নবম শ্রেণি জীবন বিজ্ঞান: অধ্যায় ৩ জৈবনিক প্রক্রিয়া ৫ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
⭐⭐ দীর্ঘ উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (LAQ) – মান: ৫
১. সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার আলোক নির্ভর দশা ও আলোক নিরপেক্ষ দশার মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য লেখো এবং সালোকসংশ্লেষের কাঁচামাল হিসেবে জলের ভূমিকা বর্ণনা করো। (পার্থক্য ৩ + জলের ভূমিকা ২)
✅ সালোকসংশ্লেষের দশার পার্থক্য ও জলের ভূমিকা:
💡 আলোক নির্ভর দশা ও আলোক নিরপেক্ষ দশার পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | আলোক নির্ভর দশা | আলোক নিরপেক্ষ দশা |
|---|---|---|
| স্থান | ক্লোরোপ্লাস্টের **গ্রানাতে** ঘটে। | ক্লোরোপ্লাস্টের **স্ট্রোমাতে** ঘটে। |
| শক্তির প্রয়োজন | এই দশা সম্পন্ন হতে **আলোর** প্রত্যক্ষ প্রয়োজন। | আলোর প্রত্যক্ষ প্রয়োজন নেই, তবে আলোক দশার উৎপন্ন শক্তি লাগে। |
| উৎপন্ন পদার্থ | ATP, NADPH₂ (শক্তির বাহক) এবং উপজাত হিসেবে **O₂** উৎপন্ন হয়। | আসল খাদ্যবস্তু **গ্লুকোজ** (শর্করা) উৎপন্ন হয়। |
💧 সালোকসংশ্লেষের কাঁচামাল হিসেবে জলের ভূমিকা
- অক্সিজেন সরবরাহ: জল সূর্যালোকের প্রভাবে ভেঙে গিয়ে $(\text{H}_2\text{O} \to \text{H}^{+} + \text{OH}^{-})$ হাইড্রোজেন আয়ন (যা পরবর্তীতে NADPH₂ সৃষ্টিতে কাজে লাগে) এবং উপজাত হিসেবে **অক্সিজেন গ্যাস $(\text{O}_2)$** মুক্ত করে। এই অক্সিজেনই পরিবেশে মুক্ত হয়।
- তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: জলের বাষ্পীভবন পাতার তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং গাছের সজীবতা বজায় রাখে।
২. উদ্ভিদের জল ও খাদ্য সংবহনের পথের পার্থক্য আলোচনা করো। সংবহন তন্ত্রের গুরুত্ব কী? (পার্থক্য ৩ + গুরুত্ব ২)
✅ উদ্ভিদের সংবহন ও তার গুরুত্ব:
🌳 জল ও খাদ্য সংবহনের পথের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | জল ও খনিজ লবণের সংবহন | খাদ্য সংবহন |
|---|---|---|
| বাহক কলা | প্রধানত **জাইলেম** কলার মাধ্যমে ঘটে। | প্রধানত **ফ্লোয়েম** কলার মাধ্যমে ঘটে। |
| গতিপথ | প্রধানত একমুখী – **মূল থেকে পাতা ও কাণ্ডের দিকে** (ঊর্ধ্বমুখী)। | বহুমুখী – প্রধানত **পাতা থেকে মূল ও অন্যান্য সঞ্চয়ী অঙ্গে**। |
| শক্তি | অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাষ্পমোচন টানের কারণে এটি **নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া**। | ফ্লোয়েমের মাধ্যমে সংবহন একটি **সক্রিয় প্রক্রিয়া** (ATP প্রয়োজন)। |
🌱 উদ্ভিদের সংবহন তন্ত্রের গুরুত্ব
- জলের যোগান: উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ, কোষে রসস্ফীতি বজায় রাখা ও দেহ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জল জাইলেম কলা মূল থেকে পাতায় সংবাহিত করে।
- খাদ্য বণ্টন: পাতায় তৈরি হওয়া শর্করা জাতীয় খাদ্য ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে গাছের বৃদ্ধি ও শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রতিটি জীবিত কোষে পৌঁছে দেয়।
৩. মানুষের রেচন তন্ত্রের প্রধান অঙ্গ বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক নেফ্রনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। বৃক্কের ভূমিকা কী? (নেফ্রনের বিবরণ ৩ + বৃক্কের ভূমিকা ২)
✅ নেফ্রনের গঠন ও বৃক্কের ভূমিকা:
🔬 নেফ্রনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ [attachment_0](attachment)
নেফ্রন হলো মানব বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক। প্রতিটি বৃক্কে প্রায় ১০-১২ লক্ষ নেফ্রন থাকে। প্রধানত দুটি অংশ নিয়ে এটি গঠিত:
- ম্যালপিজিয়ান কর্পাসল বা রেনাল কর্পাসল: এটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত:
- গ্লোমেরুলাস: এটি হলো অ্যাফারেন্ট ধমনিকা থেকে আসা সূক্ষ্ম রক্তজালকের গুচ্ছ, যেখানে রক্ত পরিস্রুত হয়।
- বাওম্যান্স ক্যাপসুল: এটি একটি পেয়ালার মতো অংশ, যা গ্লোমেরুলাসকে ঘিরে রাখে এবং পরিস্রুত তরলকে সংগ্রহ করে।
- বৃক্কীয় নালিকা: এটি বাওম্যান্স ক্যাপসুলের পরের অংশ এবং তিনটি প্রধান ভাঁজযুক্ত অংশ নিয়ে গঠিত—নিকটবর্তী সংবর্তন নালিকা (PCT), হেনলির লুপ এবং দূরবর্তী সংবর্তন নালিকা (DCT)। এই অংশগুলিতে পরিস্রাবণ, পুনঃশোষণ ও ক্ষরণ ঘটে।
কিডনির (বৃক্কের) প্রধান ভূমিকা
- মূত্র উৎপাদন ও রেচন: বৃক্ক রক্তকে ছেঁকে ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন-এর মতো বিপাকজাত ক্ষতিকারক বর্জ্যগুলিকে মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়।
- দেহের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা: বৃক্ক শরীরের জল ও খনিজ লবণের (যেমন $\text{Na}^{+}, \text{K}^{+}, \text{Cl}^{-}$) মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং রক্তরসের pH (অম্ল-ক্ষার)-এর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৪. রক্ত সংবহনে হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা চিত্রসহ আলোচনা করো (চিত্রের প্রয়োজন নেই, শুধু বর্ণনা দিন)। দ্বিসংবহন বা ডাবল সার্কুলেশন বলতে কী বোঝো? (হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা ৩ + দ্বিসংবহন ২)
✅ হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা ও দ্বিসংবহন:
❤️ রক্ত সংবহনে হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা
হৃৎপিণ্ড মানবদেহের সংবহন তন্ত্রের প্রধান পাম্প হিসেবে কাজ করে। এর প্রধান ভূমিকাগুলি নিম্নরূপ:
- রক্তকে পাম্প করা: হৃৎপিণ্ড তার অলিন্দ এবং নিলয়ের ছান্দিক সংকোচন-প্রসারণের (সিস্টোল-ডায়াস্টোল) মাধ্যমে রক্তকে ধমনির সাহায্যে পুরো দেহে এবং ফুসফুসে পাম্প করে। এই পাম্পের ফলেই রক্তচাপ সৃষ্টি হয়।
- রক্তপ্রবাহের দিক নিয়ন্ত্রণ: হৃৎপিণ্ডে অবস্থিত বিভিন্ন কপাটিকা (যেমন – ট্রাইকাসপিড, বাইকাসপিড, সেমিলুনার কপাটিকা) রক্তকে কেবল একমুখী পথে প্রবাহিত হতে সাহায্য করে এবং রক্তকে পিছনে ফিরে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
- অবিশুদ্ধ ও বিশুদ্ধ রক্তের পৃথকীকরণ: হৃৎপিণ্ড একটি সম্পূর্ণ পেশী-পর্দা দ্বারা বাম ও ডান অর্ধেকে বিভক্ত। এর ফলে বাম অর্ধেকে **অক্সিজেনযুক্ত (বিশুদ্ধ) রক্ত** এবং ডান অর্ধেকে **কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত (অবিশুদ্ধ) রক্ত** কখনই মিশে যায় না।
🔄 দ্বিসংবহন (Double Circulation) [attachment_1](attachment)
প্রতিটি সম্পূর্ণ সংবহনচক্রে রক্ত একবারের পরিবর্তে **দু’বার** হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে, তাকে দ্বিসংবহন বলে। এই প্রক্রিয়ায় দুটি আলাদা সংবহন পথ বিদ্যমান:
- ফুসফুসীয় সংবহন (Pulmonary Circulation): ডান নিলয় থেকে অবিশুদ্ধ রক্ত ফুসফুসে যায় এবং অক্সিজেন যুক্ত হয়ে আবার বাম অলিন্দে ফিরে আসে।
- দেহগত সংবহন (Systemic Circulation): বাম নিলয় থেকে বিশুদ্ধ রক্ত সারা দেহে যায় এবং অক্সিজেন মুক্ত হয়ে অবিশুদ্ধ রক্ত ডান অলিন্দে ফিরে আসে।
এই দ্বিসংবহন উন্নত প্রাণীদের একটি বৈশিষ্ট্য, যা বিশুদ্ধ রক্তকে অবিশুদ্ধ রক্তের সাথে মিশে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং উচ্চ শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় **বেশি পরিমাণে অক্সিজেন** কোষে পৌঁছানো নিশ্চিত করে।
৫. মানবদেহের পৌষ্টিকতন্ত্রে যকৃৎ ও অগ্ন্যাশয়ের দুটি করে ভূমিকা আলোচনা করো। ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ পরিপাকে পিত্তরসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো। (ভূমিকা ২+২+ গুরুত্ব ১)
✅ যকৃৎ ও অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা এবং পিত্তরসের গুরুত্ব:
💡 পৌষ্টিকতন্ত্রে যকৃৎ ও অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা
- যকৃৎ (Liver):
- পিত্তরস উৎপাদন: যকৃৎ পিত্তরস উৎপন্ন করে, যা পিত্তথলিতে জমা থাকে এবং ফ্যাট পরিপাকে সাহায্য করে।
- কার্বোহাইড্রেট বিপাক: অতিরিক্ত গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেন রূপে সঞ্চয় করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- অগ্ন্যাশয় (Pancreas):
- অগ্ন্যাশয়িক রস ক্ষরণ: এই রস ট্রিপসিন, অ্যামাইলেজ, লাইপেজ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচক বহন করে, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রোটিন, শ্বেতসার ও ফ্যাটের পরিপাক সম্পূর্ণ করে।
- অ্যালকালি মাধ্যম তৈরি: অগ্ন্যাশয়িক রস ক্ষারের প্রকৃতির হওয়ায় পাকস্থলী থেকে আসা অ্যাসিডিক খাদ্যমণ্ডলকে (কাইম) প্রশমিত করে ক্ষারীয় (অ্যালকালি) মাধ্যম তৈরি করে, যা অগ্ন্যাশয়িক উৎসেচকের কাজের জন্য অপরিহার্য।
🥑 ফ্যাট পরিপাকে পিত্তরসের গুরুত্ব
পিত্তরসে কোনো উৎসেচক থাকে না, তবুও ফ্যাট পরিপাকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিত্তরস তার লবণের (যেমন সোডিয়াম টরোকোলেট) সাহায্যে বৃহদাকার স্নেহকণিকাগুলিকে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত করে। এই পদ্ধতিকে **ইমালসিফিকেশন** বলে। ইমালসিফিকেশনের ফলে ফ্যাটের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বহুগুণ বেড়ে যায়, যার ফলে লাইপেজ উৎসেচক সহজে ফ্যাটকে পরিপাক করতে পারে।
৬. মানুষের দ্বিসংবহন বা ডাবল সার্কুলেশন প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করো। এই ধরনের সংবহনের সুবিধা কী? (প্রক্রিয়া ৪ + সুবিধা ১) [attachment_0](attachment)
✅ দ্বিসংবহন প্রক্রিয়া ও সুবিধা:
🔄 মানবদেহে দ্বিসংবহন বা ডাবল সার্কুলেশন প্রক্রিয়া
দ্বিসংবহন প্রক্রিয়ায় রক্ত মোট দু’বার হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং দুটি পথে বিভক্ত—ফুসফুসীয় সংবহন ও দেহগত সংবহন।
- ফুসফুসীয় সংবহন (Pulmonary Circulation):
- দেহ থেকে আসা $\text{CO}_2$ যুক্ত **অবিশুদ্ধ রক্ত** ডান অলিন্দে আসে এবং সেখান থেকে ডান নিলয়ে প্রবেশ করে।
- ডান নিলয় সংকুচিত হলে রক্ত **ফুসফুসীয় ধমনির** মাধ্যমে ফুসফুসে যায়, যেখানে গ্যাসের আদান-প্রদান ঘটে (অবিশুদ্ধ রক্ত বিশুদ্ধ হয়)।
- বিশুদ্ধ রক্ত **ফুসফুসীয় শিরার** মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের বাম অলিন্দে ফিরে আসে।
- দেহগত সংবহন (Systemic Circulation):
- বাম অলিন্দ থেকে $\text{O}_2$ যুক্ত **বিশুদ্ধ রক্ত** বাম নিলয়ে আসে।
- বাম নিলয় অত্যন্ত জোরে সংকুচিত হলে রক্ত **মহাধমনির** মাধ্যমে সারা দেহের কলাকোষে বাহিত হয়।
- কলাকোষে $\text{O}_2$ মুক্ত হওয়ার পর $\text{CO}_2$ যুক্ত **অবিশুদ্ধ রক্ত** শিরা দ্বারা পুনরায় ডান অলিন্দে ফিরে আসে।
⬆️ দ্বিসংবহনের সুবিধা
এই সংবহনের প্রধান সুবিধা হল: এটি **অবিশুদ্ধ (ডি-অক্সিজেনেটেড) রক্তকে বিশুদ্ধ (অক্সিজেনেটেড) রক্তের সাথে মিশে যাওয়া থেকে রক্ষা করে**। ফলে কলাকোষগুলি উচ্চ চাপ ও অধিক ঘনত্বে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পায়, যা প্রাণীর **বিপাক হার বৃদ্ধি** ও উন্নত জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য।
৭. রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হয় পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করো। রক্তে ফাইব্রিনোজেন-এর ভূমিকা কী? (রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়া ৪ + ফাইব্রিনোজেনের ভূমিকা ১)
✅ রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়া:
🩸 রক্ততঞ্চন বা রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া
ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার এই প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- প্রথম ধাপ (থ্রম্বোপ্লাসটিন উৎপাদন): দেহের কোনো অংশে আঘাত লাগলে ক্ষতিগ্রস্ত কলাকোষ এবং রক্তরস থেকে নির্গত প্লেটলেটগুলি একত্রিত হয়ে **থ্রম্বোপ্লাসটিন** নামক একটি পদার্থ উৎপন্ন করে।
- দ্বিতীয় ধাপ (থ্রম্বিন গঠন): থ্রম্বোপ্লাসটিন তখন ক্যালসিয়াম $(\text{Ca}^{++})$ আয়নের উপস্থিতিতে রক্তরসে থাকা নিষ্ক্রিয় প্রোটিন **প্রোথ্রম্বিন**-কে সক্রিয় উৎসেচক **থ্রম্বিন**-এ রূপান্তরিত করে।
- তৃতীয় ধাপ (রক্ত জালিকা গঠন): থ্রম্বিন তখন রক্তরসের মধ্যে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকা প্রোটিন **ফাইব্রিনোজেন**-এর ওপর কাজ করে এটিকে অদ্রবণীয় **ফাইব্রিন** জালকে পরিণত করে। এই তন্তুময় জালকের মধ্যে রক্তকণিকাগুলি আটকে গিয়ে রক্তের ডেলা বা ক্লট তৈরি করে।
🔗 ফাইব্রিনোজেন-এর ভূমিকা
ফাইব্রিনোজেন রক্তরসে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে এবং রক্ততঞ্চনের শেষ ধাপে থ্রম্বিনের প্রভাবে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন তন্তুতে রূপান্তরিত হয়। এই **ফাইব্রিন তন্তুই** রক্ত জালক তৈরি করে, যার মধ্যে রক্তকণিকা আটকে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধে। অর্থাৎ, রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়ার **কাঠামোগত ভিত্তি** ফাইব্রিনোজেন-ই প্রদান করে।
৮. নেফ্রনের প্রধান তিনটি কাজ উল্লেখ করো। সংবহন ও রেচনের মধ্যে সম্পর্ক কী? (নেফ্রনের কাজ ৩ + সম্পর্ক ২)
✅ নেফ্রনের কাজ ও সংবহন-রেচন সম্পর্ক:
৩টি প্রধান কাজ [attachment_1](attachment)
বৃক্কের একক হিসেবে নেফ্রন তিনটি ধাপে মূত্র উৎপাদন করে:
- অতি-পরিস্রাবণ (Ultra-filtration): এটি নেফ্রনের ম্যালপিজিয়ান কর্পাসলে ঘটে। গ্লোমেরুলাসের সূক্ষ্ম জালকের মাধ্যমে রক্ত উচ্চচাপে পরিস্রুত হয়। এই প্রক্রিয়ায় রক্তকণিকা ও বড় প্রোটিন ছাড়া বাকি সমস্ত উপাদান (জল, ইউরিয়া, গ্লুকোজ, লবণ) বাওম্যান্স ক্যাপসুলে প্রবেশ করে, যাকে **প্রাথমিক মূত্র** বলে।
- নির্বাচনমূলক পুনঃশোষণ (Selective Reabsorption): বৃক্কীয় নালিকা পথে প্রাথমিক মূত্র যাওয়ার সময় শরীর যে উপাদানগুলির প্রয়োজন মনে করে (যেমন – সমস্ত গ্লুকোজ, প্রায় ৯৯% জল ও প্রয়োজনীয় লবণ), সেগুলি আবার রক্তে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
- ক্ষরণ বা নালিকা ক্ষরণ (Tubular Secretion): রক্তে থাকা অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বস্তু (যেমন- পটাসিয়াম আয়ন, কিছু বর্জ্য) বৃক্কীয় নালিকার কোষ দ্বারা সরাসরি পরিস্রুত তরলে ক্ষরিত হয়। এই তিন ধাপেই চূড়ান্ত মূত্র তৈরি হয়।
🔗 সংবহন ও রেচনের মধ্যে সম্পর্ক
সংবহন ও রেচন প্রক্রিয়া একে অপরের ওপর নির্ভরশীল:
- সংবহনের কাজ রেচনকে সাহায্য করা: সংবহনতন্ত্র বা রক্ত (Circulation System) দেহের বিভিন্ন কলাকোষ থেকে বিপাকক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন **ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থ** (যেমন ইউরিয়া) সংগ্রহ করে এবং সেগুলিকে রেচন অঙ্গগুলির (যেমন বৃক্ক, ত্বক) কাছে পৌঁছে দেয়।
- রেচনের কাজ সংবহনকে শুদ্ধ রাখা: রেচনতন্ত্র সংবহনতন্ত্রের রক্ত থেকে ওই বর্জ্য পদার্থগুলিকে পরিস্রুত করে দেহ থেকে অপসারণ করে, যা সংবহনতন্ত্রের রক্তকে বিষমুক্ত ও বিশুদ্ধ রাখে।
৯. উদ্ভিদের নাইট্রোজেনযুক্ত ও নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থের উদাহরণ দাও এবং এদের দুটি করে ব্যবহারিক গুরুত্ব লেখো। (উদাহরণ ২ + ব্যবহারিক গুরুত্ব ৩)
✅ উদ্ভিদের রেচন পদার্থ ও ব্যবহারিক গুরুত্ব:
🌿 উদ্ভিদের রেচন পদার্থের উদাহরণ
- নাইট্রোজেনযুক্ত রেচন পদার্থ (Alkaloids): কুইনাইন (সিঙ্কোনা), রেসারপিন (সর্পগন্ধা), ডাটুরিন (ধুতুরা), নিকোটিন (তামাক), অ্যাট্রোপিন (বেলেডোনা)।
- নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থ: রজন (পাইন), গঁদ (বাবলা), ট্যানিন (খয়ের, চা)।
🛠️ ব্যবহারিক গুরুত্ব (অর্থনৈতিক মূল্য)
- নাইট্রোজেনযুক্ত পদার্থের গুরুত্ব:
- কুইনাইন: এটি সিঙ্কোনা গাছের ছালে পাওয়া যায় এবং ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- রেসারপিন: এটি সর্পগন্ধা গাছের মূলে পাওয়া যায় এবং উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure) কমানোর ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- নাইট্রোজেনবিহীন পদার্থের গুরুত্ব:
- রজন (Resin): এটি মূলত বার্নিশ, রং (Paint) এবং তারপিন তেল (Turpentine oil) তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- ট্যানিন (Tannin): ট্যানিন চামড়া ট্যানিং (চামড়া প্রক্রিয়াকরণ) শিল্পে এবং কালি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এটি রক্তক্ষরণ বন্ধ করতেও ব্যবহৃত হয়।
১০. মানবদেহে লসিকার প্রধান তিনটি কাজ সংক্ষেপে লেখো। লসিকা ও রক্তের মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য উল্লেখ করো। (লসিকার কাজ ২ + পার্থক্য ৩)
✅ লসিকার কাজ ও রক্ত-লসিকার পার্থক্য:
💧 লসিকার প্রধান কাজ
- ফ্যাট শোষণ: পরিপাকের পর ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই-এ অবস্থিত ল্যাকটিয়েলের মাধ্যমে লসিকা **ফ্যাট (স্নেহ পদার্থ)** শোষণ করে এবং সেগুলিকে রক্ত সংবহনে পৌঁছে দেয়।
- দেহ প্রতিরক্ষা: লসিকার মধ্যে থাকা লিম্ফোসাইট (এক প্রকার শ্বেত রক্তকণিকা) দেহে প্রবেশকারী **রোগজীবাণু** ধ্বংস করে এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করে দেহকে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
- কলা-রস পুনঃসংবহন: রক্তজালক থেকে বের হয়ে আসা অতিরিক্ত কলা-রস (টিস্যু ফ্লুইড) লসিকা সংগ্রহ করে সেটিকে পুনরায় রক্তে ফিরিয়ে দেয়, যা দেহে **জলের ভারসাম্য** বজায় রাখে।
🩸 লসিকা ও রক্তের মধ্যে পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | রক্ত | লসিকা |
|---|---|---|
| রং | লোহিত রক্তকণিকা থাকায় **লাল** বর্ণের। | সাধারণত **বর্ণহীন বা হালকা হলুদ** বর্ণের। |
| প্রোটিন ও $\text{O}_2$ | উভয়ের পরিমাণ **অধিক**। | উভয়ের পরিমাণ **কম** (লসিকা রক্তরস থেকে গঠিত)। |
| গতিপথ | দ্বিমুখী (ধমনি ও শিরা উভয়ের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়)। | একমুখী (কলা থেকে হৃৎপিণ্ডের দিকে প্রবাহিত হয়)। |
১১. পরিপাক প্রক্রিয়ায় প্রোটিন, শ্বেতসার ও ফ্যাটের ওপর কাজ করে এমন দুটি করে উৎসেচকের নাম এবং তাদের কাজ লেখো। (২+২+১)
✅ পরিপাক উৎসেচক ও তাদের কাজ:
🔬 প্রধান পরিপাক উৎসেচক এবং তাদের কাজ
- শ্বেতসার (কার্বোহাইড্রেট) পরিপাক:
- টায়ালিন (লালা অ্যামাইলেজ): লালারসে উপস্থিত এই উৎসেচক মুখের মধ্যে সেদ্ধ শ্বেতসারকে মলটোজে পরিণত করে।
- অ্যামাইলেজ (অগ্ন্যাশয়িক): অগ্ন্যাশয়িক রসে উপস্থিত হয়ে এটি অবশিষ্ট শ্বেতসারকে ক্ষুদ্রান্ত্রে মলটোজে পরিণত করে।
- প্রোটিন পরিপাক:
- পেপসিন: পাকস্থলীর গ্যাস্ট্রিক রস থেকে নিঃসৃত হয়ে এটি প্রোটিনকে প্রোটিওজেস ও পেপটোনসে পরিণত করে।
- ট্রিপসিন: অগ্ন্যাশয়িক রস থেকে নিঃসৃত হয়ে এটি প্রোটিন, প্রোটিওজেস ও পেপটনসকে পলিপেপটাইডে পরিণত করে।
- ফ্যাট (স্নেহ পদার্থ) পরিপাক:
- লাইপেজ (অগ্ন্যাশয়িক): অগ্ন্যাশয়িক রসে উপস্থিত এটি ফ্যাট (ইমালসিফায়েড ফ্যাট)-কে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে ভেঙে দেয়।
১২. উদ্ভিদের বাষ্পমোচনকে কেন প্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া (Necessary Evil) বলা হয়? এর দুটি সুবিধা ও দুটি অসুবিধা আলোচনা করো। (ব্যাখ্যা ২ + সুবিধা ২ + অসুবিধা ১)
✅ বাষ্পমোচন: প্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া:
🌿 ব্যাখ্যা: প্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া (Necessary Evil)
বিজ্ঞানী কার্টিস বাষ্পমোচনকে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া’ বলে অভিহিত করেন। এর কারণ:
- এটি ক্ষতিকারক কারণ এর মাধ্যমে উদ্ভিদ বিপুল পরিমাণে জল হারায়, যা জলের অভাবে উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটাতে পারে।
- এটি প্রয়োজনীয় কারণ এটি ছাড়া উদ্ভিদের জলের শোষণ, পরিবহণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সুতরাং, এর ক্ষতিকর দিক থাকা সত্ত্বেও উদ্ভিদ এর ওপর নির্ভরশীল।
👍 সুবিধা (প্রয়োজনীয় দিক)
- খনিজ লবণ শোষণ: বাষ্পমোচনের ফলে সৃষ্ট টানের জোরেই জল ও তার সাথে দ্রবীভূত খনিজ লবণ মাটি থেকে মূলের মাধ্যমে উদ্ভিদের পাতায় পৌঁছায়।
- উষ্ণতা হ্রাস: পাতা থেকে জলের বাষ্পীভবনের সময় উদ্ভিদ লীনতাপ ত্যাগ করে, ফলে পাতা ও সামগ্রিক উদ্ভিদের তাপমাত্রা কমে গিয়ে উদ্ভিদ অতিরিক্ত উত্তাপ থেকে রক্ষা পায়।
👎 অসুবিধা (ক্ষতিকারক দিক)
অতিরিক্ত বাষ্পমোচনের কারণে খরা পরিস্থিতিতে বা তীব্র গরমে উদ্ভিদ **দ্রুত জল হারায়**, যার ফলে উদ্ভিদে জলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং পাতা শুকিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত উদ্ভিদটি মারা যেতে পারে।
১৩. মানব হৃৎপিণ্ডের গঠনগত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। হৃৎপিণ্ডের কপাটিকাগুলির দুটি কাজ কী? (গঠনগত বৈশিষ্ট্য ৩ + কপাটিকার কাজ ২) [attachment_0](attachment)
✅ হৃৎপিণ্ডের গঠনগত বৈশিষ্ট্য ও কপাটিকার কাজ:
❤️ মানব হৃৎপিণ্ডের গঠনগত বৈশিষ্ট্য
- অবস্থান ও আকার: এটি বক্ষগহ্বরের মাঝখানে দুটি ফুসফুসের মধ্যবর্তী স্থানে সামান্য বাম দিকে হেলে অবস্থিত। এটি দেখতে অনেকটা ত্রিকোণাকার এবং এটি হৃৎপেশি দ্বারা গঠিত।
- প্রকোষ্ঠ: মানব হৃৎপিণ্ড চারটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত—উপরে দুটি অলিন্দ (ডান ও বাম) এবং নিচে দুটি নিলয় (ডান ও বাম)। সম্পূর্ণভাবে বিভক্ত হওয়ায় বিশুদ্ধ ও অবিশুদ্ধ রক্ত মিশতে পারে না।
- আবরণী: হৃৎপিণ্ড দ্বিস্তরবিশিষ্ট পেরিকার্ডিয়াম নামক পর্দা দিয়ে আবৃত থাকে। এই পর্দার মাঝখানে পেরিকার্ডিয়াল তরল থাকে, যা বাহ্যিক আঘাত থেকে হৃৎপিণ্ডকে রক্ষা করে।
🛡️ কপাটিকাগুলির কাজ
হৃৎপিণ্ডের কপাটিকাগুলি রক্তকে সঠিক দিকে প্রবাহিত করতে এবং পিছনের দিকে প্রবাহ রোধ করতে অপরিহার্য:
- একমুখী প্রবাহ নিশ্চিত করা: কপাটিকাগুলি (যেমন – ট্রাইকাসপিড ও বাইকাসপিড কপাটিকা) কেবল একটি দিকেই রক্তকে প্রবাহিত হতে দেয় (অলিন্দ থেকে নিলয় বা নিলয় থেকে ধমনিতে), ফলে রক্তচাপ বজায় থাকে।
- পশ্চাৎপ্রবাহ রোধ: নিলয় যখন সংকুচিত হয়, তখন এই কপাটিকাগুলি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে রক্ত অলিন্দে বা সঠিক রক্তবাহ ছাড়া অন্য কোথাও ফিরে যেতে পারে না।
১৪. একটি আদর্শ নেফ্রনের চিহ্নিত চিত্র এঁকে প্রধান চারটি অংশ চিহ্নিত করো। রেচন অঙ্গ হিসেবে যকৃতের দুটি ভূমিকা লেখো। (চিত্রের প্রয়োজন নেই, শুধু চিহ্নিত অংশের নাম দিন + যকৃতের ভূমিকা ২)
✅ নেফ্রনের চিহ্নিত অংশ এবং রেচনে যকৃতের ভূমিকা:
🔬 নেফ্রনের প্রধান চারটি অংশ
নেফ্রনের প্রধান চারটি অংশ হলো:
- গ্লোমেরুলাস
- বাওম্যান্স ক্যাপসুল
- হেনলির লুপ
- সংগ্রাহী নালিকা
🔄 রেচন অঙ্গ হিসেবে যকৃতের ভূমিকা
যকৃৎ সরাসরি মূত্র উৎপাদন না করলেও রেচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
- ইউরিয়া সংশ্লেষ (অরনিথিন চক্র): কোষে প্রোটিন বিপাকের ফলে উৎপন্ন বিষাক্ত অ্যামোনিয়াকে যকৃৎ কম বিষাক্ত **ইউরিয়াতে** রূপান্তরিত করে। এই ইউরিয়াই পরে বৃক্ক দ্বারা মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে বের হয়।
- পিত্তরসের মাধ্যমে রেচন: পিত্তরসের মাধ্যমে যকৃৎ রক্তের ক্ষতিকারক অতিরিক্ত বিলিরুবিন (হিমোগ্লোবিন ভাঙার ফলে উৎপন্ন) এবং অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের মতো রেচন পদার্থগুলিকে অন্ত্রে প্রেরণ করে, যা পরে মলের সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
১৫. মানবদেহে গ্যাস্ট্রিক রসের কাজ সংক্ষেপে লেখো। সম্পূর্ণ পুষ্টি বা হলোজ়োয়িক পুষ্টির পর্যায়গুলি পর্যায়ক্রমে আলোচনা করো। (গ্যাস্ট্রিক রসের কাজ ২ + পুষ্টির পর্যায় ৩)
✅ গ্যাস্ট্রিক রসের কাজ ও পুষ্টির পর্যায়:
🧪 গ্যাস্ট্রিক রসের (পাকস্থলীর রস) প্রধান কাজ
পাকস্থলীর প্রাচীর থেকে নিঃসৃত গ্যাস্ট্রিক রসে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) এবং উৎসেচক থাকে। এর কাজগুলি হলো:
- প্রোটিন পরিপাক: গ্যাস্ট্রিক রসের উৎসেচক **পেপসিন** প্রোটিনের ওপর কাজ করে সেগুলিকে প্রোটিওজেস ও পেপটোনসে ভেঙে দেয়। (শিশুদের ক্ষেত্রে **রেনিন** দুধের প্রোটিন কেসিন জমাট বাঁধায়।)
- মাধ্যম সৃষ্টি: **হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl)** একটি তীব্র আম্লিক মাধ্যম তৈরি করে যা পেপসিনের কাজ করার জন্য অপরিহার্য। এটি খাদ্যের সঙ্গে আসা বেশিরভাগ ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করে।
🍽️ হলোজ়োয়িক পুষ্টির পর্যায় (Holozic Nutrition)
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে প্রাণী কঠিন খাদ্য গ্রহণ করে, পরিপাক করে এবং আত্মীকরণ করে, তাকে হলোজ়োয়িক পুষ্টি বলে। এটি প্রধানত ৫টি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- ১. খাদ্য গ্রহণ (Ingestion): প্রাণী তার মুখছিদ্র দিয়ে বা অন্যান্য অঙ্গের সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ করে। (যেমন—মানুষ মুখ দিয়ে খাদ্য গ্রহণ করে)
- ২. পরিপাক (Digestion): গৃহিত জটিল ও অদ্রাব্য খাদ্য উৎসেচকের সাহায্যে ভেঙে সরল, দ্রবণীয় ও শোষণযোগ্য অবস্থায় পরিণত হয়। (প্রধানত পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে ঘটে)
- ৩. শোষণ (Absorption): পরিপাক হওয়ার পর সরল খাদ্য উপাদানগুলি (যেমন—গ্লুকোজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড) ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই দ্বারা শোষিত হয়ে রক্ত ও লসিকায় প্রবেশ করে।
- ৪. আত্মীকরণ (Assimilation): শোষিত খাদ্য উপাদানগুলি রক্ত দ্বারা কোষে পৌঁছায় এবং কোষের প্রোটোপ্লাজমে মিশে গিয়ে শক্তি উৎপাদনে বা নতুন দেহ উপাদান গঠনে ব্যবহৃত হয়।
- ৫. বহিষ্করণ (Egestion): পরিপাক না হওয়া বা অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য পদার্থগুলি মল হিসেবে দেহ থেকে নিষ্কাশিত হয়।
১৬. হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহের পথটি পর্যায়ক্রমে একটি ফ্লোচার্টের মাধ্যমে দেখাও। ডান অলিন্দ এবং বাম নিলয়ের মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য লেখো। (ফ্লোচার্ট ৩ + পার্থক্য ২)
✅ হৃৎপিণ্ডের রক্ত প্রবাহের পথ ও পার্থক্য:
➡️ হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহের পথ (ফ্লোচার্ট) [attachment_0](attachment)
মানব হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহের পর্যায়ক্রমিক পথটি নিম্নরূপ:
দেহ (অবিশুদ্ধ রক্ত) $\to$ মহাশিরা $\to$ ডান অলিন্দ $\to$ ডান নিলয় $\to$ ফুসফুসীয় ধমনি $\to$ ফুসফুস (বিশুদ্ধিকরণ) $\to$ ফুসফুসীয় শিরা $\to$ বাম অলিন্দ $\to$ বাম নিলয় $\to$ মহাধমনি $\to$ দেহ (বিশুদ্ধ রক্ত)
**বিশেষ দ্রষ্টব্য:** এই ফ্লোচার্ট দ্বিসংবহন প্রক্রিয়াকে সংক্ষেপে তুলে ধরে।
🆚 ডান অলিন্দ ও বাম নিলয়ের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | ডান অলিন্দ (Right Atrium) | বাম নিলয় (Left Ventricle) |
|---|---|---|
| রক্তের ধরন | কার্বন ডাই-অক্সাইড যুক্ত **অবিশুদ্ধ রক্ত** গ্রহণ করে। | অক্সিজেন যুক্ত **বিশুদ্ধ রক্ত** ধারণ করে। |
| পেশীর পুরুত্ব | পেশীর প্রাচীর **পাতলা** হয় (রক্ত নিলয়ে ঠেলে দিতে কম চাপ লাগে)। | পেশীর প্রাচীর **সবচেয়ে পুরু** হয় (সারা দেহে রক্ত পাম্প করার জন্য)। |
১৭. মানবদেহে মূত্র উৎপাদনের তিনটি ধাপ বা পর্যায় সংক্ষেপে বর্ণনা করো। বৃক্কের স্বাভাবিক কাজে যদি কোনো ত্রুটি দেখা দেয়, তাহলে কী হবে? (মূত্র উৎপাদন ৩ + ত্রুটির ফল ২)
✅ মূত্র উৎপাদন ও বৃক্কের ত্রুটির ফল:
💧 মূত্র উৎপাদনের তিনটি ধাপ (নেফ্রনে)
- ১. অতি-পরিস্রাবণ (Ultra-filtration): গ্লোমেরুলাসের রক্ত উচ্চচাপে পরিস্রুত হয়ে বাওম্যান্স ক্যাপসুলে প্রবেশ করে। এই তরলে রক্তকণিকা ও প্রোটিন বাদে বাকি সব থাকে (গ্লুকোজ, জল, লবণ, ইউরিয়া ইত্যাদি)।
- ২. নির্বাচনমূলক পুনঃশোষণ (Selective Reabsorption): বৃক্কীয় নালিকা পথে জল ও প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি (গ্লুকোজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড, কিছু লবণ) দেহের প্রয়োজন অনুসারে পুনরায় রক্তে শোষিত হয়।
- ৩. ক্ষরণ (Tubular Secretion): রক্তে থাকা অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য পদার্থ (যেমন পটাসিয়াম) এবং কিছু ওষুধ নালিকার কোষ থেকে সরাসরি পরিস্রুত তরলে ক্ষরিত হয়ে যায়। এই তিনটি ধাপের পরই চূড়ান্ত মূত্র তৈরি হয়।
⚠️ বৃক্কের স্বাভাবিক কাজে ত্রুটির ফল
যদি কোনো কারণে বৃক্কের স্বাভাবিক কাজে ত্রুটি দেখা দেয় (যেমন—বৃক্কের কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা বৃক্কের ব্যর্থতা), তবে এর মারাত্মক ফল হয়:
- ইউরেমিয়া: রক্ত থেকে ইউরিয়া ও অন্যান্য নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থগুলি দেহ থেকে নিষ্কাশিত হতে পারে না, ফলে রক্তে বর্জ্যের পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে **ইউরেমিয়া** বলে।
- হোমিওস্ট্যাসিস ব্যাহত: বৃক্ক দেহের জল, লবণ ও রক্তরসের pH (অম্ল-ক্ষার)-এর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না, ফলে দেহের অভ্যন্তরীন পরিবেশের সাম্যতা (হোমিওস্ট্যাসিস) ব্যাহত হয় এবং রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
১৮. সালোকসংশ্লেষকে কেন অঙ্গার আত্তীকরণ বলা হয়? সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোক ও ক্লোরোফিলের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো। (অঙ্গার আত্তীকরণ ১ + সূর্যালোকের ভূমিকা ২ + ক্লোরোফিলের ভূমিকা ২)
✅ সালোকসংশ্লেষ ও তার কাঁচামালের ভূমিকা:
🌿 অঙ্গার আত্তীকরণ
সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে **কার্বন ডাই-অক্সাইড $(\text{CO}_2)$** গ্যাস গ্রহণ করে এবং তাকে কোষের মধ্যেকার জৈব যৌগ (গ্লুকোজ) হিসাবে স্থিতিশীল করে তোলে বা আত্তীকরণ করে। কার্বনের আত্তীকরণ ঘটে বলে এই প্রক্রিয়াকে **অঙ্গার আত্তীকরণ (Carbon Assimilation)** বলা হয়।
☀️ সূর্যালোকের ভূমিকা
সূর্যালোক হলো সালোকসংশ্লেষের শক্তির উৎস:
- শক্তি সরবরাহ: আলোকরশ্মি শক্তি সরবরাহ করে, যা ক্লোরোফিল গ্রহণ করে এবং আলোক দশার বিক্রিয়াগুলিকে শুরু করে।
- জলের বিশ্লেষণ (ফটোলিসিস): আলোর উপস্থিতিতে জল ভেঙে গিয়ে হাইড্রোজেন আয়ন ও অক্সিজেন সৃষ্টি হয়, যাকে জলের **ফটোলিসিস** বলে।
🟢 ক্লোরোফিলের ভূমিকা
ক্লোরোফিল হলো সালোকসংশ্লেষের প্রধান রঞ্জক:
- সৌরশক্তি শোষণ: ক্লোরোফিল মূলত লাল ও নীল-বেগুনী তরঙ্গদৈর্ঘ্যের **সৌরশক্তিকে শোষণ** করে এবং সেই শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে (ATP ও NADPH₂) রূপান্তরিত করে।
- আলোক কেন্দ্র: ক্লোরোফিল আলোক দশার বিক্রিয়াগুলির মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যা ছাড়া কোনোভাবেই শক্তি উৎপাদন সম্ভব নয়।
১৯. ধমনি, শিরা ও কৈশিক জালকের মধ্যে তিনটি গঠনগত ও কার্যগত পার্থক্য লেখো। এদের মধ্যে কোনটি সংবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? (পার্থক্য ৪ + গুরুত্ব ১) [attachment_1](attachment)
✅ রক্তবাহের পার্থক্য ও গুরুত্ব:
🔗 ধমনি, শিরা ও কৈশিক জালকের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | ধমনি (Artery) | শিরা (Vein) | কৈশিক জালক (Capillary) |
|---|---|---|---|
| প্রাচীর | প্রাচীর পুরু ও স্থিতিস্থাপক। | প্রাচীর ধমনির চেয়ে পাতলা। | প্রাচীর **এক স্তর** বিশিষ্ট। |
| কপাটিকা | সাধারণত অনুপস্থিত। | সাধারণত উপস্থিত। | অনুপস্থিত। |
| রক্ত প্রবাহ | হৃৎপিণ্ড থেকে অঙ্গের দিকে। | অঙ্গ থেকে হৃৎপিণ্ডের দিকে। | ধমনি ও শিরার মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে। |
⭐ কৈশিক জালকের গুরুত্ব
**কৈশিক জালক** সংবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধুমাত্র কৈশিক জালকের পাতলা একস্তর বিশিষ্ট প্রাচীরের মধ্য দিয়েই রক্ত ও কলাকোষের মধ্যে **গ্যাসীয় পদার্থ $(\text{O}_2, \text{CO}_2)$, খাদ্য উপাদান ও বর্জ্য পদার্থ** আদান-প্রদান হতে পারে। অন্যান্য রক্তবাহগুলি কেবল পরিবহনের কাজ করে।
২০. মানব পৌষ্টিকনালীর বিভিন্ন অংশে শ্বেতসার বা কার্বোহাইড্রেট পরিপাক কীভাবে ঘটে তা আলোচনা করো। পরিপাকের তিনটি গুরুত্ব লেখো। (পরিপাক ৪ + গুরুত্ব ১)
✅ শ্বেতসার পরিপাক ও গুরুত্ব:
🍞 মানব পৌষ্টিকনালীতে শ্বেতসার পরিপাক
শ্বেতসার পরিপাক মূলত **মুখগহ্বর** এবং **ক্ষুদ্রান্ত্রে** সম্পন্ন হয়। পাকস্থলীতে কোনো শ্বেতসার পরিপাক হয় না।
- মুখগহ্বর (Mouth Cavity):
- খাদ্য চিবানোর সময় লালারসের সঙ্গে মিশে যায়। লালারসে **টায়ালিন (বা লালা অ্যামাইলেজ)** উৎসেচক থাকে।
- এই উৎসেচক সেদ্ধ শ্বেতসারকে $(\text{C}_{6}\text{H}_{10}\text{O}_{5})_{n}$ আংশিকভাবে **মলটোজে** $(\text{C}_{12}\text{H}_{22}\text{O}_{11})$ পরিণত করে।
- পাকস্থলী (Stomach):
- পাকস্থলীর রস আম্লিক হওয়ায় (HCl-এর উপস্থিতিতে), টায়ালিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই এখানে শ্বেতসারের কোনো পরিপাক ঘটে না।
- ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine):
- অগ্ন্যাশয় থেকে আসা অগ্ন্যাশয়িক রসে থাকা **অ্যামাইলেজ** উৎসেচক বাকি শ্বেতসার এবং মুখগহ্বরে তৈরি মলটোজের ওপর কাজ করে।
- অন্ত্রের রসের উৎসেচক **মলটেজ** মলটোজকে ভেঙে **গ্লুকোজে** $(\text{C}_{6}\text{H}_{12}\text{O}_{6})$ পরিণত করে। এটিই শ্বেতসার পরিপাকের চূড়ান্ত পরিণতি।
⚖️ পরিপাকের তিনটি গুরুত্ব
পরিপাক হলো জীবনধারণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া:
- জটিল খাদ্য সরলীকরণ: পরিপাক প্রক্রিয়ায় জটিল, অদ্রাব্য ও শোষণ-অযোগ্য খাদ্যবস্তু সরল, দ্রাব্য ও শোষণ-যোগ্য উপাদানে পরিণত হয়।
- শক্তি মুক্তি: পরিপাকের পর আত্মীকরণ এবং জারণের মাধ্যমে খাদ্য থেকে **শক্তি** মুক্তি পায়, যা জীবের সমস্ত জৈবনিক কাজের উৎস।
- কোষ গঠন ও ক্ষয়পূরণ: পরিপাকজাত সরল খাদ্য উপাদানগুলি নতুন কোষ গঠন ও পুরোনো কোষের ক্ষয়পূরণে ব্যবহৃত হয়।
২১. রক্ত সঞ্চালনে শিরা ও ধমনির মধ্যে অন্তত চারটি পার্থক্য লেখো। দ্বিপত্রক কপাটিকা (Bicuspid Valve)-এর অবস্থান ও কাজ বর্ণনা করো। (পার্থক্য ৪ + কপাটিকার কাজ ১)
✅ শিরা-ধমনির পার্থক্য ও কপাটিকার কাজ:
🆚 শিরা ও ধমনির মধ্যে পার্থক্য
| পার্থক্যের বিষয় | ধমনি (Artery) | শিরা (Vein) |
|---|---|---|
| রক্ত প্রবাহের দিক | হৃৎপিণ্ড থেকে দেহের দিকে রক্ত নিয়ে যায়। | দেহ থেকে হৃৎপিণ্ডের দিকে রক্ত ফিরিয়ে আনে। |
| রক্তচাপ | রক্ত উচ্চচাপে প্রবাহিত হয়। | রক্ত নিম্নচাপে প্রবাহিত হয়। |
| প্রাচীরের পুরুত্ব | প্রাচীর পুরু ও স্থিতিস্থাপক। | প্রাচীর পাতলা ও কম স্থিতিস্থাপক। |
| অবস্থান | সাধারণত দেহের গভীরে অবস্থিত। | সাধারণত ত্বকের কাছাকাছি অবস্থিত। |
❤️ দ্বিপত্রক কপাটিকা (Bicuspid Valve)
- অবস্থান: এটি মানব হৃৎপিণ্ডের **বাম অলিন্দ** এবং **বাম নিলয়ের** সংযোগস্থলে অবস্থিত। একে মাইট্রাল কপাটিকাও বলা হয়।
- কাজ: বাম অলিন্দ সংকুচিত হলে এটি খুলে যায় এবং বিশুদ্ধ রক্তকে বাম নিলয়ে আসতে সাহায্য করে। যখন বাম নিলয় সংকুচিত হয়, তখন এটি দ্রুত বন্ধ হয়ে রক্তকে বাম নিলয় থেকে বাম অলিন্দে **পিছন দিকে ফিরে যাওয়া (পশ্চাৎপ্রবাহ)** থেকে রক্ষা করে।
২২. পরজীবী পুষ্টি এবং মৃতজীবী পুষ্টির মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো। সবাত শোষণ ও সালোকসংশ্লেষের মধ্যে সম্পর্ক কী? (পার্থক্য ৩ + সম্পর্ক ২)
✅ পুষ্টির পার্থক্য ও সবাত শোষণ-সালোকসংশ্লেষের সম্পর্ক:
🆚 পরজীবী পুষ্টি ও মৃতজীবী পুষ্টির পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | পরজীবী পুষ্টি (Parasitic Nutrition) | মৃতজীবী পুষ্টি (Saprotrophic Nutrition) |
|---|---|---|
| খাদ্যের উৎস | জীবন্ত **পোষকদেহ** থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। | মৃত ও গলিত জৈব পদার্থ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। |
| পোষকদেহের ক্ষতি | খাদ্য সংগ্রহের সময় **পোষকের ক্ষতি** হয় বা রোগ সৃষ্টি হয়। | পোষক মৃত হওয়ায় কোনো ক্ষতি হয় না। |
| উদাহরণ | উকুন, গোলকৃমি, স্বর্ণলতা (আংশিক পরজীবী)। | ছত্রাক (যেমন পেনিসিলিয়াম), কিছু ব্যাকটেরিয়া। |
🔄 সবাত শোষণ ও সালোকসংশ্লেষের সম্পর্ক
এই দুটি প্রক্রিয়া একে অপরের **পরিপূরক**:
- পরিপূরক গ্যাসীয় উপাদান: সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় $\text{CO}_2$ গৃহীত হয় ও $\text{O}_2$ নির্গত হয়, যা সবাত শ্বসনের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, সবাত শ্বসনে $\text{O}_2$ গৃহীত হয় ও $\text{CO}_2$ নির্গত হয়, যা সালোকসংশ্লেষের কাঁচামাল। [attachment_0](attachment)
- পরিপূরক উৎপন্ন বস্তু: সালোকসংশ্লেষে উৎপন্ন খাদ্য (গ্লুকোজ) সবাত শ্বসনে ব্যবহৃত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে। অর্থাৎ, সালোকসংশ্লেষ **শক্তির সঞ্চয়** করে এবং শ্বসন সেই **সঞ্চয়কে মুক্ত** করে।
২৩. উদ্ভিদের রেচনে গ্ৰুটেশন এবং পত্রমোচন বা ছাল মোচনের ভূমিকা আলোচনা করো। উদ্ভিদের দুটি নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থের নাম ও উৎস লেখো। (ভূমিকা ৩ + নাম ২)
✅ উদ্ভিদের রেচন পদ্ধতি ও রেচন পদার্থ:
🌿 উদ্ভিদের রেচনে অঙ্গের ভূমিকা
- গ্ৰুটেশন (Guttation): রাত্রিকালে বাষ্পমোচন যখন প্রায় বন্ধ থাকে কিন্তু জল শোষণ চলতে থাকে, তখন মূলজ চাপের ফলে জাইলেম বাহিকার মাধ্যমে জল পাতার কিনারায় অবস্থিত **হাইড্রোথোড** নামক ছিদ্র দিয়ে ফোঁটা আকারে নির্গত হয়। একেই গ্ৰুটেশন বলে। এর মাধ্যমে উদ্ভিদের অতিরিক্ত জলীয় পদার্থ নিষ্কাশিত হয়।
- পত্রমোচন (Leaf Fall): কিছু উদ্ভিদ (যেমন শিমুল, তেঁতুল) নির্দিষ্ট ঋতুতে তাদের পাতা ঝরিয়ে দেয়। রেচন পদার্থগুলি (যেমন ট্যানিন, ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কেলাস) পাতার মধ্যে জমা থাকে। পাতা ঝরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে উদ্ভিদ সেই সঞ্চিত ক্ষতিকারক রেচন পদার্থগুলি দেহ থেকে দূর করে।
- ছাল মোচন (Bark Peeling): কিছু উদ্ভিদ (যেমন পেয়ারা) তাদের কাণ্ডের পুরোনো ছাল ঝরিয়ে দেয়। এই ছালের স্তরেও কিছু পরিমাণে রেচন পদার্থ সঞ্চিত থাকে, যা এই প্রক্রিয়ায় দেহ থেকে অপসারিত হয়।
🧪 দুটি নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থের নাম ও উৎস
- রজন (Resin): পাইন গাছের কান্ডের রজন নালীতে পাওয়া যায়।
- গঁদ (Gum): বাবলা বা শিরীষ গাছের কান্ডে পাওয়া যায়।
২৪. সংক্ষেপে ফ্যাটের পরিপাক আলোচনা করো। মানবদেহে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ও শ্বেত রক্তকণিকার (WBC) একটি করে গঠনগত ও কার্যগত পার্থক্য লেখো। (ফ্যাট পরিপাক ৩ + পার্থক্য ২)
✅ ফ্যাট পরিপাক ও রক্তকণিকার পার্থক্য:
🧈 ফ্যাটের পরিপাক (Fat Digestion)
ফ্যাটের পরিপাক প্রধানত ক্ষুদ্রান্ত্রে সম্পন্ন হয়।
- ইমালসিফিকেশন: পাকস্থলী থেকে খাদ্য ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছালে, যকৃৎ থেকে আসা পিত্তরস ফ্যাটের বৃহৎ কণাগুলিকে **ইমালসিফিকেশন** প্রক্রিয়ায় ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত করে। এর ফলে ফ্যাট পরিপাকের জন্য পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
- লাইপেজের কাজ: অগ্ন্যাশয় থেকে আসা অগ্ন্যাশয়িক রস এবং অন্ত্রের রসে থাকা **লাইপেজ** উৎসেচকগুলি এই ইমালসিফায়েড ফ্যাটের ওপর কাজ করে।
- চূড়ান্ত পরিণতি: লাইপেজ ফ্যাটকে ভেঙে **ফ্যাটি অ্যাসিড (Fatty Acid)** এবং **গ্লিসারলে** পরিণত করে। ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল শোষণের জন্য উপযুক্ত সরলতম উপাদান।
🆚 RBC ও WBC এর পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | লোহিত রক্তকণিকা (RBC) | শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) |
|---|---|---|
| গঠনগত (নিউক্লিয়াস) | পরিণত কোষে **নিউক্লিয়াস থাকে না**। | কোষে **নিউক্লিয়াস থাকে** (বিভিন্ন আকারের)। |
| কার্যগত (প্রধান কাজ) | শরীরের সর্বত্র $\text{O}_2$ ও $\text{CO}_2$ **পরিবহন** করা। | দেহকে রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে **প্রতিরক্ষা** করা। |