমণ করেন।
22. ‘ব্যাংক অফ ফ্রান্স’ (Bank of France) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফ্রান্সের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং মুদ্রা ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে ‘ব্যাংক অফ ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
23. ‘ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রান্স’ (University of France) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ) ওপর নজরদারি ও পরিচালনার জন্য যে কেন্দ্রীয় সংস্থা বা দপতর গঠন করেন, তাকে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রান্স’ বলা হয়। এটি কোনো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।
24. প্রিফেক্ট (Prefect) কারা ছিলেন?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন প্রশাসনিক সুবিধার্থে সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে বিভক্ত করেন। প্রতিটি প্রদেশের শাসনভার একজন করে সরকারি কর্মচারীর ওপর ন্যস্ত করা হয়, যাদের ‘প্রিফেক্ট’ বলা হতো। এরা সরাসরি নেপোলিয়নের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন।
25. পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy) কী?
উত্তর দেখো
১৮১২ সালে নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানের সময় রুশ বাহিনী সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে পিছু হটার কৌশল নেয়। পিছু হটার সময় তারা নিজেদের শস্যক্ষেত, ঘরবাড়ি, সেতু ও রসদ ভাণ্ডার পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত, যাতে ফরাসি বাহিনী কোনো খাদ্য বা আশ্রয় না পায়। রাশিয়ার এই রণকৌশলকে ‘পোড়ামাটি নীতি’ বলা হয়।
26. গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশ (Grand Duchy of Warsaw) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন পোল্যান্ড জয় করার পর প্রুশিয়ার অধীনস্থ পোলিশ অঞ্চলগুলো নিয়ে ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে যে নতুন রাষ্ট্র গঠন করেন, তাকে ‘গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশ’ বলা হয়। এটি পোলিশদের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়েছিল।
27. সিজালপাইন প্রজাতন্ত্র (Cisalpine Republic) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন তাঁর ইতালি অভিযানের সময় উত্তর ইতালির অস্ট্রিয়া-অধিকৃত অঞ্চলগুলো দখল করে ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে যে প্রজাতন্ত্র গঠন করেন, তাকে সিজালপাইন প্রজাতন্ত্র বলা হয়। এটি ইতালিতে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ছড়িয়ে দেয়।
28. টিলসিটের সন্ধির (১৮০৭) গুরুত্ব কী?
উত্তর দেখো
এই সন্ধির মাধ্যমে নেপোলিয়ন রাশিয়া ও প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং ইউরোপে তাঁর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রাশিয়ার জার মহাদেশীয় অবরোধ প্রথায় যোগ দিতে রাজি হন এবং প্রুশিয়ার অর্ধেক ভূখণ্ড নেপোলিয়নের দখলে আসে।
29. নেপোলিয়নের পতনের দুটি প্রধান কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
১) স্পেনীয় ক্ষত: স্পেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে নেপোলিয়নের বিপুল অর্থ ও সৈন্যক্ষয় হয়।
২) রাশিয়া অভিযান: রাশিয়ার বিধ্বংসী শীতে এবং পোড়ামাটি নীতির ফলে নেপোলিয়নের গ্র্যান্ড আর্মি ধ্বংস হয়ে যায়।
30. লিপজিগের যুদ্ধ বা ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’ (১৮১৩) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর দেখো
১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপের ১৩টি জাতি বা রাষ্ট্র (রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেন ইত্যাদি) জোটবদ্ধ হয়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। লিপজিগের এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন পরাজিত হন এবং তাঁর সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়।
31. ওয়াটারলুর যুদ্ধের (১৮১৫) ফলাফল কী ছিল?
উত্তর দেখো
এই যুদ্ধে ডিউক অফ ওয়েলিংটনের নেতৃত্বে মিত্রশক্তির কাছে নেপোলিয়ন চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। এর ফলে নেপোলিয়নের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে এবং তাঁকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
32. ভিয়েনা সম্মেলন (Vienna Congress) কেন ডাকা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ইউরোপীয় শক্তিবর্গ মিলিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল: ১) ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠন করা এবং ২) ফরাসি বিপ্লবের আগের রাজতন্ত্র ও ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।
33. মেটারনিক (Metternich) কে ছিলেন?
উত্তর দেখো
মেটারনিক ছিলেন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী বা চ্যান্সেলর এবং ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি। তিনি ছিলেন ঘোর রক্ষণশীল এবং ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের বিরোধী। ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনীতিতে তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, যাকে ‘মেটারনিক যুগ’ বলা হয়।
34. নেপোলিয়নকে ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’ বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন বিপ্লবের আদর্শ প্রচার করলেও তিনি গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন, নারীদের অধিকার খর্ব করেন এবং নিজের আত্মীয়দের বিভিন্ন দেশের সিংহাসনে বসিয়ে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছিলেন।
35. ‘পেনিনসুলার যুদ্ধ’ বা ‘উপদ্বীপের যুদ্ধ’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপের দুই দেশ—স্পেন ও পর্তুগালের বিরুদ্ধে নেপোলিয়ন ১৮০৮ থেকে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়েছিলেন, তাকে পেনিনসুলার যুদ্ধ বা উপদ্বীপের যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধেই নেপোলিয়নের অজেয় ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
36. ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাব’ (Frankfurt Proposal) কী?
উত্তর দেখো
লিপজিগের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ১৮১৩ সালের নভেম্বর মাসে মিত্রশক্তি নেপোলিয়নের কাছে একটি সম্মানজনক শর্তে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়, যা ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাব’ নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, ফ্রান্স যদি তার প্রাকৃতিক সীমানায় (রাইন, আল্পস, পিরেনিজ) সন্তুষ্ট থাকে, তবে নেপোলিয়নকে সম্রাট হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। নেপোলিয়ন তা প্রত্যাখ্যান করেন।
37. নেপোলিয়নের শিক্ষা সংস্কারের দুটি দিক উল্লেখ করো।
উত্তর দেখো
১) ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রান্স: শিক্ষা ব্যবস্থা তদারকির জন্য ১৮০৮ সালে এই কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠন করেন।
২) স্কুল প্রতিষ্ঠা: প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কমিউন স্কুল এবং মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ‘লাইসিয়াম’ (Lyceum) ও গ্রামার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
38. ‘কোড অফ সিভিল প্রসিডিউর’ কী?
উত্তর দেখো
কোড নেপোলিয়নের পাঁচটি আইনের মধ্যে একটি হলো ‘কোড অফ সিভিল প্রসিডিউর’ বা দেওয়ানি কার্যবিধি। এটি মূলত দেওয়ানি মামলা পরিচালনার পদ্ধতি ও নিয়মকানুন সম্পর্কিত আইন।
39. নেপোলিয়ন কেন জার্মানি ও ইতালিতে নবজাগরণের অগ্রদূত?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন জার্মানি ও ইতালির শত শত ক্ষুদ্র রাজ্যকে বিলুপ্ত করে যথাক্রমে ‘কনফেডারেশন অফ দ্য রাইন’ এবং ‘ইতালি রাজ্য’ গঠন করেন। এর ফলে এই দুই দেশে রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তি তৈরি হয় এবং মানুষের মনে জাতীয়তাবোধের জাগরণ ঘটে।
40. এলবা দ্বীপে নির্বাসনের শর্তগুলি কোন সন্ধিতে ঠিক হয়েছিল?
উত্তর দেখো
১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দের ফনটেনব্লু-র সন্ধিতে (Treaty of Fontainebleau)। এই সন্ধি অনুসারেই নেপোলিয়নকে এলবা দ্বীপের সার্বভৌম শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে নির্বাসিত করা হয়েছিল এবং বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
41. নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ‘চতুর্থ শক্তিজোট’-এ কারা ছিল?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে চতুর্থ শক্তিজোট (১৮১৩) মূলত রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেন এবং ইংল্যান্ড নিয়ে গঠিত হয়েছিল। এই জোটই লিপজিগ এবং ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নকে পরাজিত করে।
42. নেপোলিয়ন কেন ‘মহাউল্লাস’ বা ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ (Grand Army) গঠন করেন?
উত্তর দেখো
রাশিয়া আক্রমণের জন্য নেপোলিয়ন ১৮১২ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সৈন্যদের নিয়ে প্রায় ৬ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন, যা ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ নামে পরিচিত। রাশিয়ার অভিযানে এই বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়।
43. নেপোলিয়নকে ‘দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান’ (Second Justinian) বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান যেমন প্রাচীন রোমান আইনগুলিকে সংকলিত করে একটি বিধিবদ্ধ রূপ দিয়েছিলেন, তেমনি নেপোলিয়নও ফ্রান্সের বিচিত্র ও জটিল আইনগুলিকে বাতিল করে সুসংবদ্ধ ‘কোড নেপোলিয়ন’ প্রবর্তন করেন। আইন প্রণেতা হিসেবে এই তুলনার জন্যই তাঁকে ‘দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান’ বলা হয়।
44. কোড নেপোলিয়নে নারীদের অবস্থান কেমন ছিল?
উত্তর দেখো
কোড নেপোলিয়নে নারীদের অধিকারকে খর্ব করা হয়েছিল। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে নারীদের স্বামীর অধীনস্থ করা হয়। তাদের সম্পত্তির অধিকার সীমিত করা হয় এবং বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার কঠিন করা হয়। নেপোলিয়ন মনে করতেন, “নারীদের কাজ হলো কেবল সন্তান উৎপাদন করা।”
45. নেপোলিয়নের পতনে ‘জাতীয়তাবাদ’-এর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন নিজের অজান্তেই ইউরোপের দেশগুলোতে (যেমন—জার্মানি, ইতালি, স্পেন) জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলেন। ফরাসি আধিপত্য ও শোষণের বিরুদ্ধে এই দেশগুলোর মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যা তাঁর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।
46. মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা কেন ব্যর্থ হয়েছিল? (দুটি কারণ)
উত্তর দেখো
১) নৌবাহিনীর দুর্বলতা: ইংল্যান্ডের শক্তিশালী নৌবাহিনীর সামনে ফ্রান্সের দুর্বল নৌবাহিনী বিশাল উপকূল পাহারা দিতে ব্যর্থ হয়, ফলে চোরাচালান চলতে থাকে।
২) পন্যের অভাব: ইংল্যান্ডের শিল্পজাত পণ্যের বিকল্প জোগান দিতে ফ্রান্স ব্যর্থ হয়, ফলে ইউরোপের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এই প্রথার বিরুদ্ধে চলে যায়।
47. নেপোলিয়ন কেন ইংল্যান্ডকে ‘দোকানদারদের জাতি’ বলেছিলেন?
উত্তর দেখো
ইংল্যান্ডের অর্থনীতি মূলত ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নেপোলিয়ন মনে করতেন, ইংরেজরা কেবল মুনাফা চেনে এবং যুদ্ধের চেয়ে ব্যবসার ক্ষতি হলে তারা বেশি বিচলিত হবে। তাই তাচ্ছিল্য করে তিনি তাদের ‘দোকানদারদের জাতি’ (Nation of Shopkeepers) বলেছিলেন।
48. চতুর্থ শক্তিজোট (Fourth Coalition) কবে এবং কেন গঠিত হয়?
উত্তর দেখো
১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেন এবং ইংল্যান্ড মিলে এই জোট গঠন করে। উদ্দেশ্য ছিল নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে ইউরোপকে ফরাসি আধিপত্য থেকে মুক্ত করা।
49. ‘লাইসিয়াম’ (Lyceum) কী?
উত্তর দেখো
নেপোলিয়ন ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসারের জন্য সরকারি খরচে যে আবাসিক বিদ্যালয়গুলি স্থাপন করেন, সেগুলোকে ‘লাইসিয়াম’ বলা হয়। এখানে সামরিক শৃঙ্খলার সাথে বিজ্ঞান ও আধুনিক পাঠক্রম পড়ানো হতো।
50. নেপোলিয়নীয় যুগ (Napoleonic Era) বলতে কোন সময়কালকে বোঝায়?
উত্তর দেখো
১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখল থেকে শুরু করে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াটারলুর যুদ্ধে তাঁর পতন পর্যন্ত সময়কালকে ইউরোপের ইতিহাসে ‘নেপোলিয়নীয় যুগ’ বলা হয়। এই সময়ে ইউরোপের রাজনীতি ও মানচিত্র তাঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।