নবম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – 5 বিশ শতকে ইউরোপ, ৮ নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৫: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৮)

প্রশ্ন ১: ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের (নভেম্বর বিপ্লব) কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব ছিল বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা। এই বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং রাশিয়ার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছিল। এর কারণগুলিকে প্রধানত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাগে ভাগ করা যায়।

১. রাজনৈতিক কারণ (জারের স্বৈরাচার):

রোমানভ বংশের জাররা ছিলেন চরম স্বৈরাচারী। বিশেষ করে শেষ জার দ্বিতীয় নিকোলাস ছিলেন দুর্বলচেতা ও অযোগ্য। তিনি জনমতের তোয়াক্কা না করে রানির পরামর্শদাতা রাসপুটিনের মতো দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের দ্বারা দেশ চালাতেন। জারের এই দমনমূলক শাসন জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

২. সামাজিক কারণ (কৃষক ও শ্রমিক অসন্তোষ):

  • কৃষকদের দুর্দশা: রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষই ছিল কৃষক। ১৮৬১ সালে ভূমিদাস প্রথা বিলোপ হলেও কৃষকদের জমির মালিকানা ছিল না। জমিদাররা তাদের ওপর শোষণ চালাত। ‘জমি যার লাঙল তার’—এই দাবিতে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
  • শ্রমিকদের দুরবস্থা: শিল্প বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণি গড়ে ওঠে। তাদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হতো, কিন্তু মজুরি ছিল সামান্য। এই শোষণের বিরুদ্ধে তারা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

৩. অর্থনৈতিক কারণ:

রাশিয়ার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর এবং অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া। যুদ্ধের খরচ মেটাতে গিয়ে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়। খাদ্যাভাব ও অনাহার নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো শহরে রুটির দাবিতে দাঙ্গা শুরু হয়।

৪. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিপর্যয়:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া যোগ দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। যুদ্ধে রাশিয়ার শোচনীয় পরাজয় ঘটে এবং প্রায় ৬০ লক্ষ রুশ সৈন্য হতাহত হয়। সৈন্যদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র, জুতো ও খাবার ছিল না। এই যুদ্ধের ব্যর্থতা জারের পতনকে নিশ্চিত করে।

৫. দার্শনিকদের প্রভাব:

কার্ল মার্কস, টলস্টয়, গোর্কি প্রমুখ চিন্তাবিদদের রচনা রুশ জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মার্কসবাদ ও লেনিনের নেতৃত্ব বলশেভিক দল ও জনগণকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করে।

উপসংহার: এই সমস্ত কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক দল ক্ষমতা দখল করে এবং বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠিত হয়।


প্রশ্ন ২: ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের পটভূমি ও কারণগুলি আলোচনা করো।

ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বেনিটো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট দলের উত্থান ঘটে। ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসোলিনি ইতালির একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন।

১. ভার্সাই সন্ধিতে বঞ্চনা:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি মিত্রশক্তির (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স) পক্ষে যোগ দিয়ে বিপুল ক্ষতি স্বীকার করেছিল। আশা ছিল যুদ্ধের পর সে অনেক অঞ্চল পাবে। কিন্তু ভার্সাই সন্ধিতে তাকে ট্রিয়েস্ট ও টেন্টিনো ছাড়া বিশেষ কিছুই দেওয়া হয়নি। এই ‘বিকৃত জয়’ (Mutilated Victory) ইতালিবাসীর মনে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।

২. অর্থনৈতিক সংকট:

যুদ্ধের ফলে ইতালির অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। জাতীয় ঋণের বোঝা বাড়ে, লিরার (মুদ্রা) দাম কমে যায় এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। লক্ষ লক্ষ সৈনিক বেকার হয়ে পড়ে। এই সময় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।

৩. সাম্যবাদের ভীতি ও শ্রমিক অসন্তোষ:

রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের প্রভাবে ইতালিতেও শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘট শুরু হয়। শ্রমিকরা কলকারখানা দখল করতে থাকে। এতে ইতালির শিল্পপতি, জমিদার ও ধনী শ্রেণি ভীত হয়ে পড়ে। তারা সম্পত্তি রক্ষার জন্য সমাজতন্ত্র বিরোধী মুসোলিনিকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে থাকে।

৪. গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যর্থতা:

তৎকালীন গণতান্ত্রিক সরকার এই অরাজকতা ও সংকট মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিল। ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে ৫ বার মন্ত্রীসভা পরিবর্তন হয়। মানুষ গণতন্ত্রের ওপর আস্থা হারিয়ে একজন শক্তিশালী শাসকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

৫. মুসোলিনির ব্যক্তিত্ব ও প্রতিশ্রুতি:

মুসোলিনি ছিলেন সুবক্তা ও দক্ষ সংগঠক। তিনি ইতালিবাসীকে হৃত গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার এবং একটি শক্তিশালী ইতালি গড়ার স্বপ্ন দেখান। তাঁর ‘ব্ল্যাক শার্ট’ বাহিনী বিরোধীদের দমন করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

উপসংহার: ১৯২২ সালে মুসোলিনি তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে ‘রোম অভিযান’ (March on Rome) করলে দুর্বল রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। এভাবেই ইতালিতে ফ্যাসিবাদের জয়যাত্রা শুরু হয়।


প্রশ্ন ৩: জার্মানিতে হিটলার ও নাৎসি দলের উত্থানের কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।

ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ইতিহাসে এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে অ্যাডলফ হিটলার ও তাঁর নাৎসি দল জার্মানির ক্ষমতা দখল করে। এর পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ ছিল।

১. ভার্সাই সন্ধির কঠোরতা ও অপমান:

ভার্সাই সন্ধি (১৯১৯) জার্মানির ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে জার্মানিকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করা হয়, তার সেনাবাহিনী কেড়ে নেওয়া হয় এবং বিশাল ঋণের বোঝা চাপানো হয়। জার্মান জাতি এই অপমান ভুলতে পারেনি। হিটলার প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি এই ‘কলঙ্কজনক’ সন্ধি ছিঁড়ে ফেলবেন, যা জার্মানদের আকৃষ্ট করে।

২. ভাইমার প্রজাতন্ত্রের দুর্বলতা:

যুদ্ধের পর গঠিত ভাইমার প্রজাতান্ত্রিক সরকার দেশের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন সরকার পতন এবং মিত্রশক্তির প্রতি তাদের নমনীয় মনোভাব জনগণকে ক্ষুব্ধ করে। মানুষ গণতন্ত্রের বদলে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে থাকে।

৩. অর্থনৈতিক মহামন্দার প্রভাব (১৯২৯):

১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী মহামন্দা জার্মানিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং বেকারত্ব ৬০ লক্ষে পৌঁছায়। মানুষ যখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছিল, তখন হিটলার তাদের ‘রুটি ও কাজ’-এর প্রতিশ্রুতি দেন। এই অর্থনৈতিক সংকটই হিটলারের উত্থানের প্রধান সিঁড়ি ছিল।

৪. ইহুদি বিদ্বেষ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ:

হিটলার প্রচার করেন যে জার্মান আর্যরাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি এবং তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য ইহুদিরা দায়ী। এই উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ইহুদি বিদ্বেষ জার্মান যুবসমাজকে উন্মাদ করে তোলে।

৫. হিটলারের সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব:

হিটলার ছিলেন জাদুকরী বক্তা। তাঁর আবেগপূর্ণ ভাষণ জনগণকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। তাঁর সুশৃঙ্খল নাৎসি বাহিনী (S.A. এবং S.S.) বিরোধীদের দমন করে ভীতি প্রদর্শন করত।

উপসংহার: এই সমস্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে নাৎসি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন। এরপর তিনি নিজেকে ‘ফুয়েরার’ ঘোষণা করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রশ্ন ৪: ১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী ‘মহামন্দা’র (Great Depression) কারণ ও প্রভাব আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকায় যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয় এবং যা দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে ‘মহামন্দা’ বা Great Depression বলা হয়। এটি ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

মহামন্দার কারণ:

