নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 6 দূর্যোগ ও বিপর্যয়, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২

অধ্যায় ৬: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (পর্ব-১)

১. দুর্যোগ (Hazard) কী?

উত্তর দেখো
প্রকৃতি বা মানুষের কার্যাবলির মাধ্যমে সৃষ্ট যে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি করে, তাকে দুর্যোগ বলে। যতক্ষণ না বড় ক্ষতি হচ্ছে, ততক্ষণ এটি শুধুই দুর্যোগ।

২. প্রধান কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম লেখো।

উত্তর দেখো
প্রধান কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো—ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, ঘূর্ণিঝড়, সুনামি, খরা, বন্যা, ভূমিধস এবং তুষারঝড় বা হিমানী সম্প্রপাত।

৩. মানুষের তৈরি দুর্যোগগুলো কী কী?

উত্তর দেখো
মানুষের অবৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগগুলো হলো—পারমাণবিক বিস্ফোরণ, রাসায়নিক গ্যাস দুর্ঘটনা (যেমন- ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা), যুদ্ধবিগ্রহ, দাঙ্গা, অরণ্যবিনাশ এবং শিল্প দুর্ঘটনা।

৪. দুর্যোগ কত প্রকার ও কী কী?

উত্তর দেখো
উৎপত্তি অনুসারে দুর্যোগ প্রধানত তিন প্রকার। যথা—
১) প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন- ভূমিকম্প),
২) আধা-প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন- নদীবাঁধ ভাঙা বন্যা), এবং
৩) মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ (যেমন- পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ)।

৫. বিপর্যয় (Disaster) কী?

উত্তর দেখো
দুর্যোগের প্রভাবে যখন জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, সমাজ জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটে যা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সেই চরম অবস্থাকে বিপর্যয় বলে। যেমন—আইলা বা আম্ফানের ধ্বংসলীলা।

৬. পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন জেলা অত্যন্ত বন্যাপ্রবণ?

উত্তর দেখো
পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত বন্যাপ্রবণ জেলাগুলি হলো—মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া এবং হুগলি।

৭. অসম অত্যন্ত বন্যাপ্রবণ রাজ্য কেন?

উত্তর দেখো
অসমের মাঝখান দিয়ে বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ প্রবাহিত হয়েছে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং হিমালয় থেকে নেমে আসা বরফগলা জলের কারণে ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলিতে জল উপচে পড়ে। এছাড়া নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় জল ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে অসমে প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যা হয়।

৮. খরা (Drought) কাকে বলে?

উত্তর দেখো
কোনো অঞ্চলে একটানা দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়া বা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫% কম বৃষ্টিপাত হলে যে চরম শুষ্ক অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং যার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় ও জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়, তাকে খরা বলে।

৯. পশ্চিমবঙ্গের খরাপ্রবণ জেলাগুলির নাম কী কী?

উত্তর দেখো
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান খরাপ্রবণ জেলাগুলি হলো—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর (পশ্চিমাংশ) এবং বীরভূম। এই অঞ্চলটি মালভূমি প্রকৃতির এবং বৃষ্টিপাত খুব কম হয়।

১০. ভারতে ঘূর্ণিঝড় প্রভাবিত রাজ্যগুলির নাম লেখো।

উত্তর দেখো
ভারতের পূর্ব উপকূলের রাজ্যগুলি ঘূর্ণিঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন—ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ু। পশ্চিম উপকূলের গুজরাট ও মহারাষ্ট্রেও ঘূর্ণিঝড় দেখা যায়।

১১. টর্নেডো (Tornado) কী?

উত্তর দেখো
টর্নেডো হলো স্থলভাগের ওপর সৃষ্ট অত্যন্ত শক্তিশালী, ধ্বংসাত্মক এবং ফানেল আকৃতির একটি ঘূর্ণি বায়ুপ্রবাহ। এটি খুব কম সময় স্থায়ী হয় কিন্তু এর গতিবেগ ঘন্টায় ৪০০-৫০০ কিমি পর্যন্ত হতে পারে এবং এটি প্রবল ধ্বংসলীলা চালায়।

১২. ভূমিধস (Landslide) কী?

উত্তর দেখো
পার্বত্য অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত বা ভূমিকম্পের কারণে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে আলগা মাটি, শিলাখণ্ড বা পাথরের স্তূপ যখন হঠাৎ ওপর থেকে নিচে খসে পড়ে, তখন তাকে ভূমিধস বলে। দার্জিলিং জেলায় এটি প্রায়ই ঘটে।

১৩. সুনামি (Tsunami) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
‘সুনামি’ একটি জাপানি শব্দ যার অর্থ ‘পোতাশ্রয়ের ঢেউ’। সমুদ্রের তলদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সমুদ্রের জল বিশাল উঁচু ঢেউয়ের আকারে উপকূলভাগে আছড়ে পড়ে যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চালায়, তাকে সুনামি বলে।

১৪. হিমানী সম্প্রপাত (Avalanche) কী?

উত্তর দেখো
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বা মেরু প্রদেশে জমে থাকা বিশাল বরফের স্তূপ যখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে বা ভূমিকম্পের প্রভাবে পাহাড়ের গা বেয়ে প্রচণ্ড বেগে নিচে নেমে আসে, তখন তাকে হিমানী সম্প্রপাত বলে।

১৫. তুষার ঝড় (Blizzard) কী?

উত্তর দেখো
মেরু অঞ্চল বা উচ্চ অক্ষাংশে প্রবল বেগে প্রবাহিত বাতাসের সাথে যখন প্রচুর পরিমাণে তুষারপাত হয় এবং দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, তখন তাকে তুষার ঝড় বলে। এটি জনজীবন অচল করে দেয়।

১৬. অগ্ন্যুৎপাত কীভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে?

উত্তর দেখো
অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত লাভা, ছাই ও বিষাক্ত গ্যাস পরিবেশ দূষিত করে এবং আশেপাশের জনবসতি, কৃষিজমি ও বনভূমি ধ্বংস করে দেয়। এছাড়া এর ফলে ভূমিকম্প ও সুনামির সৃষ্টি হতে পারে এবং বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

১৭. দাবানল (Forest Fire) কী?

উত্তর দেখো
প্রাকৃতিক কারণে (বজ্রপাত, গাছে-গাছে ঘর্ষণ) বা মানুষের অসাবধানতায় (জ্বলন্ত বিড়ি-সিগারেট ফেলা) বনভূমিতে যে আগুন লাগে এবং তা দ্রুত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে উদ্ভিদ ও প্রাণী ধ্বংস করে, তাকে দাবানল বলে।

১৮. ‘জল ধরো ও জল ভরো’ কর্মসূচি কী?

উত্তর দেখো
এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি বিশেষ প্রকল্প। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করা এবং পুকুর, খাল, বিল খনন বা সংস্কার করে সেখানে জল ধরে রাখা, যাতে খরা বা শুষ্ক ঋতুতে সেই জল চাষবাস ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়।

১৯. QRT (Quick Response Team) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
বিপর্যয় মোকাবিলায় বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত দল, যারা কোনো দুর্যোগ ঘটার সাথে সাথে অত্যন্ত দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে, তাদের কুইক রেসপন্স টিম বা QRT বলে।

২০. ঘূর্ণিঝড় (Cyclone) কী?

উত্তর দেখো
গভীর সমুদ্রে সৃষ্ট শক্তিশালী নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে চারপাশ থেকে বাতাস যখন কুণ্ডলী পাকিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসে, তখন তাকে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন বলে। এর প্রভাবে প্রবল ঝড় ও বৃষ্টিপাত হয়। যেমন—আইলা, আম্ফান।

২১. মেঘ ভাঙা বৃষ্টি (Cloud Burst) কী?

উত্তর দেখো
পার্বত্য অঞ্চলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে (সাধারণত ১ ঘন্টায় ১০০ মিমির বেশি) কোনো নির্দিষ্ট ছোট এলাকায় যখন অত্যন্ত প্রবল মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়, তখন তাকে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি বলে। এর ফলে হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড সৃষ্টি হয়।

২২. হড়পা বান (Flash Flood) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
মেঘ ভাঙা বৃষ্টি বা অত্যধিক বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি নদী বা নালা দিয়ে যখন হঠাৎ করে প্রবল বেগে বিপুল জলরাশি নিচে নেমে আসে এবং ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখন তাকে হড়পা বান বলে। এটি খুব কম সময়ের নোটিশে ঘটে।

২৩. অগ্ন্যুৎপাত (Volcanic Eruption) কী?

