নবম শ্রেণি: জীবন বিজ্ঞান, অধ্যায় ৪: জীববিদ্যা ও মানবকল্যাণ, পর্ব – অনাক্রম্যতা ও মানুষের রোগ, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন মান ৫

অনাক্রম্যতা ও মানুষের রোগ: রচনাধর্মী প্রশ্ন (LAQ)

1. অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো। অনাক্রম্যতায় T-লিম্ফোসাইটের ভূমিকা কী? (৩+২)

উত্তর দেখো

অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির পার্থক্য:

বিষয় অ্যান্টিজেন অ্যান্টিবডি
প্রকৃতি সাধারণত বিজাতীয় প্রোটিন বা পলিস্যাকারাইড। গ্লোবিউলিন জাতীয় প্রোটিন।
উৎস দেহের বাইরে থেকে প্রবেশ করে (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া)। লিম্ফোসাইট বা প্লাজমা কোশ থেকে উৎপন্ন হয়।
কাজ অনাক্রম্যতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে রোগ সৃষ্টি করে। অ্যান্টিজেনকে ধ্বংস করে দেহকে রক্ষা করে।

T-লিম্ফোসাইটের ভূমিকা: T-লিম্ফোসাইট সরাসরি জীবাণু আক্রান্ত কোশ বা ক্যান্সার কোশকে ধ্বংস করে। একে ‘কোশভিত্তিক অনাক্রম্যতা’ (Cell-mediated immunity) বলে। এছাড়া এটি B-লিম্ফোসাইটকে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সাহায্য করে।


2. ম্যালেরিয়া রোগের বিস্তার পদ্ধতি এবং দমনের দুটি উপায় আলোচনা করো। (৩+২)

উত্তর দেখো

বিস্তার পদ্ধতি: ম্যালেরিয়া রোগটি Plasmodium নামক আদ্যপ্রাণী দ্বারা ঘটে এবং স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা এই রোগের বাহক।

  • কোনো মশা ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীকে কামড়ালে রোগীর রক্ত থেকে জীবাণুর গ্যামেটোসাইট মশার দেহে প্রবেশ করে।
  • মশার দেহে যৌন চক্র সম্পন্ন হওয়ার পর লালাগ্রন্থিতে ‘স্পোরোজয়েট’ জমা হয়।
  • ওই মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে স্পোরোজয়েট মানুষের রক্তে প্রবেশ করে ম্যালেরিয়া সৃষ্টি করে।

দমনের উপায়:

  1. মশা নিধন: জমা জলে তেল বা ডিডিটি স্প্রে করে লার্ভা মারা এবং গাপ্পি মাছ চাষ করা।
  2. ব্যক্তিগত সুরক্ষা: মশারি ব্যবহার করা এবং ধূপ বা রিপেলেন্ট ব্যবহার করে মশার কামড় থেকে দূরে থাকা।

3. টিকার গুরুত্ব কী? DPT ও BCG টিকা কোন কোন রোগের প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়? (২+৩)

উত্তর দেখো

টিকার গুরুত্ব:

  • টিকা দেহে নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী বা আজীবন অনাক্রম্যতা (স্মৃতিকোশ) গড়ে তোলে।
  • এটি মহামারী প্রতিরোধে এবং শিশু মৃত্যুহার কমাতে অত্যন্ত কার্যকরী।

টিকার ব্যবহার:

DPT ডিপথেরিয়া, পারটুসিস (হুপিং কাশি) এবং টিটেনাস—এই তিনটি রোগের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়।
BCG যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস (TB) রোগ প্রতিরোধের জন্য দেওয়া হয়।

4. ক্যান্সার কী? বিনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো। (২+৩)

উত্তর দেখো

ক্যান্সার: কোশের বিভাজন নিয়ন্ত্রণকারী জিন (প্রোটো-অনকোজিন) মিউটেশনের ফলে অনকোজিনে পরিণত হলে কোশের যে অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন ঘটে এবং টিউমার সৃষ্টি করে প্রাণহানির কারণ হয়, তাকে ক্যান্সার বলে।

পার্থক্য:

বিষয় বিনাইন টিউমার ম্যালিগন্যান্ট টিউমার
বিস্তার উৎপত্তিস্থলে সীমাবদ্ধ থাকে। রক্তের মাধ্যমে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে (মেটাস্ফ্যাসিস)।
ক্ষতিকারক প্রভাব তুলনামূলক কম ক্ষতিকারক। অত্যন্ত ক্ষতিকারক ও প্রাণঘাতী।
বৃদ্ধি বৃদ্ধির হার ধীর। বৃদ্ধির হার অত্যন্ত দ্রুত।

5. এইডস (AIDS) রোগের কারণ, বিস্তার এবং প্রতিকার সংক্ষেপে লেখো। (১+২+২)

উত্তর দেখো

কারণ: হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV) নামক এক প্রকার RNA ভাইরাসের সংক্রমণে এইডস হয়।

বিস্তার:

  • আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা রক্তজাত পদার্থ সুস্থ ব্যক্তির দেহে সঞ্চালন করলে।
  • অনিরাপদ ও অবাধ যৌন মিলনের মাধ্যমে।
  • আক্রান্ত মায়ের প্লাসেন্টা বা বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর দেহে।

প্রতিকার:

  • রক্ত সঞ্চালনের পূর্বে রক্তে HIV আছে কিনা পরীক্ষা করা।
  • ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ বা সূঁচ ব্যবহার করা এবং নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা।

6. একটি আদর্শ অ্যান্টিবডির গঠন চিত্রসহ বর্ণনা করো। (৫)

উত্তর দেখো

একটি অ্যান্টিবডি অণু (IgG) ইংরেজি ‘Y’ অক্ষরের মতো দেখতে। এর প্রধান অংশগুলি হলো:

হৃদচক্রের ডায়াগ্রাম

  1. পলিপেপটাইড শৃঙ্খল: এটি ৪টি পলিপেপটাইড শৃঙ্খল দিয়ে গঠিত। এর মধ্যে দুটি বড় বা ‘ভারী শৃঙ্খল’ (Heavy chain – H) এবং দুটি ছোট বা ‘হালকা শৃঙ্খল’ (Light chain – L)।
  2. ডাই-সালফাইড বন্ড: শৃঙ্খলগুলি নিজেদের মধ্যে ডাই-সালফাইড বন্ড (-S-S-) দ্বারা যুক্ত থাকে।
  3. অঞ্চল: প্রতিটি শৃঙ্খলে দুটি অঞ্চল থাকে—
    • পরিবর্তনশীল অঞ্চল (Variable Region): এটি ‘Y’-এর বাহুর অগ্রভাগে থাকে যেখানে অ্যান্টিজেন যুক্ত হয় (Antigen binding site)।
    • স্থায়ী অঞ্চল (Constant Region): এটি অণুর বাকি অংশ যা অপরিবর্তিত থাকে।

7. মানুষের দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর (প্লাজমোডিয়াম) জীবনচক্র সংক্ষেপে ছকের সাহায্যে লেখো। (৫)

উত্তর দেখো

মানুষের দেহে প্লাজমোডিয়ামের অযৌন জনন বা সাইজোগনি ঘটে। এটি প্রধানত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

[Image of Lifecycle of Malaria Parasite in Human]

১. হেপাটিক সাইজোগনি (যকৃতে):

  • মশার কামড়ের ফলে স্পোরোজয়েট রক্তে প্রবেশ করে এবং যকৃৎ কোশে আশ্রয় নেয়।
  • সেখানে বিভাজিত হয়ে মেরোজয়েট উৎপন্ন করে।

২. এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি (RBC-তে):

  • মেরোজয়েটগুলি লোহিত রক্তকণিকা বা RBC আক্রমণ করে।
  • সেখানে ‘ট্রফোজয়েট’ ও পরে ‘সিগনেট রিং’ দশা গঠন করে।
  • RBC বিদীর্ণ হয়ে হিমোজয়েন নামক বিষ ও মেরোজয়েট রক্তে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তীব্র কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে।
  • কিছু মেরোজয়েট গ্যামেটোসাইটে পরিণত হয়ে মশার দেহে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে।

8. অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি বিক্রিয়া বা অ্যান্টিবডির কার্যপদ্ধতিগুলি আলোচনা করো। (৫)

উত্তর দেখো

অ্যান্টিবডি বিভিন্ন পদ্ধতিতে অ্যান্টিজেন বা জীবাণুকে ধ্বংস করে:

  1. অ্যাগ্লুটিনেশন (Agglutination): অ্যান্টিবডি জীবাণুগুলিকে দলবদ্ধ করে বা দলা পাকিয়ে দেয়, ফলে ফ্যাগোসাইট কোশ সহজেই তাদের গ্রাস করতে পারে।
  2. অপসোনাইজেশন (Opsonization): অ্যান্টিবডি জীবাণুর গায়ে আস্তরণ তৈরি করে তাদের ফ্যাগোসাইটোসিসের যোগ্য করে তোলে।
  3. প্রশমন (Neutralization): অ্যান্টিবডি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিষকে (Toxin) আবৃত করে নিষ্ক্রিয় বা প্রশমিত করে দেয়।
  4. লাইসিস (Lysis): কিছু অ্যান্টিবডি সরাসরি জীবাণুর কোশপর্দা বিদীর্ণ করে তাদের ধ্বংস করে।

9. সহজাত ও অর্জিত অনাক্রম্যতার মধ্যে ৫টি পার্থক্য লেখো। (৫)

উত্তর দেখো
বিষয় সহজাত অনাক্রম্যতা অর্জিত অনাক্রম্যতা
১. উৎপত্তি জন্মগতভাবে প্রাপ্ত। জন্মের পর জীবাণু সংক্রমণ বা টিকার মাধ্যমে অর্জিত।
২. সুনির্দিষ্টতা এটি সুনির্দিষ্ট নয় (Non-specific), সব জীবাণুর বিরুদ্ধে একইভাবে কাজ করে। এটি সুনির্দিষ্ট (Specific), নির্দিষ্ট জীবাণুর জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
৩. স্মৃতিশক্তি স্মৃতিকোশ বা মেমরি সেল গঠিত হয় না। স্মৃতিকোশ গঠিত হয় এবং ভবিষ্যতে দ্রুত সাড়া দেয়।
৪. উপাদান ত্বক, লালারস, পাকস্থলীর অ্যাসিড, নিউট্রোফিল ইত্যাদি। B-লিম্ফোসাইট, T-লিম্ফোসাইট ও অ্যান্টিবডি।
৫. কার্যকরিতা তাৎক্ষণিক ক্রিয়া করে। ক্রিয়া শুরু করতে কিছুটা সময় লাগে।

10. ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া রোগের জীবাণুর নাম, সংক্রমণ পদ্ধতি ও লক্ষণ লেখো। (২.৫ + ২.৫)

উত্তর দেখো

ক) ডেঙ্গু:

  • জীবাণু: ফ্ল্যাভি ভাইরাস (Flavivirus)।
  • সংক্রমণ: স্ত্রী এডিস মশার (Aedes aegypti) কামড়ে ছড়ায়।
  • লক্ষণ: তীব্র জ্বর, চোখের পিছনে ও হাড়ের জোড়ায় অসহ্য ব্যথা (হাড়ভাঙা জ্বর), এবং রক্তে অণুচক্রিকা কমে যাওয়া।

খ) নিউমোনিয়া:

  • জীবাণু: Streptococcus pneumoniae (ব্যাকটেরিয়া)।
  • সংক্রমণ: বাতাসের মাধ্যমে বা রোগীর হাঁচি-কাশির ড্রপলেট থেকে ছড়ায়।
  • লক্ষণ: ফুসফুসে সংক্রমণ, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, জ্বর এবং কফযুক্ত কাশি।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার