নবম শ্রেণি: জীবন বিজ্ঞান অধ্যায় ৫ পরিবেশ ও তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ
🎯 নবম শ্রেণির জীবন বিজ্ঞান: পরিবেশ, সম্পদ ও সংরক্ষণ (LAQ – প্রথম ভাগ)
গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫) – (১-৮ দাগ)
১. জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করো এবং ইন সিটু (In-situ) ও এক্স সিটু (Ex-situ) সংরক্ষণের মধ্যে ৩টি প্রধান পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা:
- জীববৈচিত্র্য হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদগুলির মধ্যে অন্যতম মূল্যবান ভান্ডার; এটি ছাড়া মানবজাতির অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব।
- সংরক্ষণের প্রধান কারণ হলো **বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য** রক্ষা করা; কারণ খাদ্যশৃঙ্খল বা শক্তিপ্রবাহের স্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতি অপরিহার্য।
- পরিবেশগত পরিষেবাগুলির মধ্যে **জলচক্র নিয়ন্ত্রণ, বায়ু পরিশোধন এবং মাটি ক্ষয় রোধ** জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল।
- অর্থনৈতিক দিক থেকে, বহু উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে মূল্যবান **ঔষধ (যেমন: সর্পগন্ধা, নয়নতারা), খাদ্য ও কাঁচামাল** পাওয়া যায়, যা সংরক্ষণ করা আবশ্যক।
- এছাড়াও, কোনো একটি প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষা পেলে ভবিষ্যতে পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বজায় থাকে।
ইন সিটু ও এক্স সিটু সংরক্ষণের ৩টি পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | ইন সিটু সংরক্ষণ | এক্স সিটু সংরক্ষণ |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | জীবকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে রেখে সংরক্ষণ করা। | জীবকে প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে এনে কৃত্রিম পরিবেশে সংরক্ষণ করা। |
| ক্ষেত্র | জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। | চিড়িয়াখানা, বীজ ব্যাংক, বোটানিক্যাল গার্ডেন। |
| খরচ | তুলনামূলকভাবে **কম ব্যয়বহুল**। | ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির কারণে **অনেক বেশি ব্যয়বহুল**। |
২. গ্রিনহাউস প্রভাব কাকে বলে? বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ ও দুটি ক্ষতিকর ফলাফল আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
গ্রিনহাউস প্রভাব:
- গ্রিনহাউস প্রভাব হলো বায়ুমণ্ডলের কিছু গ্যাস (যেমন: $\text{CO}_2$, $\text{CH}_4$) দ্বারা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ বা অবলোহিত রশ্মিকে শোষণ করে বায়ুমণ্ডলে আটকে রাখার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
- এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট উষ্ণতায় (প্রায় $15^{\circ}\text{C}$) বজায় রাখে, যা জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য।
- কিন্তু যখন মানুষের কার্যকলাপের ফলে এই গ্যাসগুলির ঘনত্ব বাড়ে, তখন বায়ুমণ্ডলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপ আটকে যায়, যার ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ ও ক্ষতিকর ফলাফল:
- কারণ: প্রধান কারণ হলো **জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহার** (কয়লা, পেট্রোলিয়াম) এবং **নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস** করা, যার ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ($\text{CO}_2$) পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- কারণ: এছাড়াও ধানক্ষেত, পশুপালন এবং শিল্প কারখানা থেকে নির্গত **মিথেন ($\text{CH}_4$)** এবং নাইট্রাস অক্সাইড ($\text{N}_2\text{O}$)-এর মতো গ্যাসগুলিও গ্রিনহাউস প্রভাবকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
- ফলাফল: ১. সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি: তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আন্টার্কটিকা এবং হিমালয়ের মতো অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যায়। এই অতিরিক্ত জল সমুদ্রের জলস্তরকে বাড়িয়ে তোলে, ফলে **উপকূলবর্তী এলাকা ও নিম্নভূমিগুলি প্লাবিত হওয়ার** ঝুঁকি বাড়ে।
- ফলাফল: ২. জলবায়ুর চরম পরিবর্তন: বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এর ফলে এক দিকে **অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘকালীন খরা** হচ্ছে, অন্যদিকে **অতিবর্ষণ ও বন্যার** ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষি ও জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
৩. পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘3R’ নীতির ভূমিকা ব্যাখ্যা করো। বায়ু দূষণের দুটি কারণ ও জীবদেহে দুটি ক্ষতিকর প্রভাব লেখো।
✅ উত্তর:
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘3R’ নীতির ভূমিকা:
- ‘3R’ নীতি হলো **Reduce (কম ব্যবহার), Reuse (পুনর্ব্যবহার), এবং Recycle (পুনর্নবীকরণ)**। এই নীতিগুলি পরিবেশ সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
- **Reduce:** এই নীতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের **অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে** অপচয় রোধ করা হয়। যেমন: প্লাস্টিকের কাপের পরিবর্তে কাপ ব্যবহার করা।
- **Reuse:** কোনো জিনিস ফেলে না দিয়ে একাধিকবার ব্যবহার করলে, নতুন জিনিস তৈরির জন্য কাঁচামাল ও শক্তির ব্যবহার কমে যায়। যেমন: পুরনো জামাকাপড় বা পাত্র অন্য কাজে ব্যবহার করা।
- **Recycle:** ব্যবহৃত বর্জ্য পদার্থগুলিকে সংগ্রহ করে, প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে **পুনরায় নতুন জিনিস তৈরি** করা যায়। এর ফলে বর্জ্য পদার্থ মাটিতে মেশা রোধ হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষিত হয়।
বায়ু দূষণের কারণ ও ক্ষতিকর প্রভাব:
- কারণ: বায়ুদূষণের দুটি প্রধান কারণ হলো **১. তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র** ও কলকারখানা থেকে নির্গত সালফার ডাইঅক্সাইড ($\text{SO}_2$) এবং **২. যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া** ($\text{CO}$, সীসাযুক্ত কণা)।
- ক্ষতিকর প্রভাব: **১. শ্বাসযন্ত্রের রোগ:** দূষিত বায়ু গ্রহণের ফলে মানবদেহে **ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি (অ্যাজমা)** এবং ফুসফুসের ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ দেখা যায়। **২. অ্যাসিড বৃষ্টি:** $\text{SO}_2$ এবং $\text{NO}_2$-এর কারণে অ্যাসিড বৃষ্টি হয়, যা সৌধ ও উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে।
৪. জল দূষণের প্রধান চারটি কারণ এবং তা নিয়ন্ত্রণের চারটি উপায় আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
জল দূষণের প্রধান চারটি কারণ:
- গৃহস্থালি ও পয়ঃপ্রণালী বর্জ্য: শহর ও লোকালয় থেকে নির্গত অপরিশোধিত নর্দমার জল, যাতে প্রচুর পরিমাণে **রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ও জৈব পদার্থ** থাকে, সরাসরি নদী বা জলাশয়ে মেশে।
- শিল্পজাত বর্জ্য: কলকারখানা থেকে নির্গত **পারদ, ক্যাডমিয়াম** ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বর্জ্য জল পরিশোধন না করেই জলাশয়ে ফেলা।
- কৃষিজাত সার ও কীটনাশক: জমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত **নাইট্রেট ও ফসফেট** সমৃদ্ধ সার এবং কীটনাশক (যেমন: $\text{DDT}$) বৃষ্টির জলের সাথে মিশে জলকে দূষিত করে এবং ইউট্রোফিকেশন ঘটায়।
- তেল ও আবর্জনা: সমুদ্রে জাহাজ থেকে তেল নিঃসরণ বা তীরে তেল ট্যাঙ্কার ভেঙে পড়া, এবং প্লাস্টিকের মতো জৈব অনিয়োজ্য আবর্জনা জলে ফেলা।
জল দূষণ নিয়ন্ত্রণের চারটি উপায়:
- **পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন:** প্রতিটি শহরে পর্যাপ্ত **পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার (STP)** স্থাপন করে গৃহস্থালি জলকে শোধন করার পরই জলাশয়ে ফেলা নিশ্চিত করা।
- **শিল্প আইন কঠোর করা:** শিল্প কারখানাগুলিকে বর্জ্য জলকে পরিশোধন করার পরই নির্গমনের অনুমতি দেওয়া এবং আইন ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।
- **জৈব কৃষির ব্যবহার:** কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে **জৈব সার ও জৈব নিয়ন্ত্রক** ব্যবহারকে উৎসাহিত করা।
- **জনসচেতনতা বৃদ্ধি:** মানুষকে পুকুর, নদী বা সমুদ্রে নোংরা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকার জন্য সচেতন করা এবং **প্লাস্টিক বর্জন**-এর গুরুত্ব বোঝানো।
৫. ওজোন স্তর ধ্বংসে $\text{CFC}$-এর ভূমিকা কী? ওজোন স্তর ক্ষয়ের তিনটি ক্ষতিকর প্রভাব সংক্ষেপে লেখো।
✅ উত্তর:
ওজোন স্তর ধ্বংসে $\text{CFC}$-এর ভূমিকা:
- ওজোন স্তর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিকে শোষণ করে পৃথিবীকে রক্ষা করে।
- রেফ্রিজারেটর এবং এয়ার কন্ডিশনার থেকে নির্গত $\text{CFC}$ (ক্লোরোফ্লুরোকার্বন) গ্যাস স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছায়।
- সেখানে সূর্যের $\text{UV}$ রশ্মির প্রভাবে $\text{CFC}$ ভেঙে যায় এবং অত্যন্ত সক্রিয় **ক্লোরিন পরমাণু ($\text{Cl}$)** নির্গত করে।
- এই ক্লোরিন পরমাণু $\text{O}_3$ (ওজোন) অণুকে ভেঙে $\text{O}_2$ (অক্সিজেন) তৈরি করে এবং নিজে অপরিবর্তিত থাকে।
- একটি ক্লোরিন পরমাণু শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার ওজোন অণু ধ্বংস করতে পারে, যার ফলে ওজোন স্তরের ঘনত্ব কমে যায়।
ওজোন স্তর ক্ষয়ের তিনটি ক্ষতিকর প্রভাব:
- ১. মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি: $\text{UV}$ রশ্মির অনুপ্রবেশ বাড়লে মানুষের **ত্বকের ক্যানসার, চোখে ছানি (Cataract)** হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং **রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা** হ্রাস পায়।
- ২. জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি: $\text{UV}$ রশ্মির প্রভাবে সমুদ্রের জলে বসবাসকারী **ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন** (যারা খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সমগ্র জলজ খাদ্যশৃঙ্খলকে দুর্বল করে তোলে।
- ৩. উদ্ভিদের ক্ষতি: অতিবেগুনি রশ্মি উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং **সালোকসংশ্লেষ** প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, যার ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়।
৬. শব্দ দূষণের তিনটি উৎস, মানবদেহে এর প্রভাব এবং তা নিয়ন্ত্রণের দুটি কৌশল আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
শব্দ দূষণের তিনটি প্রধান উৎস:
- যানবাহন: মোটরগাড়ি, ট্রেন ও বিমানের ইঞ্জিন এবং হর্নের তীব্র শব্দ। ট্র্যাফিকের শব্দ জনবহুল এলাকায় প্রধান শব্দ দূষণ সৃষ্টি করে।
- শিল্প ও কলকারখানা: বৃহৎ যন্ত্রপাতি, জেনারেটর এবং নির্মাণ কাজ থেকে সৃষ্ট তীব্র শব্দ।
- বিনোদনমূলক উৎস: লাউডস্পিকার, বাজি এবং মাইকের উচ্চ আওয়াজ যা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়।
শব্দ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল:
- মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব: অতিরিক্ত শব্দের কারণে **শ্রবণশক্তির স্থায়ী বা সাময়িক হ্রাস** ঘটতে পারে। এছাড়াও এটি মানসিক চাপের সৃষ্টি করে, যার ফলে **উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure)**, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি এবং অনিদ্রা দেখা যায়।
- নিয়ন্ত্রণের কৌশল: ১. সাইলেন্স জোন ঘোষণা: হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের আশেপাশে **সাইলেন্স জোন** ঘোষণা করে শব্দের মাত্রা (দিনের বেলায় ৪৫ $\text{dB}$) কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। **২. সবুজ বেষ্টনী বা বৃক্ষরোপণ:** শব্দ উৎস এবং জনবসতির মাঝে **ঘন গাছপালা** (সবুজ বেষ্টনী) লাগালে তা শব্দ তরঙ্গকে শোষণ করে দূষণ কমায় এবং একটি প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করে।
৭. জৈব বিবর্ধন (Biomagnification) বলতে কী বোঝো? মিনামাটা ও ব্ল্যাক ফুট রোগের কারণ ও লক্ষণগুলি কী?
✅ উত্তর:
জৈব বিবর্ধন (Biomagnification):
- জৈব বিবর্ধন হলো সেই প্রক্রিয়া, যেখানে $\text{DDT}$, পারদ বা আর্সেনিক-এর মতো **জৈব অনিয়োজ্য দূষকগুলি** খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।
- এই দূষকগুলি এক পুষ্টি স্তর থেকে পরবর্তী পুষ্টি স্তরে যাওয়ার সময় প্রতিটি উচ্চতর স্তরে এদের ঘনত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
- এর ফলে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা প্রাণী বা মানুষের শরীরে এই বিষাক্ত পদার্থের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি হয়, যা তাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
মিনামাটা ও ব্ল্যাক ফুট রোগের কারণ ও লক্ষণ:
- মিনামাটা রোগ: এর কারণ হলো **পারদ (Mercury) দূষণ**। লক্ষণ: স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, যেমন- হাত-পায়ের অসাড়তা, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির দুর্বলতা দেখা যায়।
- ব্ল্যাক ফুট ডিজিজ: এর কারণ হলো পানীয় জলে **আর্সেনিক (Arsenic) দূষণ**। লক্ষণ: হাত ও পায়ের চামড়ায় **কালো দাগ ও ঘা** সৃষ্টি হওয়া, যা পরে গ্যাংগ্রিন ও ক্যানসারের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
৮. প্রাকৃতিক সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস করো এবং মানবজীবনে এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
প্রাকৃতিক সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস (পুনর্নবীকরণ ভিত্তিতে):
- পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ: যে সম্পদ ব্যবহারের পরেও দ্রুত প্রাকৃতিক উপায়ে পুনরায় সৃষ্টি হয় এবং যার ভান্ডার অফুরন্ত। এই সম্পদ পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করে। **উদাহরণ: সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জল**।
- অনবীকরণযোগ্য সম্পদ: যে সম্পদ তৈরি হতে কোটি কোটি বছর সময় লাগে এবং যার ভান্ডার সীমিত। একবার ব্যবহার করলে তা নিঃশেষ হয়ে যায়। **উদাহরণ: কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ পদার্থ**।
মানবজীবনে প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব:
- খাদ্য ও কৃষি: উর্বর মাটি, জল এবং সূর্যের আলো হলো কৃষির ভিত্তি। এই সম্পদগুলিই মানুষের প্রধান খাদ্যের উৎস।
- শক্তির সরবরাহ: জীবাশ্ম জ্বালানি (অনবীকরণযোগ্য) এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎসগুলি মানুষের শিল্প, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনে শক্তির চাহিদা মেটায়।
- কাঁচামাল সরবরাহ: বনজ সম্পদ থেকে কাঠ, রাবার এবং খনিজ সম্পদ থেকে বিভিন্ন ধাতু ও অধাতু পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- পরিবেশের ভারসাম্য: বনজ সম্পদ বায়ু থেকে $\text{CO}_2$ শোষণ করে এবং অক্সিজেন মুক্ত করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
🎯 নবম শ্রেণির জীবন বিজ্ঞান: পরিবেশ, সম্পদ ও সংরক্ষণ (LAQ – দ্বিতীয় ভাগ)
গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫) – (৯-১৬ দাগ)
৯. বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের বিভিন্ন জোনগুলির (অঞ্চল) নাম লেখো এবং তাদের কাজ বা গুরুত্ব আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থায়ী উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ইউনেস্কো কর্তৃক তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়:
- কোর জোন (Core Zone – কেন্দ্র অঞ্চল):
- অবস্থান: এটি রিজার্ভের সবচেয়ে সংরক্ষিত এবং কেন্দ্রীয় অঞ্চল।
- কাজ: বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীদের তাদের প্রাকৃতিক অবস্থায় কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সুরক্ষা দেওয়া।
- গুরুত্ব: এখানে মানুষের কার্যকলাপ, এমনকি পর্যটনও **সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ** থাকে।
- বাফার জোন (Buffer Zone – মধ্যবর্তী অঞ্চল):
- অবস্থান: এটি কোর জোনের চারদিকে পরিবেষ্টিত হয়ে থাকে।
- কাজ: কোর জোনকে বাইরের পরিবেশ দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ থেকে রক্ষা করা। এখানে **গবেষণা, শিক্ষা, এবং নিয়ন্ত্রিত পর্যটন** অনুমোদিত।
- গুরুত্ব: এটি সংরক্ষণ ও পরিবেশ শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে।
- ট্রানজিশন জোন (Transition Zone – স্থানান্তর অঞ্চল):
- অবস্থান: এটি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের **সবচেয়ে বাইরের অঞ্চল**, যেখানে স্থানীয় মানুষের বসতি থাকে।
- কাজ: স্থানীয় মানুষজন এবং সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মধ্যে সহযোগিতা স্থাপন করা। এখানে **কৃষি, বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং মানুষের অন্যান্য কার্যকলাপ** অনুমোদিত।
- গুরুত্ব: স্থায়ী উন্নয়নের মডেল তৈরি করাই এর প্রধান লক্ষ্য।
১০. বায়ু দূষণের তিনটি কারণ, মানুষের উপর এর দুটি প্রভাব এবং তা নিয়ন্ত্রণের তিনটি উপায় আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
বায়ু দূষণের তিনটি কারণ:
- জীবাশ্ম জ্বালানি দহন: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্প কারখানায় কয়লা ও খনিজ তেল পোড়ানোর ফলে সালফার ডাইঅক্সাইড ($\text{SO}_2$) ও কণা পদার্থ নির্গত হয়।
- যানবাহন থেকে ধোঁয়া: মোটরগাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন থেকে কার্বন মনোক্সাইড ($\text{CO}$) এবং সীসার মতো কণা পদার্থ নির্গত হয়ে বায়ুকে দূষিত করে।
- কৃষিজাত বর্জ্য: জমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ফলে ধোঁয়া ও কণা পদার্থ বায়ুতে মিশে দূষণ ঘটায়।
মানুষের উপর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের উপায়:
- মানুষের উপর প্রভাব: **১. শ্বাসতন্ত্রের রোগ:** দূষিত বায়ু গ্রহণের ফলে মানবদেহে **ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি (অ্যাজমা)** এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। **২. মাথাব্যথা:** কার্বন মনোক্সাইড রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, যার ফলে মাথাব্যথা ও ক্লান্তি দেখা যায়।
- নিয়ন্ত্রণের উপায়: ১. পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানি (যেমন: $\text{CNG}$, সৌরশক্তি) ব্যবহার করা। **২. শিল্প কারখানার চিমনির ধোঁয়া পরিস্রাবক যন্ত্র (স্ক্রাবার)**-এর সাহায্যে ছেঁকে নেওয়া। **৩. ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ** করে $\text{CO}_2$ শোষণ নিশ্চিত করা।
১১. অ্যাসিড বৃষ্টির সংজ্ঞা দাও। মানুষের তৈরি দুটি অ্যাসিড বৃষ্টি সৃষ্টিকারী পদার্থ এবং পরিবেশের ওপর এর ৪টি প্রভাব লেখো।
✅ উত্তর:
অ্যাসিড বৃষ্টির সংজ্ঞা:
- মানুষের কার্যকলাপের ফলে নির্গত $\text{SO}_2$ ও $\text{NO}_2$ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে যথাক্রমে সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে।
- এই অ্যাসিড মিশ্রিত বৃষ্টিপাতকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে, যার $\text{pH}$ মান সাধারণত $5.6$-এর নিচে থাকে।
পরিবেশের ওপর ৪টি প্রভাব:
- ১. সৌধের ক্ষতি: অ্যাসিড বৃষ্টির প্রভাবে ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে তৈরি ঐতিহাসিক ইমারত ও সৌধের ক্ষয় হয় (যেমন- মার্বেল ক্যানসার)।
- ২. মাটির উর্বরতা হ্রাস: অ্যাসিড বৃষ্টি মাটির $\text{pH}$ কমিয়ে দেয়, ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং গাছের প্রয়োজনীয় খনিজগুলির ক্ষতি হয়।
- ৩. উদ্ভিদের ক্ষতি: উদ্ভিদের পাতা ও কান্ড সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পাতার ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে যায়।
- ৪. জলজ জীবের ক্ষতি: পুকুর বা নদীর জলকে অতিরিক্ত অম্লীয় করে তোলে, যার ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ জীবের মৃত্যু হয় এবং প্রজনন ব্যাহত হয়।
১২. জল দূষণের তিনটি প্রধান উৎস ব্যাখ্যা করো। ইউট্রোফিকেশন কী এবং এর দুটি কুফল লেখো।
✅ উত্তর:
জল দূষণের তিনটি প্রধান উৎস:
- পয়ঃপ্রণালী ও গৃহস্থালি বর্জ্য: শহর ও লোকালয় থেকে নির্গত অপরিশোধিত নর্দমার জলে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু, ডিটারজেন্ট ও জৈব পদার্থ থাকে, যা জলকে দূষিত করে।
- শিল্পজাত বর্জ্য: কলকারখানা থেকে নির্গত **পারদ, ক্যাডমিয়াম** ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বর্জ্য জল পরিশোধন না করেই জলাশয়ে ফেলা।
- কৃষিজাত সার ও কীটনাশক: জমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত **নাইট্রেট ও ফসফেট** সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার বৃষ্টির জলের সাথে মিশে জলকে দূষিত করে এবং ইউট্রোফিকেশনের জন্য দায়ী হয়।
ইউট্রোফিকেশন ও এর দুটি কুফল:
- **ইউট্রোফিকেশন** হলো জলাশয়ে **পুষ্টি উপাদানের মাত্রাতিরিক্ত সঞ্চয়ের** ফলে শৈবালের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটার প্রক্রিয়া।
- কুফল: ১. অক্সিজেনের অভাব: শৈবাল মারা গেলে তাদের পচনের জন্য জলে দ্রবীভূত **অক্সিজেন ($\text{DO}$)** মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার ফলে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। **২. জলের গুণগত মান হ্রাস: শৈবালের ব্লুমের কারণে জল ঘোলাটে হয়ে যায় এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, যা জলকে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে।
১৩. জীববৈচিত্র্যের তিনটি স্তর (জিনগত, প্রজাতিগত, বাস্তুতান্ত্রিক) উদাহরণ সহ ব্যাখ্যা করো।
✅ উত্তর:
- জিনগত বৈচিত্র্য: এটি হলো একই প্রজাতির অন্তর্গত বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে **জিনের ভিন্নতা**। জিনের এই পার্থক্যের ফলেই একটি প্রজাতির প্রতিটি সদস্য দেখতে আলাদা হয়। এটি একটি প্রজাতির পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বজায় রাখে। উদাহরণ: ধান বা গমের বিভিন্ন জাতের মধ্যেকার পার্থক্য।
- প্রজাতিগত বৈচিত্র্য: এটি হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে উপস্থিত **বিভিন্ন প্রজাতির** জীবের সংখ্যা ও প্রকারভেদ। এই বৈচিত্র্য কোনো বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য ও স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে। উদাহরণ: একটি বনে বাঘ, হরিণ, শিয়াল, এবং বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদের একত্রে সহাবস্থান।
- বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য: এটি হলো কোনো অঞ্চলে **বিভিন্ন প্রকার বাস্তুতন্ত্রের** (যেমন- বনভূমি, জলাভূমি, মরুভূমি, তৃণভূমি) উপস্থিতি। এই বৈচিত্র্য জলচক্র, কার্বন চক্র সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে চালু রাখে। উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং উত্তরবঙ্গে আলপাইন তৃণভূমি।
১৪. ইন সিটু ও এক্স সিটু সংরক্ষণের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি তুলনামূলকভাবে লেখো।
✅ উত্তর:
| বৈশিষ্ট্য | ইন সিটু সংরক্ষণ (জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য) | এক্স সিটু সংরক্ষণ (চিড়িয়াখানা, বীজ ব্যাংক) |
|---|---|---|
| সুবিধা: প্রাকৃতিকতা | জীবকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে রাখা যায় এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষিত হয়। এটি জীবের স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখে। | বিপন্ন প্রজাতিগুলিকে নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা এবং তাদের প্রজনন করানো সহজ হয়। এটি দ্রুত ফল দেয়। |
| অসুবিধা: ঝুঁকি | প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, আগুন) বা রোগ মহামারী হলে **সকল জীবের এক সঙ্গে বিলুপ্তির ঝুঁকি** থাকে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। | জীবকে কৃত্রিম পরিবেশে রাখলে তাদের স্বাভাবিক আচরণ ও বংশবৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে। এটি পরিবেশের সঠিক ধারণা দেয় না। |
| অসুবিধা: খরচ/স্থান | সংরক্ষণের জন্য **বিশাল স্থানের** প্রয়োজন হয়। | এই পদ্ধতি **খুব ব্যয়বহুল** এবং প্রযুক্তিগত খরচ বেশি। |
১৫. বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের তিনটি জোন (কোর, বাফার, ট্রানজিশন)-এর প্রধান কাজগুলি আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থায়ী উন্নয়নের উদ্দেশ্যে তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
- কোর জোন (Core Zone – কেন্দ্র অঞ্চল):
- অবস্থান: এটি রিজার্ভের সবচেয়ে সংরক্ষিত এবং কেন্দ্রীয় অঞ্চল।
- কাজ: বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীদের তাদের প্রাকৃতিক অবস্থায় কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সুরক্ষা দেওয়া।
- গুরুত্ব: এখানে মানুষের কার্যকলাপ, এমনকি পর্যটনও **সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ** থাকে। শুধুমাত্র সরকারি পর্যবেক্ষক ও গবেষকদের প্রবেশাধিকার থাকে।
- বাফার জোন (Buffer Zone – মধ্যবর্তী অঞ্চল):
- অবস্থান: এটি কোর জোনের চারদিকে পরিবেষ্টিত হয়ে থাকে।
- কাজ: কোর জোনকে বাইরের পরিবেশ দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ থেকে রক্ষা করা। এখানে **গবেষণা, শিক্ষা, পরিবেশ নিরীক্ষণ** এবং নিয়ন্ত্রিত পর্যটন অনুমোদিত।
- গুরুত্ব: এই অঞ্চলটি সংরক্ষণ ও পরিবেশ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
- ট্রানজিশন জোন (Transition Zone – স্থানান্তর অঞ্চল):
- অবস্থান: এটি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের **সবচেয়ে বাইরের অঞ্চল**, যেখানে স্থানীয় মানুষের বসতি থাকে।
- কাজ: স্থানীয় মানুষজন এবং সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মধ্যে সহযোগিতা স্থাপন করা। এখানে **কৃষি, বনজ সম্পদ সংগ্রহ, স্কুল, ও মানুষের অন্যান্য কার্যকলাপ** অনুমোদিত।
- গুরুত্ব: স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্থায়ী জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাই এর প্রধান লক্ষ্য।
১৬. ক্রায়োসংরক্ষণ পদ্ধতিটি কী? এর দুটি সুবিধা ও দুটি অসুবিধা লেখো।
✅ উত্তর:
ক্রায়োসংরক্ষণ (Cryopreservation):
- ক্রায়োসংরক্ষণ হলো এক্স সিটু সংরক্ষণের একটি উন্নত প্রযুক্তি। এই প্রক্রিয়ায় জীবের শুক্রাণু, ডিম্বাণু, বীজ, বা অন্যান্য কোশকে সংরক্ষণ করা হয়।
- এই কাজটি **তরল নাইট্রোজেনের** মধ্যে প্রায় $\text{-196}^{\circ}\text{C}$ তাপমাত্রায় করা হয়।
- এই অতি নিম্ন তাপমাত্রায় জীবের কোশের জৈবিক প্রক্রিয়াগুলি প্রায় **সম্পূর্ণভাবে বন্ধ** হয়ে যায়।
- এর ফলে জিনগত উপাদানগুলি **দীর্ঘকাল ধরে** অক্ষত অবস্থায় থাকে এবং কোনো রকম ক্ষয় বা পরিবর্তন ছাড়াই সংরক্ষিত হয়।
সুবিধা ও অসুবিধা:
- সুবিধা: ১. দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ: এই পদ্ধতিতে **বহু বছর ধরে** জীবের জিনগত উপাদানকে **ক্ষয় বা পরিবর্তন ছাড়াই** সংরক্ষণ করা যায়। **২. অল্প স্থান: অল্প জায়গায়** বহু প্রজাতির জীবের জিনগত উপাদান সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
- অসুবিধা: ১. ব্যয়বহুল: এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় **খুব ব্যয়বহুল**। **২. বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন: পদ্ধতিটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য উচ্চ-স্তরের প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর** প্রয়োজন হয়।
🎯 নবম শ্রেণির জীবন বিজ্ঞান: পরিবেশ, সম্পদ ও সংরক্ষণ (LAQ – তৃতীয় ভাগ)
গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫) – (১৭-২৪ দাগ)
১৭. মিনামাটা রোগ ও ব্ল্যাক ফুট ডিজিজ-এর কারণ, লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি সংক্ষেপে লেখো।
✅ উত্তর:
এগুলি ভারী ধাতব দূষণের কারণে সৃষ্ট রোগ, যা পরিবেশের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে।
- মিনামাটা রোগ:
- কারণ: শিল্পজাত বর্জ্যের মাধ্যমে জলে মিশে যাওয়া **পারদ (Mercury)** দূষণ। এই পারদযুক্ত মাছ খেলে এই রোগ হয়।
- লক্ষণ: স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, যেমন- হাত-পায়ের অসাড়তা, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির দুর্বলতা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারানো।
- নিয়ন্ত্রণ: শিল্প বর্জ্য পরিশোধন করে জল থেকে পারদ অপসারণ করা।
- ব্ল্যাক ফুট ডিজিজ:
- কারণ: পানীয় জলে **আর্সেনিক (Arsenic) দূষণ**। আর্সেনিক মিশ্রিত জল দীর্ঘকাল পান করলে এই রোগ হয়।
- লক্ষণ: হাত ও পায়ের চামড়ায় **কালো দাগ ও ঘা** সৃষ্টি হওয়া, রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গ্যাংগ্রিন হওয়া।
- নিয়ন্ত্রণ: আর্সেনিকমুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা এবং আর্সেনিক পরিশোধক যন্ত্র ব্যবহার করা।
১৮. শব্দ দূষণের কারণ ও মানবদেহে এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলি আলোচনা করো। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সবুজ বেষ্টনীর ভূমিকা কী?
✅ উত্তর:
শব্দ দূষণের কারণ ও প্রভাব:
- কারণ: শব্দ দূষণের প্রধান কারণগুলি হলো **১. যানবাহনের তীব্র শব্দ** (ইঞ্জিন ও হর্ন), **২. কলকারখানার ভারী যন্ত্রপাতির আওয়াজ**, এবং **৩. সামাজিক অনুষ্ঠান** ও বাজি ফাটানো।
- মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব:
- শারীরিক ক্ষতি: অতিরিক্ত শব্দের কারণে **শ্রবণশক্তির স্থায়ী বা সাময়িক হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure)** এবং হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি দেখা দেয়।
- মানসিক ক্ষতি: মানসিক চাপ, মনোযোগের অভাব, বিরক্তি এবং অনিদ্রা (Insomnia) সৃষ্টি হয়।
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সবুজ বেষ্টনীর ভূমিকা:
- শব্দ উৎস এবং জনবসতির মাঝে **ঘন গাছপালা** (সবুজ বেষ্টনী) লাগালে তা প্রাকৃতিক বেষ্টনীর মতো কাজ করে।
- গাছপালা তাদের পাতা, ডালপালা ও কান্ডের মাধ্যমে শব্দ তরঙ্গকে শোষণ করে এবং শব্দের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।
- এটি একটি প্রাকৃতিক শোষক হিসাবে কাজ করে, যার ফলে দূষণকারী উৎস থেকে আসা শব্দের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
১৯. প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ কেন জরুরি? এই সংরক্ষণে ‘3R’ নীতির ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
✅ উত্তর:
প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ কেন জরুরি:
- কয়লা, খনিজ তেল-এর মতো অনেক সম্পদই অনবীকরণযোগ্য, যা একবার নিঃশেষ হলে আর সহজে ফিরে পাওয়া যায় না। এগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে সংরক্ষণ জরুরি।
- বনজ সম্পদ বা জল-এর মতো সম্পদগুলি সংরক্ষণ করলে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং পরিবেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
- অসংরক্ষিত ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ ব্যবহার পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যার সৃষ্টি করে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে সংরক্ষণ প্রয়োজন।
সংরক্ষণে ‘3R’ নীতির ভূমিকা:
- Reduce (ব্যবহার কমানো): সম্পদের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে আনলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমে এবং বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস পায়।
- Reuse (পুনর্ব্যবহার): জিনিসপত্র ফেলে না দিয়ে একাধিকবার ব্যবহার করলে, নতুন জিনিস তৈরির জন্য কাঁচামাল ও শক্তির ব্যবহার কমে।
- Recycle (পুনর্নবীকরণ): পুরনো জিনিসগুলিকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পুনরায় নতুন জিনিস তৈরি করলে বর্জ্য পদার্থ মাটিতে মেশা রোধ হয় এবং দূষণ কমে।
২০. বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ ও মানবজীবনে এর তিনটি প্রভাব আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ:
- বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ($\text{CO}_2$) মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি।
- এই $\text{CO}_2$ নির্গমনের প্রধান উৎস হলো কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের মতো **জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহার**।
- এছাড়াও, **নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস** করা এবং ধানক্ষেত ও পশুপালন থেকে **মিথেন ($\text{CH}_4$)** গ্যাসের নির্গমনও এই উষ্ণায়নকে বাড়াচ্ছে।
মানবজীবনে বিশ্ব উষ্ণায়নের তিনটি প্রভাব:
- ১. সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি: তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যায়, যার ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ে এবং **উপকূলবর্তী এলাকার মানুষেরা বাস্তুহারা** হয়।
- ২. কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব: অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা বা খরার কারণে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা **খাদ্য নিরাপত্তাকে** বিপন্ন করে তোলে।
- ৩. স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: উষ্ণতা বাড়লে মশা-বাহিত রোগ (যেমন: ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু) দ্রুত ছড়াতে পারে। এছাড়া তাপজনিত রোগ যেমন হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে।
২১. ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রক্রিয়া (সংক্ষেপে) এবং মানবদেহে এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলি আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রক্রিয়া:
- রেফ্রিজারেটর থেকে নির্গত $\text{CFC}$ গ্যাস স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছলে $\text{UV}$ রশ্মির প্রভাবে ভেঙে **সক্রিয় ক্লোরিন পরমাণু ($\text{Cl}$)** মুক্ত করে।
- এই ক্লোরিন পরমাণু $\text{O}_3$ (ওজোন) অণুকে ভেঙে $\text{O}_2$ (অক্সিজেন) তৈরি করে, যার ফলে ওজোন স্তরের ঘনত্ব কমতে থাকে।
- একটি ক্লোরিন পরমাণু বহু ওজোন অণু ধ্বংস করতে পারে, যা ওজোন গহ্বর সৃষ্টির জন্য দায়ী।
মানবদেহে ওজোন স্তর ক্ষয়ের ক্ষতিকর প্রভাব:
- ১. ত্বক ক্যানসার: $\text{UV}$ রশ্মির অনুপ্রবেশ বাড়লে মানুষের ত্বকে মেলানোমা নামক ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- ২. ছানি রোগ: $\text{UV}$ রশ্মির প্রভাবে চোখের লেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে চক্ষে ছানি (Cataract) পড়ার প্রবণতা বাড়ে।
- ৩. অনাক্রমতা হ্রাস: $\text{UV}$ রশ্মি মানবদেহের **রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা** কমিয়ে দেয়, ফলে মানুষ সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।
২২. পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি কেন বর্তমানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এর দুটি সুবিধা ও দুটি অসুবিধা লেখো।
✅ উত্তর:
পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির গুরুত্ব:
- কয়লা, পেট্রোলিয়ামের মতো অনবীকরণযোগ্য শক্তির ভান্ডার সীমিত এবং এদের ব্যবহার ব্যাপক পরিবেশ দূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটায়।
- তাই পরিবেশ সুরক্ষা এবং শক্তির দীর্ঘমেয়াদী যোগানের জন্য বর্তমানে **সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, ও জলবিদ্যুৎ-এর** মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
- এই শক্তিগুলি দূষণমুক্ত হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অত্যন্ত সহায়ক।
সুবিধা ও অসুবিধা:
- সুবিধা: ১. অফুরন্ত ভান্ডার: এই শক্তির উৎসগুলি (যেমন: সূর্য, বায়ু) **অফুরন্ত**। **২. পরিবেশবান্ধব: গ্রিনহাউস গ্যাস বা অন্যান্য দূষক গ্যাস** প্রায় নির্গত হয় না, ফলে পরিবেশ দূষণ কম হয়।
- অসুবিধা: ১. নির্ভরযোগ্যতা: এদের উৎপাদন **প্রাকৃতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল** (যেমন: মেঘলা দিনে সৌরশক্তি বা বাতাস না থাকলে বায়ুশক্তি পাওয়া যায় না)। **২. প্রাথমিক ব্যয়: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ** অনেক বেশি।
২৩. কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের কী কী ক্ষতি হয়, তা লেখো।
✅ উত্তর:
রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবেশগত ক্ষতি:
- জল দূষণ ও ইউট্রোফিকেশন: অতিরিক্ত নাইট্রেট ও ফসফেট সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার বৃষ্টির জলের সাথে জলাশয়ে মিশে **ইউট্রোফিকেশন** ঘটায়, যা জলের অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
- জৈব বিবর্ধন: $\text{DDT}$-র মতো জৈব অনিয়োজ্য কীটনাশকগুলি খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে **জৈব বিবর্ধন** ঘটায় এবং শীর্ষস্তরের জীবের ক্ষতি করে।
- মাটির ক্ষতি: দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিম সার ব্যবহার করলে মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয় এবং মাটির উপকারী **অনুজীব ও ব্যাকটেরিয়ারা** মারা যায়, ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়।
- জীববৈচিত্র্য হ্রাস: কীটনাশকের প্রভাবে শুধু ক্ষতিকারক পোকা নয়, উপকারী পতঙ্গ (যেমন: মৌমাছি) মারা যায়, যা **পরাগায়ণ প্রক্রিয়াকে** ব্যাহত করে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে।
- ভূগর্ভস্থ জলের দূষণ: রাসায়নিক পদার্থগুলি চুঁইয়ে মাটির নিচে প্রবেশ করে **ভূগর্ভস্থ জলকেও দূষিত** করে তোলে।
২৪. জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্যের মধ্যে ৪টি প্রধান পার্থক্য লেখো।
✅ উত্তর:
| বৈশিষ্ট্য | জাতীয় উদ্যান (National Park) | অভয়ারণ্য (Sanctuary) |
|---|---|---|
| সংরক্ষণ | এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। | প্রধানত বন্যপ্রাণী বা নির্দিষ্ট প্রজাতিকে রক্ষা করাই প্রধান উদ্দেশ্য। |
| সীমানা | এর সীমানা সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় হয়। একবার নির্ধারণ হলে পরিবর্তন করা যায় না। | বিশেষ প্রয়োজনে এর সীমানা পরিবর্তনশীল হতে পারে। |
| কার্যকলাপ | এখানে মানুষের কোনো ধরনের কার্যকলাপ (যেমন: পশুপালন, শিকার) অনুমোদিত নয়। | পর্যবেক্ষণ বা নির্দিষ্ট বনজ সম্পদ সংগ্রহের মতো সীমিত কার্যকলাপ অনুমোদিত হতে পারে। |
| বাসস্থান | স্থানীয় মানুষের বসবাসের কোনো অধিকার থাকে না। | সীমিত পরিমাণে স্থানীয় মানুষের বসবাসের অধিকার থাকতে পারে। |