নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 5 আবহবিকার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় ৫: আপনার দেওয়া সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
১. আবহবিকার কী?
উত্তর দেখো
আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান (যেমন—সূর্যের তাপ, বৃষ্টিপাত, তুষার, বায়ুপ্রবাহ) এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের কঠিন শিলা যখন নিজের জায়গাতেই (স্বস্থানে) ভেঙে টুকরো টুকরো হয় বা রাসায়নিকভাবে বিয়োজিত হয়, তখন সেই প্রক্রিয়াকে আবহবিকার বা Weathering বলে।
২. আবহবিকার কেন বিচূর্ণীভবন?
উত্তর দেখো
আবহবিকার প্রক্রিয়ায় শিলার বড় বড় টুকরোগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ছোট ছোট কণায় বা চূর্ণে পরিণত হয়। কিন্তু এই চূর্ণবিচূর্ণ শিলাগুলো স্থানচ্যুত না হয়ে নিজের জায়গাতেই পড়ে থাকে। শিলা কেবল চূর্ণবিচূর্ণ হয় বলেই আবহবিকারকে অনেক সময় ‘বিচূর্ণীভবন’ (Disintegration) বলা হয়।
৩. ক্ষয়ীভবন কী?
উত্তর দেখো
যে গতিশীল প্রক্রিয়ায় আবহবিকারের ফলে সৃষ্ট শিলাচূর্ণগুলি বা ভূপৃষ্ঠের শিথিল অংশ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির (যেমন—নদী, হিমবাহ, বায়ুপ্রবাহ) দ্বারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবাহিত বা অপসারিত হয় এবং মূল শিলাস্তরের উচ্চতা হ্রাস পায়, তাকে ক্ষয়ীভবন বা Erosion বলে।
৪. ক্ষয়ীভবনের উদ্দেশ্য কী?
উত্তর দেখো
ক্ষয়ীভবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভূপৃষ্ঠের সমতলীকরণ বা পর্যয়ন (Gradation)। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠের উঁচু-নিচু বা বন্ধুর ভূভাগকে ক্রমাগত ক্ষয় করে তার উচ্চতা হ্রাস করা এবং অবশেষে তাকে সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি একটি সমতল বা প্রায়-সমতল ভূমিতে পরিণত করা।
৫. ক্ষয়ীভবনে কোন কোন শক্তি অংশগ্রহণ করে?
উত্তর দেখো
ক্ষয়ীভবনে অংশগ্রহণকারী প্রধান প্রাকৃতিক বা গতিশীল শক্তিগুলি হলো— ১) প্রবাহমান নদীর জলধারা, ২) বায়ুপ্রবাহ, ৩) হিমবাহ বা চলমান বরফের স্তূপ, ৪) সমুদ্রের ঢেউ বা তরঙ্গ এবং ৫) ভৌমজল (Groundwater)।
৬. পুঞ্জিত ক্ষয় কীভাবে ক্ষয়ীভবনকে ত্বরান্বিত করে?
উত্তর দেখো
পুঞ্জিত ক্ষয়ের মাধ্যমে পাহাড়ের ওপরের চূর্ণবিচূর্ণ শিলা ও মাটি মাধ্যাকর্ষণের টানে দ্রুত ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে এবং নদীর গতিপথে বা হিমবাহের কাছে জমা হয়। ফলে নদী বা হিমবাহ খুব সহজেই ওই বিপুল পরিমাণ শিলাচূর্ণকে বহন করে নিয়ে যেতে পারে। এভাবেই পুঞ্জিত ক্ষয় ক্ষয়ীভবনের কাজকে দ্রুত বা ত্বরান্বিত করে।
৭. নগ্নীভবন কী?
উত্তর দেখো
আবহবিকার, ক্ষয়ীভবন এবং পুঞ্জিত ক্ষয়ের মিলিত কাজের ফলে ভূপৃষ্ঠের ওপরের শিলাস্তর ক্ষয় পেয়ে অপসারিত হলে, ভেতরের বা নিচের অবিকৃত শিলাস্তর বাইরে উন্মুক্ত বা নগ্ন হয়ে পড়ে। এই সম্মিলিত ক্ষয় প্রক্রিয়াকেই নগ্নীভবন (Denudation) বলে।
৮. নগ্নীভবনের সূত্রটি লেখো।
উত্তর দেখো
নগ্নীভবন তিনটি প্রধান প্রক্রিয়ার সমষ্টি। এর সূত্রটি হলো:
নগ্নীভবন (Denudation) = আবহবিকার (Weathering) + পুঞ্জিত ক্ষয় (Mass Wasting) + ক্ষয়ীভবন (Erosion)।
৯. নগ্নীভবনের হার কী কী বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?
উত্তর দেখো
নগ্নীভবনের হার প্রধানত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: ১) জলবায়ু (বৃষ্টিপাত ও উষ্ণতার পরিমাণ), ২) শিলার প্রকৃতি (শিলা কঠিন না নরম), ৩) ভূমির ঢাল (ঢাল বেশি হলে নগ্নীভবন দ্রুত হয়), এবং ৪) উদ্ভিদের আবরণ (গাছপালা বেশি থাকলে নগ্নীভবনের হার কমে যায়)।
১০. যান্ত্রিক আবহবিকার কাকে বলে?
উত্তর দেখো
উষ্ণতার পরিবর্তন, তুষারের কাজ, চাপের হ্রাস-বৃদ্ধি প্রভৃতি ভৌত কারণের প্রভাবে শিলার ভেতরের রাসায়নিক ধর্মের কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে, শিলা যখন কেবল যান্ত্রিকভাবে বা বাহ্যিকভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, তখন তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে।
১১. প্রস্তরচাঁই খণ্ডীকরণ কী?
উত্তর দেখো
ব্যাসাল্টের মতো যে সমস্ত শিলায় লম্বালম্বি এবং আড়াআড়ি ফাটল বা দারন থাকে, উষ্ণতার পরিবর্তনের ফলে সেই শিলাস্তর প্রসারিত ও সংকুচিত হয়ে ওই ফাটল বরাবর চৌকো বা আয়তাকার ব্লকের মতো খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে যায়। যান্ত্রিক আবহবিকারের এই প্রক্রিয়াকেই প্রস্তরচাঁই খণ্ডীকরণ (Block Disintegration) বলে।
১২. শল্কমোচন কী?
উত্তর দেখো
‘শল্ক’ মানে ছাল এবং ‘মোচন’ মানে খুলে আসা। মরু অঞ্চলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার বিশাল পার্থক্যের কারণে সমসত্ত্ব গ্রানাইট শিলার ওপরের স্তরগুলি পেঁয়াজের খোসার মতো গোলাকারভাবে মূল শিলা থেকে খুলে আসে। একে শল্কমোচন (Exfoliation) বলে।
১৩. রাসায়নিক আবহবিকার কী?
উত্তর দেখো
বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাস (যেমন—অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড) এবং বৃষ্টির জলের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে শিলার ভেতরের খনিজ পদার্থগুলো বিয়োজিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যের নরম ও দুর্বল গৌণ খনিজে পরিণত হলে, তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে।
১৪. অঙ্গারযোজন কী?
উত্তর দেখো
বৃষ্টির জলের সাথে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড মিশে কার্বনিক অ্যাসিড (H2CO3) তৈরি করে। এই অ্যাসিড চুনাপাথর যুক্ত অঞ্চলে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রবণীয় ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত করে গলিয়ে দেয়। একেই অঙ্গারযোজন বা কার্বোনেশন (Carbonation) বলে।
১৫. কার্স্ট অঞ্চল কী?