  • ১. অতিরিক্ত উৎপাদন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার কলকারখানা ও কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কম থাকায় সেই পণ্য বাজারে অবিক্রীত থেকে যায়।
  • ২. শেয়ার বাজারে ধস: ১৯২৯ সালের ২৪ অক্টোবর (কালো বৃহস্পতিবার) আমেরিকার ‘ওয়াল স্ট্রিট’ শেয়ার বাজারে আকস্মিক ধস নামে। একদিনেই শেয়ারের দাম তলানিতে ঠেকে এবং হাজার হাজার বিনিয়োগকারী দেউলিয়া হয়ে যায়।
  • ৩. ব্যাংক ফেল করা: শেয়ার বাজারের পতনের ফলে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে শুরু করে। এর ফলে আমেরিকার প্রায় ৪০০০ ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
  • ৪. অসম বণ্টন: সম্পদের অসম বণ্টনের ফলে মুষ্টিমেয় ধনীর হাতে প্রচুর টাকা ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতে পণ্য কেনার মতো অর্থ ছিল না।

মহামন্দার প্রভাব বা ফলাফল:

  • ১. অর্থনৈতিক বিপর্যয়: বিশ্বজুড়ে শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
  • ২. বেকারত্ব: কোটি কোটি মানুষ কাজ হারায়। আমেরিকায় বেকারত্ব ২৫% এবং জার্মানিতে তা ৪০% এ পৌঁছায়। মানুষ অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হয়।
  • ৩. রাজনৈতিক পরিবর্তন: অর্থনৈতিক সংকটের ফলে মানুষ গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর আস্থা হারায়। এই সুযোগে জার্মানি ও ইতালিতে একনায়কতন্ত্রের (হিটলার ও মুসোলিনি) উত্থান ঘটে।
  • ৪. তোষণ নীতি: মহামন্দার ফলে দুর্বল হয়ে পড়া ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিজেরা যুদ্ধ এড়ানোর জন্য হিটলারের প্রতি ‘তোষণ নীতি’ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

উপসংহার: মহামন্দা বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে রুজভেল্ট ‘নিউ ডিল’ নীতি গ্রহণ করেন, কিন্তু মহামন্দার পরোক্ষ ফল হিসেবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়।


প্রশ্ন ৫: রাশিয়ার পুনর্গঠনে লেনিনের ভূমিকা এবং তাঁর ‘নতুন অর্থনৈতিক নীতি’ (NEP) আলোচনা করো।

ভূমিকা: ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ছিলেন আধুনিক রাশিয়ার রূপকার এবং বলশেভিক বিপ্লবের প্রধান নায়ক। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিধ্বস্ত রাশিয়াকে পুনর্গঠনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

১. শান্তি ও ভূমি সংস্কার:

ক্ষমতায় এসেই লেনিন ‘ব্রেস্ট-লিটভস্কের সন্ধি’ (১৯১৮) স্বাক্ষর করে রাশিয়াকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনেন। তিনি জারের জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে সমস্ত জমি কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।

২. ওয়ার কমিউনিজম ও গৃহযুদ্ধ দমন:

বিপ্লব বিরোধীদের দমন করার জন্য তিনি ‘চেকা’ (গোপন পুলিশ) ও ‘লাল ফৌজ’ গঠন করেন। গৃহযুদ্ধের সময় তিনি ‘ওয়ার কমিউনিজম’ বা যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ চালু করে কঠোর হাতে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন।

৩. নতুন অর্থনৈতিক নীতি বা NEP (১৯২১):

টানা যুদ্ধ ও কঠোর নীতির ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। দুর্ভিক্ষ ও কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই অবস্থা সামাল দিতে ১৯২১ সালে লেনিন NEP প্রবর্তন করেন।

এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

• কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে শস্য নেওয়া বন্ধ করা হয় এবং নির্দিষ্ট কর দেওয়ার পর বাকি শস্য খোলা বাজারে বিক্রির অধিকার দেওয়া হয়।

• ছোট ও মাঝারি শিল্পে ব্যক্তিগত মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

• খুচরো ব্যবসা ও বাণিজ্যে ছাড় দেওয়া হয়।

• বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়।

উপসংহার: লেনিনের এই বাস্তবসম্মত নীতির ফলে রাশিয়ার কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। তিনি প্রমাণ করেন যে, সমাজতন্ত্র মানেই কেবল কঠোরতা নয়, প্রয়োজনে নমনীয়তাও দরকার।


প্রশ্ন ৬: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।

ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাত্র ২১ বছর পর ১৯৩৯ সালে বিশ্ববাসী আবারও এক ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলি ছিল বহুমুখী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের ফল।

১. ভার্সাই সন্ধির ত্রুটি:

ঐতিহাসিকরা বলেন, ভার্সাই সন্ধির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল। জার্মানির ওপর যে অপমানজনক শর্ত ও ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছিল, তা জার্মান জাতিকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। হিটলার এই ক্ষোভকেই কাজে লাগিয়েছিলেন।

২. একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসন:

জার্মানিতে হিটলার (নাৎসিবাদ), ইতালিতে মুসোলিনি (ফ্যাসিবাদ) এবং জাপানে তোজোর নেতৃত্বে উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করা হয়।

• জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করে (১৯৩১)।

• ইতালি আবিসিনিয়া দখল করে (১৯৩৫)।

• হিটলার রাইনল্যাণ্ড, অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া গ্রাস করেন।

৩. গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির তোষণ নীতি:

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সাম্যবাদের ভয়ে হিটলার ও মুসোলিনিকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য ‘তোষণ নীতি’ গ্রহণ করে। মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে তারা হিটলারের অন্যায় দাবি মেনে নেয়। এই দুর্বলতা হিটলারকে আরও বেপরোয়া করে তোলে।

৪. জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতা:

লিগ অফ নেশনস বা জাতিপুঞ্জ শক্তিশালী দেশগুলির আগ্রাসন থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এর নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী ছিল না এবং আমেরিকা এর সদস্য ছিল না।

৫. পরস্পরবিরোধী জোট ও প্রত্যক্ষ কারণ:

বিশ্ব ‘অক্ষশক্তি’ (জার্মানি, ইতালি, জাপান) এবং ‘মিত্রশক্তি’ (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স)—এই দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

উপসংহার: সুতরাং, ভার্সাই সন্ধির অসন্তোষ, ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন এবং গণতন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগেই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল।

🔴 ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ এই বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে শোষিত শ্রমিক ও কৃষকদের ক্ষমতায়ন ঘটে।

📉 ১৯২৯ সালের মহামন্দার (Great Depression) প্রধান কারণ কী ছিল?

অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন এবং ১৯২৯ সালের ২৪ অক্টোবর আমেরিকার শেয়ার বাজারে ধস নামাই ছিল মহামন্দার প্রধান কারণ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ব্যাংক ফেল করে এবং বেকারত্ব বাড়ে।

🤝 তোষণ নীতি (Appeasement Policy) কী?

যুদ্ধ এড়ানোর জন্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স হিটলার ও মুসোলিনির অন্যায় দাবিগুলো মেনে নিয়ে তাদের শান্ত রাখার যে নীতি নিয়েছিল, তাকেই তোষণ নীতি বলে। এটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

📜 এপ্রিল থিসিস (April Theses) কে ঘোষণা করেন?

বলশেভিক নেতা লেনিন ১৯১৭ সালের ১৬ এপ্রিল এটি ঘোষণা করেন। এতে তিনি যুদ্ধ বন্ধ, জমি বণ্টন এবং সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান।

⚔️ স্পেনের গৃহযুদ্ধকে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া’ বলা হয় কেন?

কারণ এই যুদ্ধে জার্মানি ও ইতালি তাদের নতুন মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল এবং বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই ফ্যাসিস্ট ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি নিজেদের শক্তি যাচাই করে নিয়েছিল।

🌍 জাতিপুঞ্জ বা লিগ অফ নেশনস কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

এর নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী ছিল না এবং আমেরিকা এর সদস্য হয়নি। এছাড়া শক্তিশালী দেশগুলির (জাপান, ইতালি, জার্মানি) আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এটি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

🇩🇪 হিটলারের ‘লেবেনস্রাম’ (Lebensraum) তত্ত্ব কী?

এটি হলো ‘বাসযোগ্য স্থান’ তত্ত্ব। হিটলার বিশ্বাস করতেন যে জার্মান জাতির বিস্তারের জন্য পূর্ব ইউরোপে (বিশেষ করে রাশিয়ায়) বাড়তি জমি দখল করা প্রয়োজন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার