নবম শ্রেণি: জীবন বিজ্ঞান, অধ্যায় ৫: পরিবেশ ও তার সম্পদ, পর্ব – বাস্তু বিদ্যার ও বাস্তু বিদ্যার সংগঠন, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নত্তোর মান‌ ৫

বাস্তুবিদ্যা ও সংগঠন: রচনাধর্মী প্রশ্ন (LAQ)

1. পপুলেশন বৃদ্ধির ধরণগুলি (Population Growth Models) চিত্রসহ বর্ণনা করো। (৫)

উত্তর দেখো

পপুলেশন বৃদ্ধির প্রধানত দুটি ধরণ বা মডেল দেখা যায়:

১. এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি (Exponential Growth) বা ‘J’ আকৃতির কার্ভ:

  • শর্ত: যখন সম্পদ (খাদ্য ও বাসস্থান) অফুরন্ত থাকে এবং কোনো পরিবেশগত বাধা (Environmental Resistance) থাকে না।
  • বৈশিষ্ট্য: পপুলেশন শুরুতে ধীর গতিতে বাড়লেও পরে জ্যামিতিক হারে (১, ২, ৪, ৮, ১৬…) বৃদ্ধি পায় এবং হঠাৎ করে সংখ্যায় বিস্ফোরণ ঘটে।
  • লেখচিত্র: এর লেখচিত্রটি ইংরেজি ‘J’ অক্ষরের মতো হয়।
  • সমীকরণ: $dN/dt = rN$ (যেখানে $N$=পপুলেশন আকার, $r$=স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার)।
  • উদাহরণ: বর্ষাকালে পতঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি বা ল্যাবে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি।

[Image of Exponential Growth Curve J shaped]

২. লজিস্টিক বৃদ্ধি (Logistic Growth) বা ‘S’ আকৃতির কার্ভ:

  • শর্ত: প্রকৃতিতে সম্পদ সীমিত। তাই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বৃদ্ধির পর পরিবেশগত বাধার কারণে পপুলেশন আর বাড়ে না।
  • বৈশিষ্ট্য: শুরুতে বৃদ্ধি ধীর (Lag phase), তারপর দ্রুত (Log phase), এবং শেষে স্থির দশায় পৌঁছায় যা পরিবেশের বহন ক্ষমতা বা Carrying Capacity (K) দ্বারা নির্ধারিত হয়।
  • লেখচিত্র: এর লেখচিত্রটি সিগময়েড বা ইংরেজি ‘S’ অক্ষরের মতো হয়। এটি প্রকৃতির বাস্তবসম্মত বৃদ্ধি।
  • সমীকরণ: $dN/dt = rN(\frac{K-N}{K})$।

[Image of Logistic Growth Curve S shaped]


2. পপুলেশন ইন্টার‍্যাকশন বা আন্তঃক্রিয়া কাকে বলে? উদাহরণসহ মিউচুয়ালিজম, কমেনসালিজম ও প্যারাসাইটিজম ব্যাখ্যা করো। (১+৪)

উত্তর দেখো

পপুলেশন আন্তঃক্রিয়া: কোনো বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী দুটি ভিন্ন প্রজাতির জীব যখন খাদ্য, বাসস্থান বা অন্য প্রয়োজনে একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাকে পপুলেশন আন্তঃক্রিয়া বলে।

ধরন প্রকৃতি উদাহরণ
১. মিউচুয়ালিজম (Mutualism) উভয় প্রজাতিই উপকৃত হয় (+/+)। একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। লাইকেন: শৈবাল খাদ্য তৈরি করে ছত্রাককে দেয় এবং ছত্রাক শৈবালকে আশ্রয় ও জল দেয়।
২. কমেনসালিজম (Commensalism) একটি প্রজাতি উপকৃত হয় (+), অন্যটি প্রভাবিত হয় না (০)। অর্কিড ও আমগাছ: অর্কিড আমগাছে আশ্রয় পায় কিন্তু আমগাছের কোনো ক্ষতি বা লাভ করে না।
৩. প্যারাসাইটিজম (Parasitism) পরজীবী উপকৃত হয় (+) এবং পোষক ক্ষতিগ্রস্ত হয় (-)। স্বর্ণলতা ও কুলগাছ: স্বর্ণলতা কুলগাছ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে গাছটিকে দুর্বল করে দেয়।

3. উদ্ভিদের জলজ (Hydrophytic) এবং মরুজ (Xerophytic) অভিযোজনগুলি তুলনামূলক আলোচনা করো। (৫)

উত্তর দেখো
বৈশিষ্ট্য জলজ উদ্ভিদ (যেমন—পদ্ম) মরুজ উদ্ভিদ (যেমন—ফনীমনসা)
১. মূলতন্ত্র মূল সুগঠিত নয়, মূলরোম ও মূলত্র অনেক সময় থাকে না। মূলতন্ত্র খুব সুগঠিত এবং জল সংগ্রহের জন্য মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে।
২. কাণ্ড কাণ্ড নরম, দুর্বল এবং বায়ুপূর্ণ (এরেনকাইমা যুক্ত) হয়। কাণ্ড শক্ত, পুরু, রসালো এবং চ্যাপ্টা (পর্ণকাণ্ড) হয় জল সঞ্চয়ের জন্য।
৩. পাতা পাতা বড় ও মোমাবৃত থাকে (পচনের হাত থেকে বাঁচতে) অথবা খুব সরু হয়। বাষ্পমোচন রোধে পাতা কাঁটায় রূপান্তরিত হয় বা খুব ছোট হয়।
৪. কিউটিকল কিউটিকল খুব পাতলা বা অনুপস্থিত। দেহতকে খুব পুরু কিউটিকলের আস্তরণ থাকে।

4. বয়স পিরামিড (Age Pyramid) কী? মানব পপুলেশনের বিভিন্ন ধরণের বয়স পিরামিড চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো। (১+৪)

উত্তর দেখো

বয়স পিরামিড: কোনো পপুলেশনের বিভিন্ন বয়সের (প্রাক-প্রজননশীল, প্রজননশীল ও প্রজননোত্তর) জীবসংখ্যার আনুপাতিক হারকে জ্যামিতিক চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করলে যে পিরামিড আকৃতির গঠন পাওয়া যায়, তাকে বয়স পিরামিড বলে।

মানব পপুলেশনে মূলত তিন ধরণের পিরামিড দেখা যায়:

  • ১. বিস্তৃতিশীল (Expanding) বা ত্রিভুজাকার: এর ভূমি চওড়া। অর্থাৎ শিশু বা অল্পবয়স্কদের সংখ্যা খুব বেশি। এটি দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা নির্দেশ করে (যেমন—ভারত, বাংলাদেশ)।
  • ২. স্থিতিশীল (Stable) বা ঘণ্টার মতো (Bell-shaped): এখানে প্রাক-প্রজননশীল ও প্রজননশীল বয়সের মানুষের সংখ্যা প্রায় সমান। পপুলেশন বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্য বা স্থির (যেমন—আমেরিকা)।
  • ৩. ক্রমহ্রাসমান (Declining) বা কলসাকার (Urn-shaped): এর ভূমি সরু। অর্থাৎ অল্পবয়স্কদের সংখ্যা বয়স্কদের তুলনায় কম। এটি জনসংখ্যা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয় (যেমন—জাপান)।

5. লবণাম্বু উদ্ভিদ বা হ্যালোফাইটের (Halophytes) অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (৫)

উত্তর দেখো

সুন্দরবন বা উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার উদ্ভিদদের (সুন্দরী, গরান) বিশেষ কিছু অভিযোজন দেখা যায়:

  1. শ্বাসমূল (Pneumatophores): লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত মাটিতে অক্সিজেনের অভাব থাকে। তাই বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে কিছু মূল মাটির উপরে উঠে আসে। এদের গায়ে নিউমাথোড বা ছিদ্র থাকে।
  2. জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম (Vivipary): লবণের আধিক্যে মাটিতে বীজ নষ্ট হতে পারে, তাই গাছে ফল থাকা অবস্থাতেই বীজের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে (যেমন—রাইজোফোরা)।
  3. ঠেস মূল (Stilt root): জোয়ার-ভাটার টান ও নরম কাদামাটিতে গাছকে সোজা রাখতে কাণ্ড থেকে কিছু অস্থানিক মূল বেরিয়ে মাটিতে প্রবেশ করে।
  4. লবণ গ্রন্থি ও মোচন: অতিরিক্ত লবণ ত্যাগের জন্য পাতায় লবণ গ্রন্থি থাকে বা পাতা ঝরিয়ে লবণ ত্যাগ করে।
  5. মোমাবৃত পাতা: বাষ্পমোচন রোধ করতে পাতার উপর কিউটিকল বা মোমের আস্তরণ থাকে।

6. ‘r-নির্বাচিত’ (r-selected) ও ‘k-নির্বাচিত’ (k-selected) প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য লেখো। (৩)

উত্তর দেখো
বৈশিষ্ট্য r-নির্বাচিত প্রজাতি k-নির্বাচিত প্রজাতি
১. দেহের আকার দেহের আকার সাধারণত ছোট হয়। দেহের আকার সাধারণত বড় হয়।
২. আয়ুষ্কাল এদের আয়ুষ্কাল খুব কম (স্বল্পজীবী)। এদের আয়ুষ্কাল দীর্ঘ (দীর্ঘজীবী)।
৩. প্রজনন হার অত্যন্ত দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি করে এবং একসাথে প্রচুর অপত্য জন্ম দেয়। বংশবৃদ্ধির হার ধীর এবং একসাথে কম সংখ্যক অপত্য জন্ম দেয়।
৪. অপত্য যত্ন পিতামাতা অপত্যের কোনো যত্ন নেয় না। পিতামাতা দীর্ঘ সময় ধরে অপত্যের যত্ন নেয়।
উদাহরণ মশা, মাছি, ব্যাকটেরিয়া। মানুষ, হাতি, বাঘ।

7. তুঙ্গস্থ অসুস্থতা বা ‘অল্টিচিউড সিকনেস’ (Altitude Sickness) কী? এর কারণ ও লক্ষণগুলি লেখো। শরীর কীভাবে এর সাথে মানিয়ে নেয়? (১+২+২)

উত্তর দেখো

সংজ্ঞা: উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে (৩,৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায়) বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ঘনত্ব বা আংশিক চাপ কমে যাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে যে অসুস্থতা বা অস্বস্তি দেখা দেয়, তাকে অল্টিচিউড সিকনেস বলে।

লক্ষণ: বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট।

অভিযোজন বা মানিয়ে নেওয়া (Acclimatization):

  • শরীরে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়।
  • হিমোগ্লোবিনের সাথে অক্সিজেনের বন্ধন ক্ষমতা কমিয়ে দেয় যাতে কলায় দ্রুত অক্সিজেন পৌঁছায়।
  • শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে দেয়।

8. প্রাণীর ওপর তাপমাত্রা ও আলোর প্রভাব সংক্ষেপে আলোচনা করো। (২.৫ + ২.৫)

উত্তর দেখো

তাপমাত্রার প্রভাব:

  • বিপাক ক্রিয়া: উৎসেচক নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কাজ করে। তাপমাত্রা কমলে বা বাড়লে বিপাক ক্রিয়া ব্যাহত হয়।
  • জনন ও লিঙ্গ নির্ধারণ: কিছু সরীসৃপের (যেমন—কুমির) ডিম ফোটার সময় তাপমাত্রা লিঙ্গ নির্ধারণ করে।
  • অভিযোজন: তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে প্রাণীরা শীতঘুম (Hibernation) বা গ্রীষ্মঘুম (Aestivation) এ যায়।

আলোর প্রভাব:

  • দিনপঞ্জি বা ফটোপিরিয়ড: অনেক প্রাণীর জনন, পরিযান (Migration) এবং শীতঘুম দিনের দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে।
  • ত্বকের বর্ণ: তীব্র আলোতে প্রাণীদের ত্বক গাঢ় বর্ণের হয় (গ্লগারের সূত্র)।
  • দৃষ্টিশক্তি: নিশাচর প্রাণীদের চোখ কম আলোতে দেখার জন্য অভিযোজিত।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার