নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 5 দূর্যোগ ও বিপর্যয় রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় ৬: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৫)

১. পশ্চিমবঙ্গে দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের প্রকৃতি ও তার প্রভাব ব্যাখ্যা করো।

বিস্তারিত উত্তর

পশ্চিমবঙ্গ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এর প্রকৃতি ও প্রভাব নিচে আলোচনা করা হলো:

১. বন্যা (Flood):

  • প্রকৃতি: বর্ষাকালে উত্তরবঙ্গের নদীগুলোতে (যেমন- তিস্তা, তোর্সা) এবং দক্ষিণবঙ্গের ভাগীরথী-হুগলি অববাহিকায় (যেমন- দামোদর, রূপনারায়ণ) প্রায় প্রতি বছর বন্যা হয়। ডিভিসি-র জল ছাড়ার ফলেও বন্যা হয়।
  • প্রভাব: কৃষি জমির ফসল নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট ডুবে যায়, এবং পানীয় জলের সংকটে মহামারী দেখা দেয়। মালদা ও মুর্শিদাবাদে নদীপাড় ভাঙন একটি বড় সমস্যা।

২. ঘূর্ণিঝড় (Cyclone):

  • প্রকৃতি: বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় মেদিনীপুর ও দুই ২৪ পরগনা জেলায় প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে (যেমন- আয়লা, আম্ফান, ইয়াস)।
  • প্রভাব: প্রবল ঝড়ে কাঁচা বাড়ি, গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে যায়। জলোচ্ছ্বাসের ফলে নোনা জল ঢুকে কৃষিজমি দীর্ঘস্থায়ীভাবে চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

৩. খরা (Drought):

  • প্রকৃতি: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের মালভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় খরা দেখা দেয়।
  • প্রভাব: জলের অভাবে চাষবাস বন্ধ হয়ে যায়, খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং পানীয় জলের তীব্র অভাব ঘটে।

৪. ভূমিধস (Landslide):

  • প্রকৃতি: দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় প্রবল বৃষ্টির ফলে ধস নামে।
  • প্রভাব: পাহাড়ি রাস্তা বন্ধ হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে প্রাণহানি ঘটে।

২. বিপর্যয় মোকাবিলায় কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি?

বিস্তারিত উত্তর

বিপর্যয় মোকাবিলা বা ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি স্তরে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন:

ক) প্রাক্-বিপর্যয় পর্যায় (প্রস্তুতি):

  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং মানচিত্র তৈরি করা।
  • উপযুক্ত স্থানে মজবুত আশ্রয়কেন্দ্র বা সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা।
  • ত্রাণ সামগ্রী (খাবার, জল, ওষুধ) ও উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা।
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মহড়া বা ‘মক ড্রিল’ (Mock Drill) আয়োজন করা।

খ) বিপর্যয়কালীন পর্যায় (সাড়া প্রদান):

  • দ্রুত উদ্ধারকার্য চালানো এবং আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা।
  • দুর্গত মানুষদের মধ্যে খাদ্য, পানীয় জল ও প্রাথমিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া।
  • আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং গুজব ছড়াতে বাধা দেওয়া।

গ) বিপর্যয়-পরবর্তী পর্যায় (পুনর্বাসন):

  • ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মেরামত করা।
  • ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সাহায্য প্রদান এবং পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

৩. বিপর্যয় মোকাবিলায় শিক্ষার্থীর ভূমিকা উল্লেখ করো।

বিস্তারিত উত্তর

ছাত্রছাত্রীরা সমাজের এক সচেতন অংশ। বিপর্যয় ব্যবস্থাপনায় তারা নিম্নলিখিত ভূমিকা পালন করতে পারে:

  1. সচেতনতা প্রচার: শিক্ষার্থীরা নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতন করতে পারে। কী করা উচিত আর কী উচিত নয় (Do’s and Don’ts), তা বুঝিয়ে বলতে পারে।
  2. সঠিক তথ্য প্রদান: দুর্যোগের সময় ভুয়ো খবর বা গুজব যাতে না ছড়ায়, সেদিকে নজর রাখা এবং আবহাওয়া দপ্তরের সঠিক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
  3. স্বেচ্ছাসেবী কাজ: বিপর্যয়ের পর ত্রাণ শিবিরে খাবার প্যাকেট করা, জল বিতরণ এবং লাইন মেইনটেইন করার কাজে তারা প্রশাসনকে সাহায্য করতে পারে।
  4. প্রাথমিক চিকিৎসা: এন.সি.সি. (NCC) বা স্কাউটের প্রশিক্ষণ থাকলে তারা আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা বা ফার্স্ট এইড দিতে পারে।
  5. মানসিক সহায়তা: ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের বা বয়স্ক মানুষদের মানসিক সাহস জোগানো এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের একটি বড় দায়িত্ব।

৪. পশ্চিমবঙ্গে বিপর্যয় ব্যবস্থাপনায় কী কী কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে?

বিস্তারিত উত্তর

পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিপর্যয় মোকাবিলায় বেশ কিছু আধুনিক কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:

  • দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তর: রাজ্যে একটি পৃথক ‘বিপর্যয় মোকাবিলা ও সিভিল ডিফেন্স’ দপ্তর গঠন করা হয়েছে যা সারা বছর নজরদারি চালায়।
  • আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ: উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে (যেমন- দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর) প্রচুর সংখ্যক বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার বা ফ্লাড শেল্টার তৈরি করা হয়েছে।
  • আগাম সতর্কবার্তা: এসএমএস অ্যালার্ট, মাইকিং এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে জেলেদের ও পর্যটকদের আগেই সতর্ক করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
  • বাঁধ সংস্কার ও ম্যানগ্রোভ সৃজন: সুন্দরবন ও দীঘা উপকূলে বাঁধ মেরামত এবং ৫ কোটি ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
  • কুইক রেসপন্স টিম (QRT): প্রতিটি জেলায় আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য দ্রুত সাড়া প্রদানকারী দল বা QRT গঠন করা হয়েছে।

৫. খরা ও বন্যা—উভয় পরিস্থিতির মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

বিস্তারিত উত্তর

খরা ও বন্যা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী হলেও কিছু সাধারণ এবং বিশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব:

  • বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting): অতিরিক্ত বৃষ্টির জল ধরে রাখলে যেমন বন্যার প্রকোপ কমে, তেমনই সেই জল খরা বা শুষ্ক ঋতুতে ব্যবহার করা যায়।
  • নদী সংযোগ প্রকল্প: বন্যাপ্রবণ নদীগুলির সাথে খরাপ্রবণ অঞ্চলের নদীগুলির সংযোগ ঘটালে জলের ভারসাম্য বজায় থাকে।
  • বনসৃজন ও বৃক্ষরোপণ: গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রেখে নদীপাড় ভাঙন ও বন্যা রোধ করে। আবার বাষ্পমোচনের মাধ্যমে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে খরা প্রতিরোধ করে।
  • জলাধার ও বাঁধ নির্মাণ: নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে বর্ষাকালে অতিরিক্ত জল ধরে রাখলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয় এবং পরে সেই জল সেচ ও পানীয় হিসেবে ব্যবহার করে খরা মোকাবিলা করা যায়।

অধ্যায় ৬: পার্থক্য নিরূপণ (মান – ৩)

১. ধস ও হিমানী সম্প্রপাতের পার্থক্য (Landslide vs Avalanche)

পার্থক্যের বিষয় ধস (Landslide) হিমানী সম্প্রপাত (Avalanche)
১. উপাদান এক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষণের টানে পাহাড়ের ওপর থেকে শিলাখণ্ড, মাটি বা পাথরের স্তূপ নিচে নেমে আসে। এক্ষেত্রে পাহাড়ের ওপর থেকে বিশাল আকারের বরফের স্তূপ বা তুষারখণ্ড নিচে নেমে আসে।
২. অঞ্চল এটি প্রধানত বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে (যেমন- দার্জিলিং, উত্তরাখণ্ড) ঘটে। এটি প্রধানত বরফাবৃত উচ্চ পার্বত্য বা মেরু অঞ্চলে (যেমন- আল্পস, হিমালয়ের উচু অংশ) ঘটে।
৩. প্রধান কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্প এবং বৃক্ষচ্ছেদন বা গাছ কাটাই এর প্রধান কারণ। অতিরিক্ত তুষারপাত, খাড়া ঢাল, এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বরফ গলাই এর প্রধান কারণ।

২. দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের পার্থক্য (Hazard vs Disaster)

পার্থক্যের বিষয় দুর্যোগ (Hazard) বিপর্যয় (Disaster)
১. প্রকৃতি/সংজ্ঞা দুর্যোগ হলো বিপদের একটি সম্ভাবনা বা কারণ, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বিপর্যয় হলো দুর্যোগের একটি ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক ফলাফল বা পরিণতি।
২. ক্ষয়ক্ষতি দুর্যোগে জানমালের বিশেষ ক্ষয়ক্ষতি হয় না, এটি কেবল ভীতি বা হুমকি তৈরি করে। বিপর্যয়ে প্রচুর মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং বিপুল সম্পত্তির বিনাশ হয়।
৩. পারস্পরিক সম্পর্ক সব দুর্যোগ বিপর্যয়ে পরিণত নাও হতে পারে (যেমন- জনহীন দ্বীপে ঘূর্ণিঝড়)। সব বিপর্যয়ের মূলেই কোনো না কোনো দুর্যোগ থাকে। দুর্যোগ ছাড়া বিপর্যয় হয় না।
৪. মোকাবিলা স্থানীয় মানুষ বা প্রশাসন নিজেরাই এটি মোকাবিলা করতে পারে। এটি স্থানীয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়।

৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের পার্থক্য

পার্থক্যের বিষয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Hazard) মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ (Man-made Hazard)
১. উৎস বা কারণ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণে বা প্রকৃতির খেয়ালে এই দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। মানুষের হাত থাকে না। মানুষের অবৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ, লোভ বা অসতর্কতার কারণে এই দুর্যোগ সৃষ্টি হয়।
২. নিয়ন্ত্রণ এর ওপর মানুষের বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, একে পুরোপুরি রোধ করা অসম্ভব। মানুষ সচেতন হলে বা প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
৩. পূর্বাভাস অনেক ক্ষেত্রে (যেমন- ঘূর্ণিঝড়) আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি আকস্মিকভাবে ঘটে, তাই পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন (যেমন- গ্যাস লিক)।
৪. উদাহরণ ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, সুনামি, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। পারমাণবিক বিস্ফোরণ, শিল্প দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, দাঙ্গা ইত্যাদি।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার