নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় -6 দূর্যোগ ও বিপর্যয় বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্ন উত্তর মান 3
অধ্যায় ৬: বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর (পর্ব-১)
১. দুর্যোগের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
দুর্যোগ (Hazard) হলো পরিবেশের এমন একটি অস্বাভাবিক অবস্থা, যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- বিপদের সম্ভাবনা: দুর্যোগ হলো বিপদের একটি সম্ভাব্য কারণ বা উৎস। এটি সর্বদা ধ্বংসাত্মক হয় না, তবে জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির একটি প্রবল সম্ভাবনা তৈরি করে।
- প্রকৃতি: এটি প্রাকৃতিক (যেমন- ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প) এবং মনুষ্যসৃষ্ট (যেমন- পারমাণবিক বিস্ফোরণ, গ্যাস লিক)—উভয় প্রকারই হতে পারে।
- সতর্কবার্তা: দুর্যোগকে বিপর্যয়ের পূর্বসুরী বা সতর্কবার্তা বলা যেতে পারে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে দুর্যোগকে বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে আটকানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
২. বিপর্যয় নির্ধারণের মানদণ্ডগুলি কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
কোনো প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক ঘটনাকে তখনই ‘বিপর্যয়’ (Disaster) আখ্যা দেওয়া হয়, যখন তা নিম্নলিখিত মানদণ্ডগুলি পূরণ করে:
- ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি: ঘটনাটির প্রভাবে যদি বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়, প্রচুর মানুষ আহত হয় এবং ঘরবাড়ি, গবাদি পশু ও সম্পত্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
- সমাজ ব্যবস্থা স্তব্ধ: আক্রান্ত অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিকাঠামো যদি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
- নিজস্ব ক্ষমতার বাইরে: পরিস্থিতি যদি এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, স্থানীয় প্রশাসন বা জনগণের পক্ষে তা মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরের সাহায্যের প্রয়োজন হয়।
৩. বিপর্যয়ের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
বিপর্যয়ের (Disaster) মূল বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
- বাস্তব ঘটনা ও ধ্বংসলীলা: দুর্যোগ যখন বাস্তবে ঘটে এবং চরম ধ্বংসলীলা চালায়, তখনই তা বিপর্যয়। এর ফলে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়।
- আকস্মিকতা ও অনিশ্চয়তা: অধিকাংশ বিপর্যয় (যেমন- ভূমিকম্প, সুনামি, হড়পা বান) অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ঘটে, ফলে মানুষ প্রস্তুতির সুযোগ পায় না।
- দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব: বিপর্যয়ের রেশ বা ট্রমা (Trauma) ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়। পুনর্বাসনের পরেও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে অনেক সময় লাগে।
৪. সাম্প্রতিক উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয়ের (২০১৩/২০২১) কারণগুলো কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
দেবভূমি উত্তরাখণ্ডে বারবার হড়পা বান বা ভূমিধসের (যেমন- কেদারনাথ ২০১৩, চামোলি ২০২১) পেছনে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট—উভয় কারণই দায়ী:
- মেঘভাঙা বৃষ্টি (Cloud Burst): খুব অল্প সময়ে প্রবল মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে অলকানন্দা, ভাগীরথী প্রভৃতি নদীতে জলস্তর বিপদসীমার অনেক ওপরে উঠে যায়।
- হিমবাহ গলন ও হ্রদ বিস্ফোরণ: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলে যাচ্ছে। অনেক সময় হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদের দেওয়াল ফেটে গিয়ে বিপুল জলরাশি নিচে নেমে আসে (GLOF), যা চামোলি বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল।
- অবৈজ্ঞানিক নির্মাণ ও বাঁধ: জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নদীতে বাঁধ দেওয়া, পাহাড় কেটে চওড়া রাস্তা ও হোটেল তৈরির ফলে এখানকার বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
৫. বন্যা হয় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
বন্যা সৃষ্টির কারণগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) প্রাকৃতিক কারণ:
- একটানা প্রবল মৌসুমী বৃষ্টিপাত বা মেঘভাঙা বৃষ্টি।
- হিমালয়ের বরফ গলা জলের আধিক্য।
- নদীর তলদেশে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়া (নাব্যতা হ্রাস), ফলে নদী অতিরিক্ত জল ধারণ করতে পারে না।
খ) মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:
- জলাধার বা বাঁধ থেকে বর্ষাকালে হঠাৎ অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেওয়া (যেমন- ডিভিসি-র জল ছাড়া)।
- শহরাঞ্চলের জলাভূমি ভরাট করে বসতি নির্মাণ, ফলে জল নিকাশি ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া।
- নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন, যার ফলে মাটির জলশোষণ ক্ষমতা কমে যায়।
৬. বন্যার ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
বন্যা জনজীবন ও অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে:
- জীবনহানি ও বাস্তুচ্যুতি: বন্যায় মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে এবং ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
- কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষতি: মাঠের ফসল পচে নষ্ট হয় এবং উর্বর কৃষিজমির ওপর বালির স্তর পড়ে জমি চাষের অযোগ্য হয়ে যায়। এতে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে।
- স্বাস্থ্য সংকট ও মহামারী: বন্যার জল সরে যাওয়ার পর পানীয় জল দূষিত হয়ে পড়ে। এর ফলে কলেরা, টাইফয়েড, আন্ত্রিক প্রভৃতি জলবাহিত রোগ মহামারী আকারে দেখা দেয়।
৭. বন্যার সময় কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি?
বিস্তারিত উত্তর
বন্যার সময় জীবন বাঁচাতে নিম্নলিখিত সতর্কতাগুলি অবলম্বন করা উচিত:
- নিরাপদ আশ্রয়: যত দ্রুত সম্ভব নিচু এলাকা ছেড়ে উঁচু এবং নিরাপদ স্থানে (যেমন- পাকা বাড়ির ছাদ, স্কুল বাড়ি বা বাঁধের ওপর) আশ্রয় নিতে হবে।
- খাবার ও জল মজুত: পর্যাপ্ত পরিমাণে শুকনো খাবার (চিঁড়ে, গুড়, বিস্কুট), বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং জরুরি ওষুধ (ওআরএস, প্যারাসিটামল) হাতের কাছে মজুত রাখতে হবে।
- সতর্কতা: বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বা মেইন সুইচ বন্ধ করে দিতে হবে। বন্যার জলে সাপ বা বিষাক্ত পোকা ভেসে আসে, তাই এ ব্যাপারে বিশেষ সাবধান থাকতে হবে।
৮. খরার ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি বিস্তারিত লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
খরা একটি ধীর গতির বিপর্যয়, কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী:
- ফসলহানি ও খাদ্য সংকট: জলের অভাবে সেচকার্য ব্যাহত হয় এবং কৃষিকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গিয়ে দুর্ভিক্ষ বা আকাল দেখা দিতে পারে।
- তীব্র জলকষ্ট: নদী, পুকুর ও জলাশয় শুকিয়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যায়। ফলে পানীয় জলের তীব্র হাহাকার দেখা দেয়।
- অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: কৃষকদের আয় কমে যায়, গবাদি পশুর খাদ্য সংকট (Fodder crisis) দেখা দেয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে।
৯. খরার মোকাবিলায় কী কী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি?
বিস্তারিত উত্তর
খরা প্রতিরোধের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন:
- বৃষ্টির জল সংরক্ষণ: ‘জল ধরো জল ভরো’ প্রকল্পের আওতায় বৃষ্টির জল পুকুর, দিঘি বা ট্যাঙ্কে ধরে রাখতে হবে এবং কূপ বা নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জ (Recharge) করতে হবে।
- শস্য নির্বাচন ও সেচ: যে সমস্ত ফসলে কম জল লাগে (যেমন- মিলেট, ডাল, তৈলবীজ) সেগুলি চাষ করতে হবে এবং জলের অপচয় কমাতে ‘বিন্দু সেচ’ বা ‘স্প্রিংকলার’ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
- ব্যাপক বনসৃজন: গাছ মাটি ধরে রাখে এবং বাষ্পমোচনের মাধ্যমে বাতাসে আর্দ্রতা যোগ করে বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে, তাই প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে।
১০. ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ঘূর্ণিঝড়ের (যেমন- আম্ফান, আইলা) প্রভাব বহুমুখী এবং ধ্বংসাত্মক:
- ঝড়ের তাণ্ডব ও ধ্বংসলীলা: প্রবল বেগে বাতাসের (ঘন্টায় ১০০-২০০ কিমি) আঘাতে কাঁচা ঘরবাড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি, টেলিফোন টাওয়ার ও বড় বড় গাছ উপড়ে যায়।
- জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্রের জল ফুলে উঠে (স্টর্ম সার্জ) উপকূলীয় এলাকা ও কৃষিজমি প্লাবিত করে। নোনা জল ঢুকে মিষ্টি জলের পুকুর এবং উর্বর কৃষিজমি নষ্ট করে দেয়, যা চাষবাসের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।
- পরিকাঠামো ও যোগাযোগ বিপর্যয়: রাস্তাঘাট জলে ডুবে যায় বা গাছ পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। টেলিফোন, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ পরিষেবা দিনের পর দিন বিচ্ছিন্ন থাকে।
১১. ঘূর্ণিঝড়ের সময় কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি?
বিস্তারিত উত্তর
ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি নেওয়া দরকার:
- আবহাওয়ার খবর: রেডিও, টিভি বা ইন্টারনেটে আবহাওয়ার সতর্কবার্তার ওপর নিয়মিত নজর রাখতে হবে এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।
- নিরাপদ আশ্রয়: ঝড় শুরু হওয়ার আগেই কাঁচা বাড়ি ছেড়ে মজবুত পাকা বাড়ি বা সরকারি ‘সাইক্লোন শেল্টারে’ আশ্রয় নিতে হবে। গবাদি পশুদেরও নিরাপদ স্থানে সরাতে হবে।
- গৃহস্থালি সতর্কতা: ঝড়ের সময় ঘরের দরজা-জানালা শক্ত করে বন্ধ রাখতে হবে এবং দুর্ঘটনার এড়াতে ইলেকট্রিক মেইন সুইচ বন্ধ করে দিতে হবে। শুকনো খাবার, মোমবাতি, দেশলাই ও জরুরি ওষুধ হাতের কাছে রাখতে হবে।
১২. ভূমিকম্প হওয়ার প্রধান কারণগুলি কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণগুলিকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
- পাত সঞ্চালন (Plate Tectonics): এটিই ভূমিকম্পের প্রধান প্রাকৃতিক কারণ। ভূত্বকের নিচে থাকা পাতগুলি সর্বদা চলমান। যখন দুটি পাত একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় (অভিসারী) বা সরে যায় (অপসারী), তখন সংযোগস্থলে প্রবল ঘর্ষণ ও কম্পনের সৃষ্টি হয়।
- অগ্ন্যুৎপাত: আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা নির্গত হওয়ার সময় বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ভেতরে গ্যাসের চাপে বিস্ফোরণ ঘটলে আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা কেঁপে ওঠে।
- মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: বড় জলাধারের জলের চাপে (যেমন- কয়না বাঁধ), খনি অঞ্চলে ডিনামাইট বিস্ফোরণে বা ধস নামার ফলেও স্থানীয়ভাবে ভূমিকম্প হতে পারে।
১৩. হিমালয় অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ কেন?
বিস্তারিত উত্তর
হিমালয় একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বত এবং এটি বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এর কারণগুলি হলো:
- পাত সীমানা: ভূতাত্ত্বিকভাবে হিমালয় পর্বত ‘ভারতীয় পাত’ এবং ‘ইউরেশীয় পাত’-এর সংযোগস্থলে (Collision Zone) অবস্থিত।
- অবিরাম সংঘর্ষ: এই দুটি পাতের মধ্যে এখনও সংঘর্ষ চলছে এবং ভারতীয় পাতটি প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার করে ইউরেশীয় পাতের নিচে ঢুকে যাচ্ছে (Subduction)।
- অস্থিতিশীল গঠন: ভূ-অভ্যন্তরের এই ক্রমাগত চাপ এবং শিলাস্তরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এখানে জমে থাকা শক্তি মাঝেমধ্যেই কম্পন বা ভূমিকম্পের আকারে বেরিয়ে আসে।
১৪. ভারতের প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল কোনগুলি?
বিস্তারিত উত্তর
ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (BIS) ভারতকে সিসমিক জোন অনুযায়ী ৫টি ভাগে ভাগ করেছে। এর মধ্যে অত্যন্ত তীব্র ও বিপজ্জনক অঞ্চলগুলি হলো:
- জোন ৫ (অতি তীব্র): সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত (অসম, অরুণাচল), জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চল এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।
- জোন ৪ (তীব্র): দিল্লি, সিকিম, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ (দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি) এবং বিহার-নেপাল সীমান্ত এলাকা।
১৫. ভূমিকম্পের ফলে কী কী ঘটনা বা বিপর্যয় ঘটে?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকম্পের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং ধ্বংসাত্মক:
- ভৌত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি: প্রবল কম্পনের ফলে বাড়িঘর, হাসপাতাল, সেতু, বাঁধ ভেঙে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বহু মানুষ ও প্রাণীর মৃত্যু হয়।
- সুনামি ও জলোচ্ছ্বাস: সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্প হলে বিশাল সামুদ্রিক ঢেউ বা সুনামি সৃষ্টি হয় যা উপকূলীয় সভ্যতাকে ধুয়েমুছে দেয়।
- প্রাকৃতিক পরিবর্তন: ভূপৃষ্ঠে ফাটল সৃষ্টি হয়, পার্বত্য এলাকায় ধস নামে, নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং কখনো কখনো ভূমির উত্থান বা পতন ঘটে।
- আগুন ও বন্যা: গ্যাস লাইন ফেটে বা বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে আগুন লাগতে পারে এবং বাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
১৬. ভূমিকম্প বিপর্যয়ের সময় কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকম্প চলাকালীন জীবন বাঁচাতে মাথা ঠান্ডা রেখে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:
- দ্রুত বেরিয়ে আসা: কম্পন অনুভূত হওয়ার সাথে সাথে যত দ্রুত সম্ভব ঘর বা বহুতল থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় চলে আসতে হবে।
- Drop, Cover and Hold on: বের হতে না পারলে ঘরের কোণে বা শক্ত টেবিল/খাটের নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং হাত দিয়ে মাথা বাঁচাতে হবে।
- সিঁড়ি ব্যবহার: বহুতল থেকে নামার সময় লিফট কখনোই ব্যবহার করা যাবে না, সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে।
- নিরাপদ দূরত্ব: ইলেকট্রিক খুঁটি, বড় গাছ, কাঁচের জানালা বা জরাজীর্ণ বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হবে।
১৭. ভূমিধস (Landslide) হওয়ার কারণ কী?
বিস্তারিত উত্তর
পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবিক উভয় কারণই কাজ করে:
- প্রাকৃতিক কারণ: একটানা প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে মাটি ও শিলাস্তর নরম ও ভারী হয়ে যায়, যা মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচে নেমে আসে। এছাড়া ভূমিকম্পের কম্পন এবং নদীর স্রোতে পাহাড়ের নিচের মাটি ক্ষয়ে যাওয়াও ধসের কারণ।
- মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: পাহাড়ের ঢালে নির্বিচারে গাছ কাটা (বৃক্ষচ্ছেদন) হলো প্রধান কারণ, কারণ গাছের শিকড় মাটি ধরে রাখে। এছাড়া রাস্তা বা বহুতল তৈরির জন্য পাহাড় কাটা, ডিনামাইট ফাটানো এবং অবৈজ্ঞানিক চাষবাস (ঝুম চাষ) ধসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
১৮. ভূমিধস প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করা প্রয়োজন:
- ব্যাপক বনসৃজন: পাহাড়ি ঢালে প্রচুর পরিমাণে স্থানীয় প্রজাতির গাছ এবং ঘাস লাগাতে হবে। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে এবং ধস প্রতিরোধ করে।
- উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থা: বৃষ্টির জল যাতে পাহাড়ের ফাটলে ঢুকে মাটিকে আলগা না করে, তার জন্য পাহাড়ের গা বেয়ে বিজ্ঞানসম্মত ‘নিকাশি নালা’ (Drainage system) তৈরি করতে হবে।
- নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ: ধসপ্রবণ এলাকায় ভারী নির্মাণকাজ, বহুতল হোটেল এবং রাস্তা চওড়া করার কাজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।
১৯. সুনামি হওয়ার কারণ কী?
বিস্তারিত উত্তর
সমুদ্রে বিশাল বিধ্বংসী ঢেউ বা সুনামি সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি হলো:
- সমুদ্রতলে ভূমিকম্প: এটিই সুনামির প্রধান কারণ। সমুদ্রের তলদেশে টেকটনিক পাতের চলনের ফলে যদি তীব্র ভূমিকম্প (রিখটার স্কেলে ৭-এর বেশি) হয়, তবে উপরের জলরাশি প্রবলভাবে আলোড়িত হয় এবং বিশাল ঢেউয়ের সৃষ্টি করে।
- সমুদ্রগর্ভে অগ্ন্যুৎপাত: সমুদ্রের নিচে থাকা আগ্নেয়গিরিতে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটলে বিপুল পরিমাণ জল স্থানচ্যুত হয় এবং সুনামি সৃষ্টি হয়।
- ধস বা উল্কাপাত: সমুদ্রের তলদেশে বিশাল ভূমিধস নামলে বা মহাকাশ থেকে বড় উল্কা সমুদ্রে পড়লে তার অভিঘাতেও সুনামি হতে পারে।
২০. সুনামির ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
সুনামির প্রভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবর্ণনীয় ধ্বংসলীলা চলে:
- প্লাবন ও ধ্বংসলীলা: সমুদ্রের বিশাল ঢেউ (৩০-৪০ ফুট উঁচু হতে পারে) প্রবল বেগে উপকূলে আছড়ে পড়ে। এতে বন্দর, জেটি, নৌকা, হোটেল এবং জনবসতি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।
- ব্যাপক প্রাণহানি: সুনামির পূর্বাভাস না পেলে মানুষ পালানোর সুযোগ পায় না। জলে ডুবে বহু মানুষ ও প্রাণীর মৃত্যু হয় (২০০৪ সালের সুনামিতে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল)।
- পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়: নোনা জল লোকালয়ে ঢুকে মিষ্টি জলের উৎস নষ্ট করে। ধ্বংসস্তূপ ও মৃতদেহ পচে মহামারী ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
২১. সুনামি রোধে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে?
বিস্তারিত উত্তর
সুনামি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, একে পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতে পারে:
- সতর্কতা ও প্রযুক্তি: মহাসাগরে ‘সুনামি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ (Tsunami Warning System) বসানো প্রয়োজন। ভূমিকম্পের পরপরই সুনামির সতর্কবার্তা পেলে উপকূল দ্রুত খালি করা সম্ভব।
- জৈব সুরক্ষা প্রাচীর: উপকূল বরাবর ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য বা ঝাউবন তৈরি করা উচিত। এই অরণ্য ঢেউয়ের গতিবেগ কমিয়ে লোকালয়কে রক্ষা করে।
- কাঠামোগত ব্যবস্থা: সমুদ্র উপকূলে কংক্রীটের উঁচু বাঁধ বা ‘সি-ওয়াল’ (Sea Wall) এবং টেট্রাপড ব্যবহার করে জলোচ্ছ্বাস আটকানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
২২. কী কী কারণে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় ঘটে?
বিস্তারিত উত্তর
মানুষের অসতর্কতা, লোভ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে যে বিপর্যয়গুলো ঘটে, তার কারণগুলি হলো:
- শিল্প ও রাসায়নিক দুর্ঘটনা: কলকারখানায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিষাক্ত গ্যাস লিক (যেমন- ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা) বা বয়লার বিস্ফোরণ।
- তেজস্ক্রিয়তা ও পারমাণবিক বিপদ: পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি (যেমন- চেরনোবিল, ফুকুশিমা) বা পরমাণু বোমার ব্যবহার ও পরীক্ষা।
- যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ: আধুনিক মারণাস্ত্র, বোমা বিস্ফোরণ, বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসলীলা।
- পরিবেশ দূষণ: সমুদ্রে তেলের ট্যাঙ্কার ডুবে তেল চুঁইয়ে পড়া (Oil Spill), প্লাস্টিক দূষণ এবং রাসায়নিক বর্জ্য মিশে জল ও মাটি বিষাক্ত হওয়া।
২৩. ২০১৮ সালে কেরলে ভয়াবহ বন্যার কারণ লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
২০১৮ সালে কেরলের শতাব্দীর সেরা বন্যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল:
- অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত: সেবার বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে (প্রায় ৪২% বেশি) একটানা মৌসুমি বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
- বাঁধের অব্যবস্থাপনা: রাজ্যের ৩৫টি বড় বাঁধ বৃষ্টির জলে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায়, প্রশাসন বাধ্য হয়ে একযোগে সব বাঁধ থেকে বিপুল পরিমাণ জল ছেড়ে দেয়, যা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে।
- পরিবেশ বিনাশ: পশ্চিমঘাট পর্বতের জঙ্গল নির্বিচারে কাটা এবং জলাভূমি ভরাট করার ফলে মাটির জল ধারণক্ষমতা কমে গিয়েছিল এবং নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়েছিল।
২৪. দাবানলের কারণ ও ফলাফল সংক্ষেপে লেখো। (Bonus)
বিস্তারিত উত্তর
দাবানলের কারণ:
- প্রাকৃতিক: বজ্রপাত, অগ্ন্যুৎপাতের লাভা, ঝড়ের সময় শুকনো ডালপালায় ঘর্ষণ এবং গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপে শুকনো পাতায় আগুন লাগা।
- মনুষ্যসৃষ্ট: পর্যটকদের ফেলে দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট, ক্যাম্প ফায়ার না নেভানো এবং জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য বা পশুখাদ্যের লোভে ইচ্ছাকৃত আগুন লাগানো।
ফলাফল: বিস্তীর্ণ বনভূমি ভস্মীভূত হয়, বন্যপ্রাণী মারা যায় ও তাদের বাসস্থান নষ্ট হয়। প্রচুর কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়ে বায়ুদূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়।
২৫. দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি লেখো। (Bonus)
বিস্তারিত উত্তর
| বিষয় | দুর্যোগ (Hazard) | বিপর্যয় (Disaster) |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা | পরিবেশের যে অস্বাভাবিক অবস্থা বিপদের সম্ভাবনা তৈরি করে। | দুর্যোগের প্রভাবে যখন জানমালের ব্যাপক ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে। |
| ২. ক্ষয়ক্ষতি | এতে বিশেষ ক্ষয়ক্ষতি হয় না, এটি ক্ষতির কারণ মাত্র। | এতে প্রচুর জীবন ও সম্পত্তির বিনাশ ঘটে, এটি ধ্বংসাত্মক ফলাফল। |
| ৩. সম্পর্ক | সব দুর্যোগ বিপর্যয় নয় (যেমন- জনহীন স্থানে ভূমিকম্প)। | সব বিপর্যয়ের মূলেই কোনো না কোনো দুর্যোগ থাকে। |
২৬. নদীপাড় ভাঙন প্রতিরোধের উপায় কী কী? (Bonus)
বিস্তারিত উত্তর
নদীপাড় ভাঙন রোধে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করা যেতে পারে:
- সবুজায়ন: নদীর পাড় বরাবর প্রচুর পরিমাণে গাছ বা শিকড়যুক্ত ঘাস (যেমন- ভেটিভার ঘাস) লাগাতে হবে। গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রেখে ভাঙন রোধ করে।
- বাঁধ নির্মাণ: ভাঙনপ্রবণ এলাকায় নদীর পাড়ে বোল্ডার, ইটের গাঁথনি বা কংক্রীটের বাঁধ (Embankment) দিয়ে পাড়কে সুরক্ষিত করতে হবে।
- বালি তোলা নিয়ন্ত্রণ: নদীগর্ভ থেকে অতিরিক্ত বালি বা পাথর তোলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কারণ এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পাড়ের ক্ষতি করে।
২৭. বিপর্যয় মোকাবিলায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা আলোচনা করো। (Bonus)
বিস্তারিত উত্তর
ছাত্রছাত্রীরা সমাজের সচেতন অংশ হিসেবে বিপর্যয় ব্যবস্থাপনায় ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ (First Responder)-এর ভূমিকা পালন করতে পারে:
- সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার ও প্রতিবেশীদের দুর্যোগ সম্পর্কে সতর্ক করা এবং মক ড্রিল (Mock Drill)-এ অংশ নিতে উৎসাহিত করা।
- সঠিক তথ্য প্রচার: দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে এবং গুজব ছড়াতে বাধা দিয়ে প্রশাসনের সঠিক সতর্কবার্তা ও নির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
- ত্রাণ ও সেবা: বিপর্যয়ের পর ত্রাণ শিবিরে খাবার, জল ও ওষুধ বিতরণে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসায় সাহায্য করা।
২৮. হিমানী সম্প্রপাত বা তুষারঝড়ের কারণ ও ফলাফল লেখো। (Bonus)
বিস্তারিত উত্তর
কারণ: উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে অতিরিক্ত তুষারপাত, খাড়া ঢাল, ভূমিকম্পের কম্পন বা এমনকি জোরে শব্দ করার ফলেও বরফের স্তূপ আলগা হয়ে নিচে নেমে আসে।
ফলাফল:
- পার্বত্য রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
- পর্বতারোহী, পর্যটক এবং সীমান্তে প্রহরারত সেনাদের (যেমন- সিয়াচেন) বরফের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়।
- পাহাড়ের পাদদেশে থাকা গ্রাম বা জনবসতি হিমানী সম্প্রপাতের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়।