উত্তর দেখো
ভূ-অভ্যন্তরের প্রচণ্ড তাপে ও চাপে গলিত শিলা (ম্যাগমা), ছাই, গ্যাস ও জলীয় বাষ্প যখন ভূপৃষ্ঠের কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে প্রবল বেগে বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে অগ্ন্যুৎপাত বলে।

২৪. NIDM কী?

উত্তর দেখো
NIDM-এর পুরো কথাটি হলো National Institute of Disaster Management। এটি ভারতের একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং নীতি নির্ধারণের কাজ করে।

২৫. বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা (Disaster Management) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি কমানো, উদ্ধারকার্য চালানো, ত্রাণ বণ্টন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য যে সুসংহত পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাকে সামগ্রিকভাবে বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা বলে।

[Image of disaster management cycle diagram]

২৬. বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার ধাপগুলি কী কী?

উত্তর দেখো
বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার প্রধান তিনটি ধাপ হলো—
১) বিপর্যয়-পূর্ব পর্যায়: প্রস্তুতি ও প্রশমন (যেমন- আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি)।
২) বিপর্যয়কালীন পর্যায়: উদ্ধারকার্য ও ত্রাণ বণ্টন।
৩) বিপর্যয়-পরবর্তী পর্যায়: পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ।

২৭. দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মধ্যে একটি প্রধান পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো
দুর্যোগ হলো বিপদের সম্ভাবনা বা কারণ, আর বিপর্যয় হলো তার ধ্বংসাত্মক ফলাফল। সব দুর্যোগ বিপর্যয়ে পরিণত হয় না, কিন্তু সব বিপর্যয়ের পেছনেই কোনো না কোনো দুর্যোগ থাকে।

২৮. ভূমিকম্প কী?

উত্তর দেখো
ভূ-অভ্যন্তরে হঠাৎ কোনো কম্পন সৃষ্টি হলে, সেই কম্পন যখন তরঙ্গ আকারে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষণিকের জন্য ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠে, তখন তাকে ভূমিকম্প বলে। এটি একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

২৯. আধা-প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Quasi-natural Hazard) কাকে বলে?

উত্তর দেখো
যে সমস্ত দুর্যোগের পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষেরও হাত থাকে, তাদের আধা-প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে। যেমন—নদীবাঁধ ভাঙা বন্যা, ভূমিক্ষয় বা ধস (গাছ কাটার ফলে)।

৩০. নদীপাড় ভাঙন (River Bank Erosion) কী?

উত্তর দেখো
নদীর জলস্রোতের আঘাতে বা গতিপথ পরিবর্তনের ফলে নদীর পাড়ের মাটি ধসে গিয়ে জনবসতি ও কৃষিজমি নদীতে তলিয়ে যাওয়াকে নদীপাড় ভাঙন বলে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এটি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।

৩১. ভূমি অবনমন (Land Subsidence) কী?

উত্তর দেখো
ভূ-অভ্যন্তর থেকে খনিজ (যেমন- কয়লা) বা জল অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে মাটির নিচের স্তর ফাঁপা হয়ে গেলে ওপরের মাটি হঠাৎ বসে যায় বা ধসে যায়। একে ভূমি অবনমন বলে। আসানসোল-রানিগঞ্জ খনি অঞ্চলে এটি প্রায়ই ঘটে।

৩২. আম্ফান (Amphan) কী?

উত্তর দেখো
আম্ফান ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা ‘সুপার সাইক্লোন’। এটি ২০২০ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার উপকূলে আছড়ে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।

৩৩. বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধের ভূমিকা কী?

উত্তর দেখো
নদীর অতিরিক্ত জল ধরে রেখে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা বাঁধের প্রধান কাজ। কিন্তু অনেক সময় জলাধারে অতিরিক্ত জল জমে গেলে বা বাঁধ থেকে হঠাৎ জল ছাড়লে তা আরও ভয়াবহ বন্যার (Man-made flood) কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৩৪. বিপর্যয় মোকাবিলায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা কী?

উত্তর দেখো
ছাত্রছাত্রীরা জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে, গুজবে কান না দিয়ে সঠিক তথ্য ছড়াতে পারে, প্রাথমিক চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে এবং ত্রাণ বিতরণে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে পারে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার