নবম শ্রেণি: ইতিহাস অধ্যায় – 2 বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়বাদ, 4 নম্বরের প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ২: নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন
1. কোড নেপোলিয়ন (Code Napoleon) বা নেপোলিয়নের আইনবিধির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ১৮০৪ সালে প্রবর্তিত ‘সিভিল কোড’ বা ‘কোড নেপোলিয়ন’। তিনি ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানের বিচিত্র আইনকে সমন্বিত করে এই আইনবিধি রচনা করেন।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- সামাজিক সাম্য: আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান। জন্মগত ও শ্রেণিগত সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হয়।
- সম্পত্তির অধিকার: ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: সকল ধর্মের মানুষকে সমান অধিকার দেওয়া হয় এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নীতি গৃহীত হয়।
- পারিবারিক আইন: পরিবারে পিতার কর্তৃত্ব স্থাপন করা হয় এবং বিবাহ বিচ্ছেদকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয় (তবে এখানে নারীদের মর্যাদা কিছুটা খর্ব করা হয়)।
উপসংহার: এই আইনবিধি ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শকে রক্ষা করেছিল এবং পরবর্তীতে ইউরোপের বহু দেশের আইনের মডেলে পরিণত হয়েছিল।
2. নেপোলিয়নকে কেন ‘বিপ্লবের সন্তান’ (Child of Revolution) বলা হয়?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ঐতিহাসিকদের মতে, ফরাসি বিপ্লব না হলে নেপোলিয়নের উত্থান সম্ভব ছিল না। তিনি বিপ্লবের আদর্শ ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন।
যুক্তি:
- উত্থানের সুযোগ: বিপ্লব পুরাতন তন্ত্রের বংশকৌলীন্য প্রথা ভেঙে দিয়েছিল বলেই এক সাধারণ কর্সিকান পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি মেধার জোরে সম্রাট হতে পেরেছিলেন।
- সাম্য রক্ষা: বিপ্লবের প্রধান আদর্শ ‘সাম্য’কে তিনি কোড নেপোলিয়নের মাধ্যমে রক্ষা করেছিলেন।
- সামন্ততন্ত্রের বিনাশ: তিনি ফ্রান্সে এবং বিজিত ইউরোপীয় দেশগুলিতে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছিলেন।
- চার্চের ক্ষমতা হ্রাস: বিপ্লবের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বজায় রেখে তিনি চার্চের বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।
3. নেপোলিয়নকে কেন ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’ (Destroyer of Revolution) বলা হয়?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন একদিকে যেমন বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করেছিলেন, অন্যদিকে তিনি বিপ্লবের মূল রাজনৈতিক আদর্শগুলিকে ধ্বংস করেছিলেন।
যুক্তি:
- গণতন্ত্র হত্যা: বিপ্লব রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটিয়েছিল, কিন্তু নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে পুনরায় রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন।
- স্বাধীনতার বিনাশ: তিনি বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন। তাঁর আমলে গুপ্তচর ব্যবস্থা প্রবল ছিল।
- নারীর মর্যাদা হ্রাস: কোড নেপোলিয়নে নারীদের অধিকার খর্ব করে তাদের পুরুষের অধীনস্থ করা হয়, যা বিপ্লবের সাম্য নীতির বিরোধী ছিল।
- স্বজনপোষণ: তিনি মেধার কথা বললেও নিজের ভাই-বোনদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সিংহাসনে বসিয়ে স্বজনপোষণ করেছিলেন।
4. কনস্যুলেট শাসনে (Consulate Rule) নেপোলিয়নের ভূমিকা কী ছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৭৯৯ সালে ডাইরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে যে নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাকে কনস্যুলেট শাসন (১৭৯৯-১৮০৪) বলে।
ভূমিকা ও সংস্কার:
- প্রথম কনসাল: সংবিধান অনুযায়ী তিনজন কনসাল থাকলেও, সমস্ত ক্ষমতা ‘প্রথম কনসাল’ নেপোলিয়নের হাতেই ন্যস্ত ছিল।
- শান্তি ও শৃঙ্খলা: তিনি ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ অরাজকতা দূর করে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
- অর্থনৈতিক সংস্কার: ১৮০০ সালে তিনি ‘ব্যাংক অফ ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ফ্রান্সের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেন।
- প্রশাসনিক দক্ষতা: তিনি সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্টে ভাগ করেন এবং দক্ষ প্রিফেক্ট নিয়োগ করেন।
5. নেপোলিয়নের শিক্ষা সংস্কার সম্পর্কে টীকা লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন বিশ্বাস করতেন যে, রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নাগরিক তৈরির জন্য রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সংস্কারসমূহ:
- ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি: সমগ্র ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তিনি ১৮০৮ সালে ‘ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি’ বা ‘ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- লিসে (Lycee) বিদ্যালয়: মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য তিনি সরকারি খরচে চালিত ‘লিসে’ বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যেখানে আধা-সামরিক কায়দায় শিক্ষা দেওয়া হতো।
- স্তর বিন্যাস: তিনি শিক্ষাকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয়—এই চারটি স্তরে ভাগ করেন।
- উদ্দেশ্য: তাঁর শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নাগরিক ও দক্ষ আমলা তৈরি করা।
6. ‘কনকর্ড্যাট’ (Concordat, 1801) বা ধর্মমীমাংসা চুক্তি কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ফরাসি বিপ্লবের সময় রাষ্ট্রের সঙ্গে রোমান ক্যাথলিক চার্চের যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা মেটানোর জন্য ১৮০১ সালে নেপোলিয়ন পোপ সপ্তম পায়াসের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন, যা ‘কনকর্ড্যাট’ নামে পরিচিত।
শর্তাবলী:
- ক্যাথলিক ধর্মকে ‘ফরাসি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- বিনিময়ে পোপ বিপ্লবের সময় বাজেয়াপ্ত হওয়া চার্চের সম্পত্তি দাবি করবেন না বলে কথা দেন।
- যাজকদের রাষ্ট্র কর্তৃক বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তবে তাদের আনুগত্য রাষ্ট্রের প্রতি থাকতে হতো।
গুরুত্ব: এর ফলে ফ্রান্সের ধর্মীয় বিভেদ দূর হয় এবং নেপোলিয়ন ক্যাথলিক জনগণের সমর্থন লাভ করেন।
7. ‘লিজিয়ন অফ অনার’ (Legion of Honour) কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য যে রাষ্ট্রীয় সম্মান বা খেতাব চালু করেন, তাকে ‘লিজিয়ন অফ অনার’ বলা হয়।
উদ্দেশ্য:
- বিপ্লবের ‘সাম্য’ নীতি অনুযায়ী জন্মগত কৌলীন্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
- রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত একটি নতুন অভিজাত শ্রেণি তৈরি করা।
- মানুষের কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের উৎসাহিত করা।
মন্তব্য: এটি আজও ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে প্রচলিত।
8. রাইন রাষ্ট্রসংঘ (Confederation of the Rhine) কেন গঠিত হয়েছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: জার্মানি বিজয়ের পর নেপোলিয়ন ১৮০৬ সালে জার্মানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলিকে একত্রিত করে ‘রাইন রাষ্ট্রসংঘ’ গঠন করেন।
গঠন ও উদ্দেশ্য:
- পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্ত করে ১৬টি জার্মান রাজ্য নিয়ে এটি গঠিত হয়।
- নেপোলিয়ন নিজে এর ‘প্রোটেক্টর’ বা রক্ষাকর্তা হন।
- এর উদ্দেশ্য ছিল অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার প্রভাব খর্ব করা এবং ফ্রান্সের সীমান্তে একটি বাফার জোন তৈরি করা।
ফলাফল: এটি পরোক্ষভাবে জার্মানিতে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায় এবং জার্মানির ঐক্য সাধনে সাহায্য করে।
9. ট্রাফালগারের যুদ্ধ (১৮০৫) সম্পর্কে কী জানো?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নের নৌযুদ্ধ ট্রাফালগারের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
ঘটনা: স্পেনের ট্রাফালগার অন্তরীপের কাছে ব্রিটিশ নৌসেনাপতি নেলসনের বাহিনীর সঙ্গে ফ্রান্স ও স্পেনের যৌথ নৌবাহিনীর যুদ্ধ হয়।
ফলাফল:
- এই যুদ্ধে ফরাসি নৌবহর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং নেপোলিয়ন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
- ব্রিটিশ সেনাপতি নেলসন যুদ্ধজয়ের মুহূর্তে মারা যান।
- নেপোলিয়ন বুঝতে পারেন যে সমুদ্রপথে ইংল্যান্ডকে হারানো অসম্ভব। তাই তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ বা ‘মহাদেশীয় অবরোধ’ শুরু করেন।
10. টিলসিটের সন্ধি (Treaty of Tilsit, 1807)-এর গুরুত্ব কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ফ্রিডল্যান্ডে রাশিয়ার পরাজয়ের পর ১৮০৭ সালে রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার এবং নেপোলিয়নের মধ্যে টিলসিটের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।
গুরুত্ব:
- নেপোলিয়নের চরম ক্ষমতা: এই সন্ধির মাধ্যমে নেপোলিয়নের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি চরম শিখরে পৌঁছায়। ইউরোপের প্রায় সব বড় শক্তি তাঁর পদানত হয়।
- মিত্রতা: রাশিয়া ও ফ্রান্স মিত্রশক্তিতে পরিণত হয় এবং রাশিয়া ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় অবরোধ মানতে রাজি হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন: পোল্যান্ডের অংশ নিয়ে ‘গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশ’ গঠিত হয়।
11. মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা (Continental System) কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ট্রাফালগারের যুদ্ধে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে নেপোলিয়ন বুঝতে পারেন যে যুদ্ধে ইংল্যান্ডকে হারানো যাবে না। তাই তিনি ইংল্যান্ডকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার পরিকল্পনা করেন।
ব্যবস্থা: ১৮০৬ সালে ‘বার্লিন ডিক্রি’ এবং ১৮০৭ সালে ‘মিলান ডিক্রি’-র মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন যে—
- ইউরোপের কোনো দেশ বা বন্দর ইংল্যান্ডের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না।
- ব্রিটিশ জাহাজ বা ব্রিটিশ পণ্যবাহী কোনো জাহাজ ইউরোপের বন্দরে ঢুকতে পারবে না।
ইংল্যান্ডকে ‘দোকানদারদের জাতি’ বলে ব্যঙ্গ করে তিনি তাদের ভাতে মারতে চেয়েছিলেন।
12. ‘অর্ডারস ইন কাউন্সিল’ (Orders in Council) কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের বার্লিন ডিক্রি বা মহাদেশীয় অবরোধের পাল্টা জবাব হিসেবে ইংল্যান্ড ১৮০৭ সালে যে ঘোষণা জারি করে, তাকে ‘অর্ডারস ইন কাউন্সিল’ বলে।
ঘোষণা: ইংল্যান্ড ঘোষণা করে যে—
- কোনো নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ ফ্রান্স বা তার মিত্র দেশগুলোর বন্দরে যেতে পারবে না।
- যদি যেতে চায়, তবে তাকে আগে ইংল্যান্ডের কোনো বন্দরে এসে শুল্ক দিয়ে লাইসেন্স নিতে হবে।
- এই নিয়ম না মানলে ব্রিটিশ নৌবাহিনী সেই জাহাজ বাজেয়াপ্ত করবে।
13. মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় এবং ব্যর্থ হয়।
ব্যর্থতার কারণ:
- নৌবাহিনীর দুর্বলতা: ইংল্যান্ডের শক্তিশালী নৌবাহিনীর সামনে ফ্রান্সের পক্ষে বিশাল ইউরোপীয় উপকূল পাহারা দেওয়া অসম্ভব ছিল। ফলে চোরাচালান বাড়তে থাকে।
- পণ্যের অভাব: ব্রিটিশ পণ্য বন্ধ হওয়ায় ইউরোপে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের (যেমন—চিনি, কফি, কাপড়) হাহাকার দেখা দেয়। ফ্রান্স এর বিকল্প জোগান দিতে ব্যর্থ হয়।
- মিত্রদের ক্ষোভ: ইউরোপের দেশগুলি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে নেপোলিয়নের ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং তারা এই ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করে (যেমন—রাশিয়া, পর্তুগাল)।
14. উপদ্বীপের যুদ্ধ (Peninsular War) বা স্পেনীয় ক্ষত (Spanish Ulcer) কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পর্তুগাল দখল করতে গিয়ে নেপোলিয়ন স্পেন দখল করেন এবং ভাই জোসেফকে স্পেনের রাজা করেন (১৮০৮)। এর প্রতিবাদে স্পেনবাসী যে গণবিদ্রোহ শুরু করে, তাকে উপদ্বীপের যুদ্ধ বলে।
গুরুত্ব ও ফলাফল:
- স্পেনবাসী ‘গেরিলা পদ্ধতি’তে যুদ্ধ করে ফরাসি বাহিনীকে নাজেহাল করে দেয়।
- ইংল্যান্ড স্পেনকে সাহায্য করে।
- এই যুদ্ধে ফ্রান্সের প্রায় ৩ লক্ষ সেরা সৈন্য মারা যায় এবং বিপুল অর্থ নষ্ট হয়।
- নেপোলিয়ন নিজেই স্বীকার করেন, “এই স্পেনীয় ক্ষতই আমাকে ধ্বংস করেছে।”
15. নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানের (১৮১২) কারণ কী ছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: টিলসিটের সন্ধির মাধ্যমে ফ্রান্স ও রাশিয়া মিত্র হলেও ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেন।
কারণ:
- মহাদেশীয় অবরোধ অমান্য: রাশিয়ার অর্থনীতি ব্রিটিশ বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জার আলেকজান্ডার মহাদেশীয় অবরোধ মানতে অস্বীকার করে ব্রিটিশ জাহাজকে বন্দরে ঢুকতে দেন।
- পোল্যান্ড সমস্যা: নেপোলিয়ন পোল্যান্ডকে পুনর্গঠন করলে (গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশ) রাশিয়া নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়।
- নেপোলিয়নের অহংকার: নেপোলিয়ন রাশিয়াকে শিক্ষা দিতে এবং নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে এই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।
16. পোড়া মাটি নীতি (Scorched Earth Policy) কী? এটি কতটা সফল হয়েছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের আক্রমণের মুখে রুশ সেনাপতি কুটুজভ যে আত্মরক্ষামূলক কৌশল নেন, তাকে পোড়া মাটি নীতি বলে।
কৌশল: রুশ বাহিনী সম্মুখ যুদ্ধ না করে পিছু হটতে থাকে এবং যাওয়ার পথে শস্যক্ষেত, ঘরবাড়ি, সেতু ও পানীয় জল ধ্বংস বা বিষাক্ত করে দেয়।
সাফল্য: এর ফলে নেপোলিয়নের বিশাল বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে ঢুকে খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। মস্কো শহরে ঢুকেও নেপোলিয়ন থাকার জায়গা পাননি কারণ রুশরা তাতেও আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এই নীতি নেপোলিয়নের বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়।
17. ‘লাইপজিগের যুদ্ধ’ বা ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’ (Battle of Nations) সম্পর্কে কী জানো?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: রাশিয়া অভিযানে নেপোলিয়নের বিপর্যয়ের পর ইউরোপের শক্তিগুলি জোটবদ্ধ হয়ে তাঁকে আক্রমণ করে। ১৮১৩ সালে জার্মানির লাইপজিগে এই যুদ্ধ হয়।
কেন ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’: এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেন সহ ইউরোপের প্রায় ১৩টি জাতি বা রাষ্ট্র নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে যুদ্ধ করেছিল বলে একে ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’ বলা হয়।
ফলাফল: নেপোলিয়ন এই যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তাঁর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং ১৮১৪ সালে তিনি সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
18. ‘শত দিবসের রাজত্ব’ (Hundred Days Rule) বলতে কী বোঝো?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৮১৪ সালে সিংহাসন ত্যাগের পর নেপোলিয়নকে এলবা দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেখান থেকে পালিয়ে ১৮১৫ সালের ২০ মার্চ ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন।
সময়কাল: ১৮১৫ সালের ২০ মার্চ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত—এই প্রায় ১০০ দিন বা তিন মাস তিনি দ্বিতীয়বার ফ্রান্স শাসন করেন। একেই ‘শত দিবসের রাজত্ব’ বলে।
সমাপ্তি: ১৮১৫ সালের ১৮ জুন ওয়াটারলুর যুদ্ধে পরাজিত হলে এই শাসনের অবসান ঘটে।
19. ওয়াটারলুর যুদ্ধের (১৮১৫) গুরুত্ব আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৮১৫ সালের ১৮ জুন বেলজিয়ামের ওয়াটারলু প্রান্তরে নেপোলিয়নের জীবনের শেষ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
ঘটনা: ব্রিটিশ সেনাপতি ডিউক অফ ওয়েলিংটন এবং প্রুশীয় সেনাপতি ব্লুকারের যৌথ বাহিনীর কাছে নেপোলিয়ন চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন।
গুরুত্ব:
- এই যুদ্ধের মাধ্যমেই নেপোলিয়ন যুগের বা ফরাসি বিপ্লব যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।
- নেপোলিয়নকে বন্দি করে সুদূর সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়, যেখানে ১৮২১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
- ইউরোপে পুনরায় পুরাতন তন্ত্র বা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
20. ইউরোপে জাতীয়তাবাদের প্রসারে নেপোলিয়নের ভূমিকা কী ছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন অজান্তেই ইউরোপে জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিলেন।
ভূমিকা:
- ঐক্য স্থাপন: তিনি জার্মানি (রাইন রাষ্ট্রসংঘ) এবং ইতালির ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে সেখানে ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- বিপ্লবী আদর্শ: তিনি বিজিত দেশগুলোতে সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ ছড়িয়ে দেন, যা মানুষকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলে।
- প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদ: নেপোলিয়নের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলোতে (স্পেন, প্রুশিয়া, রাশিয়া) দেশপ্রেম ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ঘটায়।
21. নেপোলিয়নের পতনের প্রধান কারণগুলি কী ছিল?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: উল্কার মতো উত্থান হলেও নেপোলিয়নের পতন ছিল অনিবার্য।
কারণসমূহ:
- অসীম উচ্চাকাঙ্ক্ষা: তাঁর সীমাহীন রাজ্যলিপ্সা তাঁকে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে, যা ফ্রান্সের শক্তি ক্ষয় করে।
- মহাদেশীয় অবরোধ: এই ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ায় ফ্রান্সের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং ইউরোপের মিত্ররা শত্রু হয়ে ওঠে।
- স্পেন ও রাশিয়া অভিযান: স্পেনের গণবিদ্রোহ এবং রাশিয়া অভিযানের বিপর্যয় তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
- জাতীয়তাবাদ: যে জাতীয়তাবাদ তাঁকে ক্ষমতায় এনেছিল, বিজিত দেশগুলোর সেই জাতীয়তাবাদই তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে ওঠে।
22. ‘ব্যাংক অফ ফ্রান্স’ (১৮০০) প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: বিপ্লব পরবর্তী ফ্রান্সের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য নেপোলিয়ন ১৮০০ সালে ‘ব্যাংক অফ ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা করেন।
গুরুত্ব:
- এটি ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে কাজ শুরু করে।
- এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
- রাষ্ট্রের ঋণ ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল হয় এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
- এটি নেপোলিয়নের শাসনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছিল।
23. নেপোলিয়ন ইতালির ঐক্যসাধনে কী ভূমিকা নিয়েছিলেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের পূর্বে ইতালি ছিল কেবল একটি ‘ভৌগোলিক সংজ্ঞা’।
ভূমিকা:
- তিনি ইতালির ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে জয় করে একই শাসন ব্যবস্থার অধীনে আনেন।
- সেখানে ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ প্রচার করেন এবং সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটান।
- একই আইন ও মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করে তিনি ইতালিবাসীর মনে একাত্ববোধ জাগিয়ে তোলেন।
- তাঁর এই কাজই পরবর্তীতে ইতালির ঐক্য আন্দোলন বা ‘রিসর্জিমেন্টো’-র ভিত্তি তৈরি করে।
24. নেপোলিয়ন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মূল্যায়ন কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন ছিলেন ইতিহাসের এক বিতর্কিত চরিত্র।
মূল্যায়ন:
- কেউ তাঁকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলেছেন, কারণ তিনি বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করেছিলেন (যেমন—ফিশার)।
- আবার কেউ তাঁকে ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’ বলেছেন, কারণ তিনি গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন (যেমন—মিশেলে)।
- অনেকে তাঁকে ‘আধুনিক ইউরোপের রূপকার’ বলে মনে করেন।
উপসংহার: দোষে-গুণে মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক অসামান্য প্রতিভার অধিকারী, যিনি ইউরোপের মানচিত্র ও ইতিহাস দুইই বদলে দিয়েছিলেন।
25. নেপোলিয়নের পতনে ইংল্যান্ডের ভূমিকা আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের আজীবন শত্রু ছিল ইংল্যান্ড। তাঁর পতনের পেছনে ইংল্যান্ডের ভূমিকাই ছিল প্রধান।
ভূমিকা:
- নৌযুদ্ধে পরাজয়: ট্রাফালগারের যুদ্ধে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে নেপোলিয়নের সমুদ্রজয়ের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।
- অর্থনৈতিক যুদ্ধ: ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় অবরোধ ব্যর্থ হলে ফ্রান্সের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।
- উপদ্বীপের যুদ্ধ: স্পেনের যুদ্ধে ইংল্যান্ড স্পেন ও পর্তুগালকে সাহায্য করে নেপোলিয়নের বাহিনীকে দুর্বল করে দেয়।
- চূড়ান্ত আঘাত: ওয়াটারলুর যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাপতি ডিউক অফ ওয়েলিংটন নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন।
26. নেপোলিয়ন ও জার্মানির পুনর্গঠন (Reorganization of Germany) সম্পর্কে কী জানো?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের আগে জার্মানি ছিল প্রায় ৩০০টি ছোট ছোট রাজ্যের সমষ্টি। নেপোলিয়নই প্রথম জার্মানির আধুনিক রূপ দেন।
কর্মকাণ্ড:
- তিনি পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটান।
- ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করে তিনি ১৬টি (মতান্তরে ৩৯টি) রাজ্য নিয়ে ‘রাইন রাষ্ট্রসংঘ’ (Confederation of the Rhine) গঠন করেন।
- সেখানে ফরাসি আইন ও শাসন ব্যবস্থা চালু করেন।
গুরুত্ব: তাঁর এই পদক্ষেপ জার্মানিতে ঐক্যের চেতনা জাগিয়ে তোলে, যা পরে বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির পূর্ণাঙ্গ ঐক্যসাধনে সাহায্য করে।
27. নেপোলিয়নের ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ (Grand Army) সম্পর্কে টীকা লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়নের দিগ্বিজয়ী বিশাল বাহিনীকে ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ বলা হতো।
বৈশিষ্ট্য:
- ১৮১২ সালে রাশিয়া অভিযানের সময় এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লক্ষ।
- এতে কেবল ফরাসি সৈন্য নয়, পোল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের সৈন্যরাও ছিল।
- এই বাহিনী ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নেপোলিয়নের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত।
পরিণতি: রাশিয়ার প্রবল শীতে এবং খাদ্যভাবে এই বিশাল বাহিনীর প্রায় ৫ লক্ষ সৈন্য মারা যায়, যা ছিল নেপোলিয়নের পতনের অন্যতম কারণ।
28. বার্লিন ডিক্রি (Berlin Decree) ও মিলান ডিক্রি (Milan Decree) কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: মহাদেশীয় অবরোধ কার্যকর করার জন্য নেপোলিয়ন দুটি বিশেষ ঘোষণা জারি করেন।
- বার্লিন ডিক্রি (১৮০৬): বার্লিন থেকে জারি করা এই ঘোষণায় বলা হয়, সমগ্র ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ অবরুদ্ধ এবং কোনো ব্রিটিশ জাহাজ ফ্রান্স বা তার মিত্র দেশের বন্দরে ঢুকতে পারবে না।
- মিলান ডিক্রি (১৮০৭): মিলান থেকে জারি করা এই ঘোষণায় বলা হয়, কোনো নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ যদি ব্রিটিশ বন্দরে যায় বা ব্রিটিশ সরকারকে শুল্ক দেয়, তবে সেই জাহাজকেও ‘শত্রু জাহাজ’ বলে গণ্য করা হবে এবং বাজেয়াপ্ত করা হবে।
29. নেপোলিয়নের জনহিতকর কার্যাবলি (Public Works) আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নেপোলিয়ন কেবল যুদ্ধবাজ ছিলেন না, তিনি ফ্রান্সের উন্নয়নে অনেক জনহিতকর কাজও করেছিলেন।
কাজসমূহ:
- প্যারিস সৌন্দর্যয়ন: তিনি প্যারিসকে বিশ্বের সুন্দরতম শহরে পরিণত করেন। রাস্তাঘাট চওড়া করা, সেতু নির্মাণ এবং পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার উন্নতি করেন।
- যোগাযোগ: তিনি ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে আল্পস পর্বতের ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করেন।
- জাদুঘর: ল্যুভর মিউজিয়ামকে সমৃদ্ধ করেন।
- বেকারত্ব দূরীকরণ: এইসব নির্মাণকাজে হাজার হাজার মানুষ কাজ পায়, যা বেকার সমস্যা কমায়।