উত্তর দেখো
ভূপৃষ্ঠের যে সমস্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রধানত চুনাপাথর (Limestone) বা ডলোমাইট শিলা দ্বারা গঠিত এবং যেখানে বৃষ্টির জল ও ভৌমজলের দ্রবণ কার্যের (অঙ্গারযোজন) ফলে গুহা, সিঙ্কহোল প্রভৃতি বিচিত্র ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, তাকে কার্স্ট (Karst) অঞ্চল বলে।
১৬. স্ট্যালাকটাইট ও স্ট্যালাগমাইট কী?
উত্তর দেখো
চুনাপাথর যুক্ত কার্স্ট অঞ্চলের গুহায় দ্রবণ প্রক্রিয়ায় চুনাপাথর গলে জলের সাথে চুঁইয়ে পড়ে। এই চুন গোলা জল গুহার ছাদ থেকে ঝুলতে থাকলে তাকে স্ট্যালাকটাইট (Stalactite) বলে এবং ওই জল মেঝেতে পড়ে নিচ থেকে ওপরের দিকে স্তম্ভের মতো জমতে থাকলে তাকে স্ট্যালাগমাইট (Stalagmite) বলে।
১৭. জারণ প্রক্রিয়া কী?
উত্তর দেখো
জলের উপস্থিতিতে শিলার খনিজ পদার্থের সাথে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে জারণ বা অক্সিডেশন (Oxidation) বলে। এই প্রক্রিয়ায় শিলা দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং শিলার ওপর মরচে পড়ে।
১৮. লোহায় কোন প্রক্রিয়ায় এবং কীভাবে মরচে পড়ে?
উত্তর দেখো
লোহায় জারণ বা অক্সিডেশন প্রক্রিয়ায় মরচে পড়ে। জলের উপস্থিতিতে লোহার কঠিন আকরিক ‘ফেরাস অক্সাইড’ বাতাসের অক্সিজেনের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে। এর ফলে এটি দুর্বল, ভঙ্গুর এবং হলুদ বা লালচে বাদামি রঙের ‘ফেরিক অক্সাইডে’ পরিণত হয়, যাকেই আমরা মরচে পড়া বলি।
১৯. আর্দ্র বিশ্লেষণ কী?
উত্তর দেখো
যে রাসায়নিক আবহবিকারে জলের অণু বিশ্লিষ্ট হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) এবং হাইড্রোক্সিল আয়নে (OH-) পরিণত হয় এবং শিলার খনিজের সাথে বিক্রিয়া করে নতুন দুর্বল খনিজ তৈরি করে, তাকে আর্দ্র বিশ্লেষণ বা হাইড্রোলিসিস (Hydrolysis) বলে।
২০. জৈব আবহবিকার কী?
উত্তর দেখো
উদ্ভিদ (গাছের শিকড়), বিভিন্ন প্রাণী (যেমন—কেঁচো, ইঁদুর, উইপোকা) এবং মানুষের নানা কাজকর্মের ফলে শিলার যে ভৌত বা যান্ত্রিক ভাঙন এবং রাসায়নিক পরিবর্তন ও বিয়োজন ঘটে, তাকে জৈব আবহবিকার (Biological Weathering) বলে।
২১. কোন কোন জলবায়ু অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকার কার্যকরী হয়?
উত্তর দেখো
যান্ত্রিক আবহবিকার প্রধানত দুটি জলবায়ু অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়:
১) উষ্ণ মরু ও শুষ্ক অঞ্চল: যেখানে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য খুব বেশি।
২) উচ্চ অক্ষাংশের শীতল ও পার্বত্য অঞ্চল: যেখানে জল জমে বরফ হওয়ার সুযোগ থাকে।
২২. মৃত্তিকার উপাদানগুলি কী কী?
উত্তর দেখো
একটি আদর্শ মৃত্তিকা বা মাটির প্রধান উপাদান চারটি। যথা— ১) খনিজ পদার্থ (প্রায় ৪৫%), ২) জৈব পদার্থ বা হিউমাস (প্রায় ৫%), ৩) মাটির জল (প্রায় ২৫%) এবং ৪) মাটির বায়ু (প্রায় ২৫%)।
[Image of soil composition pie chart]
২৩. মৃত্তিকা স্তর বা হোরাইজন (Soil Horizon) কী?
উত্তর দেখো
মাটি সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে একেবারে মূল শিলা পর্যন্ত মাটির মধ্যে কতগুলো সমান্তরাল স্তর তৈরি হয়। ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে একটি স্তর থেকে অন্য স্তর আলাদা হয়। এই আলাদা বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমান্তরাল স্তরগুলিকেই মৃত্তিকা স্তর বা হোরাইজন বলে।
২৪. মৃত্তিকা পরিলেখ (Soil Profile) কী?
উত্তর দেখো
ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে একেবারে নিচে অবস্থিত আদি শিলা পর্যন্ত মাটিকে লম্বালম্বিভাবে বা খাড়াখাড়িভাবে কাটলে (প্রস্থচ্ছেদ করলে) মাটির যে বিভিন্ন স্তরগুলো (যেমন—O, A, B, C স্তর) পরপর সজ্জিত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়, তার সম্পূর্ণ চিত্রটিকে মৃত্তিকা পরিলেখ বা Soil Profile বলে।
২৫. সোলাম (Solum) কী?
উত্তর দেখো
পরিণত মৃত্তিকা পরিলেখের একেবারে ওপরের দুটি প্রধান স্তর, অর্থাৎ ‘A’ স্তর এবং ‘B’ স্তরকে একত্রে সোলাম বা আদর্শ মাটি বলা হয়। এখানেই উদ্ভিদ জন্মায় এবং মাটির প্রকৃত রাসায়নিক ও জৈবিক কাজগুলো সম্পন্ন হয়।
২৬. হিউমিফিকেশন (Humification) কী?
উত্তর দেখো
যে প্রক্রিয়ায় মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ মাটিতে থাকা বিভিন্ন জীবাণু, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা বিয়োজিত ও পচে গিয়ে কালো বা গাঢ় বাদামি রঙের অত্যন্ত উর্বর ও জটিল জৈব পদার্থে পরিণত হয়, তাকে হিউমিফিকেশন বলে। এর ফলে সৃষ্ট পদার্থটিই হলো হিউমাস।
২৭. খনিজকরণ (Mineralization) কী?
উত্তর দেখো
যে প্রক্রিয়ায় মাটির হিউমাস পুনরায় ব্যাকটেরিয়া দ্বারা বিয়োজিত বা জারিত হয়ে সরল খনিজ পদার্থে (যেমন—কার্বন ডাইঅক্সাইড, জল, নাইট্রোজেন, ফসফরাস) পরিণত হয়ে মাটিতে মিশে যায় এবং মাটির খনিজ ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে, তাকে খনিজকরণ বলে।
২৮. এলুভিয়েশন (Eluviation) কী?
উত্তর দেখো
যে প্রক্রিয়ায় বৃষ্টির জল বা ধোয়া জলের সাহায্যে মাটির ওপরের ‘A’ স্তর থেকে খনিজ পদার্থগুলো (যেমন—লোহা, অ্যালুমিনিয়াম) দ্রবীভূত বা ভাসমান অবস্থায় ধুয়ে নিচের স্তরে চলে যায়, তাকে এলুভিয়েশন বা ধৌত প্রক্রিয়া বলে।
২৯. মাটির ক্ষয় (Soil Erosion) কী?
উত্তর দেখো
প্রাকৃতিক শক্তি (যেমন—প্রবল বৃষ্টিপাত, নদীর স্রোত, বায়ুপ্রবাহ) বা মানুষের অবৈজ্ঞানিক কাজকর্মের ফলে মাটির ওপরের উর্বর ও শিথিল স্তরটি স্থানচ্যুত হয়ে নষ্ট হওয়াকে বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অপসারিত হওয়াকে মাটির ক্ষয় বা মৃত্তিকা ক্ষয় বলে।
৩০. খোয়াই ক্ষয় (Gully / Ravine Erosion) কী?
উত্তর দেখো
গাছপালাহীন উন্মুক্ত ঢালু জমিতে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে জল যখন প্রবল বেগে নিচে নামে, তখন তা মাটিকে কেটে গভীর ও চওড়া নালি বা খাদের সৃষ্টি করে। বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনের কাছে এই ধরনের ব্যাপক নালি বা গালি ক্ষয়কে স্থানীয় ভাষায় ‘খোয়াই’ বলে।
৩১. অপভূমি বা ব্যাডল্যান্ড (Badland) কী?
উত্তর দেখো
ব্যাপক গালি বা নালি ক্ষয়ের ফলে কোনো বিস্তীর্ণ অঞ্চল যখন অসংখ্য গভীর খাত ও উঁচু-নিচু টিলায় ভরে গিয়ে সম্পূর্ণ এবড়োখেবড়ো হয়ে যায় এবং কৃষিকাজ বা যাতায়াতের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়ে, তখন তাকে অপভূমি বা ব্যাডল্যান্ড বলে (যেমন—ভারতের চম্বল নদীর অববাহিকা)।
৩২. মাটি ক্ষয়ের প্রধান কারণগুলি কী কী?
উত্তর দেখো
মাটি ক্ষয়ের প্রধান কারণ দুটি:
১) প্রাকৃতিক কারণ: প্রবল বৃষ্টিপাত, বন্যা, খাড়া ভূমির ঢাল এবং তীব্র বায়ুপ্রবাহ।
২) মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: যথেচ্ছভাবে গাছ কাটা (বৃক্ষচ্ছেদন), অবৈজ্ঞানিক প্রথায় পাহাড়ে ঢালু জমিতে কৃষিকাজ (ঝুম চাষ) এবং অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণ।
৩৩. মাটি সংরক্ষণ (Soil Conservation) কী?
উত্তর দেখো
যে সমস্ত বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে মাটির ক্ষয় বা স্থানচ্যুতি রোধ করা যায় এবং মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা বজায় রেখে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তাকে সামগ্রিকভাবে মাটি সংরক্ষণ বলে। বৃক্ষরোপণ এর অন্যতম সেরা উপায়।
৩৪. শস্যাবর্তন (Crop Rotation) কী?
উত্তর দেখো
একই জমিতে বছরের পর বছর একই ফসল চাষ করলে মাটির নির্দিষ্ট কিছু খনিজ শেষ হয়ে যায়। তাই মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য পর্যায়ক্রমে বা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন ফসলের (বিশেষত ডাল বা শিম্বগোত্রীয় শস্যের) চাষ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে শস্যাবর্তন বলে।
৩৫. কলয়েড প্লাকিং (Colloid Plucking) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
মাটির উপরিভাগে থাকা সূক্ষ্ম কাদা বা কলয়েড কণাগুলি যখন বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যায় এবং প্রবাহিত জলের টানে মাটি থেকে বিছিন্ন বা অপসারিত হয়ে ধুয়ে চলে যায়, তখন সেই সূক্ষ্ম ক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে কলয়েড প্লাকিং বলে।
৩৬. ইলুভিয়েশন (Illuviation) কী?
উত্তর দেখো
এলুভিয়েশন প্রক্রিয়ায় ‘A’ স্তর থেকে ধুয়ে আসা খনিজ পদার্থগুলো (লোহা, অ্যালুমিনিয়াম) যখন মাটির নিচের ‘B’ স্তরে এসে জমা হয় বা সঞ্চিত হয়, তখন তাকে ইলুভিয়েশন বলে।
৩৭. রেগোলিথ (Regolith) কী?
উত্তর দেখো
আবহবিকারের ফলে আদি বা মূল শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভূপৃষ্ঠের ওপর যে শিথিল, নরম ও অসমসত্ত্ব আস্তরণ তৈরি করে, তাকে রেগোলিথ বলে। এটি হলো মাটি সৃষ্টির একেবারে প্রথম ধাপ।
৩৮. ফালি চাষ (Strip Cropping) কী?
উত্তর দেখো
পাহাড়ের ঢালে মাটির ক্ষয় রোধ করার জন্য ভূমির ঢালের আড়াআড়িভাবে চওড়া ফিতের বা ফালির (Strip) মতো জমি তৈরি করে তাতে সারিবদ্ধভাবে ফসল চাষ করার পদ্ধতিকে ফালি চাষ বলে। এটি জলের স্রোতে বাধা দিয়ে মৃত্তিকা ক্ষয় আটকায়।
৩৯. ধাপ চাষ (Terrace Farming) কী?
উত্তর দেখো
পাহাড়ি অঞ্চলে খাড়া ঢালযুক্ত জমিতে মাটির ক্ষয় কমানোর জন্য ঢাল বরাবর সিঁড়ির মতো চওড়া ধাপ (Terrace) কেটে কৃষিকাজ করার পদ্ধতিকে ধাপ চাষ বলে। এটি পার্বত্য অঞ্চলে মৃত্তিকা সংরক্ষণের অন্যতম সেরা উপায়।
৪০. সমোন্নতি রেখা বরাবর চাষ (Contour Farming) কী?
উত্তর দেখো
পাহাড়ের ঢালে একই উচ্চতাযুক্ত বিন্দুগুলোকে যোগ করে যে কাল্পনিক রেখা পাওয়া যায় (সমোন্নতি রেখা), ঠিক সেই রেখা বরাবর আড়াআড়িভাবে জমি চষে চাষ করার পদ্ধতিকে সমোন্নতি রেখা বরাবর চাষ বলে। এর ফলে বৃষ্টির জল সরাসরি ঢাল বেয়ে নিচে নামতে পারে না, ফলে মাটি ক্ষয় বন্ধ হয়।
অধ্যায় ৫: ১০০% প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত ১০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (Bonus)
৪১. গোলাকার আবহবিকার (Spheroidal Weathering) কী?
উত্তর দেখো
ব্যাসাল্ট জাতীয় শিলায় লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি ফাটল থাকলে, রাসায়নিক আবহবিকারের (প্রধানত জলযোজন) প্রভাবে শিলার ফাটল বা কোণগুলো দ্রুত ক্ষয় পেয়ে গোলাকার রূপ ধারণ করে। শিলার এই গোলাকারভাবে ক্ষয় পাওয়ার প্রক্রিয়াকেই গোলাকার আবহবিকার বলে।
৪২. রিল ক্ষয় (Rill Erosion) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
প্রবল বৃষ্টির পর জল যখন ভূমির ঢাল বেয়ে নিচে নামে, তখন তা মাটির ওপরের স্তরে ছোট ছোট, সরু ও অগভীর সুতোর মতো নালা তৈরি করে মাটি ক্ষয় করে। মাটির এই প্রাথমিক ও সূক্ষ্ম নালি ক্ষয়কেই রিল ক্ষয় বলে। এটি গালি ক্ষয়ের প্রাথমিক রূপ।
৪৩. চিলেশন (Chelation) কী?
উত্তর দেখো
গাছের শিকড় বা মাটিতে থাকা বিভিন্ন জীবাণু থেকে নিঃসৃত নানা রকম জৈব অ্যাসিড (যেমন- হিউমিক অ্যাসিড) শিলার খনিজ পদার্থের সাথে বিক্রিয়া করে শিলাকে গলিয়ে দেয় বা দুর্বল করে। উদ্ভিদ ও জীবাণু দ্বারা ঘটা এই বিশেষ ধরনের জৈব-রাসায়নিক আবহবিকারকেই চিলেশন বলে।
৪৪. টেরা রোসা (Terra Rossa) কী?
উত্তর দেখো
ইতালীয় শব্দ ‘টেরা রোসা’-এর অর্থ হলো ‘লাল মাটি’। চুনাপাথর যুক্ত অঞ্চলে কার্বোনেশন (অঙ্গারযোজন) প্রক্রিয়ায় চুনাপাথর গলে অপসারিত হওয়ার পর, শিলায় পড়ে থাকা অদ্রবণীয় লৌহ অক্সাইড এবং কাদামাটি জমাকৃত হয়ে যে লাল রঙের উর্বর মাটি তৈরি করে, তাকে টেরা রোসা বলে।
৪৫. মৃত্তিকা সংরক্ষণে ‘মালচিং’ (Mulching) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
কৃষিজমিতে ফসলের সারিগুলোর মাঝখানের ফাঁকা মাটি যাতে রোদ বা বাতাসে শুকিয়ে ক্ষয় না হয়, তার জন্য ওই ফাঁকা জায়গাগুলো খড়, শুকনো পাতা, ঘাস বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়ার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে মালচিং বলে। এটি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং ক্ষয় রোধ করে।
৪৬. জলবায়ু কীভাবে আবহবিকারকে নিয়ন্ত্রণ করে?
উত্তর দেখো
জলবায়ুর প্রধান দুটি উপাদান—উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাত আবহবিকারের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। যেমন, বৃষ্টিবহুল ক্রান্তীয় অঞ্চলে জলের প্রাচুর্যের কারণে রাসায়নিক আবহবিকার বেশি হয়। অন্যদিকে, শুষ্ক মরু অঞ্চলে উষ্ণতার চরম পার্থক্যের জন্য যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি ঘটে।
৪৭. রেগোলিথ ও মৃত্তিকার (Soil) মূল পার্থক্য কী?
উত্তর দেখো
রেগোলিথ: এটি কেবল আবহবিকারের ফলে সৃষ্ট আদি শিলার চূর্ণবিচূর্ণ রূপ। এতে কোনো জৈব পদার্থ থাকে না এবং এখানে গাছপালা জন্মাতে পারে না।
মৃত্তিকা: রেগোলিথের সাথে জল, বাতাস এবং হিউমাস (জৈব পদার্থ) মিশে দীর্ঘদিন ধরে মৃত্তিকা তৈরি হয়, যা অত্যন্ত উর্বর এবং উদ্ভিদের জন্ম ও বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত।
৪৮. মৃত্তিকা সৃষ্টিতে ‘সময়’-এর ভূমিকা কী?
উত্তর দেখো
মাটি তৈরি হওয়া একটি অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়া। মাত্র ১ সেন্টিমিটার পুরু মাটি তৈরি হতে শত শত বা হাজার হাজার বছর সময় লাগতে পারে। যত বেশি সময় পাওয়া যায়, মাটির স্তরবিন্যাস (Profile) তত ভালো হয় এবং মাটি তত পরিণত (Mature) ও উর্বর হয়ে ওঠে।
৪৯. মৃত্তিকার গ্রথন (Soil Texture) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
মাটির মধ্যে থাকা বিভিন্ন আকারের কণা—যেমন বালি (Sand), পলি (Silt) এবং কাদা (Clay)-র আপেক্ষিক অনুপাত বা ভাগকে মৃত্তিকার গ্রথন বলা হয়। এই গ্রথনের ওপর ভিত্তি করেই মাটিকে বেলে মাটি, এঁটেল মাটি বা দোআঁশ মাটি হিসেবে ভাগ করা হয়।
৫০. পাহাড়ি ধস (Landslide) কীভাবে আবহবিকারে সাহায্য করে?
উত্তর দেখো
পাহাড়ি ধস হলো পুঞ্জিত ক্ষয়ের একটি রূপ। ধস নামার ফলে পাহাড়ের ওপরের চূর্ণবিচূর্ণ আলগা শিলা ও মাটি দ্রুত নিচে নেমে যায়। এর ফলে ভেতরের মূল কঠিন শিলাটি পুনরায় আবহাওয়ার সংস্পর্শে আসার জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং সেখানে নতুন করে আবহবিকার শুরু হতে পারে।